- 60
- 0
শহরতলির ইতিকথা
নতুন-বৌ,তার আত্মীয়দের সাহায্য নিয়ে-সেজোসহোদরার জন্য পাত্র খুঁজছে;সেজোর বক্তব্য,যারা,ওকে এমএ পড়ার সুযোগ দেবে,সেখানেই সে বিয়ে করবে।
এদিকে,রাজীব খবর পেল,তার ছোট সহোদরা,পড়াশোনার তুলনায়,প্রেম করতে বেশ পটু হয়েছে; স্কুলের ছেলে-মেয়ে,ও-পথে গেলে তার যে পড়াশোনায় মনোযোগ নেই, তা বলাই বাহুল্য;প্রেম স্বাস্থ্যকর,তবে বিপজ্জনকও বটে,এবং স্কুলের গণ্ডীতে প্রেম এলে তো আর, কহতব্য নয়;সুতরাং,সব জানিয়ে,হৈমবতীর সঙ্গে দেশের বাড়িতে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এক পাত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে; বিয়ের পরই, তার বৌ ছেড়ে চলে গেছে;
ছেলেটি,লেখাপড়া পছন্দ করে, সেজোসহোদরা, নিজে ছেলে দেখলো,পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে,তারপর মত দিল; রাজীব ও সজীব গিয়ে ছেলের দাদার
সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছে; দাদার চাহিদামত দু'হাজার টাকা নগদ দিয়েও এলো;রাজীবের দায় না,সে যে পড়িয়েছে; না,সজীব ,এক পয়সার ফাদার-মাদার,নিজেদের আসা-যাওয়ার খরচাও সবই, ঐ রাজীবের ঘাড় দিয়েই হচ্ছে; এবার সোনা-দানা তো কিছু দিতেই হয়,যদিও ছেলেদের দিক থেকে কিছুই বলেনি। ঘরের গদরেজ আলমারি-তে ,হৈমবতীর কিছু থাকলেও থাকতে পারে ভেবে,সেজোসহোদরাকে বললো,
"দেখ খুলে,কিছু পাওয়া যায় কি না।"
সেজোসহোদরা ও সেজভাই মিলে খুলে যা পাওয়া গেল,ঐ দিয়ে আশীর্বাদের আংটি হয়ে গেল;সেজোসহোদরার অভিমত,"আমি,ফুলের তোড়ায় সাজবো,আমার গয়না লাগবে না।"
বিয়ের দান-সামগ্রী কেনা থেকে সব খরচই,সবই রাজীবের দায়িত্ব;আর সজীব,লোকজন খাওয়ানোর জন্য অঞ্চলের মুদিখানার দোকান থেকে ধারে প্রায় নশো টাকার মত জিনিসপত্র এনে দিল;বাকি সব দায়িত্ব রাজীবের,কারন,সে লেখাপড়া শিখিয়েছে, না! দিন স্থির হয়ে যাবার পর,কন্যাদানের জন্য হাজরামশাইকে আনবার জন্য সেজভাইকে দেশে পাঠিয়েছে। হাজরামশাই,দু'তিন আগে এসেছে;বিয়ের আচারাদি তো নতুন-বৌ কিছুই জানে না,তাই,তার এক আত্মীয়া এসেছেন,তিনিই সব জোগাড়-যন্ত্র করছেন।পাড়ার লোকে,হৈমবতীর কথা জিজ্ঞেস করছে,মেয়ের বিয়ে,আর মা উপস্থিত নেই!হয়তো,হাজরারও চক্ষু লজ্জা ঠেকছে,তাই সেজছেলেকে চুপিচুপি দেশে পাঠিয়েছে,হৈমবতীকে আনতে;আবার,দেশেও তো লোক আছে না! লোকে তো জিজ্ঞেস করবেই,"মেয়ের বিয়ে,মা---।"বিয়ের দিন বিকেল বেলায়,হৈমবতী এলো। যাই হোক,বিয়ে মিটে গেল; পরের দিন,
মেয়ে বিদায় করার সময়,আশীর্বাদের টাকাটুকুও সেই রাজীবের কাছ থেকে নিয়ে, হাজরা আশীর্বাদ করেছে। রাজীব,নিজের আগফা-ক্যামেরাতে বিদায়-কালের ছবি তুলে রাখলো।
সেজোর উক্তি,কোনোদিন আর এ বাড়ি মুখো হবো না।হায়রে!-----
ফুলশয্যার দিন রাজীব,সজীব ও ওদের ছোট সহোদরকে নিয়ে ফুলের সাজ ইত্যাদি নিয়ে সেজোর শ্বশুর বাড়িতে দুপুরে গিয়ে জানলো,ওদের গাঁয়ের নিয়ম,বৌ যেদিন ই শ্বশুর বাড়িতে আসবে,সেদিনই লোকজন সব দুপুর বেলায় বৌ দেখতে আসবে ও পাত পেড়ে খেয়ে যাবে অর্থাৎ রাজীবরা যখন দুপুর বেলায় পৌছলো,বাড়িতে আত্মীয়স্বজন নেই বললেই চলে;যাই হোক,সেজো যে রাজীবকে প্রায় মারমুখী হয়ে ব্যবহার দেখালো,তাতে আর যাই হোক না কেন, রাজীবই যে তাকে নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে সাহায্য করেছে,তা আর ভাবার কারন নেই;রাজীব,মনে দুঃখ পেলেও প্রকাশ করে না,সহোদরাকে আশীর্বাদ করে ফিরে এসেছে;হ্যাঁ,সমস্ত খরচা,মিষ্টি,ফুলের মালা ইত্যাদি, সব, সবই রাজীবের,কারন,সে অন্যায় করেছে,তাকে পড়তে সাহায্য করেছে,তাই,মুখ-ঝামটানো তো তার প্রাপ্য হবেই,এতে আর আশ্চর্য কী! মেয়েটা আজীবন যুদ্ধ করে এসেছে,তাই তাকে ক্ষমা করা যেতেই পারে।
পরের দিন,রাজীব জানালো,উনিশশো টাকা খরচা হয়েছে,অর্থাৎ অর্ধেকটা সজীব দিয়েছে,তাই কাঁচা বাজারের অর্ধেকটাও ওর মেয়েরা ভাগ করে নিয়ে চলে গেছে,না, ছেলেদের কাছে দেওয়া খরচা ধরা হবে না,অন্যান্য খরচা তো প্রশ্নই ওঠে না;রাজীব আর এ সব নিয়ে মনোমালিন্যের পথে হাঁটতে রাজী নয়।
এবার হাজরা-দম্পতির আর দেশে যাবার নাম নেই;সব গুটি গুটি গ্রামের জীবন ছেড়ে আবার শহরতলিতে জাঁকিয়ে বসেছে।ছোট-সহোদর,টেকনিক্যাল স্কুল থেকে ফিটারের ডিপ্লোমা নিয়ে,ওরই বন্ধুর একটা বন্ধ খড়কল লিজে নিয়েছে,অর্থাৎ হাজরারই অর্থের বিনিয়োগ হয়েছে। রাজীবের সংসারেও নতুন অতিথি এসেছে,খরচ আবার বাড়লো,আবার 'ঘোঘের' প্রভাব প্রকট রয়ে দেখা দিল।
হাজরামশাই,পুত্রের খড়কল দেখাশোনা করে,হিসাব-টিসাব খাতায় লেখে;ছেলেটা খুবই উদ্যোগী,মূলধন পেয়েছে,আবার নিজেও খুব পরিশ্রমী,সুতরাং,দাঁড়াতে সময় লাগলো না। না,রাজীবকে তা ঘটনাক্রমেও জানতে দেওয়া যাবেনা:শুরু হয়েছে,হৈমবতীর বাক্যবর্ষন;"তোদের না পোষালে,তোরা অন্য জায়গায় চলে যা,আমার বাড়ি,আমার কথামত থাকতে হবে।"
অতএব,চললো বাদানুবাদ ,'শাশুড়ি-বৌ'র চিরকালীন রঙ্গভূমির অনুষ্ঠান;কাক-পক্ষীও সময় বুঝে
এসে বসে।একদিন সকাল বেলা,নতুন-বৌ,সদর-দরজায়,চাষী-বৌ'র আওয়াজে, দরজা থেকেই কিছু আনাজপাতি কিনলো;রাজীব বাড়ি নেই,হাজরামশাই,নিজেই দশটাকা মিটিয়েছে। ব্যস,শুরু হয়ে গেছে,ছোটছেলেও বাপের মধ্যে বাগ-বিতণ্ডা,না,ব্যবসার টাকা,সংসারের জন্য খরচ করা যাবে না।
0 Comments.