- 4
- 0
শহরতলির ইতিকথা
রাজীবের মনটা খুবই অস্থির; মন খারাপ হলেই সে গঙ্গার ধারে,বটগাছের চাতালে এসে বসে;এই চাতালে বসেই সে স্কুলজীবনের বহুদিন পাঠাভ্যাস করেছে;এখানে এলে,সে মানসিক শান্তি পায়। পাশেই রয়েছে জলাধার;ইট খোলার মালিকেরা,গঙ্গার পার কেটে বর্ষাকালে গঙ্গার জলে টইটম্বুর করে রাখে এ জলাধার;বর্ষাশেষে, পার আবার বন্ধ করা ; পলি থিতিয়ে গেলে,শীতের প্রারম্ভে পার কেটে, জল বের করে, চলে অপেক্ষা;পলি একটু শক্ত হলে,পক-মিলের সাহায্যে চলে মাটি তৈরি, সকাল সন্ধে কাঠের ছাঁচে মাটি পুরে ধপাধপ ইট তৈরি,শুখানো,আবার কাঁচা ইটের পাঁজা করা,সে এক বিশাল কর্মকান্ড;শুধু চলে অন্য প্রদেশের মানুষের, সকাল থেকেই কর্মব্যস্ততা।এখন চারদিক নিস্তব্ধ; ইট তৈরির সময় শেষ হয়ে গেছে,প্রবাসীরাও নিজেদের এলাকায় ফিরে গেছে; দূরে গোঁশাইদাদুর অন্তিম-সময়ের জায়গাটা রাজীবের মনে ভাসছে;সব ঠিকই আছে,শুধু গঙ্গায় ভাটার কালে জলের প্রবাহ কম থাকার জন্য,পার থেকে বহুদূর দিয়ে বইছে জল; হয়তো গঙ্গাও আজ পরিশ্রান্ত,আর সহ্য করতে পরছে না,মানুষের অনাচার।
আদিম কালে, আদম-ইভও হয়তো মানসিক অস্থিরতা কাটাতে গুহায় শান্তির আবাসস্থল গড়ে তুলেছিল;সেই কাল বেয়ে,গোষ্ঠী,সমাজ,চাষ-বাস তারপর স্থায়ী আস্থানা,এসেছে মাটির টান,শিকড়ের প্রতি টান,অনুভূতি,'জননী,জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি---';না এ মাটির সঙ্গে সে যে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, এ মাটির ধুলোয় সে অমৃতের স্বাদ পায়,এর বাতাসে তার 'লাব- ডুবাডুব' ওঠা-নামা করে,এ অঞ্চল থেকে কোথাও সে যেতে পারবে না;এখানেই কেটেছে তার শৈশব-কৈশোর-যৌবনের এতগুলো বছর, না, না,এ যে তার কাছে স্বর্গ,এখান থেকে বিতাড়ন তো তার কাছে 'মরন সমান'।"তোরা চলে যা---", চলছে, তো চলছেই;দেশ থেকে ফিরে আসার পর থেকেই প্রায় শুরু হয়ে গেছে এ রকম মানসিক অত্যাচার,'এ বাড়ি আমার,তোরা অন্য কোথাও যা, এখানে থাকলে আমার কথা মেনে চলতে হবে'।
রাজীব আর থাকতে না পেরে বলেছে,"মেয়ের বিয়ের গণ্ডগোলের সময়,এই এখানে বসলাম,আমাকে যা বলবি, শুনবো,বলে থেবড়ে ঘরের মেঝেতে বসেছিলে,ভুলে গেলে,এখন তো আমার বাড়ি বলে তড়পাবে,আজ যে আমার প্রয়োজন ফুরিয়েছে"।
"আমি যদি একটা পাস না করাতম, চা-এর দোকানেই তো কাজ করতিস", বলে পাড়া মাতিয়ে চীৎকার শুরু করেছে হৈমবতী।সাইকেল নিয়ে,রাজীব বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এখানে এসেছে,একটু শান্তির নিঃশ্বাস নিতে, একটু নিরিবিলিতে থাকতে;এখানে নিজেই,নিজের সাথে কথা বলা যায়,নিজের মনের দুঃখে,নিজেই শান্তির মলমের প্রলেপ লাগায়।
বাড়ি ফেরার পথেই দেখা হয়ে যায় রমার সঙ্গে। রমা দিদিমনি,রিক্সা থামিয়ে বলে,"নিজে তো পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস;এদিকে,যাকে বিয়ে করে আনলি,তার কথা একটু চিন্তা কর,দেখে এলাম,জানলায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে; বাবা-মার কাছে যাবার উপায় নেই,বলেই কী এভাবে,মেয়েটাকে কষ্ট দিবি;একটু ভাবিস, ভাই"।
দেশ থেকে একটা লোক এসেছে;হাজরার সঙ্গে কথা বলছে,রাজীবকে দেখে বলে,"কাকা,ভালো আছো,বাবার মুখে তোমার কত কথা শুনি,আমিই তোমাদের জমি ভাগে চাষ করি।"রাজীবের তো চেনার কথা নয়;হাজরামশাই বলে,"ও, আজগরের ছেলে"।
ছোটবেলায় মামার বাড়ি গেলে,ঐ আজগরের দোকান থেকে মামা/দিদিমা,লজেন্স কিনে দিত।এবার ভদ্রতার খাতিরে বলতেই হয়,"বেশ,বেশ,তুমি,আজগর মামার ছেলে,তোমার বাবা কেমন আছেন,"ইত্যাদি।আজগরের ছেলে,ওসবের মধ্যে না গিয়ে,বলে,"দেখনা কাকা, দাদু দেখে দেখে খাস জমি কিনেছে; ও জমি,কেউ কিনবে না; আমি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের,তাই কিছু টাকা নিয়ে আমার নামে বিক্রয় কবালা করে দিলে,আমার কাছ থেকে ও-জমি কেড়ে নেওয়া সোজা নয়;আমি ভাগচাষী,আমার কাছ থেকে জমি নিতে গেলে সংখ্যালঘু সেলের অনুমতি নিতে হবে; আমি বর্ধমান কোর্টে মুহুরিগিরিও করি, দাদুকে তাই বলছি"। ওর হাতে জমির দলিলপত্র সব রয়েছে।রাজীব,ওগুলো নিয়ে একটু দেখতেই,ওর মেজাজ চড়ে গেল,দেখে, ঐ জমি, সেজোসহোদর ও ছোটোসহোদরের নামে কেনা হয়েছে,হাজরামশাই,কখনও তা ওর কাছে প্রকাশ করেনি; উল্টে, দেশে থাকা কালে বারবার বলেছে,"টাকা দে,তোর নামে কিছু জমি কিনে দিই"।
ছেলেটা চলে গেলে,রাজীব, হাজরামশাইকে বলে,"কৈ,এ জমি কেনার সময় তো আমার কথা মনে পড়েনি,তাই বলতে,টাকা দে,তোর নামে জমি কিনে দিই;টাকা দিলে,রাস্তার কুকুর,বেড়ালও জমি কিনে দিতে পারে;আমি, বাড়ি করার জন্য জমি কেনার সময় তোমায় জিজ্ঞেস করলে তো,দিব্যি বলেছিলে,তিন ভাই'র নামে কেন,তখন তো বলনি,তোর টাকা,তোর নামে কেন,ছিঃ! এত নীচ মনোবৃত্তি তোমার,আমি কী বাধা দিতাম ? আমিও ওদের নামেই কিনতে বলতাম,কিন্ত,তোমার মনটা কতটা নীচ প্রকৃতির, তা বুঝতে আর বাকি থাকলো না।"এখন বুঝতে পারছি,কাকাদের সঙ্গে তোমার সদ্ভাব নেই কেন;তুমি,আমাদের ভাইদের মধ্যেও ঐ বিভেদের বীজ বুনে যেতে চাও, ছিঃ!
সজীবের শ্বশুরবাড়ি ও ওর কলেজের মাঝামাঝিতে কেনা জায়গা, তিন ভাইদের নামেই কিনতে বলেছিল হাজরামশাই; তো রাজীব, সজীবকে না বাদ দিয়ে,তিনজনের জায়গায়, সজীবের ছেলের নামও রেখেছে; আর আজ, সম্পত্তিতে নাবালকের নাম আছে বলে, ঐ জমি বিক্রি করা যাচ্ছে না। রাজীব,সব ভাইদের কাছ থেকে নিজের নামে ঐ জমির বিক্রয়-কবালা করে নিয়েছে। এবার নিজেই সেখানে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে চায়,কিন্ত বললেই তো আর বাড়ি হবে না।বাড়িকরতে লাগে টাকা,পোয়াতে হয় হ্যাপা,রাজীব কী তা পারবে?
হৈমবতীর ফরমান,"ভাড়া বাড়িতে নয়,বাড়ি করে তোরা উঠে যা"।মনে কী ছিল ,কে জানে,হয়তো রাজীবের সাংসারিক জ্ঞানের প্রতি তার ছিল অনাস্থা ; রাজীব,নিজের বিয়ের আগে,এই বাড়ির প্রায় সবটাই, খোল-নলছে পাল্টানোর ব্যবস্থা করেছে, রাজীবের অর্থেই সব হয়েছে,সে কথা উঠলেই বলে,"তুই আমার বাড়ির প্লান নষ্ট করে দিয়েছিস,আমার বাড়ির পুরনো অবস্থা ফিরিয়ে দে"।মিউনিসিপ্যালিটিতে প্লান অনুমোদন করিয়ে তবেই কনস্ট্রাকশন করতে হয়। হাজরামশাই,সে দিকে না গিয়ে,প্লানের বাইরে সব কাজ করিয়েছে;রাজীবকে তার জন্য মিউনিসিপ্যালিটির অফিসারদের অনেক কথা শুনতে হয়েছে; নেহাত,রাজীবকে,মিউনিসিপ্যালি-টির চেয়ারম্যান খুব ভালোবাসে বলেই,তারা কিছু করতে সাহসী হয়নি।
রাজীবের এক ছাত্রের পরিবারও ঐ কেনা জায়গার কাছেই বাড়ি করেছে;ছাত্রের দাদাও রাজীবের ছাত্র ছিল, এখন ঐ কলেজেই ক্লার্কের চাকরি করে; ওদের ভরসাতেই রাজীব বাড়ি শুরু করার মনস্থ করলো। জমানো টাকা, নিজের বিয়ে,সেজবোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে, অনেকটাই খরচ হয়ে গেছে,নিজের সন্তান হতেও নাসিং হোমের খরচা মেটাতে হয়েছে,আবার সদ্য একটা স্কুটারও কিনে ফেলেছে,এ রকম পরিস্থিতির কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। ওদিকে, শ্বশুর বাড়ি,মেয়ে বিদায় করে, দায় খালাস করেছে, আর এ মুখো হয় না; এদেশে থাকা ওদের আত্মীয়রা,টাকা না পাঠালে,একবার নেমতন্নও করে না, সুতরাং----। হাজরা-দম্পতির মনের খবরও তার ছিল অজানা।
লোন করে সে বাড়ি করতে রাজি নয়।সংসারে অশান্তি চরমে উঠলে,সে তার ঈশ্বরের নাম নিয়ে শুরু করে দিল, বাড়ি; স্ত্রী,তার এদেশের আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে গহনা বিক্রি করে কিছু টাকা এনে দিল,কোন রকমে,মাথা গোঁজার ঠাঁই করে রাজীব, তার ধাত্রীমাতা শহরতলিকে প্রণাম করে নতুন অঞ্চলের বাসিন্দা হয়েছে,সে নিজেকে উদ্বাস্ত মনে করে, একজন শিকড়চ্যুত,নস্টালজিয়ায় ভোগী,মনমরা,সে এখন প্রায় একটা মানসিক রোগী বললে অত্যুক্তি হয় না;সময় সুযোগ পেলেই স্কুটার নিয়ে আবাল্য-মাতৃভূমির কাছে ছুটে যায়, শান্তির খোঁজে,বুঝতে পারে ওপার বাংলার কলোনীর লোকজনের মনে কী অসন্তোষ ,আর তারই বহিঃপ্রকাশের ফলশ্রুতিতে ঘটে যায় বাঙ্গাল-ঘটির নিদারুণ করুণ অধ্যায়।
সমাপ্ত
0 Comments.