- 4
- 0
সুপুরি বনের ছায়ায় ছায়ায়
তৃ তীয় পর্ব
কাধে ঝোলা, পাজামা পাঞ্জাবী সনৎ দা অন্তহীন ঘুরে বেড়াতেন ডুয়ার্সের গঞ্জ গ্রামে।
খুব মায়াময় আর সহজ কবিতা লিখতেন।
সনৎ দা লিখেছিলেন_
"আমার মা খুব সুন্দর
ঝিঙে পোস্ত রাধেন"
কিংবা_
"এবার ভালো করে একটা প্যান্ডেল করো।"
কুচবিহারে ভগীরথ দাসের ডেরায় মাঝে মাঝে হানা দিতেন সনৎ দা। সেখানে বসে যেত আমাদের আড্ডা। মজলিস। ভালো গান গাইতেন তিনি।
বেশ মেজাজ বিছিয়ে দিতেন আড্ডায় আমাদের সনৎ দা। খুব পান খেতেন। আমাদের পানাহার চলতো আড্ডার পাশাপাশি।
পুরোন ডুয়ার্সের নাটক, কবিতা, গণনাট্যের গান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা কথা বলে যেতেন তিনি।
তার কাছেই জেনেছিলাম সতী সেনগুপ্ত আর লাল শুক্র ওরাওয়ের কথা।একটা লুপ্ত পৃথিবীর গন্ধ ফিরিয়ে আনতেন সনৎ দা।
জীবনের শেষের পর্বে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। মুখে মুখে কবিতা বলতেন। বৌদি লিখে রাখতেন। সনৎ দা প্রয়াত হবার পরে আমি আর কখনও গঙ্গুটিয়ায় যেতে পারি নি।
আগামীতে কাজ হওয়া জরুরী কবি সনৎ দাকে নিয়ে।
একজন বহুবর্ণ মানুষ। আমি অনেক শিখেছি তার কাছ থেকে। অনেক ঋণ তার কাছে।
সনৎ দা আমার ভেতরে থাকবেন অনিবার্য ভাবেই।
রঘু দা।কবি পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত। এই উত্তর জনপদের আদ্যন্ত এক বোহেমিয়ান জাত কবি। সমস্ত জীবন জুড়ে কবিতা আর কবিতাকে নিয়ে বারবার স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছুই তো করলেন না রঘু দা। হ্যাঁ,পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত আমাদের কাছে আদ্যন্ত রঘু দা। এমন জাত কবি আর তার ঈর্ষণীয় যাপন খুব কাছ থেকেই দেখবার সুযোগ হয়েছে। আসলে এত এত ব্যাক্তিগত স্মৃতি রয়েছে রঘু দার সঙ্গে যে গুছিয়ে লেখা প্রায় অসম্ভব।
রঘু দার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ১৯৯১ সালে কবি সমীর চট্টোপাধ্যায় ধূপগুরিতে রঘু দার বাসায় "শব্দ" পত্রিকার অনুষ্ঠানে।
এরপর ক্রমে কিভাবে রঘু দা তুমুল আত্মীয় হয়ে গেলেন আমার।সম্পর্ক ছিল আমৃত্যু।
ভীষন স্নেহ পেয়েছি পূর্ণিমা বৌদির কাছে।আর রঘু দার কাছে তো অঢেল প্রশ্রয়। আশ্রয়।
কৃষিবউ, ভাটফুল, উডবার্ন ওয়ার্ড, কুয়াশার বাগান আর ডুয়ার্সের লোকায়ত দুনিয়ায়, অনন্ত সব হাটের পরিসর জড়িয়ে তীব্র এক কবিতার জীবন কাটিয়ে গেছেন আজন্ম বাউন্ডুলে কবি পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত।
তার জীবন আর জীবনভঙ্গিমা ছিল প্রবল ঈর্ষণীয়। তরুণ কবিদের মস্ত এক আশ্রয় ছিলেন রঘু দা।
কবিতা ছাড়া আর কিছুই করতে চান নি।
দারিদ্র,অভাব উড়িয়ে দিয়ে বরাবর ধরে রেখেছিলেন হাসিমুখ। কবি হিসেবে শক্তিশালী রঘু দা সবসময় নুতন নুতন স্বপ্ন নিয়েই বাঁচতেন।
কত কত বার ডাকবাংলো পড়ার বাসায় উঠে গেছি সটান সিড়ি বেয়ে।কত আড্ডা। নুতন কবিতা শোনাতেন শেষের দিকে ফোনে।
এত এত স্মৃতি তো আর লেখা যায় না। বুকের খুব গহিনে সংরক্ষণ করে রেখে দিতে হয়।
পূণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত যে কোন নুতন লিখতে আসা কলমের কাছে একটা আইডল।
0 Comments.