- 7
- 0
পিয়ানো:- শেষ সঙ্গী
তৃতীয় অধ্যায়: দুটি নিঃসঙ্গতার ধীরে ধীরে একে অপরের আশ্রয় হয়ে ওঠা
প্রেমের সবচেয়ে আশ্চর্য সময়টা বোধহয় সেই সময়, যখন দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবাসি বলে এখনো স্বীকার করেনি, অথচ দিনের ভেতর একে অপরের জন্য একটা নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি হয়ে গেছে চুপিসারে। অপেক্ষার তখন কোনো নাম থাকে না। সম্পর্কের অধিকার দাবি করা যায় না। শুধু একজনের অনুপস্থিতি অন্যজনের সারাদিনটাকে অকারণে ভারী করে তোলে, আর মানুষ নিজেকে বোঝাতে থাকে — এ নেহাতই অভ্যাস, নিছক বন্ধুত্ব। হৃদয় অবশ্য যুক্তির চেয়ে ঢের আগে সত্যিটা জেনে বসে থাকে।
অর্ণবের বেলাতেও তাই হয়েছিল। মেঘলা কবে আসবে তার কোনো ঠিক ছিল না, তবু অর্ণবের সপ্তাহটা যেন অদৃশ্য এক মেঘলা-সম্ভাবনার হিসেবেই গড়িয়ে চলত। কোনো বিকেলে সে নতুন একটা সুর লিখে রাখত, শুধু এই ভেবে যে মেঘলা এলে শোনাবে। কোনো দুপুরে পুরনো রেকর্ডের বাক্স হাতড়ে এমন একটা গান খুঁজে বার করত, যা শুনলেই মনে হতো — এই গানটা যেন মেঘলার গলার জন্যই অপেক্ষা করছিল এতদিন।
নিজের ঘরটাকেও সে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছিল। জানালার পাশের চেয়ারটায় মেঘলা বসত, ওটায় সে আর কাউকে বসতে দিত না। পিয়ানোর পাশে একটা ছোট কাঠের টেবিল কিনে এনেছিল শুধু চায়ের কাপ রাখার জন্য। মেঘলা চায়ে চিনি খায় না — এই সামান্য কথাটাও অর্ণবের মনে এমনভাবে বাসা বেঁধেছিল, যেন বহু বছরের কোনো জরুরি স্মৃতি। মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসতে শুরু করে, বড় ঘটনা নয় — এইরকম একটা টুকরো অভ্যাসই তাকে সবচেয়ে গভীরভাবে বেঁধে ফেলে।
মেঘলা নিজেও এই বদলটা টের পেয়েছিল। সে আর অর্ণবের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসত না। বইয়ের তাকের একটা অংশে অর্ণবের দেওয়া কয়েকটা গানের বই থাকত তার নামে, নোটবইয়ের পাতায় ছড়িয়ে থাকত অর্ণবের হাতে লেখা সুরের টুকরো। কোনো নতুন গান তোলার আগে সে প্রায়ই অর্ণবকে শুনিয়ে নিত — শুধু মতামতের জন্য নয়, যেন অর্ণবের শোনাটাই তাকে নিজের গানের সত্যিটা খুঁজে পেতে সাহায্য করত।
তাদের সম্পর্কের তখনও কোনো নাম হয়নি। হয়তো নামহীন বলেই এত সুন্দর ছিল সেটা।
একদিন মেঘলা অর্ণবকে নিয়ে শহরের বাইরে একটা ছোট্ট নদীর ধারে গিয়েছিল। শীতের বিকেল, নদীর জল বেশি নয়, দূরে কাশবন শুকিয়ে এসেছে। সূর্য হেলে পড়েছে আকাশে, নদীর ওপারে গ্রামের বাড়িগুলোর ধোঁয়া সন্ধ্যার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে।
পাশাপাশি বসেছিল দুজন, কথা বলছিল খুব কম। মেঘলাও চুপ ছিল, কিন্তু সেই নীরবতায় কোনো অস্বস্তি ছিল না। অনেকক্ষণ পর মেঘলা বলেছিল, "তুমি কি কখনো ভেবেছ, মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে শুধু তাকে বদলে দেওয়ার জন্য?"
অর্ণব নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল, কোনো উত্তর দেয়নি। মেঘলা নিজেই বলে গেল, "আমার মনে হয়, আমরা প্রত্যেকে জীবনে একটা ঘর বানিয়ে রাখি। সেই ঘরে খুব কম মানুষকে ঢুকতে দিই — কারণ জানি, একবার কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিলে তাকে বের করে দেওয়া সহজ নয়। তুমি যখন প্রথম আমাকে তোমার পিয়ানোর ঘরে ঢুকতে দিয়েছিলে, তখন হয়তো নিজেও জানতে না — তুমি আমাকে জীবনের এমন এক জায়গায় ঢুকতে দিচ্ছ, যেখানে আগে কেউ কখনো ঢোকেনি।"
অর্ণব এবার তার দিকে তাকাল। মেঘলার চোখ তখনও নদীতে। জিজ্ঞেস করল, "আর এখন?"
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "এখন মনে হয়, ঘরটাকে আর শুধু তোমার ঘর বলা যায় না।"
কথাটা সাদামাটা, অথচ অর্ণবের ভেতরে তার আঘাত ছিল গভীর। "আমি তোমাকে ভালোবাসি" — এই বাক্যটার চেয়েও বড় স্বীকারোক্তি কখনো কখনো এমন সাধারণ একটা কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকে, যেখানে একজন নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে অন্যজনের অস্তিত্বকে অজান্তেই একই বাক্যে বসিয়ে দেয়।
ফেরার পথে দুজনে খুব ধীরে হাঁটছিল। মেঘলার হাত অর্ণবের হাতের খুব কাছে, তবু কেউ কাউকে ছুঁচ্ছিল না। স্পর্শের আগের সেই দীর্ঘ মুহূর্তটার মধ্যেই যে প্রেমের সবচেয়ে তীব্র উত্তেজনা লুকিয়ে থাকে, সেটা দুজনেই জানত।
অর্ণবের মনে হচ্ছিল, এখন যদি সে মেঘলার হাত ধরে, তাহলে এতদিনের নীরব সম্পর্কটার চরিত্রই বদলে যাবে। সেই বদলকে সে ভয় পাচ্ছিল — কোনো কোনো সৌন্দর্য মানুষ হারাতে চায় না, এমনকি সেটা পাওয়ার শেষ সুযোগ সামনে থাকলেও।
শেষমেশ মেঘলাই হাত বাড়িয়ে নিজের আঙুল জড়িয়ে দিয়েছিল অর্ণবের আঙুলে। কোনো কথা হয়নি, শুধু তারা হেঁটেছিল বহুদূর। এতদিন অর্ণব সঙ্গীতের ভাষাতেই মেঘলার সঙ্গে কথা বলেছে — আজ প্রথম মনে হলো, তাদের নীরবতাও যেন একসঙ্গে হেঁটে চলেছে।
সেই রাতেই মেঘলা অর্ণবকে একটা খাতা দিয়েছিল। গারনিল রঙের মলাট, প্রথম পাতায় নিজের হাতে লেখা — "কেবল আমাদের অসমাপ্ত সুরগুলোর জন্য।"
অর্ণব খাতাটা খুলে দেখল, অনেক পাতাই খালি। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "এতগুলো ফাঁকা কেন?"
মেঘলা বলল, "কারণ আমাদের গল্প এখনো শেষ হয়নি।"
অর্ণব হেসেছিল। মেঘলা হাসেনি। শান্ত গলায় বলল, "আমরা জীবনকে সম্পূর্ণ ভাবতে ভালোবাসি, কিন্তু কোনো জীবনই সম্পূর্ণ নয়। কিছু গান শেষ হয়েছে মনে হলেও আসলে শেষ হয় না। কিছু চিঠি লেখা হয় না, কিছু কথা বলব বলেও বলা হয় না। তবু সেগুলো অসম্পূর্ণ বলে মূল্যহীন নয় — বরং সেই অসম্পূর্ণতাই কখনো কখনো একটা সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে। তাই এই খাতার পাতাগুলো খালি থাকুক। যতদিন বাঁচব, একটু একটু করে লিখব।"
অর্ণব খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরেছিল। সেদিন সে বুঝতে পারেনি, এই খাতাই একদিন তার কাছে মেঘলার সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
তারপর শুরু হলো তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা। খুব বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না তাদের — একটা ছোট্ট বাড়ি, একটা ছোট্ট জানালা, যেখান দিয়ে সকালের আলো এসে পড়বে পিয়ানোর ওপর। মেঘলার জন্য একটা বইয়ের ঘর, অর্ণবের জন্য একটা সংগীতকক্ষ। বাড়ির সামনে কয়েকটা শিউলিগাছ। বর্ষার দিনে বারান্দায় বসে গান শোনা, শীতের সকালে একসঙ্গে চা খাওয়া — আর পিয়ানোটা থাকবে এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে তার সুর বাড়ির প্রতিটা ঘরে পৌঁছায়।
মেঘলা বলেছিল, "আমি চাই, আমাদের বাড়ির কোনো ঘরই কখনো পুরোপুরি বন্ধ না থাকুক।"
"কেন?" অর্ণব জিজ্ঞেস করেছিল।
"কারণ বন্ধ দরজার ওপারে মানুষ একা হয়ে যায়। আমি চাই একটা ঘরের শব্দ অন্য ঘরে গিয়ে পৌঁছাক — তুমি পিয়ানো বাজালে আমি যেন রান্নাঘর থেকেও শুনতে পাই, আমি গান গাইলে তুমি যেন বই পড়তে পড়তেও শুনতে পাও। মানুষ একসঙ্গে থাকলে সবসময় কথা বলতে হয় না, মাঝেমধ্যে শুধু একে অপরের অস্তিত্বটা টের পাওয়াই যথেষ্ট। ওটারই নাম সংসার।"
অর্ণব সে কথার জবাব দিতে পারেনি। তার মনে হয়েছিল, এতদিন সংসার বলতে যে ছবি সে কল্পনা করেছে, তাতে মানুষ ছিল ঠিকই — কিন্তু মেঘলা এসে সেই ছবির মানুষের মুখে একটা সুর বসিয়ে দিয়েছে।
সেই সময় থেকেই অর্ণবের সুরগুলো বদলাতে লাগল। আগে তার সুরে থাকত একাকীত্ব, দীর্ঘ ছায়া — এখন সেখানে অপেক্ষা আছে, কোমলতা আছে, মাঝে মাঝে অকারণ আনন্দও। এমনকি বিষণ্ণ সুরের ভেতরেও কোথাও একটা আলো জেগে থাকে এখন।
একদিন মেঘলা তার নতুন একটা সুর শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। অর্ণব ভেবেছিল হয়তো ভালো লাগেনি। কিছুক্ষণ পর মেঘলা বলল, "আগে তোমার সুর শুনলে মনে হতো, একজন মানুষ নিজের সঙ্গেই কথা বলছে। আজ মনে হলো, তুমি সত্যিই কারো জন্য দরজা খুলে বাজাচ্ছ।"
অর্ণব কিছু বলল না। মেঘলা পিয়ানোর ওপর হাত রেখে বলল, "এই বদলটা ধরে রেখো। মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে, তার সঙ্গীতও বদলে যায়।"
সেই সন্ধ্যায় অর্ণব প্রথমবার মেঘলার কপালে হাত রেখে বলেছিল — তুমি আমার নতুন পথের দিশা। সেদিন সেই কথায় কোনো নাটকীয়তা ছিল না, কোনো প্রতিশ্রুতিও না। ছিল শুধু একটা দীর্ঘ নীরবতা। আর সেই নীরবতার ভেতরেই দুজনে বুঝে গিয়েছিল — তারা আর আলাদা কোনো নিঃসঙ্গতা নয়, তারা একে অপরের আশ্রয়।
কিন্তু তখনও তারা জানত না, আশ্রয় যত গভীর হয়, একে অপরকে হারানোর ভয়ও ততই গভীরভাবে জন্ম নেয়। আর সেই ভয় খুব নিঃশব্দে এসে বসেছিল তাদের সুখের ভেতরে — একটা অদৃশ্য ছায়ার মতো, একটা অশ্রুত, অসমাপ্ত সুরের মতো।
0 Comments.