- 9
- 0
মাটি মানুষ মা
প্রথম বর্ষার জল ভূঁয়ে পড়লেই গোষ্ঠ পটুয়া সীতার ভিটেতে গিয়ে হাজির হয়।
--" কই গো সীতা মা -- ফের এট্টুস জ্বালাতি এনু গো --"
পটভূমিটা একটু বলে রাখা ভালো। মাতলা ছাড়িয়ে ওপারে গেলে গোসাবা উজিয়ে গেলে এই ছোট্ট জনপদে গোষ্ঠবিহারি প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। এ অঞ্চলে মূলত ধীবর শ্রেনীর বাস। মাতলা ছাড়াও হাতের শিরার মতো যে নদ নদীগুলো সুন্দরবনের মানচিত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এনারা সে সব নদীর বুক ছেনে রূপোলী শস্য তুলে আনেন।
সে কোনকালে, সীতার এখন সে কথা পরিস্কার মনেও নেই, ওর স্বামী নেতাই , নৌকো আর জাল নিয়ে বেড়িয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছিলো সে কথা ঘন বৃষ্টির ভেতর দিয়ে গাছপালা যেমনি ঝাপসা চোখে পড়ে সেরকমই মাঝেমধ্যে মনের ভেতর উঁকি দিতে চায়।
বেশ কিছুকাল কেটে গেলে কিশোরী সীতা বেধবার সাদা থান পড়ে হাতের শাঁখা নোয়া ভেঙে ঘরের কোনায় দুপায়ের মাঝে মুখ গুঁজে মাতলাকে ডেকে এনেছিলো দুচোখের কোলে। আর সেই অশ্রুধারা মোছাতে ক্রমে ক্রমে আবির্ভূত হলেন গাঁয়ের মোড়ল থেকে নৌকোর মহাজন, জালের মহাজন, মাছের আড়তদারেরা। শরীরগুলো ধীরেধীরে ছায়া হতে লাগলো, সীতার ঘরে রাতের বেলা ইঁদুরের ছোটাছুটি বেড়ে গেলো। বেধবা সীতা ধীরেধীরে বেবুশ্যে সীতা হয়ে গেলো।
--" এসো গো পোটো দাদা, আমিও মনে মনে তোমার কতাই ভাইবতেছেনু গো! বলি বাড়ির সবাই ভালো আচেন তো? "
--" হ্যা গো সীতা মা, মা দুগগার কিপায় ভালোই আচেন সব। ইদিকে তো দেকতিচি জলে সব ভাইসে নেচে গো। হাটতলা তো এক্কেরে জলে থৈথৈ কত্তিচে। "
--" তোমাদের ও পাড়ার খপর কি? জল জমে নে? "
--" ঝা বিস্টি দেচে ওপরআলা, এ পাড়া ও পাড়ায় আর আলাদা হবে কি কইরে বল দিকিন? ঘরে আন্না বান্না করার মতুন ছাল বাকলও নি এক্কেবারে। ভাগ্যিস কিচু চিড়ে মুড়ি আর খেজুরে মিস্টি ছেলো ঘরে পুজানো। "
--" আমার ঘরে বেশ অনেকটা কেরোচিন আচে গো পেয়োজনে নে যেও। পরে একসুময় ফেরত দিলিই হবেনে। "
গোষ্ট উঠোনের জমা জলে পা ধুয়ে মাটির দাওয়ায় বাবু হয়ে বসলো। এ বাড়িতে এসে সে এবাড়ির আসনও গ্রহণ করে না। অন্নগ্রহণ করা তো দূরের কথা, তেষ্টায় গলা ফেটে গেলে একগ্লাস জলও গলায় ঢালেনা গোষ্ঠ পোটো।
--" এবারে পুজো কোন মাসি পইরেচে গো পোটোদাদা? "
--" আশ্বিনির আটাশ তারিকে ষষ্টি গো মা। "
--" তালি এবেরে হাতে এট্টু সুময় পাবে গো। বলো? "
--" হু, তা এবড়ে কোত্তেকে মাটি নেবো গো? ভিটে তো জলে ডুইবে গেচে পুরোটাই।
--" ঘরের থে মাটি নিলি চইলবে না? থালি আন্নাঘরের থেইকে নিতি পারো। "
--" সে যেকানের থে নিলিই হোল। আন্নাঘর কি আর তোমার ভিটির বাইরে কিচু? "
--" সে এট্টুস বোসো দিনি। দুগাছা গপ্পো টপ্পো করি, এই তো সমবচ্চরে একবারই আসো মাটি নিতি। আচ্চা পোটো দা, আমি এ ভিটিতে না থাকলি তুমি মাটি নেবা ক্যামনে? "
--" মানে বুইজলুম নি। এট্টু বুইজে বলো দিনি! "
--" মেইয়ে তো বায়না ধইরেচে আমারে একানের থে নে যাবে! "
--" কুতায় গো? তার ঠেয়ে?
--" হুম। সে একদম জোজ্জার করতি নেগেচে। "
--" কোতায় গো, কইলকেতায়? "
--" নাগো, আরে তোমারে তো বলাই হয়নে দেকিচো, মেয়ে তো বড়ো চাকরি কইরতিচে গো। সেই ব্যাংলোর না কি বলে ঝেনো, অনেক বড় চাকরি গো পোটোদা, ইঞ্জিনির। চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার মাস কাবারি ---!!"
--" দেকিচো, এত্তো বড় খপরটা আমার কাচে চেইপে রেকেচো?"
--" চুপ চুপ পোটোদা। কত্তবড় সুকের জ্বালা বুকে চেইপে রেকিচি এ পঁচিশটা বচর গো পোটোদাদা, সে তুমি বুইঝবেনি। শ্যাল কুকুরগুলি তো মুইখে আচে আমার মতুন ওরেও ছিঁড়ি খাবে বলি। "
--" ঝাই বলোনা কেন মা, ওই দত্তবাবু মানুষ না গো, সাক্কাত শিব ঠাউর গো। "
--" মিত্থ্যি কতা বইলবোনি গো পোটোদা জেবনে এই দুজন মানুষকে দেইকলাম, একজন তুমি আর একজন দত্তবাবু, ঝারা আমার মুকির দিকি ছাড়া কুনোদিন বুকির দিকে নক্ক করেনে। কুনোদিন তোমাদের এই দুজনের চোখি আমি অন্য কোনো ছায়া দেকতে পাইনিকো।"
--" আমার কতা ছাড়ান দাও মা, সেই ছোট্ট বেলায় বাবা ঝেকন মাটিতে হাত ছোয়াইছিলো সেই ত্যাকনই আমায় বইলে দেচিলো, দ্যাক গোষ্ট মাটি ছুঁয়ে দিব্বি কর। যে হাত দে মাটি ছানবি সে হাত দে কোন চামড়ার পিত্তিমের শরীর ছানবি নে। থালি পিত্তিমের চোখ আকতি গেলে তিনি মুক ঘুইরে নেবেন। যে চোক আকবি সে চোকির আগুনে দেবী তোরে ছাই কইরে দেবে। তুমিই বলো মা, এয়ারপরেও কি? "
--" দত্তবাবুর কতা কি বইলবো গো পোটোদা, সেও এক ঝড়বিস্টির আত ছিলো। সব্বাংগ জলে চুপচুপ। ঘরে আইসে ঝেকন বইসলো দেকি তার সব্বাংগ দে ঝেনো আলো জ্বইলতিচে। গামচা নে মাতা মুইচে দিতি গেলাম। এক ঝটকায় সইরে গেলো ছোয়ার ত্থে। ' আমায় ভুল বুইজবেন না। খপর পেনু আপনার নাকি একটি কইনে সন্তান আচে! ' আমার চোক বাঘিনীর মতুন জ্বইলে উটলো গো, ' সেই চোকের আগুন কখন যে তার কতা শুইনে জল হইয়ে গেলো বুইজলুম নি। তার ঘরে নে গেলো কইলকেতায়, পেসাদ গো আজপেসাদ, তার ইস্তিরি মানুষ নয় গো পোটোদা, আজকইন্যে। কত খাতির যত্ন কইরে সেদিনটা রাইখলো, শুধু একটাই কতা, তোমার মেইয়ে তোমারই থাইকপে গো মা, আমরা শুদু বড় কইরবো বইলে তোমায় কতা দিলাম। তোমাকে শুদু একটাই কতা দিতে হপে দশ বচরি দূরেরথে দেকতি পারো কিন্তুক মেয়ের সাতি কতা বলতি পারবা না। "
দুজনে চুপ করে বসে। কারো মুখে কোন কথা নেই। উঠোনে, খরের চালায়, গাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ।
--" হ্যাগো পোটোদা, আমি চইলে গেলি পর এ ভিটে ঝেনো কেউ দকল নিতি না পারে -- এ ভিটেতে আমার শরীল খুইবলে খেইয়েছে অসুরেরা আর সেই শরীলের থে জন্ম নেচে মা দুগগা। আমার ভিটের মাটি নে গিয়ে তোমার মতো দেবতা আসলে মাটির পিতিমে বানাওনি গো পোটোদা, সেই মাটির পিত্তিমের আশীব্বাদে দত্তবাবুর হাতে তৈরি হয়েচে আমার মেয়ে, আমার মা গো, আমার দুগগা মা ---"
সীতা ধীরেধীরে উঠে এলো গোষ্ঠর দিকে। পরম যত্নে মাথায় কাপড় টেনে বলে উঠলো --" আজ তুমি আমায় বারণ কইরবে না পোটোদাদা। এ ভিটে আজ আমি তোমায় উচ্ছজ্ঞ কইরে গেলাম। এক বেবুশ্যে বোনের ভিটের মাটির হকদার হিসেবে। পিতি বচর তুমি এই ভিটির থে মাটি নে মায়ের শরীলে দিয়ে আমার দুগগার পেরাণপিতিষ্টে কইরবে গো। আজ আমি তোমায় ছোব তোমায় এট্টা পেন্নাম কত্তি দাও পোটোদাদা।"
গোষ্ঠ বারণ করতে পারেনা। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন সীতার দাওয়ায়। গোষ্ঠ পরিস্কার দেখতে পান কোন মানবী নন তার শরীর ছুঁচ্ছেন গিরিজায়া স্বয়ং।
0 Comments.