Sun 13 September 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ গল্পে সৌমেন কর্মকার

maro news
হৈচৈ গল্পে সৌমেন কর্মকার

সবুজ পৃথিবীর শপথ

সূর্য তখনো পুরোপুরি ওঠেনি। ভোরের মিঠে রোদ কুয়াশার পাতলা চাদর ফুঁড়ে ছড়িয়ে পড়ছে রূপপুর গ্রামের সবুজ বুকজুড়ে। গ্রামের পুব দিকে প্রবীণ বটগাছের তলায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পুরনো পাঠশালাটি। সকালের হাওয়া সেখানে শিমুল আর নিমপাতার মিঠে সুবাস বয়ে নিয়ে আসে। পাখিদের কলকাকলিতে চারপাশ মুখরিত, যেন প্রতিটি গাছ ডালপালা নেড়ে নতুন একটি দিনের গান গাইছে। তবে এত সুন্দর রূপের আড়ালে এক নিঃশব্দ বিষাদের ছায়া বয়ে চলেছে গ্রামের বুকের ওপর দিয়ে।

গ্রামের বড় প্রবীণ মানুষ সনাতন কাকা জীর্ণ কাঠের বেঞ্চে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একসময় যে রূপসী নদী কুলকুল রবে বয়ে যেত, আজ তা মরে ছোট খালের মতো হয়ে গেছে। পাশের খোলা প্রান্তর যেখানে আগে ঘন বাঁশঝাড় আর নানা রঙের ফুল-ফলের বাগান ছিল, সেখানে এখন রুক্ষ মাটি আর ইটভাটার কালো ধোঁয়া। আধুনিকতার অজুহাতে একের পর এক গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে, আর তার মাশুল গুনছে আস্ত গ্রামটি। অনাবৃষ্টি, চরম গরম আর অকাল বন্যা এখন গ্রামের প্রতিদিনের সঙ্গী।

ঠিক সেই মুহূর্তে পাঠশালার প্রাঙ্গণে জড়ো হচ্ছিল গ্রামের একদল কিশোর-কিশোরী। তাদের নেতৃত্বে ছিল সতেরো বছরের উদ্যমী তরুণী মেঘনা আর তার বন্ধু প্রদীপ্ত। মেঘনা শুধু বইয়ের পাতায় পরিবেশ সুরক্ষার কথা পড়ে সন্তুষ্ট থাকার মেয়ে নয়; প্রকৃতির প্রতি তার ভালোবাসা গভীর এবং খাঁটি। প্রদীপ্তকে সাথে নিয়ে সে ইদানীং দেখছে কীভাবে শহরের কিছু ব্যবসায়ী আর গ্রামের কতিপয় অসাধু মানুষ মিলে বাজারের পাশের পুরনো বনটা কেটে আবাসন আর দোকানঘর বানানোর চক্রান্ত করছে।

মেঘনা বেঞ্চে বসে থাকা সনাতন কাকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

"কাকা, এভাবে যদি সব গাছ কেটে ফেলা হয়, তবে আমাদের গ্রামটা তো মরুভূমি হয়ে যাবে! আমরা কি কিছুই করব না?" মেঘনার কণ্ঠে ছিল তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ।

সনাতন কাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "পাগলি মেয়ে, বড় বড় বাবুদের টাকার গরম আর ক্ষমতার সামনে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কথা কে শুনবে? গাছ কেটে ওরা নিজেদের পকেট ভরছে, আর প্রকৃতির অভিশাপ ঝরছে আমাদের মাথায়।"

মেঘনার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। সে দৃঢ় স্বরে বলল, "না কাকা, প্রকৃতি আমাদের মা। মাকে নষ্ট হতে দেখে আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি না। যদি কেউ কিছু না করে, তবে এই নতুন প্রজন্মই এগিয়ে আসবে।"

সেই দিন বিকেলেই মেঘনা ও প্রদীপ্ত গ্রামের সব ছেলেমেয়েদের এক জায়গায় জড়ো করল। পাঠশালার মাঠটিতে বসে জমল এক জরুরি বৈঠক। মেঘনা সবাইকে বুঝিয়ে বলল, গাছ কেবল কাঠ বা ছায়া দেয় না, গাছ আমাদের প্রাণ বাঁচায়। যদি এই বনটা কেটে ফেলা হয়, তবে গ্রামের পরিবেশ পুরোপুরি বিষাক্ত হয়ে যাবে। বৃষ্টি হবে না, ফসল ফলবে না, আর পাখিরা চিরতরে হারিয়ে যাবে।

কিশোর-কিশোরীদের মনে সেই কথা আগুন জ্বালিয়ে দিল। প্রদীপ্ত বলল, "আমরা শুধু মুখে প্রতিবাদ করব না। আমরা কাজে করে দেখাব। আমরা নতুন গাছ লাগাব এবং পুরনো গাছগুলোকে কেটে ফেলতে দেব না।"

তারা সিদ্ধান্ত নিল এক বিরাট অভিযানের—*"সবুজ পৃথিবীর শপথ"*।

পরদিন সকালে যখন ইটভাটা ও আবাসন প্রকল্পের জন্য লোকজন কুড়াল আর করাত নিয়ে বনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন তারা এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি হলো। বনের মুখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের ছোট-বড় শত শত ছেলেমেয়ে। তাদের হাতে রোপণের জন্য হরেক রকমের চারা গাছ—আম, জাম, কাঁঠাল, কৃষ্ণচূড়া, নিম আর বকুল।

সবাই একসঙ্গে স্লোগান দিতে লাগল, "গাছ বাঁচাও, প্রাণ বাঁচাও! সবুজ পৃথিবী আমাদের অধিকার!"

ব্যবসায়ীদের দলের নেতা করিম খাঁ গর্জে উঠে বলল, "তোরা বাচ্ছার দল, এখান থেকে পালা! এখানে বড়দের কাজ হচ্ছে। এই বন কেটে এখানে আধুনিক বাজার আর ঘরবাড়ি হবে।"

মেঘনা নির্ভয়ে এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল, "না খাঁ সাহেব, এই বন আমাদের গ্রামের ফুসফুস। আপনারা টাকার লোভে আমাদের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দিতে পারেন না। এই গাছগুলো আমাদের বিশুদ্ধ বাতাস দেয়, আমাদের মাটিকে ধরে রাখে। একটা গাছ কাটতে হলে আগে আমাদের ওপর দিয়ে যেতে হবে।"

মেঘনার মুখের ওই দৃঢ় এক্সপ্রেশন বা অভিব্যক্তি এবং বাকি শিশুদের চোখের ভেতরের অকুতোভয় জ্বলজ্বলে আলো দেখে করিম খাঁ ও তার লোকেরা কিছুটা চমকে গেল। শিশুদের এই একতা তারা আশা করেনি।

খবর পেয়ে ধীরে ধীরে গ্রামের সাধারণ মানুষ, কৃষক, এমনকি বৃদ্ধ সনাতন কাকাও লাঠি ভর দিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। শিশুদের এই আত্মত্যাগ আর সাহস দেখে বড়দের রক্তের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ জেগে উঠল।

সনাতন কাকা সামনে এসে উচ্চস্বরে বললেন, "ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আজ আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা বেঁচে থাকতে আর একটা গাছও কাটতে দেব না। প্রকৃতির ওপর অত্যাচার অনেক হয়েছে, আর নয়!"

গ্রামবাসীর একতা দেখে করিম খাঁ বুঝতে পারল, আজ জোর জবরদস্তি করে বন ধ্বংস করা সম্ভব নয়। তারা অপমানিত ও পরাজিত হয়ে সেখান থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হলো।

বিকেল ঘনিয়ে এল। আকাশে তখন সোনালি রোদ হেলে পড়েছে। বাতাসের মেজাজে যেন এক ধরনের আনন্দের সুর। বন বাঁচানোর যুদ্ধে জয়ী হয়ে ছেলেমেয়েরা কিন্তু সেখানেই থেমে থাকল না। তারা তাদের আনা শত শত চারা গাছ বনের ফাঁকা জায়গায় এবং নদীর পাড় বরাবর রোপণ করতে শুরু করল।

মেয়েরা মাটিকে পরম মমতায় খুঁড়ে চারা বসাচ্ছিল, আর ছেলেরা জল এনে সেই চারার গোড়ায় ঢেলে দিচ্ছিল। প্রতিটি চারা রোপণের সাথে সাথে তাদের বুকে যেন নতুন এক আশার কুঁড়ি ফুটছিল।

সন্ধ্যা নামার মুখে তারা সবাই মিলে নবোপিত চারা গাছগুলোকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াল। তাদের হাতগুলো পরস্পরের হাতে শক্ত করে ধরা। মাথার ওপর প্রবীণ বটগাছটি যেন ডালপালা ছড়িয়ে তাদের আশীর্বাদ করছিল।

সবাই একসাথে হাত তুলে সমবেত কণ্ঠে শপথ পাঠ করল: 

"আমরা এই মাটির সন্তান, শপথ করছি আজ—

প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের প্রথম কাজ

একটি গাছও কাটতে দেব না, রোপণ করব হাজার চারা,

 সবুজ শ্যামল ভালোবাসায় ভরিয়ে দেব বসুন্ধরা।

 আমাদের এই ছোট্ট হাত, আনবে সবুজ ভোর,

 পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দেব প্রাণের মিঠে আলো।"


প্রতিটি শিশুর মুখে তখন আত্মতৃপ্তি আর বিজয়ের হাসি। তাদের চোখের কোণে ফুটে উঠেছিল এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন—যে পৃথিবী হবে সবুজ, শীতল, দূষণমুক্ত এবং শান্তিময়।

সূর্য ডোবার সাথে সাথে গ্রামের ওপর নেমে এল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। নদীর হাওয়া যেন গান গেয়ে উঠল, আর চারপাশের ঘন সবুজ গাছগুলো হালকা দোলে যেন সাড়া দিল সেই খুদে বিপ্লবীদের। রূপপুর গ্রাম সেদিন কেবল একখণ্ড বনকে বাঁচায়নি, বরং গোটা পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল এক বার্তা—যদি নতুন প্রজন্ম জেগে ওঠে, তবে প্রকৃতি আবার তার চিরন্তন সবুজ রূপ ফিরে পাবেই।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register