Sun 13 September 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ গল্পে দীপঙ্কর বৈদ্য

maro news
হৈচৈ গল্পে দীপঙ্কর বৈদ্য

জয়ীর জয়যাত্রা

  সেদিন বিকেলের আকাশটা ছিল মেঘলা। ভাঙা টালির চালের নিচে বসে জয়ী যখন তার বাংলা সাহিত্যের বইটা উল্টাচ্ছিল, তখন পাশের ঘরে মার গলার চড়া সুর শোনা যাচ্ছিল। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার ওপর মায়ের দীর্ঘদিনের অসুখ। বাবা জরাজীর্ণ এক কোম্পানিতে সামান্য মাইনেতে কাজ করেন। সেই টাকায় সংসার চলে না বলে জয়ীকে চারটে টিউশনি করতে হয়। নিজের পড়ার খরচ আর ছোট বোন রিনির স্কুলের খাতা-কলম জোগাড় করতেই তার দিন কাবার। সংসারের হাড়ভাঙা খাটুনি আর অভাবের মাঝেও জয়ীর একমাত্র অক্সিজেন ছিল তার সই—সুমি।

     জয়ীর একটাই স্বপ্ন—সে অনেক দূর পড়বে। পাড়ার প্রথম মেয়ে হিসেবে সে এবার উচ্চমাধ্যমিক দেবে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল তার বয়স। মা বললেন, "মেয়ের বয়স বাড়ছে, ঘরে আইবুড়ো মেয়ে রাখা পাপ। রিনির বিয়েরও তো একটা গতি করতে হবে।" পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের চাপে জয়ীর বিয়ের সম্বন্ধ আসতে লাগল। কিন্তু জয়ী অনড়। সে সাফ জানিয়ে দিল, "আমি এখন বিয়ে করব না, আমি পরীক্ষা দেব।" তার এই জেদের কারণে একের পর এক সম্বন্ধ ফিরে গেল। অভাবের তাড়নায় শেষ পর্যন্ত ছোট বোন রিনির বিয়ে ঠিক করে দিল মা। বিয়ের আসরে বোন যখন কাঁদছিল, মা তখন জয়ীকে লক্ষ্য করে বিষবাণ ছুড়ছিলেন—"বড় মেয়েটা কুলাঙ্গার, ওর জন্যই আজ ছোটটার আগে বিয়ে দিতে হলো। ঘরে বসে বসে শুধু গিলছে আর বই পড়ছে।" বাবা অবশ্য কোনোদিন কিছু বলেননি। দিনশেষে জয়ীর মাথায় হাত রেখে শুধু বলতেন, "মা রে, তুই পড়। আমি আছি তো।"

     সুমি আর জয়ী একই ক্লাসে পড়ে। ছেলেবেলা থেকে তারা একে অপরের ছায়া। সুমি একটু সচ্ছল ঘরের মেয়ে হলেও জয়ীর প্রতি তার টান ছিল অকৃত্রিম। ক্লাসে বসে দুজনের কত কথা! জয়ী বলত, "জানিস সই, আমি একদিন বাংলা সাহিত্য নিয়ে অনেক বড় হব। রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রকে আরও গভীরে গিয়ে বুঝব।" সুমি তার হাত জড়িয়ে ধরে বলত, "তুই পারবি জয়ী। তুই তো আমাদের বাতিঘর।"

     উচ্চমাধ্যমিকের ফল বেরোলে পাড়া মেতে উঠল। অভাবী ঘরের মেয়ে জয়ী শুধু পাস করেনি, প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। সারা পাড়ায় হইচই পড়ে গেল। সবাই তাকে ভালোবেসে ডাকতে লাগল 'জয়ী'। বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার গভীর টান। সে কলেজে ভর্তি হলো বাংলার নেশায়। কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। কলেজে ভর্তির মাস তিনেক পরেই বাড়িতে কান্নাকাটির রোল পড়ল। বাবার শরীরটা আর চলছে না, মায়ের চিকিৎসা থমকে গেছে। মা সোজা জানিয়ে দিলেন, "এবার হয় বিষ খা, না হয় বিয়ে কর। তোর পড়ার বিলাসিতা মেটাতে গিয়ে আমরা না খেয়ে মরব নাকি?" বাবার অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে জয়ী সেদিন হার মানল। চোখের জলে প্রিয় বইগুলো টিনের বাক্সে তুলে রেখে সে কনের সাজে সাজল। তার স্বপ্নগুলো যেন সেই লাল চেলির নিচে চাপা পড়ে গেল।

    জয়ীর বিয়ে হলো এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেই শুরু হলো লাঞ্ছনা। "গরীব ঘরের মেয়ে, যৌতুক আনেনি তেমনকিছু"—শাশুড়ির এই টিপ্পনি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘরের সব কাজ একা হাতে সামলাতে হতো তাকে। তবে তার স্বামী অমিত ছিল একটু অন্যরকম। সে দেখত, গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, জয়ী তখন জানলার ধারে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে তৃষ্ণা, কিছু একটা হারানোর যন্ত্রণা।

     একদিন সাহস করে জয়ী অমিতকে তার স্বপ্নের কথা বলল। "আমি বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। অভাবের জন্য শেষ করতে পারিনি।" অমিত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "মানুষের স্বপ্ন মরে গেলে মানুষটাও মরে যায় জয়ী। আমি তোমাকে মরতে দেব না। আমি কালই তোমার কলেজে কথা বলব।"

     শাশুড়ির প্রবল বাধা আর পাড়া-পড়শির "বউ আবার স্কুল-কলেজ যাবে নাকি" —এমন বিদ্রূপ সহ্য করেও অমিত জয়ীকে কলেজে আবার ভর্তি করিয়ে দিল। জয়ী যেন নতুন জীবন পেল। দিনের বেলা সংসারের ঘানি টেনে রাতে সে নিমগ্ন হতো রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের পাতায়। তার এই লড়াইতে সবসময় পাশে থাকল তার সই সুমি। সে জয়ীকে নতুন নতুন বই দিয়ে, নোটস দিয়ে সাহায্য করত।

     জয়ী শুধু স্নাতক শেষ করল না, সে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করল। তার এই বদলে যাওয়া দেখে যারা একসময় টিটকারি দিয়েছিল, তারা আজ অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে। আজ জয়ী একটি নামী প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষিকা। তবে জয়ী শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সে নিজের বাড়িতে শুরু করেছে 'স্বপ্নপাঠ' নামের এক অবৈতনিক কোচিং। পাড়ার গরীব ছেলেমেয়েদের সে নিজে হাতে পড়ায়। তাদের সে শুধু ব্যাকরণ বা ছন্দ শেখায় না, সে শেখায় জীবনকে জয় করার কৌশল। তার বাড়িতে এখন সবসময় বইয়ের সুবাস।

     মায়ের সেই ঘৃণা আজ ভক্তিতে রূপ নিয়েছে। বাবা এখন গর্ব করে পাড়ায় বলেন, "আমার জয়ী আজ সবার জয়ী।" আর প্রতি রবিবার বিকেলে সুমি আজও আসে জয়ীর কাছে। দুজনে মিলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথা বলে সাহিত্য আর আগামীর স্বপ্ন নিয়ে।

    জয়ী আজ আর কেবল অভাবী ঘরের মেয়ে নয়; সে এক অনুপ্রেরণা। সে শিখিয়েছে— দারিদ্র্য শরীরকে আটকাতে পারে, কিন্তু যার স্বপ্নের ডানা শক্তিশালী, তাকে আকাশ ছোঁয়া থেকে কেউ বিরত রাখতে পারে না।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register