- 45
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
বিট্টুর কোনও খবর কি কমল পাবে? পড়ুন পরের ২১তম পর্বে…
বিট্টুর ছবির দিকে তাকিয়ে কমলের ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। তার একমাত্র ছেলের জন্য তার মন বড়ই আনচান করছে। ছবিতে প্রিয় বিট্টুকে ঘিরে রয়েছে কমল, তন্দ্রা এবং কমলের বাবা-মা। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে কমল পুরনো দিনে ফিরে গেল। তন্দ্রার সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা… না, তন্দ্রার সাথে প্রেম করে বিয়ে হয়নি। কারণ জীবনে উত্তরণের প্রথম ধাপ, বাবার তৈরী ব্যবসাকে নিজের করে বুঝে নিতেই তার সময় কেটে গেছে। কিশোর বয়সের কমল, যখন সে কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে চাকরির খোঁজ করছিল। তখন ওর বাবা বলেছিলেন,
“তোকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়েছি কি চাকরি করার জন্য? আমার কাছে তোর সাবজেক্ট নিয়েই ব্যবসা আছে। এই ব্যবসা করেই আমি অর্থ উপার্জন করেছি। তোর এতদিনকার লেখা-পড়ায় আমি বাবা হিসাবে কর্তব্য পালন করেছি, এটা যেমন সত্য, তেমনি এই ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়েই তোর মনোবাঞ্ছা ও লেখাপড়ার দায়িত্ব সবকিছু করেছি। তোর কাছে আমার চ্যালেঞ্জ রইল, এই ব্যবসাকে তুই কিভাবে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিস, দেখব?”
এমন একটি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে ওর বাবা কমলকে তার ব্যবসার নাগপাশে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। চ্যালেঞ্জটা তিনি করেছিলেন, যাতে কমল ব্যবসাটাকে সুন্দর ভাবে বুঝে নিয়ে, গুছিয়ে নিতে পারে। কমল তার বাবার চ্যালেঞ্জ শুধু সফলভাবে গ্রহণ করেছে তা নয়, বরং মিত্র ওয়াচ ইন্ডাস্ট্রিজ-এর ব্রান্ডকে কমল দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। কমল চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পর ওর বাবা বিশাল একটা পার্টির আয়োজন করেছিলেন। সেই আয়োজনে উপস্থিত ছিল তন্দ্রা ও তন্দ্রার পরিবার। কমলের বাবা, ভীষণ গর্বের সাথে তার কোম্পানীর অগ্রগতির মূল কাণ্ডারী হিসাবে ছেলে কমল মিত্রকে চিহ্নিত করেন। সেদিনই কমলের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানীর মালিকত্ব সঁপে দেন। এরপর তিনি তন্দ্রার বাবাকে সবার সামনে প্রিয় বন্ধু হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেন এবং সারপ্রাইজ হিসাবে তন্দ্রাকে নিজের ছেলে কমলের ভাবী বৌ হিসাবে উল্লেখ করেন। তিনি খুব শীঘ্রই ওদের চার হাত করে দেবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন। বাবার ঘোষণায় কমল হতবাক। তন্দ্রাকেও সেই অনুষ্ঠানে প্রথমবার দেখে কমলের খুব ভালো লেগে যায়। বিয়ে হওয়ার আগে পর্যন্ত তন্দ্রার সাথে কমলের সাক্ষাৎ হামেশাই হত। অবশেষে, দুই পরিবারের উপস্থিতিতে কমল ও তন্দ্রার মধ্যে শুভ বিবাহ সম্পন্ন হল। তন্দ্রা ভীষণ ভালো মেয়ে, সকলের মুখে তন্দ্রার প্রশংসা। তন্দ্রা শ্বশুরবাড়ি এসে ধীরে ধীরে সকলের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠল। বিয়ের একবছর কাটাবার পরই সংসারে একটা খুশীর খবর এল, সেই খবরে সবাই আনন্দ করল। তন্দ্রার কোল আলো করে মিত্র পরিবারে নতুন বংশধরের আবির্ভাব। বিট্টুকে পেয়ে সবাই মিলে আত্মহারা। কমল নিজের কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকত। বিট্টুকে কোলে-পিঠে করে দাদু ও ঠাম্মার দিন কেটে যায়। তন্দ্রা যথারীতি সংসারের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। ধীরে ধীরে বিট্টু বড় হচ্ছে। সে একদিন স্কুল যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। কোনওদিন দাদু বা কোনওদিন ঠাম্মার হাত ধরে স্কুলে যেত।
একদিন তন্দ্রা প্রস্তাব দিল,
“আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাব”।
পরিবারের সবাই মিলে জগন্নাথ দর্শন করার উদ্দেশ্যে পুরীতে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে এই ছবিটা তোলা হয়েছে। পুরীতে খুব সুন্দর কেটেছিল। সবাইকে নিয়ে তন্দ্রার চলার মানসিকতা কমলকে ওর কাজের ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করত। সে নিশ্চিন্ত মনে ব্যবসার জন্য সব জায়গায় যেতে পারত। সেইদিনের কথা মনে করে সে ভীষণ হতাশ হল। রত্নাকে বিয়ে করে ভেবেছিল, বিট্টু নিশ্চিন্ত ছিল। কিন্তু তার ধারণা যে কতটা ভুল, সে আজ বুঝতে পেরেছে। তন্দ্রার বাবা ও হরিকাকার থেকে রত্না সম্বন্ধে শোনার পর সে আরও বেশী বিচলিত হয়ে আছে। বিট্টুকে কিভাবে খুঁজে বের করবে? কোনও সঠিক রাস্তা সে খুঁজে পাচ্ছে না।
তার ভাবনার মাঝেই ল্যান্ডফোনে একটা কল এল…
ঘোতন তার বোন সুলেখার শ্বশুর বাড়িতে দিব্যি আছে। সুলেখার পরিবারের সকলের কাছে বিট্টু এখন পছন্দের মানুষ। ঘোতনের পরামর্শ মত বিট্টু তার বাড়ির অবস্থার কথা সবাইকে শোনাচ্ছে। বিট্টু তার বাবা বিশাল কোম্পানীর মালিক সে কথা জানিয়েছে। হাতিবাগানের কাছে তাদের বিশাল বাড়ি ও ঘড়ির শো-রুমের কথা সে জানিয়েছে। ঘোতন সুলেখাদের জানিয়েছে,
“বিট্টুর বাবার কাছ থেকে আমরা বিরাট অংকের টাকা দাবী করব। বিট্টু হল ওর বাবার একমাত্র সন্তান। সুতরাং আমরা অপেক্ষা করব, একদম তাড়াহুড়ো করব না। আমরা কিছুতেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ব না। আমাদের বুদ্ধি করে চলতে হবে”
বিট্টুর কাছ থেকে ওর বাবা কমল মিত্রর ল্যান্ডফোনের নাম্বার চেয়ে ঘোতন ফোন করে জানিয়েছে,
“আপনার ছেলে বিট্টু আমাদের কাছে আছে। ছেলেকে ফেরৎ পেতে হলে পাঁচ লাখ টাকা রেডি রাখুন”
এই কথাটা বলেই ঘোতন ফোনটা কেটে দিয়েছে। যদিও সে ফোনটা সুলেখার বাড়ির কাছাকাছি কোনও টেলিফোন বুথ থেকে করেনি। একদিন বিট্টুকে নিয়ে ঘোতন বেরিয়েছিল। সুলেখার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। সেখানে একটা বুথ থেকেই কলটা করেছিল। ঘোতন বেশ ভালো করেই জানে, বিট্টু বাড়ি থেকে নিখোঁক হওয়ার পর নিশ্চয়ই ওর বাড়ির লোকজন চুপ করে বসে থাকবে না। পুলিশকে নিশ্চয়ই জানিয়েছে। তাই সে সাবধানতা অবলম্বন করে অল্প কথা বলেই ফোনটা কেটে দিয়েছিল। এছাড়াও ঘোতন তার গ্রামের এক বন্ধুকে ফোন করে জানতে পেরেছিল,
“তোরা চলে যাওয়ার পর বিভাস পুলিশ নিয়ে এসেছিল। পুলিশের মোবাইলে বিট্টুর ছবি আছে। বিট্টুকে পুলিশ খুঁজছে। ঘোতন, খুব সাবধানে থাকিস। বিট্টুকে একদম বাইরে বের করবি না। ওর ছবি রাজ্যের সব থানায় ছড়িয়ে গেছে”
ঘোতন, বিট্টুকে নিয়ে ফিরে আসার পর সুলেখার বাড়িতে জানায়,
“বিট্টুকে বাড়ি থেকে একদম বের করা যাবে না। ওর বাবা পুলিশের কাছে বিট্টুর নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে ডায়রি করেছে। এছাড়াও মিডিয়ার কাছে বিট্টুর নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে জানিয়েছে। বিট্টুর ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের সাবধানে থাকতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের ভেবে-চিন্তে নিতে হবে”
সুলেখার শ্বশুর জানায়,
“হুম, টিভিতে দেখলাম বিট্টুর ছবি। বিট্টুর ব্যাপারে খোঁজ দিতে পারলে দু’লাখ টাকা আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছে। আর একটা খবরও দিয়েছে দেখলাম। বিট্টুকে অপহরণ করেছে ঘোতন, সেই খবরও পুলিশের কাছে চলে গেছে”
সুলেখার শ্বশুরের কথায় ঘোতন খুব চিন্তায় পড়ে গেল। তার কথা কিভাবে জানল? ঘোতন বাড়ি থেকে বেরিয়ে তার গ্রামের সেই বন্ধুকে ফোন করল,
“আচ্ছা, আমি যে বিট্টুকে কিডন্যাপ করেছি। পুলিশের কাছে কিভাবে খবর পৌঁছল?”
“গ্রামের পুলিশকে নিয়ে বিভাস এসেছিল। পুলিশ অফিসারের মোবাইলে বিট্টুর ছবি দেখে আমি বুঝতে পেরেছি। ভয়ে আমি বলেছি যে এই ছবিটাই বিট্টু। সেইজন্যই তোর নাম চলে এসেছে”
“হতচ্ছাড়া, আমি গ্রামে ফিরি, তোর অবস্থা কি করি দেখ”
“বিশ্বাস কর, আমি ভাবিনি যে তোর নাম এইভাবে টিভিতে দেখাবে”
ঘোতন ভীষণ চিন্তায়। সে ঠিক করে নিল ছদ্মবেশ ধারণ করবে। সুলেখার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বৃদ্ধের ছদ্মবেশ ধারণ করবে। এছাড়া বাঁচার উপায় নেই। একরাশ হতাশা নিয়ে সে বিট্টুকেই জানাল। সুলেখার বাড়ির কাউকে জানালো না। এদিকে সুলেখার শ্বশুর ঘোতনকে শুনিয়ে দিয়েছে,
“এই ছেলেটাকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেই আমরা দু’লাখ টাকা পেয়ে যাব। কি দরকার বিট্টুকে আশ্রয় দিয়ে বেকার ঝামেলা নেওয়ার”
ঘোতন বুদ্ধি করে বলল,
“দু’লাখ টাকা পেয়েই আপনার শান্তি, তাইতো। কিন্তু, আমি কথা দিচ্ছি বিট্টুর বাবার থেকে আরও দশগুণ টাকা হাতাব। ফিফটি পারসেন্ট আপনাদের”
“যাই বলো, তোমার কথায় ভরসা পাচ্ছি না”
সুলেখার শ্বশুরমশাই একপ্রকার ঘোতনকে গালাগাল দিয়ে বলল,
“তুমি উটকো ঝামেলা আমাদের বাড়িতে বয়ে এনেছ। এমনিতেই পুলিশের খাতায় তোমার নাম আছে। একজন ক্রিমিনালের উপর আমি বিশ্বাস করতে পারছি না”
বিট্টু এই তর্কের মাঝে এসে জানাল,
“ঘোতনকাকা ঠিকই বলেছে। আমি বাবার কাছ থেকে তোমাদের সবার জন্য টাকার ব্যবস্থা করে দেব। কিছুদিন তোমাদের সাথে এখানে থাকতে চাই”
-----------------
বিট্টুর কথা কি মেনে চলবে সুলেখার শ্বশুরমশাই? পড়ুন ২২তম পর্বে…
0 Comments.