Sun 27 September 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

maro news
হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

ধাতু অধাতুর মানব নিয়ন্ত্রণ (২য় ভাগ)  

       আমরা আগের অংশে দেখেছি ধাতু ও অধাতু কিভাবে RNA থেকে DNA সৃষ্টি করে বিপরীত লিঙ্গ প্রাণ ধারা বজায় রাখে । ধাতু ক্ষারীয় ধর্মী আর অধাতু আম্লিক । এখন অম্ল ও ক্ষারের ভূমিকা কেমন সেই সম্পর্ক জেনে নিতে পারি ।

         অম্ল বা অ্যাসিডের কাজ

          মানবদেহের পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl) খাবার হজম করতে সাহায্য করে এবং খাদ্যের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। শিল্প ও রাসায়নিক উৎপাদনে সালফিউরিক অ্যাসিড (H_2SO_4) ব্যাটারি, সার (যেমন সুপারফসফেট), প্লাস্টিক এবং বিস্ফোরক তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত হয়।সংরক্ষণের কাজে সাইট্রিক অ্যাসিড ও অ্যাসিটিক অ্যাসিড (ভিনেগার) আচার এবং অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দীর্ঘকাল পচন থেকে রক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়।পরিষ্কারের কাজে নাইট্রিক অ্যাসিড ও ম্যুরিয়াটিক অ্যাসিড ধাতু পরিষ্কার এবং টয়লেট ক্লিনার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এমনকি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

           ক্ষারের কাজ

           ক্ষার দিয়ে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (NaOH) এবং পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড (KOH) থেকে সাবান, ডিটারজেন্ট ও মার্জক সামগ্রী তৈরি করা হয়। মানবদেহের পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি কমাতে ম্যাগনেসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [text{Mg(OH)}_2] সম্বলিত অ্যান্টাসিড ওষুধ ব্যবহার করা হয়।কৃষিকাজে মাটির অতিরিক্ত অম্লতা দূর করতে ও উর্বরতা বাড়াতে চুন বা ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড [text{Ca(OH)}_2] যোগ করা হয়।সোডিয়াম কার্বনেট (কাপড় কাচার সোডা) কাচ এবং কাগজ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অ্যামোনিয়াম হাইড্রোক্সাইড [NH_4OH] ঘরের কাচ ও জানালা পরিষ্কারের দ্রবণ হিসেবে কাজ করে।

         অম্ল মূলত ভালো ভালো কাজগুলোই করে থাকে। তবে মাত্রাতিরিক্ত হলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ক্ষার ব্যবহৃত হয়। শুধু ব্যবহারিক জীবনে নয় , আমাদের দেহ ও মস্তিষ্ক চালিত কাজকর্মেও অম্ল ও ক্ষারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

       দেহে এবং মস্তিষ্কে অম্ল ও ক্ষারের ভারসাম্য

         আমাদের দেহে এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় অম্ল ও ক্ষারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরনের সঠিকভাবে কাজ করার জন্য রক্ত ও মস্তিষ্কের তরলের (Cerebrospinal Fluid) pH মান প্রায় ৭.৪ (সামান্য ক্ষারীয়) থাকা আবশ্যক। মস্তিষ্কে অম্লের পরিমাণ বেড়ে গেলে (অ্যাসিডোসিস) নিউরনের সংবেদনশীলতা কমে যায়, চেতনা লোপ পেতে পারে। আবার অতিরিক্ত ক্ষারীয় হলে (অ্যালকালোসিস) স্নায়ু অত্যধিক উত্তেজিত হয়ে খিঁচুনি বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া আমাদের ভালো লাগা, রাগ, উদ্দীপনা বা শান্ত অনুভূতির মতো বিষয়গুলো নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন ডোপামিন, সেরোটোনিন, জিএবিএ) দ্বারা পরিচালিত হয়। এই নিউরোট্রান্সমিটারগুলো উৎপন্ন ও সঞ্চালিত হতে কোষের অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা হওয়া জরুরি। দেহে থাকা ধাতু (যেমন সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম) এবং অধাতু (যেমন ক্লোরিন, কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন) তড়িৎ বিশ্লেষণ বা 'আয়ন' হিসেবে কাজ করে। নিউরনের মধ্য দিয়ে সংকেত পাঠাতে এই সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে । শরীর সবসময় অতিরিক্ত অম্ল বা ক্ষার দূর করতে নিজস্ব 'বাফার সিস্টেম' (যেমন বাইকার্বোনেট বাফার) এবং ফুসফুস ও কিডনিকে ব্যবহার করে। অম্লের মাত্রা বেড়ে গেলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে আমরা কার্বন ডাই অক্সাইড (যা অম্ল তৈরি করে) বের করে দিই, যাতে মস্তিষ্ক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচে।

           মানব সংগঠনে মস্তিষ্ক 

            জীব মাত্রেই বস্তুবাদী চিন্তা ভাবনা ক্রিয়া কলাপে অভ্যস্ত এবং স্বস্তি অনুভব করে। দেহ ও মস্তিষ্ক চায় প্রাকৃতিক নিয়মে সব কিছু সংগঠিত হোক। যেদিন থেকে মানুষ আধিপত্যকামী পরশ্রম ভোগী ,বাহুবলী হয়ে ভোগসুখে মত্ত হলো তখন থেকেই তার দেহ ও মস্তিষ্কের খারাপ উপাদানের আবির্ভাব ঘটলো। এই খারাপ উপাদান জিনের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে যে জাঁকজমকপূর্ণ জীবন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো তাতে অন্যান্য সাধারণ মানুষ মোহিত হলো। ভুলে যেতে থাকলো দেহের মধ্যে থাকা মৌল ধাতু ও অধাতুর সাম্য হলো জীবন। অর্থাৎ বস্তুবাদী চিন্তা চেতনা থেকে সরে যেতে থাকলো । কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বার বার তার সামর্থ্য বা শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে। মানুষ চেষ্টা করলে তার সামর্থ্য বাড়াতে পারে। মানব সভ্যতার মঙ্গলে অনেককে সমবেত করতে পারে। মানব সভ্যতার শুরু থেকে গঠনমূলক কাজে মানব সংগঠন সক্রিয়। ধ্বংসাত্মক কাজে দেহ ও মস্তিষ্ক যেমন সায় দেয় না, মানব সংগঠনও এগিয়ে আসে না । ধ্বংসাত্মক কাজে দেহ ও মস্তিষ্ক অগ্রণী হলেও শেষ পর্যন্ত সাম্যে ফিরে আসতে চায়। কিন্তু ধ্বংসাত্মক মানব সংগঠন তাকে ফিরে আসতে বাধা দেয়। এরও পিছনে ধাতু ও অধাতুর ভূমিকা কম নয়।

          ১. জৈব-রাসায়নিক সাম্যাবস্থা ও চরম উত্তেজনা

           মানবদেহে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম (ধাতু) এবং ক্লোরিন, সালফার, ফসফরাস (অধাতু) যখন নির্দিষ্ট অনুপাতে বাফারিং অবস্থায় থাকে, তখন স্নায়ুতন্ত্রে pH এবং ইলেকট্রোলাইটের সাম্য বজায় থাকে। এটি মস্তিষ্ককে শান্ত, সহানুভূতিশীল এবং যুক্তিবাদী করে তোলে। সৃজনশীল ও গঠনমূলক সামাজিক কাজ এই সুস্থ জৈব-রাসায়নিক সাম্যাবস্থারই বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে আধিপত্য, লোভ বা ধ্বংসাত্মক উগ্রতার সময় মস্তিষ্কে অ্যাড্রেনালিন, কর্টিসল এবং ডোপামিনের একমুখী সুনামি ঘটে। এ সময় কোষীয় সোডিয়াম-পটাশিয়াম পাম্প অত্যন্ত দ্রুত ও অস্বাভাবিক গতিতে কাজ করে কোষকে চরম অম্লীয় বা 'হাইবার-উত্তেজিত' অবস্থায় নিয়ে যায়।

      ২. প্রাকৃতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও শক্তির সংরক্ষণ সূত্র

        প্রকৃতিতে নিউটনের তৃতীয় সূত্র বা থার্মোডায়নামিক্সের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো চরম বিশৃঙ্খলা (Entropy) বা ধ্বংসাত্মক প্রবণতা শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী সাম্যাবস্থায় (Thermal Equilibrium) ফিরে আসতে চায়। মানব মস্তিষ্কও প্রকৃতির বাইরে নয়। চরম অ্যাকশন পটেনশিয়াল বা ধ্বংসাত্মক আবেগের পর নিউরনগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং ক্ষারীয়-অম্লীয় সাম্য ফিরিয়ে এনে নিজেকে রক্ষা করতে চায়। অর্থাৎ, জৈবিকভাবেই শরীর দীর্ঘকাল ধ্বংসাত্মক অবস্থায় টিকে থাকতে পারে না—তার কোষীয় ধাতু ও অধাতুগুলো তাকে পুনরায় সাম্যাবস্থায় ফেরাতে বাধ্য করে।

   ৩.সামাজিক সংগঠন ও জৈবিক প্রতিক্রিয়া

       (ক)কৃত্রিম সামাজিক বিন্যাস: 

         মানব ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পর্বে উৎপাদন উপকরণ দখল ও শ্রমাভিজাত্য তৈরি হওয়ায় কিছু মানুষ প্রাকৃতিক বস্তুবাদী জীবনচর্চা থেকে বিচ্যুত হয়। জাঁকজমক ও অতিরিক্ত ভোগের লোভ স্নায়ুতন্ত্রে কৃত্রিম উদ্দীপনা তৈরি করে, যা সামাজিক স্তরে একধরনের বিকৃতি বা 'ভাববাদী অন্ধত্ব' সৃষ্টি করে।

          (খ)গঠনমূলক সংগঠনের প্রাকৃতিক শক্তি: ধ্বংসাত্মক মানব সংগঠন সাময়িকভাবে অস্ত্রের বা বলপ্রয়োগের জোরে মানুষকে মিছিলে শামিল করলেও, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ মানুষের স্বতন্ত্র মস্তিষ্ক ও তার জৈবিক গঠন সর্বদা ধ্বংসের বদলে সৃষ্টি এবং বেঁচে থাকার প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া দেয়। সমবেত গঠনমূলক চেতনায় যখন মানুষ একত্র হয়, তখন মানুষের মস্তিষ্কে 'অক্সিটোসিন' ও 'সেরোটোনিন'-এর মতো শান্তিদায়ক কেমিক্যাল নিঃসৃত হয়, যা রাসায়নিকভাবেই মানুষের মধ্যে একতা ও সাম্যের বোধ দৃঢ় করে।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register