Mon 26 October 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে রাজকুমার ঘোষ

maro news
হৈচৈ ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে রাজকুমার ঘোষ

বিট্টুর সঙ্গী 

 ইংলিশ ক্লাসে হরিকে ডাকা হল… পড়ুন ২৫তম পর্বে…  


মেয়েদের ইংলিশ ক্লাসের টিচার হরির সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে কাজুকো তাদের ইংলিশ ক্লাসে হরিকে আসার জন্য অনুরোধ করে। হরির ইংলিশে কথা বলার ধরণে মুগ্ধ কাজুকো সহ অন্যান্য জাপানী সুন্দরীরা। আসলে হরি জাপানীদের থেকে ভাল ইংরেজী বলে। অবশেষে, সে ইংলিশ ক্লাসে উপস্থিত হয়। সেখানে গিয়ে দেখে শুধুমাত্র মেয়েরাই এই ক্লাশে উপস্থিত আছে। লেডি টিচার তার চেয়ার থেকে উঠে হরিকে ইংরেজীতে ভারত সম্বন্ধে কিছু বলতে অনুরোধ করে। হরি সবার সামনে তার জন্মভূমি ভারতবর্ষ সম্পর্কে ইংরাজীতে দুর্দান্ত ভাবে তুলে ধরে। ছাত্রীরা অনেক প্রশ্নও করে, হরি আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে সকলের প্রশ্নের উত্তর ইংরাজীতে দিতে থাকে। ক্লাসের লেডি টিচার হরির ইংলিশ বলার ভঙ্গিমা ও ছাত্রীদের সাথে স্বতস্ফূর্ততা দেখে প্রভাবিত হন। তিনি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলে হরিকে রোজ এক ঘন্টা ইংরেজী কনভারসেশন ক্লাশে ছাত্রীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের দ্বারা ইংরেজী ক্লাশ নিতে অনুরোধ করেন। ছাত্রীরা চাঁদা তুলে রোজ হরির হাতে পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। হরিও রাজী হয়ে যায়। ইওকাহামাতে হরিদের জাহাজ জেনারেল সার্ভের জন্য দু’মাস ছিল। জাহাজের কোম্পানীও হরিকে বড় হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে। সেখানে থেকে জাহাজে রোজ কাজ করার পর হরি বিকেলে ইংলিশ ক্লাসে যেত। কাজুকো ও তার বান্ধবী, হরিকে রবিবার দিন পাতাল রেলে অথবা মনোরেলে অথবা তাদের নিজেদের গাড়ীতে শহরের বিশেষ দর্শনীয় স্থানগুলোতে দেখাতে নিয়ে যেত। ইওকাহামা থেকে টোকিও পর্য্যন্ত বিভিন্ন সুন্দর স্থান পরিদর্শন করে হরি মুগ্ধ হয়ে যায়। 

জাপান খুবই স্বচ্ছ দেশ। এখানে কেউ চুরি করে না। এখানকার সব দোকান কাচের দরজায় টিভি ক্যামেরা। দোকান খোলা রেখেও দোকানদাররা চলে যেতে পারে। রাস্তার পাশে দোকানের খোলা বারান্দায় বিভিন্ন বাক্সে বিভিন্ন ফল খোলা রেখে দোকানের মালিক বাড়ী চলে যায়। কখনও চুরি হয় না। জাপানে বিদেশীদের প্রতি জাপানীদের ব্যবহার অমায়িক। মনোরেলে টোকিওতে জুডো স্টেডিয়াম এমপেরর হাইজ- গিঞ্জা শপিং সেন্টারে প্রভৃতি স্থান ঘোরা হল এবং কিছু মারকেটিংও করা হল। ইওকাহামায় হনমকু শিপবিল্ডিং ডইয়ার্ড। ঐ ডকের পাশেই হরির থাকার হোটেল। সেখানে কাজুকো আসত তার বান্ধবীকে নিয়ে। কাজুকো ভাল গান গায়। হরি জানতে পেরে একদিন কাজুকোকে নিজের হোটেলে আসতে অনুরোধ করে। ডিনারের আমন্ত্রণ জানায়। কাজুকো ওর বান্ধবীকে নিয়ে সর্বত্র যায়। কিন্তু সে এবার হরির হোটেলে একাই আসে। হরি তার বান্ধবীর কথা জানতে চাইলে কাজুকো ইংরাজীতে বলে, “আই হ্যাভ বিন ইনভাইটেড হিয়ার। হোয়াই উইল মাই ফ্রেন্ড কাম? দেন আই গো” 

“ওকে। ওকে… নট অ্যাট অল” … হরি বুঝতে পারল কাজুকো বেশ অসন্তুষ্ট হল। তাই সে কথা বাড়াল না। ডিনার কমপ্লিট করার পর হরি ওকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করল। কাজুকো ওর মিষ্টি কন্ঠস্বরে বেশ কয়েকটা ইংলিশ গান শোনায়। হরি কাজুকোর গানের প্রশংসা করে হাততালি দেয়। সেদিনের মত কাজুকো ফিরে গেল। তবে যাবার আগে হরিকে বলেছে, তার বান্ধবী যেন জানতে না পারে। হরি সম্মতি জানায়। 

জাপানে বড় বড় রাস্তা। একদিন কাজুকো তার সঙ্গী মিসেস তানাকা ও হরিকে নিয়ে টোকিও শহরের হাই ওয়ে পথে দ্রুতবেগে গাড়ি চালাতে থাকে। কাজুকো হরিকে দেখাতে চায়, সে কতটা এক্সপার্ট। অন্যান্য জাপানী মেয়েদের থেকে সে খুবই আলাদা। হরি সবই বুঝতে পারে। কিন্তু কোনও কথা বলে না। 

জাপানকে ফুলের দেশও বলা হয়। বড় বড় পরিচ্ছন্ন রাস্তা, প্রায় প্রতি রাস্তার মাঝখান দিয়ে ছোট ছোট পিতলের ফুলদানিতে বিভিন্ন রংয়ের ফুল সাজিয়ে রাখা আছে। অবশ্য হরি টোকিওতে এই ফুলের বাগান সবচেয়ে বেশী লক্ষ করেছে। টোকিও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর। 

প্রায় দু’মাস থাকার পর কাজুকো যেন হরির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বান্ধবী মিসেস তানাকা কাজুকোকে মিসেস হরি বলে সম্বোধন করত। কাজুকো লজ্জা পেলেও ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করত। কিন্তু হরি এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাতো না। কারণ জাহাজের চাকরিতে সে বেরিয়েছে। দুনিয়া ঘুরতে হবে তাকে। কতশত মানুষের সান্নিধ্যে আসবে সে। ওর মত মানুষের পিছুটান থাকলে হবে না। তার জীবনের লক্ষ্য স্থির। দুনিয়া ঘুরে মানুষের সাথে মিশে তাদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে জানা। কিন্তু কোনও মানুষের সাথে গাঢ় বন্ধনে জড়াবে না। দু’মাস অতিক্রান্ত হয়ে সেই দিনে চলে এল, যেদিন হরিদের জাহাজ বন্দর ছেড়ে অন্য দ্বীপে যাবে। কাজুকো হরির চলে যাওয়াতে ভীষণ কষ্ট পেল। হরিকে নিজের ভালোবাসার কথাও জানাল। হরি বলল, “আমি এই দেশে এসেছি তোমাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে। আমার দেশ ভারতবর্ষ সম্বন্ধে জানাতে এসেছি। আমার কাজ শেষ। এবার আমাকে যেতে হবে” 

কাজুকোর মনে একরাশ দুঃখ দিয়ে হরিদের জাহাজ এগিয়ে চলল জাপানের অন্য একটি দ্বীপ নাগোয়াতে। নাগোয়া হল একটি ঐতিহাসিক পুরোনো শহর। এখানে রাজা সোগানের রাজপ্রাসাদ দর্শনীয়। নাগোয়া থেকে হনসু দ্বীপের দক্ষিনে মোজি বন্দর। তারপর হিরোসিমায় যাওয়া হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার পরমাণু বোমা নিক্ষেপে এই শহর ধুলিস্যাৎ হয়েছিল। হরিদের জাহাজ ছিলো হিরোশিমার সংলগ্ন কিউরে বন্দরে। হিরোসিমায় প্রথম যেখানে বোম পড়েছিল, একটি গম্বুজের মত বাড়ীতে। বাড়ীটি প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। ঐ বাড়ীর পাশে একটি উদ্যান ও সংরক্ষিত মিউজিয়াম আছে। বোম পড়ার কেন্দ্রবিন্দু থেকে পনের মাইল দূরেও এত উত্তাপ হয়েছিল যে সেখানে কাচের বোতলও গলে দুমরে গিয়েছিল। মিউজিয়মে ঐ সব বিভিন্ন নিদর্শন সহ বিদ্ধস্ত শহরের ফটো ও অনেক লেখা বই ছিল। ঐ উদ্যানে অনেক পায়রা দেখা যায় এবং আর্টস্কুলের ছাত্রীরা ছবি আঁকার অভ্যাস করে। বোম পড়ার পর যারা বেঁচেছিল তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। সরকার তাদের বিনা পয়সায় স্পেশাল চিকিৎসার সুযোগ দেয়। ঐ দুটি নিদর্শন ছাড়া হিরোশিমায় আর কোন পুরনো নিদর্শন নেই। বর্তমানে এটি জাপানের অন্যতম বিশেষ উন্নত শহর। রাস্তার দুপাশে বড় বড় অট্রলিকা - বড় বড় শপিং সেন্টার। এই হিরোশিমা থেকেই টোকিও পর্য্যন্ত পৃথিবীর অন্যতম দ্রুততম রেল পথ। জাপানের জীবনযাত্রার মান খুব উচু হওয়ায় প্রত্যেকেই সর্ব্বদা ব্যাস্ত। সময় বাঁচানোর জন্য সকলেই দৌড়ে চলাফেরা করে। মেয়েরা একেবারে আধুনিক পোষাকে অভ্যস্ত। কিমোনো এখানে মেয়েদের জাতীয় পোষাক। এদের জাতীয়তাবোধ খুব উচুস্তরের। কিমোনো পড়া দেখলেই সকলে মাথা নীচু করে সম্মান প্রদর্শন করে। একজন জাপানীকে যদি বলা যায়, সে খুব ভাল তাহলে সে উত্তর দেবে অনেক ধন্যবাদ "ডোম্ আরিগটো"। তাকে যদি বলা যায় জাপান খুব ভাল "নিহঙ্গ জো তো" তাহলে সে খুশী হয়ে বলবে অনেক ধন্যবাদ মহাশয়, অর্থাৎ জাপানী ভাষায়, "ডোম্ আরিগটো গোজাইমাস”। তারপর হ্যান্ডসেক করে তাকে তার বাড়ী নিয়ে যাবে অথবা কফি হাউসে একটি কফি অফার দেবে। হরি এখানে এসে অনেককে এমন ভাবে সম্বোধন করেছে। ওখানে প্রত্যেক অফিস অথবা কারখানা শুরু হওয়ার পনেরো মিনিট আগে জাতীয় সঙ্গীতের মিউজিকের সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পিটি না করলে তাকে কাজে অনুপস্থিত হিসবে ঘোষণা করা হবে। জাপানীদের উন্নতির চাবিকাঠি হল সৎ কৰ্ম্ম দায়িত্বশীল এবং জাতীয়তাবোধ সম্পন্ন মন্। কাজের প্রতি অবহেলা প্রমানিত হলেই চাকরী থেকে বহিস্কার করে দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে প্রতিবাদও হয় কিন্তু যার যার সময়মত, নিজের কর্মক্ষেত্রে কাজ বন্ধ করে না, রাস্তার কখনও মিছিল করে না। 

নাগোয়াতে বেশ কিছুদিন থাকার পর হরিদের জাহাজ বেশ কিছু দ্বীপ ঘুরে, শহর ঘুরে আইয়োই নামে আরেকটি দ্বীপে গেল। এখানে হেভী ইন্ড্রাস্টিজের কারখানা বিখ্যাত। এখেনে হুণ্ডা মটর সাইকেল খুব সস্তায় পাওয়া যায়। জাহাজের বহু নাবিক এই মটর সাইলেক কিনে জাহাজের মধ্যে লোড করে নেয়। হরিও একটি রেসিং হুণ্ডা বাইক কিনে নেয়। জাপানের মত দেশে হরি প্রায় ছয় মাস ঘুরে দারুণ রোমাঞ্চ অনুভব করল। এবার তাকে জাপান ছেড়ে অন্যদেশে পাড়ি দিতে হবে…

------------------ 

এরপর হরিদের জাহাজ কোন দেশে যাবে? পড়ুন পরের ২৬তম পর্বে…

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register