- 14
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
নতুন জায়গায় চলে এল ঘোতন, সাথে বিট্টু… এরপর। পড়ুন ১৮তম পর্বে…
বিট্টু তার ঘোতনকাকার সাথে চল্লিশ মিনিটের হাঁটা পথে যাবে বলে মনস্থির করল। ঘোতন বিট্টুকে বলল,
“বিট্টু দরকার হলে আমি তোকে কোলে করে নিতে পারি? অসুবিধা হলে জানাস”
বিট্টু হাসতে হাসতে বলল, “কি বলছ? আমি এখন বড় হয়ে গিয়েছি”
“তাছাড়া রাতের অন্ধকারে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে তোর ভালোই লাগবে। যা যা বলেছি, সব মনে আছে তো, বিট্টু? আমার বোনকে সবকিছু ঠিকভাবে বলতে পারবি তো?”
“হ্যাঁ গো, সব ঠিক করে বলব”
আটপুরের মূল রাস্তায় নেমে, ঘোতন বিট্টুকে নিয়ে একটি মাঝারি রাস্তা ধরে নিল। সেখান থেকে প্রায় পাঁচ মিনিট হাটার পর একটা মাটির রাস্তা ধরল। আলের উপর দিয়ে মাটির রাস্তা। কাছাকাছি কোনও নদী আছে, তাই রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে নদীর জলের কুলকুল শব্দ ভেসে আসছে। আলের দুই ধারে বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে ক্ষেত আছে। দুই সবুজ ক্ষেতের (যদিও রাতের অন্ধকারে সবুজ মনে হচ্ছে না) মাঝে সোজা আলের রাস্তা চলে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। সোদা মাটির গন্ধ নাকে ভেসে আসছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছে বিট্টু। অন্ধকারে ওদেরকে পথ দেখাচ্ছে পরিস্কার আকাশে চাঁদের মিটিমিটি আলো। এছাড়াও অসংখ্য আলোর বিন্দু যাত্রাপথে ওদের সঙ্গী হল। বিট্টুর সেই আলোর বিন্দুগুলো দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে বলল,
“ঘোতনকাকা, কি সুন্দর গো? এই আলোগুলো কি সুন্দর উড়ছে। আমাদের সাথেই যাচ্ছে তো দেখছি”
“হুম, এরা হলো জোনাকি পোকা। এই পোকাগুলোর সাথে আলো থাকে। রাতের অন্ধকারে এই পোকাগুলো আমাদের যাওয়ার পথে আলো দেখায়”
রাতের অন্ধকারে জোনাকীর মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত গ্রাম্য পরিবেশ অতিক্রম করে বিট্টু তার ঘোতনকাকার হাত ধরে অবশেষে ঘোতনের বড় বোন সুলেখার বাড়িতে প্রবেশ করল। ঘোতনকে দেখেই সুলেখার চক্ষু চড়কগাছ।
“একি রে দাদা, বলা নেই, কওয়া নেই। একেবারে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লি যে। তুই বেরো ঘর থেকে। এক্ষুণি বেরিয়ে যা। (এবার বিট্টুর দিকে তাকিয়ে) ও বাবা, নিজের হয়না, এ আবার কাকে জোটালি, দাদা? বিয়ে করেছিস নাকি? না, এতো সুবিধের মনে হচ্ছে না। এত বড় ছেলে তোর কেন হবে? কি ব্যাপার বলত?”
সুলেখা অতি চিৎকার শুরু করল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল ওর বর এবং অন্যান্য সদস্যরা- শ্বশুর, শাশুড়ী ও ননদ। শ্বশুর বিরক্ত প্রকাশ করল,
“কি হলো বৌমা, রাত বিরেতে অমন শিয়ালের মত চেল্লাও কেন?”
ঘোতনের দিকে তাকিয়ে শ্বশুর কিছু না বলে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। শুধু শ্বশুর না, ওর বর, শাশুড়ী এবং ননদও চুপচাপ ঘরে ঢুকে গেল। ঘোতন, রীতিমত অবাক। মনে মনে বলল, ‘কি ব্যাপার?’
সুলেখা গজগজ করতেই থাকল। ঘোতন এবার রীতিমত ধমক দিল,
“তুই একটু চুপ করবি? আমি তোর বিয়ে দিলাম ধুমধাম করে। অথচ তুই এমন ব্যবহার আমার সাথে কেন করছিস? মায়েরও কোন খোঁজ নিসনি। তোরা দুই বোন স্বার্থপর হয়ে গেলি”
“বেশ করেছি। আমাদের বিয়ে দিয়ে কত্তব্য (কর্তব্য) করেছিস। এতে নাম কেনার কি আছে। এখন ভালোয় ভালোয় বিদায় হ”
“ঠিক আছে”
ঘোতন বিট্টুকে ধমক দিয়ে বলল,
“শয়তান ছেলে, এখানে থাকা যাবে না। আগে তোর বাপের থেকে টাকাটা জোগার করি, যদি না দেয়, তাহলে তোকে কেটে নদীর জলে ফেলে দেব, হতচ্ছাড়া”
বিট্টু এবার সুলেখাকে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ও পিসি, তুমি আমাকে তোমার কাছে রেখে দাও। এই ঘোতনাটা মহা বদমাশ। আমাকে শুধু মারধর করে। আমি আমার বাবাকে বলে তোমার জন্য অনেক টাকার ব্যবস্থা করে দেব”
ঘোতন এবার বিট্টুকে আরও ধমক দিল,
“চুপ কর শয়তান ছেলে। তোর বাবার থেকে সব টাকা আমি নেব, কাউকে ভাগ বসাতে দেব না। এখানে বলছিস কেন? সুলেখার অত লোভ নেই। এখানে কেঁদে লাভ নেই”
কথাটা শুনে সুলেখার এবার টনক নড়ে উঠল। সে ঘোতনকে বলল,
“এই দাদা, ছোঁড়াটা কি বলল রে?”
“কিছু না, তুই শুনে কি করবি? আমরা চললাম”
“না, একদম যাবি না। ছোঁড়াটার কাছ থেকে আমি সব শুনব। ওকে তুই কিডন্যাপ করেছিস, মনে হচ্ছে”
বিট্টু এবার ঘোতনের ঈশারা বুঝতে পেরে ছুটে এসে সুলেখাকে জড়িয়ে ধরল,
“পিসি গো, আমাকে তুমি এখানে রেখে দাও। আমি দু’দিন মা-বাবাকে ছেড়ে এই দুষ্টু লোকটার সাথে আছি”
ঘোতন পুনরায় বিট্টুর হাত ধরে টানতে উদ্যত হতেই সুলেখা বলল,
“একদম এখান থেকে বেরোবি না। আগে আমাকে সব খুলে বল”
প্রাথমিকভাবে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ঘোতন, বিট্টুকে চোখ টিপে জানিয়ে দিল, “দারুণ এক্টিং করছিস। চালিয়ে যা”
সুলেখা ওদের দুজনকে নিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করল,
“দাদা, এবার বলতো। তুই কি কাণ্ড করেছিস?”
“ঠিক আছে, সব বলছি। আগে তুই বল, তোর বর, শ্বশুর ও বাড়ির অন্য লোক আমাকে দেখে ঘরের মধ্যে ঢুলে গেল কেন?”
“সকলে টিভিতে দেখেছে। তুই নেতার সাথে মিশে কোন নেতাকে খুন করেছিস। সব খবর জানে। আমি খুনিদাদার সাথে কোনও সম্পর্ক রাখতে চাইনে। এই গ্রামে পাঁচ লোকে পাঁচ কথা বলবে। আমার সংসার আমাকেই বুঝতে দে”
“তোদের সংসারে অভাব নেই তো? সব ঠিক আছে, মনে হচ্ছে। খুনী দাদার সাথে সম্পর্ক রেখে লাভ কি? আমাকে যেতে দে।”
সুলেখা এবার বিট্টুকে আদর করে বলল,
“তোমার কোনও ভয় নেই। তুমি একটু বোসো এই ঘরে। আমি এই দুষ্টু কাকার সাথে একটু কথা বলে নিই”
আলাদাভাবে ঘোতনের সাথে কথা বলার জন্য সুলেখা এবার ওকে নিয়ে শ্বশুর যে ঘরে আছে, সে ঘরে প্রবেশ করল। ঘোতন দেখল, ওই ঘরে সকলেই উপস্থিত আছে। ঘোতনকে দেখেই সকলে বেশ আড়ষ্ট হয়ে গেল। সুলেখা সবাইকে আশ্বস্ত করল,
“ভয় পাবার কিছু নেই। আমি ওর সাথে কিছু কথা বলব। সকলের শোনা উচিত”
ঘোতন শুরু করল,
“প্রথমেই বলি, আমাকে ভয় পাবার দরকার নেই। আমি খুন করিনি। ওই দলের সাথে যুক্ত ছিলাম। আমাদের দলকে ফাঁসানো হয়েছে। তাছাড়া ওই খুনের জন্য নেতাকে এরেস্ট করেছে। পুলিশ আমাদের খোঁজ করেনি। সবাই জানে আমরা আর নেই। আমি এখন ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াই”
“ঠিক আছে। এখন কি করেছিস বল?”
“তুই কিছুই জানিস না। গ্রামের লোকেরা আমাদের ঘরবাড়ি সব নষ্ট করে দিয়েছে। আমি কোনওরকমে ওই ভাঙা ঘরে পড়ে আছি। কিন্তু টাকার জন্য আমাকে অনেক কিছু করতে হয়। এখন আমাদের জায়গাটা গ্রামের বিভাসরা কেড়ে নিতে চাইছে। আমি বিট্টুকে কিছুদিন আগে কিডন্যাপ করেছি। এই ছেলেটার বাবার অনেক টাকা। বিট্টু বলেছে, ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিলে ওর বাবা অনেক টাকা দেবে। কিন্তু মাঝে সেই পুলিশের চক্কর। তাই বিট্টুকে নিয়ে তোর কাছে পালিয়ে এসেছি”
“আমরা কি সেই টাকার হিস্যা পেতে পারি? মানে এর জন্য আমাদের কি করতে হবে?”
“এসব শুনে কি করবি? তোদের কোনও অভাব নেই। আমার ব্যবস্থা আমাকেই করতে দে”
“দেখ দাদা, টাকা সবারই দরকার। আমরা রাজি আছি, কি করতে হবে, তুই শুধু সেটাই বল”
“কিছুই না, বিট্টুকে একটু যত্ন করতে হবে। আমি ওকে এখানে নিশ্চিন্তে রেখে যাব। টাকা কিভাবে আদায় করতে হবে, সে আমার জানা আছে”
“ঠিক আছে আমি ও বাড়ির সবাই রাজি”
সুলেখার পরিবারের সকলেই মত দিল। বিট্টুর যত্ন নেবে, কথা দিল। ঘোতন জানত, এই নাটকটা করলে একটা ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। তাই সে বিট্টুর কাছে ফিরে এসে বলল,
“একদম ফাটাফাটি এক্টিং হয়েছে বিট্টু। এখানে তুই নিশ্চিন্তে থাক। আমি দেখছি কি করা যায়। তোকে আমি যে করে হোক, তোর বাবার কাছে ফিরিয়ে দেব। তোর দুষ্টু মাকে কিভাবে জব্দ করতে হয়, দেখছি”
সুলেখা ভীষণ যত্ন সহকারে ঘোতন ও বিট্টুর জন্য খাবারের আয়োজন করল।
----------------------
সুলেখার বাড়িতে বিট্টু পরম যত্নে থাকবে… তারপর কি হবে? পড়ুন ১৯তম পর্বে…
0 Comments.