- 4
- 0
সহযাত্রী
হাওড়া মেলে যাচ্ছি জবলপুর থেকে কলকাতা। রাতটাও ট্রেনেই কাটবে। সাইড লোয়ার বার্থে আরামসে ঘুমাচ্ছিলাম। হালকা একটা ঝটকা লাগতেই ঘুমটা ভেঙে গেল। আর দাঁড়ালো তো দাঁড়ালো। নট নটনড়নচড়ন কন্ডিশন, মনে হয় কোনও ছোটখাটো স্টেশনে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। বড্ড গরম! দরদর করে ঘামছি। আর শুয়ে থাকা যাচ্ছে না। চোখ কচলে উঠে বসলাম। এইটা কোন জায়গা? টিমটিম আলো জ্বলছে স্টেশনে। দু’ চারজন লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্লাটফর্মে শুয়ে ঘুমাচ্ছে, ভিখিরি বা পোর্টার হবে হয়ত। থেমে থাকা ট্রেন থেজে গোটাকয়েক যাত্রী স্টেশনে নেমে একটু হাত-পা ছাড়িয়ে নিচ্ছে, কেউ পায়চারি করছে, কেউ স্টেশনের বারোয়ারি কল থেকে জল নিচ্ছে। টাইম দেখলাম মোবাইলে, রাত প্রায় আড়াইটে, মানে মিনিট পাঁচেক এখনও বাকি আছে আর কি। গলাটা শুকিয়ে এসেছে, একটু জল পেলে বেশ ভাল হতো। কিন্তু জলের বোতলে আর একবিন্দু জলও অবশিষ্ট নেই। রেলআওয়ে ভেন্ডারও আসেনি মাঝে, জলের বোতল কেনা হয়নি। জানালার ঠিক সামনেই পানীয় জলের একটা কল চোখে পড়ল। বোতলটা নিয়ে চটপট নেমে পড়লাম প্ল্যাটফর্মে।
মনে হয় কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, গোটা প্ল্যাটফর্ম এখনও জবজবে ভিজে। আরেকটু হলেই পা হড়কে যাচ্ছিল। সাবধানে হ্যান্ড্রল ধরে ট্রেন থেকে নামলাম। আকাশ এখনও কালো মেঘে ঢাকা। যে কোনও মুহূর্তে আবার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামতে পারে। জলের বোতল ভরে নিয়েও দেখি সিগনাল লাল। খানিকদুরে স্টেশন মাস্টারের অফিসে ঘোরাঘুরি করছে কিছু কালচে অবয়ব। আমার চশমাটা মাইনাস পাওয়ারের। ভুল করে বার্থেই রেখে এসেছি। দুরের কিছু ভালো কিরে দেখতে পাইনা। নড়ন্তচড়ন্ত ছায়াগুলোকে ভুতের মত লাগছিলো। জোরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। অজানা নির্জন স্টেশন, নট নড়নচড়ন ট্রেন, ঘুমঘুম চোখ, দূরে হেঁটে বেড়াচ্ছে, দৌড়াচ্ছে কিভহু ছায়ামুর্তি, তাদের গলার অস্ফুট আওয়াজ ঢেকে যাচ্ছে ঝিঁঝিঁর ডাক, তক্ষকের টকটক ডাকে। সুন্দর ঠান্ডা ঠান্ডা বৃষ্টির গুড়ো মাখা বাদলা হাওয়া বইছে। আরামে চোখ জুড়িয়ে আসছে। একটু।দুরের বেঞ্চটায় একজন মোটে বসে আচগে দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম, বেঞ্চের আরেক কোণে গিয়ে বসলাম। বয়স্ক লোক, এই ছয়ের ঘরে বয়স হবে মনে হয়, আমার বাবার বয়সী হবেন ভদ্রলোক। ডেনিম ট্রাউজারের ওপর বিস্কিট কালারের হাফ স্লিভ পোলো নেক টি শার্ট। পা খালি। মানে চটি চপ্পল কিছুই পড়েন নি। ড্রেস বা ভদ্রলোকের এপিয়ারেন্সের সাথে যা ভীষণভাবেই বেমানান। বুঝলাম ট্রেন থেকে সদ্য নেমে এসে বসেছেন, তাড়াহুড়োতে অন্ধকার কামরায় জুতোটা খুঁজে পাননি। আমি আড়চোখে তাকিয়ে এত কিছু দেখে নিলেও ভদ্রলোক কিন্তু একবারও আমার ফিরেও তাকান নি। আমিই উপ্যাভক।হয়ে বললাম,
ট্রেনের ভিতর বড্ড গরম, এখানে তাও বসা যাচ্ছে।
হুম
আপনি ট্রেনে ছিলেন বুঝি?
হ্যাঁ, A2 কোচে।
আমি HA1
ওহ।
কতক্ষন যে দাঁড়াবে ট্রেন।
জানিনা। তবে আমার বেশ লাগছে জায়গাটা।
এতক্ষনে দুটো ফুল সেন্টেন্স শুনতে পেলাম। কেমন যেন চাপা ঘষঘষে গলার স্বর। ভালো করে খেয়াল না করলে যেন শোনাই যাবে না। বড্ড অস্বস্তিকর।
আমি তো অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
আমি তো বেশ দেখতে পাচ্ছি। ভদ্রলোক দূরে অন্ধকার জগোপঝারের দিক থেকে দ্ররুষ্টি না সরিয়ে, মুখের একটা ভাঁজ না হেলিয়ে বললেন।
কি দেখতে পাচ্ছেন? অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
এই স্টেশন থেকে একটা পায়ে চলা সরু পথ চলে গেছে ওই পাহাড়টার পিছনে। ওখানে আছে একটা ছোট্ট নদী। লাল পাথুরে মাটি কেটে বয়ে চলছে স্বচ্ছ জলের দগারা। রীদ্দুরে সোনা রঙ আর চাঁদনী রাতে রূপোরঙ সেই নদীর দিকে তাকিয়ে থাকলে নেশা হবেই আপনার। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। কত রকমের সবুজ যে হয়। আর অগুন্তি ফুল। লাল নীল আকাশি বেগুনি হলুদ গোলাপি। কত্ত প্রজাপতি, মৌমাছি, ভোমরা উড়ে বেড়াচ্ছে, পাখী উড়ছে।গান গাইছে। পাথরের আসনে শরীর এলিয়ে বসার অপেক্ষামাত্র, শান্ত ঠান্ডা হাওয়া ঘুম পাড়িয়ে দেবে। নদী থেকে উঁকি মেরে আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইবে লাল নীল মাছের দল… কি শান্তি সেখানে। সেখানেই তো আমার মা অপেক্ষায় আছেন। আমি যাব। সেখানেই যাব।
বলে হঠাৎকরে লাফ দিয়ে উঠে প্রায় দৌড়েই স্টেশনের শেষপ্রান্তে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। ও বাবা, এতো ফুল্লি গন কেস। মাথায় ছিট না, এক্কেবারে থান কাওড়ের ফ্যাক্টরি আছে!
ও আঙ্কেল, আঙ্কেল, যাবেন না, ট্রেন এক্ষুনি ছেড়ে দেবে।
বলতে না বলতে দুলে উঠল রেলদানবের নিথর ধাতব দেহ, কথা শুনতে শুনতে খেয়ালই করিনি কখন লাল থেকে হলুদ হয়ে সবুজ হয়ে গেছে সিগন্যালের আলো। ডাকাডাকি ছেড়ে নিজে দৌড়ে গিয়ে আমার কোচে উঠে পড়লাম। আমার সাথেই দৌড়ে এসেছিলেন আরেক সহযাত্রী। তাকে হাত বাড়িয়ে টেনে তুলে জিজ্ঞাসা করলাম,
কি হয়েছিল দাদা? ট্রেন এতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল কেন?
আরে ওই A1 কোচে এক ভদ্রলোক ঘুমের মধ্যে বোধহয় হার্ট এটাকে মারা গেছেন। ওনার এক বন্ধু সাথে ছিলেন, তিনিই চেন টেনেছিলেন। ওই, ওই যে বডিটা নিয়ে যাচ্ছে।
চলন্ত ট্রেনের পাশ দিয়ে চার পাঁচজন মানুষের ছোট্ট দলটা বেরিয়ে যাচ্ছে, দু’জন একটা স্ট্রেচার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। লাশটা ঢাকাচাপা দেয় নি কেউ, স্ট্রেচারে চিরঘুমে ঘুমিয়ে আছেন এক সহযাত্রী। স্টেশনের টিমটিমে আলোয় তাঁর ডেনিমের শার্ট, বিস্কিট কালারের টি শার্টটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম, দেখতে পেলাম ওনার খালি পা ও। কিন্তু তা কি করে সম্ভব? আমি ঠিক জানি, তিনি তো এখন পাহাড়ের পিছনে, নদীর তীরে,ওনার হারিয়ে যাওয়া মাকে খুঁজতে গেছেন।
0 Comments.