- 7
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
বিট্টুকে অফিসার খুঁজে পাবে? পড়ুন ১৭তম পর্বে…
কমলের অভিযোগের ভিত্তিতে ওসি বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বিট্টুর একটি ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। বাড়ির ল্যান্ডফোন, কমলবাবুর মোবাইল সব কিছু ট্র্যাপ করার ব্যবস্থা করলেন। কমলকে বললেন,
“আপনারা বাড়ি ফিরে যান। আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করে দেখছি। সব থানায় বিট্টুর ছবি পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। কোনও খবর পেলে আমি তৎক্ষনাৎ ফোন করে জানিয়ে দেব”
রত্না ন্যাকামো করে জিজ্ঞাসা করল,
“অফিসার আমার ছেলেকে আমি পেয়ে যাব তো? ওকে ছাড়া আমি একদম থাকতে পারব না। প্লিজ, তাড়াতাড়ি আমার ছেলেকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন”
অফিসার বিশ্বজিৎ রত্নার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে মনে মনে বলেই ফেললেন, “একটু বেশী বাড়াবাড়ি করছে ভদ্রমহিলা। আচ্ছা কমলবাবু কি কিছুই বোঝেন না?” নিজের মনেই প্রশ্ন করলেন নিজেকে। অগত্যা, বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলী কমলকে বললেন,
“বিট্টুকে কিডন্যাপ করার ব্যাপারে কোনও কল আসলে অন্তত তিন মিনিট কথা বলবেন। কেটে যেন না দেয়। তাহলে আমাদের ট্রেস করতে সুবিধা হবে। অন্তত বিট্টুর লোকেশন বুঝতে পারব। মনে থাকে যেন”
“ঠিক আছে” – কমল রত্নাকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। যাবার পথে রত্নাকে বলল,
“থানার মধ্যে অত বেশী রিয়াক্ট করার কোনও দরকার ছিল না। বিট্টুর প্রতি তোমার মনোভাব আমি বুঝতে পেরেছি। সকালে তুমি ঘুমের ঘোরে বলেছিলে ‘আপদ বিদায় হয়েছে’। কানে আমার কথাটা বাজছে। যাই হোক, আমার ছেলেকে আমি খুঁজে বের করবই”
“তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ? আমি বিট্টুকে খুব ভালোবাসি, কি প্রমাণ চাও বল। আমি এক্ষুণি রাস্তায় অনেক যানবাহন যাচ্ছে, তার সামনে গিয়ে লাফ দেব। একেবারে মরে যাব”
“ঠিক আছে চলো। অত কিছু করতে হবে না। বিট্টুটা কোথায় গেল? আমি তন্দ্রার কাছে কিভাবে মুখ দেখাব?”
“মুখ দেখাবে মানে? সে কোথায়?”
“আরে সে আমার মনে আছে। বিট্টু আমার জন্যই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। তন্দ্রা, তুমি আমাকে ক্ষমা করো না”
রত্নার ভীষণ রাগ হচ্ছে। সে কিছুই বলল না। মিথ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার অভিনয় করল।
বাড়ি চলে এল কমল। ওর মোবাইলে রিং হল। তন্দ্রার বাবা কল করেছে। রত্না জিজ্ঞাসা করল,
“কে কল করেছে?”
“বিট্টুর দাদু-দিদা কল করেছেন। আমি আসছি, একটু বাইরে গিয়ে কথা বলি”
রত্না খুব রেগে গেল। কিছুই বলতে পারল না। সেও কমলের পেছন পেছন গেল, কমলের সাথে তন্দ্রার বাবার কি কথা হয় শোনার জন্য, কিন্তু কমল বিট্টুর নিরুদ্দেশে একটু বেশীই সতর্ক হয়েছে। সে খেয়াল করেছে, রত্না আসছে ওর পেছনে, সাথে সাথে রত্নাকে বলল,
“কি ব্যাপার? কিছু বলবে? আমি একটু কথা বলে আসছি। তুমি ঘরে যাও”
রত্না না চাইলেও ফিরে এল। কমলের কথায় আড়ি পাতা হল না। মনের মধ্যে জ্বালামুখী ফাটল ধরার মত রাগ পুষিয়ে রেখে দিল। জানে না সে কখন বিস্ফোরণ ঘটাবে? কমল বাইরে গিয়ে তন্দ্রার বাবার সাথে কথা বলছে,
“হ্যাঁ, বলুন”
“তুমিই তো বলবে বাবা। আমার বলার কিছুই নেই। আমার মেয়ে যখন ওই বাড়িতে নেই, তখন আমার বলার অধিকারও নেই। বিট্টুর জন্যই আমার মনটা ভীষণ খারাপ হত। ওর সাথে দেখা করতে মানা করল, ওই রত্না। আমি ভাবিনি যে, রত্না এইভাবে আমাদের অপমান করবে। দাদু-দিদা হিসাবে নাতির প্রতি আদর, মমতায় সে আপত্তি জানাল, আমাদের বিট্টুর কাছে আসতে মানা করল। তোমার বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিল, গেলেই নাকি অশান্তি করবে”
“আচ্ছা, আপনার ভাই মানে রত্নার বাবা-মা জানেন ব্যাপারটা”
“হ্যাঁ, জানে বৈকি। ওরাও এসে বলল, যে চলে গেছে তাকে নিয়ে ভাববার দরকার নেই, যে এখন ওই বাড়িতে আছে তার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে বলল। আমরা তোমার বাড়িতে গেলে রত্নার খুব অসুবিধা হবে। একদিন অপমান করে আমাদের তাড়িয়ে দিল। আজ দেখো, বিট্টু বাড়ি ছেলে পালিয়ে গেল। জানিনা ওর সাথে কি হয়েছে? রত্না কি ব্যবহার করেছে?”
“এতো কিছু হয়েছে, আমাকে জানাননি কেন?”
“দেখো বাবা, তুমি ভীষণ ওয়ার্কলোড নিয়ে থাকো। তোমার ব্যস্ততা আমরা জানি। তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি, বাবা। এখন এই নিয়ে অশান্তি করো না। আগে বিট্টুকে খুঁজে পাওয়াটা ভীষণ জরুরী”
“পুলিশকে বলেছি। বিট্টুর ছবি দিয়েছি। ওরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবে বলেছে”
“ঠিক আছে, এখন রাখো। কিছু খোঁজ পেলে আমাকে অবশ্যই জানিও। চিন্তায় থাকব”
কল কেটে দিল কমল। বিট্টুকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণা ছিলই। কিন্তু তন্দ্রার বাবা কি বললেন? রত্নার প্রতি কমলের খুব রাগ হচ্ছে। এই সময় নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রত্নাকে কিছুই বলা যাবে না। আগে বিট্টুকে খুঁজে পেতে হবে। কমল ঘরে ফিরতেই রত্না জিজ্ঞাসা করল,
“কি বলল?”
“কিচ্ছু না, বিট্টু হল ওনাদের আদরের নাতি। নাতির নিরুদ্দেশের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, যা যা হয়েছে। ব্যাস”
“আর কিছু বলল না জেঠু?”
“কেন? আরও কিছু বলার ছিল!”
“না, তা নয়। আমার সম্বন্ধে কিছু বলল না? মানে তোমার কান ভাঙানোর মত কিছুই বলেনি? আমার জন্যই বিট্টু এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, জেঠু এমন কিছু কথা বলেনি তোমাকে”
“মানে, সত্যিই কি তুমি তাই করেছ? পুলিশকে গিয়ে বলব তাহলে”
“তুমিও কি তাই মনে করো, কমল?”
“তোমার প্রশ্নগুলোই তো আমাকে অবাক করাচ্ছে, এইসব ভাবাতে বাধ্য করছে। কি সব বলছ? ঐ বয়স্ক মানুষ সম্বন্ধে এমন ধারণা পোষণ করছ, তোমার লজ্জ্বা করছে না। ওদের জন্যই তুমি এই বাড়িতে এসেছ? সামান্য কৃতজ্ঞতা বোধ থাকা উচিত। ছিঃ রত্না”
রত্নার খুব ইচ্ছা করছিল ভীষণ চিৎকার করে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু নিজেই বুঝতে পারল, ভীষণ ভুল হয়ে গেছে। সে মাথা ঠাণ্ডা করে বলল,
“সত্যিই তো, আমি কি সব বলছি। আসলে বিট্টুর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। তাই মাথার ঠিক নেই। প্লিজ, রাগ করো না। আমরা বিট্টুকে ঠিক খুঁজে বের করব”
কমল আর কথা বাড়ালো না। রত্না খুব চালাক মেয়ে, কমল সেটা বুঝতে পেরেছে। পুলিশের তরফ থেকে খবর আসার অপেক্ষায় থাকল।
বিট্টু তার প্রিয় ঘোতনকাকার হাত ধরে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ল। বিভাস নামে লোকটা পুলিশ নিয়ে আসার আগেই ওরা গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। ঘোতন, বিট্টুকে নিয়ে হাইরোডের ধারে চলে এসেছে। একটা ছোট্ট মাল বোঝাই করা ভ্যান আসছে। সেটা দেখেই ঘোতন দাঁড় করাল,
“ও ভাই, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?”
“আমরা বাঁকুড়ার দিকে যাচ্ছি”
“বেশ তো। আমাদের একটু নিয়ে যাবে গো। এখন বাস পাবো না। খুব দরকার আছে। আমার এই ভাইপোর মা খুব অসুস্থ। সেই আটপুরের গ্রামের দিকে থাকে। তোমরা ওই রাস্তার উপর দিয়েই তো যাবে। আমরা ওখানে নেমে যাব। তোমাদের গাড়ির পেছনে মালগুলোর পাশেই আমরা ঠিক বসে যাব”
গাড়ির মধ্যে ড্রাইভার ছাড়াও একজন খালাসি ছিল। খালাসি বলল,
“কোনও বাজে ব্যাপার নেই তো?”
“মানে?”
ড্রাইভার, খালাসীকে বলল, “কি সব বকছিস? দেখছিস, ওর সাথে একটা বাচ্চা ছেলে আছে। নিশ্চয়ই ওর মায়ের শরীর ভালো নয়। পেছনে মালগুলোর পাশে ওদের বসার একটু ব্যবস্থা করে দে”
বিট্টু বলল, “থ্যাংক ইউ ড্রাইভারকাকু। খুব উপকার করলে”
বিট্টুর কথা শুনে ড্রাইভার খুব খুশী হল,
“সবই ভগবানের ইচ্ছা। মানুষের উপকারে লাগতে পারছি, এটাই আমার কাছে অনেক, বাবু। তোমরা বসে পড়ো”
ঘোতন, বিট্টুকে নিয়ে গাড়ির মধ্যে বসে পড়ল। গাড়ি চলতে শুরু করল। যাবার পথে ঘোতন, বিট্টুকে ভালো করে বুঝিয়ে দিল, তার বড় বোনের বাড়িতে গিয়ে কি কি বলতে হবে? তবেই সেখানে থাকতে পারা যাবে। কারণ বোনের সাথে ঘোতনের সম্পর্ক ভালো নয়। গাড়ি রাতের অন্ধকারে আটপুরের কাছে পৌঁছে গেল। ড্রাইভারকাকাকে বিট্টু আবার থ্যাংক ইউ জানিয়ে দিল। গাড়ি চলে যেতেই ঘোতন বিট্টুকে বলল,
“এখান থেকে প্রায় চল্লিশ মিনিটের হাঁটা পথ। আমার সাথে হাঁটতে পারবি তো বিট্টুসোনা?”
“আমি হাঁটতে পারব গো”
নতুন জায়গায় চলে এল ঘোতন, সাথে বিট্টু… এরপর। পড়ুন পরের ১৮তম পর্বে…
0 Comments.