- 7
- 0
ওয়াঙমোর সংসার
সিকিমের উত্তর প্রান্তে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯৬০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি অপরূপ সুন্দর ও শান্ত পাহাড়ী গ্রাম লাচুঙ। এখানে রয়েছে বরফে ঢাকা পাহাড়,ঘন পাইন আর ফার গাছের বনভূমি। আর তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লাচুঙ নদী। গ্যাংটক থেকে লাচুঙ এর দূরত্ব প্রায় ১২৫ কিলোমিটার। সেখানে পৌছতে গাড়িতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগে। তুষারাবৃত পর্বতমালা, সবুজ উপত্যকা গর্জন রতা জলপ্রপাত এবং প্রাচীন মঠের এক অপূর্ব মিলনস্থল।
এই পাহাড়ী গ্রামে লাচুঙ এর ঐতিহ্যবাহী লাচুঙ মঠটির বৌদ্ধ সংস্কৃতির ছোঁয়া স্পষ্ট। চার পাশের সবুজ পরিবেশের জন্য বিখ্যাত।
লাচুঙ মঠ( স্যামাতেন চোয়েলিঙ মঠ )
১৮৮০ সালে স্থাপিত একটি ঐতিহাসিক বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থান। এটি নিঙমাপা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী মঠ মা আপেল বাগান এবং তুষারাবৃত পর্বতমালার পটভূমিতে এক অপরূপ আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে।
লাচুঙ মঠের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লাচুঙ নদী।একে স্থানীয় ভাষায় লাচুঙ চু বলা হয় এটি তিস্তা নদীর একটি উপনদী।
লাচুঙ মঠের থেকে একটু দূরে একটি কাঠের বাড়ীতে বাস করেন ওয়াঙমো। তাঁর স্বামীর নাম সোনা ওয়াঙচুক যিনি কাঠের কারুকাজ খুব দক্ষ ছিলেন। উনি নিজের হাতে একটু একটু করে এই সুন্দর কাঠের কুঠীর টি বানিয়ে ছিলেন! কিছু দিন আগে ই ওয়াংচুক নিউমোনিয়া রোগে মারা যান । ওনাদের কোনো সন্তান নেই। এখানে ওয়াঙমো একাকী থাকেন! ওনার বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। স্বামী স্ত্রী দুজনের শখ ছিল পায়রা পোষা
।এখন শত খানেক বা তার ও বেশি ভিন্ন জাতের পায়রা আছে। রয়েছে তুষার পায়রা। এদের দেখতে খুব সুন্দর। মাথা ও ঘাড় কালচে স্লেট ধূসর যা গলার চারপাশের সাদা রঙের সঙ্গে সুন্দর বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। এদের ডানার রঙ হালকা ছাই এবং তাতে তিনটি গাড় বাদামি বা কালো ডোরা থাকে। এদের লেজ কালো আর মাঝ বরাবর একটি সদা চওড়া ব্যান্ড থাকে।
উড়লে খুব সুন্দর দেখায়।
আর রয়েছে স্পেকলেড উড পিজন যা লাচুঙ এর আশপাশের এলাকায় প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। এদের পাতি বাঙলা য় বলা যেতে পারে চশমা পরা বন কবুতর। এদের ও দেখতে খুব সুন্দর। পুরুষ পায়রা গুলোর মাথা ছাই রঙের। ঘাড়ের দুপাশে ও বুকে গোলাপী ও সোনালী রঙের যার ওপর কালো ফোটা ফোটা দাগ থাকে। খুব উজ্জ্বল রঙের হয় পুরুষ পায়রা গুলো । স্ত্রী পায়রা তুলনায় কম উজ্জ্বল।
এছাড়াও রয়েছে ওরিয়েন্টাল টার্টল ডাভ। খুব সুন্দর দেখতে। এদের পিঠ ও ডানায় লালচে বাদামি পালকের ওপর কালো আঁশের মতো সুন্দর নকশা থাকে। ঘাড়ের দুপাশে রূপালী ও সাদা ডোরাকাটা। তার ওপরে কালো স্পট থাকে। এদের বুকে ও গলায় হালকা গোলাপি। দেখতে ভারী মিষ্টি।
এছাড়াও আরও কয়েক জাতের পায়রা আছে।
প্রতিদিন সকাল সকাল উঠে ওয়াঙমোর প্রথম কাজ হলো পায়রা গুলোকে খাওয়ানো।মুঠো মুঠো করে গমের দানা ছড়িয়ে দেন ।আর পায়রা গুলো বকবকম বকবকম করে ঐ গমের দানা খুঁটে খুঁটে খায়। পায়রার ঐ ডাকে চারিদিকে ভরে ওঠে। শুনতে ভারী ভালো লাগে। খেতে খেতে কয়েকটি আবার গায়ে মাথায় কাঁধে উড়ে এসে জুড়ে বসে ওয়াঙমোকে আদর করে। আদরের চোটে তিনি খিলখিল করে হেসে ওঠেন । মায়ের মতো অত্যন্ত স্নেহে তাদের খাওয়ান আর ভুটানি ভাষায় কি সব বলেন তা বোঝাই দায়। তাদের জন্য বিশেষ পাত্রে জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।কুঠিরের সারা গায়ে অসংখ্য খোপ খোপ করা আছে যেখানে তারা নিরাপদে থাকতে ও বঙশ বৃদ্ধি করে।
ওয়াঙমোর আর্থিক অবস্থা মন্দ নয়। একবার ভরদুপুরে দুজন চোর তাঁর বাড়িতে চুরি করতে আসে। একটু দূরে আপেল বাগানে কাজ করছিলেন ওয়াঙমো। কিন্তু বাড়ির দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছিলেন। চোরেদের চুপিচুপি বাড়িতে ঢুকতে দেখেছিলেন। তিনি ও পা টিপে টিপে পেছন দিক দিয়ে ঢুকে অলক্ষ্যে চোরদের ওপর শস্যদানা মুঠো মুঠো করে ছড়িয়ে দেন। তাঁর পায়রার ঝাঁক শস্য দানার শব্দ শুনে চোরেদের
শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠুকরে ঠুকরে রক্তাক্ত করে তোলে। সেই সুযোগে তিনি একজন চোরকে তাঁর কুঠিরের সামনে বড় কাঠের পিলারের সাথে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেন । অন্য জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সিকিমের পুলিশ সহায়তা নম্বরে ফোন করেন । কিছু ক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসে চোরকে ধরে। শুনেছিলাম অন্য চোরকে ধরা হয়। তাদের আদালতে পাঠিয়ে শাস্তিরও ব্যবস্থা করা হয়।
ওয়াঙমোর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় লাচুঙ মঠে । প্রতিদিন পায়রা গুলোকে খাওয়ানোর পর তিনি ও মঠে আসেন প্রার্থনা করতে। উনি খুব মিশুকে মানুষ।নিজে নিজে অচেনা পর্যটকদের সঙ্গে আলাপ করেন । আবার কাউকে পছন্দ করলে তাঁকে নিমন্ত্রণ করে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ান । কেন জানি না, আমাকে ও উনি সেই দিন দুপুরে নিমন্ত্রণ করেন ।
ওয়াঙমোর কুঠিরে পৌঁছাতে ই উনি বেতের তৈরি সুদৃশ্য সোফায় বসতে দেন । বেতের তৈরি সুদৃশ্য টি টেবিলে খাওয়ার আয়োজন করলেন।
আমাকে মোটা শালপাতা য় ফাগশাপা,শাফালে ও চুরপি খাইয়ে ছিলেন। ফাগশাপা হলো শুয়োরের মাংসের চর্বি যুক্ত অঙশ যা শুকনো লাল লঙ্কা এবং মূলো দিয়ে তৈরি কারি বা স্টু ।যার স্বাদ একবার খেলে ভোলা যায় না। আর শাফালে হলো মাঙস ও বাঁধা কপি পুর ভরে তেলে ভাজা অর্ধ চন্দ্রাকৃতি রুটি । আর চুরপি হলো চমরী গাই বা ছাগলের দুধের তৈরি এক ধরনের পনির যা খেতে খুবই সুস্বাদু। খাওয়ার পর কুঠিরে ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখালেন। ভিতরের অন্তর্সজ্জা খুব সুন্দর। বিলাসবহুল বিছানা, সুন্দর রঙ করা বেড রুম, কিচেন সুসজ্জিত, আধুনিক মানের ওয়াশরুম।
বেশ কিছু সময় গল্প গুজব হল। বিকেলে ফেরার সময় খাইয়ে ছিলেন বাটার টি যা মাখন ,লবণ ও দুধের তৈরি, যা আমি বাপের জন্মে ও খাইনি। আমাকে এক ঝুড়ি আপেল উপহার দেন তাঁর নিজের বাগানের ।
লাচুঙ থেকে গাড়িতে ফেরার পথে বার বার ওয়াঙমোর কথা মনে পড়ছিল। একা একা থাকেন ভেবে চোখে জল এসে গেল।
মনে মনে বললাম,ওয়াঙমো আপনি অনেক অনেক ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।
0 Comments.