- 6
- 0
বর্ণান্ধতা
আমি দীর্ঘদিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাথে যুক্ত। আমি অবাক হয়ে দেখেছি একজন মহিলা বা পুরুষ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে চাকররিতে সূযোগ পাওয়ার পর যখন medical certificate এর জন্য সরকারী হাসপাতালে আসে তখন দৃষ্টিশক্তি পরিমাপ করার সাথে সাথে colour vision test মানে সেই মানুষটি বিভিন্ন রঙ চিনতে পারে কিনা তার পরীক্ষা হয়। বেশীরভাগই হয়ত রঙ চিনতে পারে কিন্তু কিছু সংখ্যক রং চিনতে পারে না। ফলে হয়ে যাওয়া চাকরিতে সে প্রবেশ করতে পারে না। হাউ হাউ করে কাঁদে, কাকুতি মিনতি করে, পাশ করিয়ে দিতে অনুরোধ, উপরোধ করে। কখনো কখনো সমাজের কেউকেটাকে দিয়ে ফোন করে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের হাত পা বাঁধা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশ পালনে বাধ্য হতে হয়। ফলে সেই কিশোর কিশোরীর একটা চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন মাটির সাথে মিশে যায়।
আসুন, বিষয়টা একটু বুঝে নিই। বর্ণান্ধতা বা colour blindness বলতে আমরা কি বুঝি? এটা হল সেই ব্যক্তির এমন একটি অবস্থা যখন আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক আলোয় বিশেষ কিছু রঙের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পান না। এরা সাধারণতঃ লাল, সবুজ, হলুদ বা নীল রঙের শেডগুলোকে আলাদা করে চিনতে পারে না। এই অসুখটা মানুষ জন্মগতভাবেই নিয়ে আসে। কিন্তু আজও এই বংশগত এই ধরণের বর্ণান্ধতার চিকিৎসা নেই। তবে কিছু পদ্ধতি বর্ণান্ধ রোগীদের সহায়তা করে। বর্ণান্ধতা কিন্তু অন্ধত্ব নয়। আমরা সকলেই রঙের একটি বর্ণালী দেখতে পাই, তবে আমরা কোনটি দেখি তা নির্ভর করে আমাদের ফটো রিসেপ্টর কতটা ভাল কাজ করে তার ওপর। ফটো রিসেপ্টর হল আমাদের চোখের কোষ যা নির্দিষ্ট আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সাড়া দেয়। অধিকাংশ মানুষ কিছু রঙ সঠিকভাবে দেখলেও কিছু রঙকে আলাদাভাবে চিনতে পারে না। নারীদের তুলনায় পুরুষদের বর্ণান্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। প্রায় ১২ জনের মধ্যে ১ জন পুরুষ বর্ণান্ধ, ২০০ জনের মধ্যে ১ জন মহিলা বর্ণান্ধ। এটি ঘটতে পারে আমাদের চোখের রেটিনার নির্দিষ্ট কোষ যদি অনুপস্থিত থাকে বা সঠিকভাবে কাজ না করে। আমাদের রেটিনায় রড ও কোন কোষ থাকে। কোন কোষ আমাদের বিভিন্ন রঙ চেনাতে সাহায্য করে। এই কোষের মাধ্যমেই আমরা বিভিন্ন রঙের পার্থক্য বুঝতে পারি। আর রড কোষ আমাদের আলো শনাক্ত করতে ও আলোর ধরণ বুঝতে সাহায্য করে। বর্ণান্ধ হওয়ার মূল কারণ কোন কোষের ঠিকমতো কাজ না করা। রড কোষের কোনো ভূমিকাই নেই। যার রেটিনায় কোন কোষই না থাকে তবে সে সব রঙকেই ধূসর দেখবে।
বর্ণান্ধতার মূল কারণ জেনেটিক ও বংশগত। এছাড়া ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, গুরুতর আঘাত বা চোখে ছানি থাকলে। এছাড়া পারকিনসন, ভিটামিনের অভাব ও বার্ধক্যজনিত কারণেও বর্ণান্ধতা ঘটতে পারে। বর্ণান্ধতা তিন রকম হতে পারে। লাল-সবুজ, নীল-হলুদ ও কমপ্লিট কালার।
যেহেতু জিনগত ও বংশগত হলে এর কোন চিকিৎসা নেই, তাই কিছু পেশায় এরা একেবারেই যোগ দিতে পারে না। মূলতঃ যেসব চাকুরীতে রঙ চেনার খুব দরকার, যেমন ট্রেন, বাস, গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে সিগন্যালের রঙ দেখেই চালাতে হয়, এ ধরণের পেশায় তারা যোগ দিতে পারবে না। এছাড়াও প্লেন চালানো, পুলিশের চাকরি। কারণ রঙ দেখেই গুলি চালানো শিখতে হয়। তাই আমাদের জন্মের পর যখন বুঝতে শিখি তখনই বিশেষ করে স্কুলে ভর্তির সময়েই এই পরীক্ষা হওয়া জরুরী। তখনই ধরা পড়লে বিশেষ কিছু চাকরিতে তারা applyও করবে না এবং সেই বিশেষ চাকুরীতে না যাবার জন্য মানসিকভাবে তৈরী থাকবে।
0 Comments.