- 10
- 0
বিষবৃক্ষের নিরিখে সাহিত্য সম্রাটের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন
লেখক ,ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে কিছু লিখতে ইচ্ছে হলো তাঁর জন্মস্থানের খুব নিকটেই বসবাসকারী এই অধমের।প্রণাম জানাই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে।তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রের মাঝে নারী আজও আবিষ্কার করে নিজেকে! " তাঁর রচনা আমাদের প্লাবিত করেছে, অভিভূত করেছে,তাঁর প্রতিটি শব্দের নাম এই খরতপ্ত ভূখণ্ডে নীলাঞ্জন------ কিন্তু কখনোই খেয়াল করিনি তাঁর রচনা সমূহে অশ্রুর একটি ক্ষীণরেখা বয়ে যায়, তাঁর খ্যাতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকে একটি নির্জন মানুষের ধ্বংসস্তূপ।যে বঙ্কিমবাবুকে আমরা জানি যিনি ঋষি ও স্থপতি,যিনি আমাদের ভাষায় প্রভাতসঙ্গীত,যিনি অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক তার বাইরেও তাঁর লেখাতে একটি প্রতিকৃতি আছে যা আত্মোপলব্ধির বিরল মুহূর্ত,যখন তাঁর মুখমণ্ডলে গাঢ় হয়েছে রেখা,সেখানে তিনি বোঝেন সামাজিক মুখরতার অন্তরালে থেকে যায় শূন্যতার স্বগতোক্তি।" ( সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় - গদ্য চর্চা - ১) সহমত হই ব্যাখ্যাটির সাথে, এবার আসি বিষবৃক্ষ উপন্যাসের কথায় , এখানে তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রেরএই যে দ্বিধা, এই যে অবিরত নিজেকে প্রবোধ দেওয়া, হৃদয়াবেগ কে অনিয়ন্ত্রিত করতে না পারার অসহায়তা এবং শেষমেশ সপক্ষে যুক্তি সাজিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারা, নারীকে কি আধুনিকতার দরজায় পৌঁছে দেননি বঙ্কিম বাবু ?তাই বুঝি চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতার দাবী করে তাঁর সৃষ্টি । আজও হৃদয় সমর্পিত হয় তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে।
সঞ্জয় যখন উপন্যাসটির জনপ্রিয়তা নিয়ে ব্যখ্যা দেন" বঙ্গদর্শনের শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে বাঙালির হৃদয় একেবারে লুঠ করে নিল বিষবৃক্ষ --- রবীন্দ্রনাথের ভাষায় কাহিনীর বদলে জন্ম নিল আখ্যান।আর আখ্যান বলেই এবার ইতিহাসের দূরত্বে নয়, সাম্প্রতিকের নৈকট্যে বঙ্কিমবাবুকে সনাক্ত করা গেল --- এই প্রথম ,এই বিষবৃক্ষে ,তাঁকে যন্ত্রণা পেতে দেখলাম বিবেকের দংশনে।সমগ্র বঙ্কিম রচনাবলীতে এত স্ববিরোধী; এত দ্বিধাদীর্ণ রচনা আর নেই " আবারও সহমত হই সঞ্জয়ের ব্যাখ্যার সাথে। চরিত্রগুলি নিয়ে ভাবিত হই!
বিষবৃক্ষ উপন্যাস চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতা দাবী করে কারণ পুরুষ চরিত্রের দ্বিধা দ্বন্ধপূর্ণ মনস্তত্ত্ব এই একুশ শতকে দাঁড়িয়েও যেন সমকালীন সমাজের পুরুষের পরকীয়ার চরিত্রকে চিহ্নিত করে! বিবাহিত কর্তব্যপরায়ণ পুরুষও কোন যাদুবলে, মোহ ও ভ্রমের বশবর্তী হয়ে অপর নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয় , এবং শেষে অনুশোচনায় ও অনুতাপে পর্যবাসিত হয় নগেন্দ্র চরিত্রটি।পুরুষতন্ত্রের এক আধিপত্য ছায়া ফেলে তার মনোরাজ্যে, তবু সাহিত্য সম্রাট ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্নে দাগিয়ে দেন নি মানব চরিত্রগুলিকে। কিন্তু অসাধারণ একটি রূপক ধর্মী নাম দিয়ে সমাজ যেভাবে জাজমেন্টাল হয় সেভাবে উপন্যাসটিকে মনোগ্রাহী করে তোলেন ! স্ত্রী চরিত্রগুলিও আঁকেন বাস্তবধর্মী নারীর বৈশিষ্ট্য অনুসারে। পরতে পরতে খুলে যায় মনুষ্য চরিত্রের জটিল দিকগুলি। সূর্যমুখী চরিত্র বাঙালি নারীর ত্যাগ, স্নেহ, মমত্ব দিয়ে গড়া এবং সমকালীন আধুনিক ! বিষ্ময় উপস্থিত হয় তিনি জোর করে নিজের অধিকার ধরে রাখায় স্বচেষ্ট না হয়ে গৃহত্যাগ করেন। কুন্দনন্দিনী! এ যেন এক অদৃষ্টের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া সরলমতী এক নারী! আজও গ্রাম বাংলায় এহেন নারী চরিত্র বিরল নয়।
এই ক্ষুদ্র পরিসরে সমগ্র উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করা এক দুরহ কাজ। আমাদের কাজ বারংবার বঙ্কিম বাবুর সৃষ্টি গুলিকে পাঠ করা। তাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।
0 Comments.