Thu 29 October 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

maro news
হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

ধাতু অধাতুর মানব নিয়ন্ত্রণ 

(তৃতীয় ভাগ)

মুক্তির সন্ধানে ধাতু অধাতুর ভূমিকা 

         সৌর বিশ্বমণ্ডলে মোট শক্তির হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটবে না,কেবল রূপান্তর ঘটবে। পার্থিব শক্তির মূল উৎস সূর্য ও তার মৌল ধাতু ও অধাতু। মানব সভ্যতা তার ভাববাদী আধিপত্যকাম্যতায় ধ্বংসাত্মক পরিণতির শেষ পর্যায়ে পৌঁছাবার আগে বস্তুবাদী আত্মবিকাশমূলক গঠনাত্মক শক্তির উত্থান ঘটবেই। প্রাকৃতিক নিয়ম লঙ্ঘনেরও সীমা আছে। তার পর প্রকৃতিই তাকে সাম্য অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। এটাই মাতৃ দর্শন। মাতৃ দর্শন কেবল বস্তবাদী নয় বা ভাববাদী নয়, সে শক্তিবাদে বিশ্বাসী । শক্তিই সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে । 

          শক্তির নিত্যতা এবং সৌরজগৎ

          সৌরজগতে শক্তির মোট পরিমাণ ধ্রুবক। সূর্য নিজেই পারমাণবিক ফিউশন (Nuclear Fusion) প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন (অধাতু) থেকে হিলিয়ামে রূপান্তরের মাধ্যমে অসীম শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। পৃথিবীতে বিদ্যমান প্রতিটি জীব ও জড় পদার্থের অণু-পরমাণু, ক্যালসিয়াম, লোহা (ধাতু) থেকে শুরু করে কার্বন, অক্সিজেন (অধাতু)—সবই নক্ষত্রের গর্ভে তৈরি হওয়া উপাদানের রূপান্তর মাত্র। শক্তির এই রূপান্তরই রূপ ও পদার্থের সৃষ্টি করে, কিন্তু মূল শক্তি অবিনশ্বর থাকে।

        মাতৃ দর্শন ও শক্তিবাদ 

        সূর্য, পৃথিবীর ধাতু ও অধাতু এবং মানুষের মস্তিষ্ক মিলিয়ে প্রকৃতির শক্তিবলয়। এখানে মানুষকে শক্তি বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হলো এই কারণে যে মানুষই একমাত্র ধাতু ও অধাতু থেকে শক্তি বের করতে সক্ষম। মানুষ নিজেই প্রকৃতির ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। বাহ্য প্রকৃতির শক্তি রূপান্তরের মতো মানুষের ভিতরেও শক্তির রূপান্তর ঘটে চলে এবং মানুষ নিজে অনেক বড় শক্তি গড়ে তুলতে সক্ষম। একজন মানুষ পারে দশজন মানুষকে দিয়ে নিজের থেকে দশগুণ বা তার বেশি শক্তি গড়ে তুলতে । সবটাই মানুষের ভেতরকার ধাতু ও অধাতুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা শক্তির সহায়তায় আপন ব্রহ্মকে সক্রিয় করে তুলতে । মানুষের গঠনমূলক ব্রহ্ম সক্রিয় হয়ে বস্তুরাজ্য ও মানব রাজ্যের ব্রহ্মকে সক্রিয় করে তুলতে । মানুষ নিজেকে ও অন্যদেরকে জাগিয়ে তুলে জাগতিক মঙ্গল বৃদ্ধির জ্ঞান ও বিজ্ঞান হলো শক্তি দর্শন বা মাতৃ দর্শন।

        মাতৃ দর্শন: প্রকৃতি (বা মাতৃশক্তি) নিজেই এক মহাসাম্যাবস্থা। সে সৃষ্টি করে, লালন করে, এবং কোনো উপাদান মাত্রাতিরিক্ত সীমার বাইরে গেলে নিজের প্রাকৃতিক নিয়মেই তাকে নিয়ন্ত্রণ বা বিনাশ করে সাম্যে ফিরিয়ে আনে।

         শক্তিবাদ: এটি ভাববাদ ও জড় বস্তুবাদ—উভয় চরমপন্থার সীমানা পেরিয়ে শক্তিকেই বিশ্বজগতের মূল নিয়ামক হিসেবে গণ্য করে। জড় পদার্থ হলো ঘনীভূত শক্তি (E=mc^2), আর চিন্তা হলো স্নায়ুর বায়োইলেকট্রিক শক্তির ক্রিয়া। শক্তি কখনো একচ্ছত্র ধ্বংসকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না; শক্তি সর্বদা ভারসাম্য চায়।

           প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘনের একটি নির্দিষ্ট সীমানা বা 'Threshold' থাকে। মানুষ যখন তার ভাববাদী আধিপত্যকামী আচরণে সেই সীমা স্পর্শ করে, তখন প্রকৃতির এই মাতৃসুলভ শক্তিবাদই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তির সঠিক রূপান্তরের মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে রক্ষা করবে। 

             জৈব- মানস- রাসায়নিক বিবর্তন 

দেহ,মন এবং শ্রম মিলিয়েও একটা মানব শক্তি বলয় গঠিত হয়। এই শক্তি বলয় সামাজিক সমস্ত রূপান্তরের মূল উৎস ।একক মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আদি মাতৃকোষ আপন অস্তিত্ব সুরক্ষিত রাখতে একদিন আধিপত্য বিস্তার ও কায়েম রাখতে RNA থেকে DNA সৃষ্টি করেছে, সেখান থেকে নারী ও পুরুষ।আদি মাতৃ কোষের ক্রম বিবর্তন মানুষের স্তরে এসে আধিপত্য শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে দিল নিয়ন্ত্রণে, আধ্যাত্মিকতায়, ভোগ-সুখের জন্য নিয়ম কানুন আইন বিধান ইত্যাদি ভাববাদী জগতে ; সেখানে মানুষ মানুষকে শিকারে পরিণত করলো - বিবেক , বুদ্ধি, চেতনা, যুক্তি সব গ্রাস করলো। কিন্তু মানুষের তৈরি সেই ভাববাদী জগত কেবলই এক সাময়িক উপরি কাঠামো (superstructure) যা মানুষের ধাতু ও অধাতুর রসায়ন প্রভাব ফেলে একটা স্বপ্ন রাজ্য গঠন করে।অন্যদিকে মানুষের জৈব-রাসায়নিক দেহই হলো আদি ও চূড়ান্ত সত্য। সেই আদি মাতৃকোষ থেকে জৈব-মানস- রাসায়নিক বিবর্তনের ধারা মানুষ গড়ে তুলেছে। মানুষ তার নিয়ন্ত্রক নয়। জৈব অভিযোজন ঠিক ভাববাদী বলয় ভেঙে মানুষকে প্রাকৃতিক নিয়মমুখী করে তুলবে।না পারলে অন্য জীবের মতো মানুষও লুপ্ত হয়ে যাবে।

           মানব মুক্তির সোপান 

        আদি মাতৃ কোষীয় বস্তুর মধ্যে ছিল বেঁচে থাকা ও অভিযোজনের ইচ্ছা পুরণের মন রাসায়নিক উপাদান হিসাবে। আদি মাতৃ কোষ অভিযোজনের পথে যেখানে যেমন অভিব্যক্তির প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে তেমনভাবে পরিবর্তন করে নিয়েছে । এটাকে জৈব-মানস- রাসায়নিক বিবর্তন বলা যায় । এটা কখনো বন্ধ হয় না। মানুষের ক্ষেত্রে এটাই ব্যক্তি -সচেতনতা । মানুষের তৈরি সামাজিক পরিবেশ কৃত্রিম এবং ভাববাদী অভিব্যক্তি। সমাজ, তার সমস্ত নিয়ম-কানুন, প্রতিষ্ঠান এবং মানসিক কাঠামো নিয়ে গঠিত একটি জটিল কৃত্রিম পরিবেশ। মানুষ তার অস্তিত্বের অতিরিক্ত নিরাপত্তা এবং আনন্দের খোঁজে সামাজিক ও ভাববাদী ভিত্তিগুলো (যেমন আধিপত্য, সম্পত্তি, নিয়ম, ধারণা) গড়ে তোলে। এই কৃত্রিম আনন্দ বা প্রত্যাশাগুলো যতদিন মানুষকে উদ্বুদ্ধ রাখে, ততদিন মানুষ বাহ্যিক সমাজ ও বস্তু জগতের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। প্রত্যেক মানুষের জীবনের শেষভাগে এসে জটিল আবেগ, সামাজিক আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং ভাববাদী কাঠামোর প্রভাব একে একে ম্লান হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে কেবল মৌলিক শারীরিক অস্তিত্ব—ক্ষুধা, শারীরবৃত্তীয় কষ্ট এবং বেঁচে থাকার আদিম বস্তুসত্তা—অবশিষ্ট থাকে। এই জীবদ্দশায় জৈব-মানস- রাসায়নিক ক্রিয়া ততক্ষণ সক্রিয় থাকে, যতক্ষণ ভাববাদী ক্রিয়া কলাপে প্রত্যাশা থাকে। একসময় কৃত্রিম সেই আনন্দ আর মাতৃ ব্রহ্মকে আর সক্রিয় করতে পারবে না । তখন মানুষকে আবার তার আদিম সজীব বস্তু রূপ বা মাতৃকোষীয় মৌলিক প্রকৃতিমুখী হতে হবে , যা একেবারেই অসম্ভব। সত্যি যদি অসম্ভব হয়,মানব জাতি লুপ্ত হবে। কিন্তু তার হবে না। মানুষ তার জীবদ্দশায় ভাববাদী প্রভাব মুক্ত হয়ে পড়ে অনেক সময় । নিজেকে আপ্রাণ প্রভাব মুক্ত করতে চায় যত তার বয়স বাড়ে। লোভ লালসা আকাঙ্ক্ষা মুক্ত নির্লিপ্ত নির্বিকার। এই মৃত্যু দশার অনেক আগেও অনেক মানুষ সব ত্যাগ করে গৃহী সন্ন্যাসীর জীবন কাটায় ।এই সন্ন্যাসী কোনো ঈশ্বর খোঁজে না ,যারা খোঁজে তারা আসক্ত, যারা খোঁজে না তারা প্রত্যাশাহীন কর্মে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়। চল্লিশ ঊর্ধ্ব এমন মানুষ বিরল নয় । অতএব ভাববাদী প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রবণতা মানুষের মধ্যে আছে। সেটাই ব্যক্তি -সচেতনতা এবং মানব মুক্তির সোপান।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register