- 2
- 0
সহাবস্থানের ক্ষত
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারের ভিতরে। বাজারের দোকান গুলোর সামনে একে একে জ্বলে উঠছে আলো। চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে রাজনৈতিক আলোচনা চলছে জোর কদমে। কয়েকদিন আগেই বদলেছে রাজ্যের ক্ষমতা। বহু বছরের পুরোনো 'কে.বি 'দলের পতন হয়েছে, নতুন সরকার এসেছে ‘যুগের হাওয়া’ স্লোগান তুলে। বদলের হাওয়া যেন মানুষের ভাষা, ব্যবহার, এমনকি চোখের চাহনিতেও এসে লেগেছে।
সুমন বাড়ি ফিরছিল। কাঁধে একটি পুরোনো ব্যাগ, মুখে ক্লান্তি। সে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়। কিন্তু পাড়ার বহু মানুষের চোখে সে একটা চিহ্নিত মুখ। কারণ সে ‘সত্যের আওয়াজ’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনটি মূলত আঞ্চলিক অধিকার, ভাষা ও বঞ্চিত মানুষের দাবি নিয়ে কাজ করে। তবে অনেকেই মনে করে, এই সংগঠনটি আসলে কে.বি দলেরই শাখা সংগঠন।
সুমন এসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামায় না। তার কাছে মানুষ আগে, রাজনীতি পরে। কিন্তু সমাজ সবসময় এত সহজভাবে ভাবে না।
বাজারের মোড়ে পৌঁছাতেই হঠাৎ কয়েকজন যুবকের বিদ্রুপ ভেসে এল।
'এই যে রসগোল্লা! এদিকে আয়!'
আরেকজন বলল,
কী রে? তোদের সরকার তো গেল! এখন কেমন লাগছে?
চারপাশে কয়েকজন হেসে উঠল।
সুমন থেমে গেল। সে শান্ত গলায় বলল,
আমাকে যা বলার বল, কিন্তু একটা সম্প্রদায়কে অপমান করিস না।তপন নতুন শাসক দলের স্থানীয় সমর্থক হিসেবে বেশ পরিচিত, এগিয়ে এসে বলল, বেশি
জ্ঞান দিস না। তোরা সবাই এক। এতদিন খুব বাড়ছিলি না?
সুমনের ভিতরে একটা চাপা রাগ জমতে লাগল। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আমি
কোনো দলের হয়ে রাজনীতি করি না। মানুষের অধিকারের কথা বলি। সেটা অপরাধ নয়।
তপন হেসে উঠে বলে,
মানুষের অধিকার? নাকি পুরোনো সরকারের দালালি?
হঠাৎ পিছন থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল,
চোর! চোর!
মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন ছুটে এসে সুমনকে ধাক্কা দিতে শুরু করল। কেউ তার জামার কলার চেপে ধরল, কেউ কাঁধে আঘাত করল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
সুমনের চোখে অপমানের আগুন জ্বলে উঠে। সে বুঝতে পারছিল, তাকে একা নয়, তার পরিচয়, তার ভাষা, তার অস্তিত্বকেই অপমান করা হচ্ছে।
সে কোনো ভাবে মোবাইল বের করে ‘সত্যের আওয়াজ’ সংগঠনের সদস্য রাজীবকে ফোন করল।
দশ মিনিটের মধ্যেই মোটরবাইকের শব্দে বাজার কেঁপে উঠল। রাজীব, মেহেদী, সুদীপ্ত আর আরও কয়েকজন এসে দাঁড়াল ঘটনাস্থলে।
রাজীব চিৎকার করে বলল,কে
মেরেছে ওকে? ওর অপরাধ কী?
তপন উত্তর দিল,তোদের মতো লোকেরা সমাজ নষ্ট করছে!
মেহেদী রাগে ফেটে পড়ে বলল,
কারও আত্মসম্মানে আঘাত করার অধিকার কে দিয়েছে?
চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। বাজারের দোকানদারেরা শাটার নামাতে শুরু করল। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিল, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছিল।
সুমনের মা মালতী দেবী খবর পেয়ে ছুটে এলেন। ছেলের মুখে আঘাতের দাগ দেখে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
ঠিক তখনই পুলিশের জিপ এসে দাঁড়াল বাজারের সামনে। অফিসার অরিন্দম সেন নেমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,সবাই শান্ত হন! কেউ আইন নিজের হাতে তুলবেন না।
পুলিশ দু’পক্ষকে আলাদা করল। তপন তখনও গলা চড়িয়ে বলছিল,এরা
সমাজবিরোধী!
অরিন্দমবাবু কঠিন গলায় বললেন,
কারও রাজনৈতিক মত বা পরিচয়ের জন্য তাকে অপমান বা মারধর করা অপরাধ। সেটা মনে রাখবেন।
বাজার ধীরে ধীরে শান্ত হল। কিন্তু সুমনের ভিতরের ঝড় থামল না।
সেই রাতে বাড়ির ছাদে একা বসে ছিল সে। মুখে ব্যথা, কিন্তু তার চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল অপমানে। তার ছোট বোন মৌ বলল,
দাদা, তুমি তো কিছু ভুল করোনি।
সুমন মৃদু হেসে বলল,
ভুল করিনি বলেই হয়তো কষ্টটা বেশি লাগছে।
পরদিন ঘটনাটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল। কেউ সুমনের পাশে দাঁড়াল, কেউ আবার তাকে রাজনৈতিক রঙ দিতে শুরু করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাজারের অনেক সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করল।
চায়ের দোকানের মালিক নিতাই কাকা বললেন,
রাজনীতি থাকতেই পারে, কিন্তু কাউকে তার পরিচয়ের জন্য অপমান করা ঠিক নয়।
স্কুলশিক্ষক দেবাশিস বাবু স্থানীয় ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন ,
গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়। গণতন্ত্র মানে ভিন্ন মতকে সম্মান করার সাহস।
তপনও সেদিন দূরে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার চোখে যেন প্রথমবারের মতো কিছুটা অনুশোচনা দেখা গেল।
কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় সে সুমনের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
সুমন অবাক হয়ে বলল,
কিছু বলবি?
তপন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,সেদিন যা হয়েছে… সেটা ঠিক হয়নি। রাগ ছিল, কিন্তু ব্যাপারটা অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিল।
সুমন তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, রাজনীতি
বদলায়, সরকার বদলায়। কিন্তু মানুষের ব্যবহার বদলে গেলে সমাজটাই হারিয়ে যায়।
তপন মাথা নিচু করে।
সেই ঘটনার পর বাজারের মোড়ে আগের মতো রাজনৈতিক তর্ক এখনও হয়, কিন্তু একটা জিনিস বদলেছে। মানুষ অন্তত বুঝতে শুরু করেছে— মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু অপমান কখনো প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।
কারণ আত্মসম্মান এমন এক নীরব শক্তি, যা ভেঙে গেলে মানুষ শুধু আহত হয় না, সমাজও ছোট হয়ে যায়।
ক্ষমতা চিরদিন কারও হাতে থাকে না। আজ যে শাসক, কাল সে বিরোধী হতে পারে। কিন্তু মানবতা, সম্মান আর সহাবস্থান— এই মূল্যবোধগুলো টিকে থাকলে তবেই সমাজ সত্যিকারের শক্তিশালী হয়।
0 Comments.