- 4
- 0
পিয়ানো : শেষ সঙ্গী
*প্রথম অধ্যায় : যে মানুষটি সুরের ভিতর বাস করত*
রাতেরও একটি বয়স আছে। সন্ধ্যার কোলাহল পেরিয়ে, মধ্যরাতের নীরবতা অতিক্রম করে যখন পৃথিবী ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন এমন এক সময় আসে যাকে ঘড়ির কাঁটা দিয়ে মাপা যায় না — শুধু অনুভব করা যায়। দূরের রেললাইনের শব্দ থেমে যায়, পথকুকুরের ডাকও বিরল হয়ে ওঠে, জানালার কাঁচে লেগে থাকা বাতাসও যেন নিঃশব্দে হাঁটতে শেখে। সেই গভীর নীরবতায় যদি কোথাও একটি মাত্র পিয়ানোর সুর ভেসে আসে, মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত নিঃসঙ্গতা যেন এক জায়গায় এসে বসেছে।
পুরোনো উত্তরমুখী বাড়িটির তৃতীয় তলার ঘরটি বহুদিন ধরেই মানুষের চেয়ে স্মৃতির বাসস্থান হয়ে উঠেছিল। দেওয়ালের রং খসে পড়েছে, বুকশেলফে ধুলো জমেছে, পর্দার রং সময়ের কাছে হার মেনে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কিন্তু ঘরের এক কোণে রাখা কালো গ্র্যান্ড পিয়ানোটি আজও অবিশ্বাস্যরকম ঝকঝকে। প্রতিদিন সকালে সেটি পরিষ্কার করা হয় — নরম কাপড়ে ধুলো মোছা হয়, ঢাকনা খুলে কী-বোর্ডে আঙুল বুলিয়ে দেখা হয়, যেন কেউ জ্বর এসেছে কি না পরীক্ষা করছে।
এই কাজটি যে করে, তার নাম অর্ণব।
বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। কপালের দু'পাশে রুপোলি চুল, চোখের নীচে অনিদ্রার স্থায়ী ছাপ — অথচ সেই চোখে এখনও অদ্ভুত এক কোমলতা রয়ে গেছে। এমন কোমলতা, যা কেবল দীর্ঘদিন কাউকে গভীরভাবে ভালোবেসে তাকে হারিয়ে ফেলা মানুষের চোখে দেখা যায়।
লোকে তাকে চেনে একজন বিখ্যাত পিয়ানোবাদক হিসেবে। বহু বছর আগে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে বাজিয়েছে, দেশের বাইরে আমন্ত্রণ পেয়েছে, সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার বেরিয়েছে। কিন্তু খ্যাতির সেই আলো বহু আগেই নিভে গেছে — ইচ্ছে করেই সে সমস্ত আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিয়েছে। একসময় যে মানুষ করতালির জন্য নয়, সংগীতের জন্য বাঁচত, সে আজ আর কোনো শ্রোতার প্রয়োজন অনুভব করে না। কারণ সে জানে, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় শ্রোতাটি আর এই পৃথিবীতে নেই।
আজকাল তার প্রতিটি সুর কেবল একজনের জন্য — যে আর কোনোদিন এসে বলবে না, "আজকের এই অংশটুকু আরেকবার বাজাবে?"
---
অর্ণবের জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ মনে হতো। সকালে ঘুম থেকে ওঠা, গাছে জল দেওয়া, নিজের জন্য চা বানানো, কিছুক্ষণ বই পড়া, তারপর দীর্ঘ সময় পিয়ানোর সামনে বসে থাকা। মাঝে মাঝে দু-একজন ছাত্র আসে, শেখে, চলে যায়। কিন্তু কেউ জানে না, পাঠ শেষ হওয়ার পর অর্ণব আবার সেই একই চেয়ারে ফিরে বসে থাকে আরও কয়েক ঘণ্টা — যেন কোনো অসমাপ্ত আলাপ তার অপেক্ষায় রয়েছে।
তার কাছে পিয়ানো কখনও নেহাত বাদ্যযন্ত্র ছিল না। সে যখন ছোট ছিল, তার আনন্দের ভাষা বুঝত এই কাঠ আর তারের শরীর। কৈশোরের প্রথম অপমান, প্রথম স্বপ্নভঙ্গ, প্রথম একাকীত্ব — সবকিছু এই নীরব সঙ্গীটিই শুনেছিল। পরে প্রেম যখন এসেছিল, এই পিয়ানোই তাদের দু'জনের মাঝখানে বসে থেকেছে। আর মৃত্যু যখন সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল, পৃথিবীতে একমাত্র এই জিনিসটিই অর্ণবকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। মানুষ চলে যায়, স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়, বাড়ি ভেঙে পড়ে, গাছ শুকিয়ে যায় — কিন্তু কিছু কিছু জড়বস্তু মানুষের আত্মার এমন অংশ হয়ে ওঠে যে তাদের ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ তারা আর বস্তু থাকে না; তারা মানুষের জীবন হয়ে যায়।
অর্ণব বহুবার ভেবেছে, এই পিয়ানোটি যদি কোনোদিন নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? প্রশ্নটির উত্তর সে শেষ পর্যন্ত ভাবতে পারেনি — মনে হয়েছে, সেই দিনটি এলে হয়তো তার নিজেরও আর বেঁচে থাকার প্রয়োজন থাকবে না।
---
ঘরের দক্ষিণ দেওয়ালে একটি মাত্র ছবি ঝোলে — একজন তরুণীর। মেয়েটি হাসছে না, আবার পুরোপুরি গম্ভীরও নয়; এমন এক শান্ত মুখ, যাকে দেখলে মনে হয় সে পৃথিবীর সমস্ত শব্দের ভেতর থেকেও নীরবতার অর্থ খুঁজে নিতে পারে।
অর্ণব প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমে সেই ছবিটির সামনে দাঁড়ায়। ফুল দেয় না, ধূপ জ্বালায় না, প্রার্থনাও করে না — শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। অনেকের কাছে এটি হয়তো একটি মৃত মানুষের ছবি। অর্ণবের কাছে নয়। তার কাছে এই ছবি এমন এক জানালা, যার ওপারে সময় থেমে আছে — যেখানে বয়স বাড়ে না, মৃত্যু প্রবেশ করতে পারে না, একটি অসমাপ্ত বিকেল চিরকাল অপেক্ষা করে।
ক্ষত শুকিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু যে মানুষ ক্ষতটি রেখে গিয়েছিল, তার অনুপস্থিতি কোনোদিন শুকোয় না — বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যতাই মানুষের শরীরের একটি অঙ্গ হয়ে যায়।
---
সন্ধ্যা নামার একটু আগে অর্ণব পিয়ানোর ঢাকনা খুলল। আজও সেই একই অভ্যাস। প্রথমে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে সবচেয়ে নিচের সাদা কী-টিকে আলতো ছুঁয়ে দিল — একটিমাত্র নোট। তারপর চোখ বন্ধ করল।
এই একটি নোটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার সমগ্র জীবন। কারণ ঠিক এই নোটটি শুনেই একদিন একটি মেয়ে প্রথম তার দিকে তাকিয়েছিল, আর সেদিন অর্ণব জানত না, সেই একটি দৃষ্টি তার ভবিষ্যতের প্রতিটি দিনকে বদলে দেবে।
আজও যখন সে প্রথম নোটটি বাজায়, মনে হয় সময়ের নদী উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে। মঞ্চের আলো জ্বলে ওঠে, অডিটোরিয়ামের ভিড় নিঃশব্দ হয়ে যায়, আর সেই ভিড়ের মাঝখান থেকে একটি মেয়ে ধীরে উঠে দাঁড়ায় — খোলা চুলে সন্ধ্যার আলো লেগে আছে, হাতে একটি পুরোনো নোটবই, আর ঠোঁটে সেই চেনা প্রশ্ন যা সে আজীবন শুনতে চেয়েছিল।
তার নাম ছিল মেঘলা।
0 Comments.