- 10
- 0
এবার নাটুবাবু টোটো ডাকলেন। সেখান থেকে অম্বলগ্রাম পাশে রেখে দু কিলোমিটার টোটো রিক্সায় এই গ্রাম। একদম অজ পাড়াগাঁ। মাটির রাস্তা ধরে বাবলার বন পেরিয়ে স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করতে হবে।তন্ময়বাবু গবেষক।এন জি ও সসংস্থার প্রধান কারিগর বনের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। তার জগৎ।পশু,প্রাণীদের উন্মুক্ত অঞ্চল।বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে, সেখানে।মা কালীর মূর্তি আছে। কাঁচের ঘরে ইকো সিষ্টেমের জগৎ।কেউটে সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে নানারকমের পতঙ্গ যা একটা গ্রামের জমিতে থাকে। বিরাট এক ক্যামেরায় ছবি তুলছেন তন্ময় হয়ে।আমি ঘুরে দেখলাম প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বানানো রিসর্ট।ওপেন টয়লেট কাম বাথরুম।পাশেই ঈশানী নদী।এই নদীপথে একান্ন সতীপীঠের অন্যতম সতীপীঠ অট্টহাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে চায় এন জি ও, নৌকায়। তন্ময়বাবু হাতে সাপ ধরে দেখালেন। শিয়াল,বেজি,সাপ,ভ্যাম আছে। তাছাড়া পাখির প্রজাতি শ খানেক।একটা পুকুর আছে। তার তলায় তৈরি হচ্ছে গ্রন্হাগার।শীতকালে বহু বিদেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। তন্ময়বাবু বললেন,স্নেক বাইটের কথা ভেবে সমস্ত ব্যবস্থা এখানে করা আছে। ঔষধপত্র সবসময় মজুত থাকে।বর্ষাকালে ঈশানী নদী কিশোরী হয়ে উঠেছে।এই নদীকে মাঝখানে রেখে বেলুনের চাষিরা চাষ করছেন আনন্দে।এখানকার চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করেন। কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন না। এক চাষি বললেন,আমরা সকলে একত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জৈব সার প্রয়োগ করেই আমরা চাষ করবো।তাতে বন্ধু পোকারা মরবে না। ফলনও হয় বেশি। এক এন জি ও সংস্থার পরামর্শে তাদের এই সঠিক সিদ্ধান্ত অন্য চাষিদের অনুকরণযোগ্য।এই এন জি ও সংস্থার যুবকরা গ্রামের ভিতর কুকুরদের নির্বিজকরণ কাজে লেগেছে।একটা লম্বা লাঠির ডগায় সূচ বেঁধে তাতে ওষুধভরে চলছে কাজ।কোনো প্রাণী আহত হলে তার সেবাশুশ্রূষা করেন যুবকবৃন্দ।সাপ ধরতে জানেন এই যুবকবৃন্দ।কোনো গ্রামে কোনো সাপ দেখা গেলে এই যুবকেরা সেটি ধরে নিয়ে এসে তাদের সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেন।এখনও এই যুবকবৃন্দ কাজ করে চলেছেন মানুষ ও প্রাণীজগতকে ভালোবেসে।বর্ষাকালে প্রচুর বিষধর সাপের আনাগোনা এই অঞ্চলে।এখানে পা দিলেই সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন এখানকার কর্মিবৃন্দ।ঘুরে দেখার জন্য গামবুট দেওয়া হয় পর্যটকদের। প্রচুর দেশি বিদেশি গাছ গাছালিতে ভরা এই প্রাঙ্গন। একটি কৃত্রিম জলাধার আছে।তার নিচে লাইব্রেরী রুম তৈরির কাজ চলছে।ওপরে জল নিচে ঘর। কিছুটা তৈরি হয়েছে। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসে হাজির হয়। সেই পাখিদের নিয়েও চলে গবেষণা। তাদের জন্য সব রকমের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।আর একটি জলাধারে বিভিন্ন ধরণের মাছ রাখা হয়। পা ডুবিয়ে জলে দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের চামড়ার মৃত কোষ খায় এইসব বিদেশি মাছেরা। ওপেন বাথরুমে ঈশানীর জল উপলব্ধ।এই রিসর্টগুলিতে সর্বসুখের ব্যবস্থা আছে।শীতকালে অনেক বিদেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। রাতে থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাও খুব সুন্দর।বেলুন গ্রামে ঢুকতে গেলে বাবলার বন পেরিয়ে মাটির আদরে হেঁটে যেতে হবে। এখন অবশ্য শিবলুন হল্ট থেকে নেমে বেলুন যাওয়ার পাকা রাস্তা হয়েছে।টোটো,মোটর ভ্যান চলে এই রাস্তা ধরে।চারিদিকে সবুজ ধানক্ষেতে হারিয়ে যায় মন এক অদ্ভূত অনাবিল আনন্দে।বেলুন ইকো ভিলেজ কাটোয়া মহুকুমার গর্ব। লিলিদি বিজ্ঞানী । পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।গোয়েন্দাগিরিও করেন। এটা তার শখ।বুুদ্ধিতেে শান দেন নিয়মিত।খুব কম সময় বাইরে বেরোন।সবসময় নিজের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখেন কখন কিভাবে সমাজের উপকার করা যায়।দিদির বাড়ির একটি ছেলে আছে। তার নাম রিপন রিপন। ঘাড় বাঁকা।সে চলতে ফিরতে পারে না। একটা তিন চাকার রিকশা ছোট থেকে কিনে দেওয়া হয়েছে। তাতেই চেপে যাওয়া আসা করে। কিন্তু রিপন লেখাপড়ায় খুব ভালো তার বুদ্ধি খুব প্রখর।দিদির ঘরে তিনজন সদস্য সুমন বাবু নিজে তার এক চাকর তার দেখাশোনা করে আর একটা কুকুর।কুকুর প্রভুভক্ত প্রাণী। সমানভাবে কুকুরটি খুবই প্রিয় তার। ইঁদুর ধরে দেয় কুকুরটি সুমনবাবুকে।সঙ্গে যে থাকে তার নাম তোতন।। তোতন তাঁর দেখাশোনা করে। সবকিছুই তোতনই করে। লোকের সঙ্গে কথা বলা সব কিছুই সে সামলায়। আজ ভোরে উঠেই দিদির মাথায় একটা চিন্তা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। সে তোতনকে বলছে, মহাভারতের আদিপর্বে গল্পটা জানিস। ধৃতরাষ্ট্র পত্নী দু'বছর গর্ভধারণের পর প্রসব করলেন একটি গোলাকার মাংসপিণ্ড।সেটি তুলে দেওয়া হল ঋষি দ্বৈপায়নের হাতে। তার থেকে তিনি 100 টি খন্ডে বিভক্ত করে বিভিন্ন ওষুধি উদ্ভিদে ভিজিয়েএকটি কাপড়ের টুকরো নিয়ে সেগুলির মধ্যে টানা দু'বছর রেখে দিলেন। আজকের টেস্ট টিউব বেবি সৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে কোথাও মিল আছে। কারো কারো মতে প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান খুব উন্নত ছিল।তোতন বললো তাহলে আর্য ঋষিরা কত পণ্ডিত ছিলেন বলুন। তারা নিশ্চয়ই এইসব ব্যাপারে বিজ্ঞানসম্মত উপায়গুলো জানতেন।দিদি আবার বললেন আমাদের পাশের বাড়ি রিপনের রোগ হয়েছে। তার নাম ডাক্তারি ভাষায়, আমিও ট্রফিক লেটারাল স্ক্লোরেসিস সংক্ষেপে এ এল এস।
বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং যার অসহায় শিকার। এমন একটা রোগ যা মস্তিষ্কের নিউরন অর্থাৎ কোষগুলোকে নষ্ট করে দেয়। ফলে প্রচুর অঙ্গ কাজ করে না।
কোষ বেশি অচল হয়ে পড়ে।
তোতন তো অত পড়াশোনা জানেনা।
সে সবে গ্রাজুয়েট হয়েছে। কিন্তু তবু তার জানার আগ্রহ অনেক।
সে বলল যে, এই অঙ্কুর কোষ আসলে কি? অঙ্কুর কোষ দিয়ে কি সব অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা যায়?
বিজ্ঞানী দিদি বলেন, প্রথমেই সম্ভাবনার দিকে তাকানো যাক দেশ-বিদেশের বহু বিশেষজ্ঞ মনে করেন অঙ্কুর কোষের গবেষণা পৃথিবীতে রোগবালাইয়ের মুখচ্ছবি একদিন আমূল বদলে দেবে।
নির্মূল করবে ক্যান্সসার থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস।
ক্যান্সার এবং বহু বংশগতীয় অসুখ নিখুঁতভাবে মেরামত করে দেবে এবং তা থেকে ফুসফুস লিভার কিডনি ইত্যাদি বিশেষ করে তা শরীরের মধ্যে নির্দিষ্ট অংশে ইনজেকশনের মাধ্যমে দিয়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করা হবে।
বিজ্ঞানী ভোরবেলা হাঁটতে বের হন আর দেখেন তিন চাকার সাইকেলে করে রিপন পড়তে যাচ্ছে তার মাস্টারের কাছে।
তিনি রিপন কে ডেকে বললেন আমার ঘরে তুমি মাঝে মাঝে যাবে। আর তোমার সঙ্গে আমার প্রয়োজন আছে। তোমার বাবা-মাকে বলেই আমার ঘরে আসবে।
রিপনের বাবা মা কারণ জিজ্ঞেস করাতে বলল দিদি বললেন যে, ও এলে আমি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাপারগুলোকে বোঝাতে পারব এবং আমাদের গল্প হবে। আর ওর রোগের চিকিৎসা করব।
রিপনের মা বললেন, ওর কোন ক্ষতি হবে না তো?
সুমন বললেন, আমাকে সবাই পাগল বলে। তবে আশা করি আপনার ছেলেকে আমি সারিয়ে তুলতে পারব।
রিপনের বাবা মা আলোচনা করে দেখল ছেলেটা এমনিতেই অচল। বেঁচে থেকেও মরার মত। তাই ওরা ঠিক করলেন সুমনবাবুই ওদের শেষ ভরসা। দেখা যাক কি হয়।
রিপন এবার থেকে প্রায় রোজই বিজ্ঞানীর ঘরে আসে এবং খুব কৌতুহলী ওঠে। কিন্তু ও খুব কার্যকরী কথা বলে। ও খুব পড়াশোনায় ভালো। ওর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অচল হলেও পড়াশোনায় খুবই ভালো। এক থেকে দশের মধ্যে ছিল ওর রোল নম্বর।
বিজ্ঞানী কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে একটা নিডল দিয়ে ওর শরীরের হাতে পায়ে তিনি ওষুধ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আস্তে আস্তে চিকিৎসা করতেন। আপনি এগুলো কি করছেন?
তোমার ঘাড় সোজা করার চেষ্টা করছি। তোমার হাত-পা সচল করার চেষ্টায় আমি তোমাকে আসতে বলেছি। তোমার বাবা-মাকে সবকথা বলার প্রয়োজন নেই এখন।
যখন তুমি সুস্থ হবে তখন তারা এমনিতেই জেনে যাবে। তাছাড়া আমি ওনাদের পারমিশনও নিয়েছি তোমার চিকিৎসা করার জন্য।
রিপন খুব বুদ্ধিমান ছেলে সে সময় পেলেই দিদির কাছে চলে আসে আর বিজ্ঞান এর সমস্ত কিছু জানতে চায়।
দিদি তার যথাযথ উত্তর দেন এবং তার মাঝেই তার চিকিৎসা চালিয়ে যান অঙ্কুর কোষের মাধ্যমে তার চিকিৎসা চলে।
বিজ্ঞানী, রিপনের নিজস্ব অঙ্গ থেকে দেহকোষ নিয়ে প্রতিস্থাপনযোগ্য যন্ত্রটি তৈরি করেছেন এবং এতে কোনো সমস্যা নেই।
সেক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেছেন তিনি, তা হল কোন অঙ্গ থেকে কেবল সেই অঙ্গ বা তার অংশবিশেষ টি সুস্থ করা যায়।
প্রথমে তিনি হাত থেকেই চিকিৎসা শুরু করেন এবং যথাযথ ফল পেয়ে যান।
তার ফলে তার উৎসহ আরো দ্বিগুণ হয়ে যায় বিজ্ঞানী দেখেন যে রিপন তার হাত নিচে নামাতে পারছে,ওপরে ওঠাতে পারছে।
বিজ্ঞানী বলেন রিপনকে এটা হাট করে সবাইকে বলার দরকার নেই।
যখন তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হবে তখন আমি নিজে থেকেই এই কথাগুলো সবাইকে বলব।
তোতন আজ আরো অবাক হয়ে গেল রিপন পা নড়াচড়া করছে। সে দেখল নিজে নিজে দাঁড়াতে পারছে। হয়তো বেশিক্ষণ পারছেনা।
কিন্তু আগে তো একবারেই পারত না। হুইল চেয়ারে বসে বসে যাওয়া করত।
কিন্তু এখন সে দাঁড়াতে পারছে।
সে জিজ্ঞেস করল বিজ্ঞানী যে এটা কি করে সম্ভব হল?
বিজ্ঞানী বললেন এসব ক্ষেত্রে আরও সফলভাবে কাজে লাগানো সম্ভব যদি ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন আইভিএফ পদ্ধতি সাহায্যে অর্থাৎ পরীক্ষাগারে রোগী বা রোগীনীর জনন গ্রন্থি তৈরি করা যায়।
রতন বলল হ্যাঁ আপনি যেভাবে বলেছিলেন যে এখন টেস্টটিউববেবী বা নলজাতক এর ব্যাপক সৃষ্টি সম্ভব হচ্ছে। বস্তুত আইডি এতে একসঙ্গে অনেকগুলো এমব্রায়ো তৈরি করতে হয়।।
যার মধ্যে একটি উপযোগী ভ্রূণকে মাতৃগর্ভে স্থাপন করে নলজাতক জন্ম দেওয়া হয়। এগুলো আমি আপনার কাছে শুনেছি।
রিপন বলল তাহলে আপনি কি অবশিষ্ট কোষগুলি থেকে অঙ্কুর কোষ নিষ্কাশন করে অঙ্গ মেরামতি কাজে আপনি সফল হবেন বা রোগ নিরাময় কাজে লাগিয়ে আমাকে সুস্থ করতে পারবেন।
বিজ্ঞানী বললেন মানুষের বা ইঁদুরের কোষ নিষ্কাশন সম্ভব হয়েছে মাত্র কুড়ি বছর আগে। তাই এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিকভাবে আছে। তবে বহুবিধ শারীরিক ত্রুটি এবং দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ে একদিন সফল হবে বলেছেন বিদেশের বিশেষজ্ঞরা।
তুমি নিশ্চিন্ত থাকো আমি চলাফেরা করার মত মোটামুটি সুস্থ তোমাকে করে দিতে পারব।
রিপন বলে এগুলো পৃথিবীর কোথায় কোথায় ভাল রকম গবেষণাগার আছে স্যার।
বিজ্ঞানী বলেন অঙ্কুশ নিয়ে কোথায় কি ধরনের গবেষণা চলছে আমরা জানতে পারি এই বিজ্ঞান পত্রিকার মাধ্যমে।
এদেশে প্রায় 15 টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অঙ্কুর কোষ গবেষণা তার বাস্তব প্রয়োগ পরীক্ষা চলছে তার মধ্যে রিলায়েন্স লাইফ সাইন্স, হায়দ্রাবাদের এল ভি প্রসাদ ইনস্টিটিউশন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সাইন্সেস, ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজের নাম উল্লেখযোগ্য।
0 Comments.