- 4
- 0
আমাদের খাওয়া দাওয়া
নবান্ন উৎসব থেকে শুরু করি। ভোর থেকেই গোটা পাড়া জুড়ে হাঁক ডাক। মেজো কাকা সেই কোন ভোরে গেছে পুব মাঠের বড়ো জমিতে মোঠ আনতে। ধানের শীষ সমেত এক গোছা খড় কেটে কলা বউয়ের মত নতুন লাল পাড় শাড়ীতে মুড়ে কাকা এলে উলু দিয়ে শাঁখ বাজিয়ে ঠাকুরঘরে জলচৌকির ওপর বসিয়ে দেয় ঠাকুমা গঙ্গাজল ছিটিয়ে। এর নাম মোঠ, মা লক্ষ্মীর প্রতিভূ।
এখানেই নৈবেদ্য সাজিয়ে পুজো হবে। ওদিকে রান্নাঘরে হৈ হৈ চলছে। তিনটে শিলে ভিজে আলো চাল বাটা হচ্ছে। একদিকে ফল কাটা চলছে। বাবা গয়লা বাড়ী গেছে ক্ষীর আর
দুধ আনতে। ময়রার দোকান থেকে সন্দেশ, রসগোল্লা সব আগের দিনই এসে গেছে। উঠোনে
চাটাইয়ের ওপর পুকুরের মাছ এনে ঢালছে বিজয় জেলের ছেলে নবীন। একদিকে বড়ো বড়ো রুই কাতলা, আর একদিকে খয়রা, ট্যাংরা,
এই সব ছোটো মাছ। আমাদের মত কুচো কাচারা অপেক্ষাকৃত বড়ো বড়ো চুনো মাছ গুলোকে আলাদা করে রাখছি, বাকি সব নারকেল গাছের গোঁড়ায় পুঁতে দেওয়া হবে, সার
হবে। কত রকমের ছোটো মাছ! বাঁশপাতা মাছ,
বকের ঠোঁট ওয়ালা মাছ, পুঁটি, দাঁড়কে, বেলে।
সব চেয়ে সুন্দর দেখতে খয়রা। রূপোর মত ঝকঝকে , যেন ছোট ছোট ইলিশ।
চানটান করে নতুন জামা পরে
সবাই জড়ো হয়েছি ঠাকুর দালানে। একটা ইয়া
বড়ো পিতলের গামলায় নবান্ন মাখা হয়েছে। কি
নেই তাতে! আলো চাল বাটা, দুধ, ক্ষীর, খেজুর
গুড়, নারকেল কোরা, সব রকমের কুচনো ফল,
সন্দেশ, আর স্পেশাল হলো ওর সঙ্গে আদা কুচি
আর আখের কুচি। ছোটো ছোটো কাঁসার বাটিতে এই নবান্ন মাখা তুলছে মা। ঠাকুমা সবার
হাতে হাতে একটু করে পুরনো চাল দিয়ে বললে,
"নয় পুরনো সইলো?" আমরা সমস্বরে বলি,"সইলো ...... !" তিনবার বলার পর ঠাকুমা সবার হাতে হাতে দিলে নবান্ন মাখার বাটি। আহা!!!! যেন অমৃত!!! এর পর রসগোল্লা সন্দেশ!!! দুর!!! এবার দলে দলে এ বাড়ী ও বাড়ীর কাকা, পিসি, দিদি দাদাদের আগমন আর
নবান্ন মাখা ভক্ষণ। তারপর চাষের কিষেন গবিন দাদু, ঝোড়ো রাখাল, সন্ধ্যা খুড়ির পরিবারের লোকজন। আজ সবার আমাদের বাড়ীতে নেমতন্ন।
এবার দুপুরের খাবার! নয় রকমের ভাজা,
সোনা মুগের ডাল নারকেল কুচি দিয়ে। মাছের মাথা দিয়ে চচ্চড়ি, শুক্ত। শুক্ত রান্নাটা আমার মায়ের হাতে বড্ডো চমৎকার! খাঁটি সরষের তেলে সব সব্জী ছেঁকে ভাজা। অল্প একটু
আদা জিরে বাটা দিয়ে সামান্য কষে গরম জল
দেওয়া পরিমাণ মত। স্বাদ মত নুন মিষ্টি, শেষের দিকে ভেজে রাখা বেগুন, কাচকলা আর উচ্ছে ভাজা দিতে হবে, নাহলে ঘেঁটে যাবে। উনুন থেকে কড়া নামিয়ে আলাদা ভাবে দুধে চন্দনি বা রাঁধুনি বাটা গুলে কড়াতে ঢেলে দিতে হবে। তার পর বড়ো লোহার হাতায় অনেকটা গাওয়া ঘি গরম করে আগে থেকে শুকনো খোলায় ভেজে নিয়ে শুক্তর মশলা ঘিয়ের হাতায় দিয়ে সাঁত লানো। এরপর খয়রা মাছ, মৌরলা মাছ ভাজা, মাছের ডিমের বড়া,বড়োমাছের কালিয়া, আলু
পোস্ত, চাটনি,গোবিন্দভোগ চালের পায়েস, পাঁপড়, দই, রসগোল্লা। আর ছোটো কাকার আনা মিষ্টি পান। ওহ! সে এক এলাহী ব্যাপার!
এতেই হাঁপিয়ে গেলে হবে না! রাতে আবার লুচি আলুর দম,ছোলার ডাল মোহনভোগ। যত রান্না ততো খাওয়া!
দেখতে দেখতে এসে গেলো পৌষ মাস।
মিঠে পিঠে পুলি। এবার মামার বাড়ী। কাঠের উননে লোহার চারচৌকো খাদায় ( বিশেষ ধরনের তাওয়া) একটার পর একটা পাতলা কাগজের মত সরুচাকলি খুন্তি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তুলছে দিদিমা, আর মামা মাসী আমরা মিলে গোল হয়ে বসে গজগজে মটরশুটি দেওয়া বাঁধাকপি সহযোগে খাচ্ছি একটার পর একটা।
পরদিন কাঁচা নারকেলের পুর ভরে ধবধবে সাদা
সিদ্ধ পিঠে, ঝাল ঝাল মশলা দেওয়া ভাজা পিঠে, ফুলো ফুলো গোকুল পিঠে আর চোষির
পায়েস! আহা!!! মনে পড়লেই জিভে জল!
এখানেও দিদিমার স্পেশাল পাটি সাপটার
রেসিপি একটু না দিয়ে থাকা যাবেনা! দুকাপ আলোচাল বাটা হলে এক কাপ ময়দা আর দের
কাপ মুগ ডাল বাটা ঘন করে জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করা দুধে গুলতে হবে সামান্য খেজুর গুড় সহযোগে। তারপর ছোটো ছোটো সরু চাকলির
মত গাওয়া ঘি তাওয়াতে বুলিয়ে হালকা ভেজে
ঘরে করা ঘন ক্ষীর এর পুর ভরে গরম খেজুর গুড়ের রসে অল্প সময়ের জন্য রেখে তুলে নিতে হবে। এর পর দিদিমার হাতের গুণ আর উফ্ছে পড়া স্নেহ! তার কি অপূর্ব যে স্বাদ তা ভাষায় প্রকাশ করা আমার সাধ্য নয়।
এর পরের আকর্ষণ সরস্বতী পুজো। ওটাও মামারবাড়ীতে। মামার বাড়ীর লাগোয়া মন্দির,রীতিমত দালান কোঠা। ভিতরে একটি কাঠের সিংহাসন। দুদিন আগে থেকেই শুরু হয় যায় সাজানো। কি সুন্দর রঙিন কাগজ দিয়ে ফুল, পাখি, নানা নকশা তৈরী করে মালাকার, এক পাশে বসে অবাক হয়ে দেখি। শেষের দিন
বারতি কাগজ রাংতা দিয়ে ফুল পাখি বানিয়ে দেয় মালাকার মামা আমাদের মত কচি কাচাদের। কি যে আনন্দ সেই সব উপহার পেয়ে!
সরস্বতী পুজোর দিন ওখানেই খিচুড়ি খাওয়া কলাপাতা পেতে, সঙ্গে লাবড়া, বেগুনি, বাঁধা কপির তরকারি, চাটনী , পাঁপড়, রসগোল্লা! রাতে লুচি আলুর দম, ছোলার ডাল,সিতাভোগ,
মিহিদানা। পরদিন ঠান্ডা খাওয়া, শীতল ষষ্ঠী। আগের দিনের রান্না করা ভাত, কলাই সিদ্ধ(জোড়া সিম, কুল, মটরশুটি, ছোটো আলু
বেগুন ইত্যাদি সহ), অনেক রকম ভাজা, আলু পোস্ত, কড়া করে ভাজা মাছের মুড়ো,ল্যাজা
দিয়ে তেঁতুলের টক আর বড়ো বড়ো পিস গুলো
দিয়ে দই কষা। অমৃতের স্বাদ কি এর থেকেও বেশি!!জানিনা। সেই কবেই তো রবি ঠাকুর বলে
গেছেন... অমৃত জিনিসটা রসের মধ্যে নেই, আছে রসবোধের মধ্যে। তাই...... !
এই সব মিটলে, শুরু হয় বড়মামার কেরামতি। একদিন আম আদা দিয়ে হাঁসের ডিমের ডালনা, চর্বি দিয়ে কুমড়োর তরকারি সঙ্গে মোটা মোটা পরোটা কিংবা রুটি। তার পর
দিন বড়ো বড়ো আলু দিয়ে খাসির মাংসের ঝোল,সরু ছোটো ছোটো মূর্গিবালাম চালের ঝরঝরে ভাত আর টমেটো রাঙা আলু দেশি কুলের চাটনি, লম্বা লাল বারান্দায় সার সার বসা
আর কলাপাতায় হাপুস হাপুস করে খাওয়া!
আর একটি দারুন খাবার এর কথা না বললেই নয়,মামার বাড়ির কমলা ময়রার দোকানের সিঙ্গাড়া!
আধ ভাঙা ভাজা বাদাম, মেথি পাতা, ভাজা মশলা দেওয়া খাঁটি সরষের তেলে ভাজা ছোট ছোট সিঙ্গাড়া। ওহ! কি তার স্বাদ!
পিসিমার বাড়িটা কাছেই হওয়ায় সারা বছরই যখন তখন সেখানে অধিষ্ঠান। ওখানে সব
রেসিপি প্রকৃতির নিজের রান্না ঘরে! বাড়ীর চার
দিকে বাগান,তাতে আম, কলা, পেয়ারা, আনারস,কুল, চালতা, কামরাঙা কি না হয় না!
আম ছেঁচা অল্প সর্ষে, কাঁচা লঙ্কা,নুন চিনি দিয়ে
মেখে কলাপাতায় ঠোঙার মত মুড়ে নিচের দিকে
মুখ লাগিয়ে চোখ বুজে চুষে চুষে.....উঃ! দারুন!
কুল ছেঁচাতে দিতে হবে শুকনো লঙ্কা পোড়া, ভাজা কালো জিরে নুন আর আখের গুড়, একটু
লেবু পাতা চটকে মেশানো! এটা আমার মায়ের
হাতের কেরামতি। আর রান্না হয়ে না উঠলে পিসিমার চট জলদি একটি থালি.... গরম ভাত,
ক্ষীরের মত ঘন দুধ আর নৈনিতাল আলুভাতে
সামান্য নুন দিয়ে মাখা। ওই দিয়ে দুধ মাখা ভাত!
অসাধারণ!!!! অঢেল পুকুরের মাছ। শুধু কলায়ের ডাল আর গরম গরম মাছ ভাজা, অতুলনীয়। ছোটো কাকিমার হাতের কাঁচা মাছের ঝাল! ভাবলেই জিভে জল! একটা বড়ো
টিনের বাটিতে জল, নুন, হলুদ, চেরা কাঁচা লঙ্কা,
অনেকটা সরষের তেল দিয়ে ভালো ভাবে ফুটে
উঠলে ওতে বড়ো বড়ো গাদের মাছ দিয়ে কম আঁচে চাপা দিয়ে ফুটতে দিতে হবে। জল কমে
অর্ধেক হয়ে গেলে অল্প একটু সর্ষে পোস্ত বাটা।
সঙ্গে কাকিমার হাতের গুণ। কি যে অপূর্ব স্বাদ!
এক থালা ভাত শেষ। গরমের দিনে পান্তা ভাত,
কুচো লঙ্কা, পিঁয়াজ, নুন, তেল বেসনের ফুলুরি
ভেঙে মেখে সঙ্গে চুনো মাছের টক! এক থালায়
মেখে খাচ্ছি আমি আর কাকিমা। ছোট কাকা বললো.... ইস!কি সব জঘন্য খাওয়া রে তোদের! এক গাল হাতে নিয়ে বলি.... একটু খেয়ে দেখো .…..। মুখে নিয়েই কাকার কি আনন্দ!..... আরে দারুন তো!!! দে তো আর এক গাল!
0 Comments.