Fri 24 July 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

maro news
হৈচৈ তথ্যসমৃদ্ধ লেখায় অংশুদেব

বাঙালি : মিঠেকষা হিন্দু লোকসম্প্রদায় 

         বাঙালি হিন্দুদের বারো মাসে তেরো পার্বণ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অন্যান্য ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের থেকে এরা সাহিত্য, শিল্প, ধর্মীয় সংস্কৃতি , মানসিকতা, চিন্তা -ভাবনা , খাদ্য-খাবার, আচার -আচরণ সব দিক থেকে ভিন্ন কিন্তু পৃথক নয়, খুব বেশি ভারতীয় । রাজনৈতিক অপচেষ্টায় বাঙালির এই স্বতন্ত্রতাকে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ভারতীয় ঐক্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে গেছে । এখনও পর্যন্ত অতীতের মতো বর্তমানেও সফল হতে পারেনি । কেন ? এর উত্তর খুঁজতে আমরা একটা প্রাকৃতিক দৃষ্টান্ত সামনে আনতে পারি।

           পাহাড় ধৌত মিঠে জল প্রাকৃতিক নিয়মে সমুদ্রে মিশে নোনাই বা লোনাই হয় । কিন্তু সমুদ্রের প্রভাবেও মিঠে জল কিছুটা ব্র্যাকিশ ওয়াটার বা মোহনার জল হয়ে ওঠে। একে আঞ্চলিক ভাষায় মিঠেকষা জলও বলে । তেমনি বিজয়ী শাসকদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতি বিজিতদের সাগরে গিয়ে মিশবে,এটাই প্রত্যাশিত। কেননা প্রাকৃতিক নিয়মে তাই বলে । বাস্তবে উল্টো ধারা দেখি । লোনা জল ওপরের দিকে মিঠে জলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। যেটা দেখা যাচ্ছে , সেটা মনে হয় ঠিক নয় । ভারতের হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি তার বৈদিক উচ্চতা থেকে ব্রাহ্মণ্য ধারায় রূপান্তরিত হয়ে পৌরাণিক ধারায় অনেকটাই লৌকিক হয়ে গেছে। এর কারণ ভারতের আদি বাসিন্দারা যারা আদিবাসী সংস্কার থেকে ক্রমশ নিজস্ব দর্শন ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে লোক হয়ে উঠছিল, নিজেদেরকে উন্নত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জনসমাজে উন্নত হবার মানসে পৌরাণিক ধর্ম ও জীবন সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে মার্জিত লোক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। যেমন বৈষ্ণব, শাক্ত,শৈব,নাথ বা বিভিন্ন গুরুমুখী জন সম্প্রদায় । ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠী পুরাণকে গ্রহণ করলেও ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর অনুশাসন বা বৈদিক যজ্ঞের জটিলতা গ্রহণ করেনি। তারা পুরাণের গল্প, অবতারবাদ এবং দেবদেবীকে নিজেদের মতো করে, নিজেদের লৌকিক আচার ও দর্শনের ছাঁচে ঢেলে সাজিয়ে নিয়েছে। রাধাকৃষ্ণ, শিব-পার্বতী বা চণ্ডীর লৌকিক রূপগুলো এর বড় প্রমাণ।এদেরকে কি বলা হবে ? পুরাণাশ্রীত লোকসম্প্রদায় বা নব্য পৌরাণিক লোক সম্প্রদায় নাকি মিঠেকষা হিন্দু লোকসম্প্রদায়? সমন্বয়ী লোকায়ত ধারা (Syncretic Folk Tradition): গুরুমুখী বা বিভিন্ন ভক্তিবাদী সম্প্রদায়গুলো (যেমন বাউল, কর্তাভজা বা বিভিন্ন বৈষ্ণব উপসম্প্রদায়) আসলে পুরোপুরি বৈদিকও নয়, আবার আদিম লোকায়তও নয়। এরা হলো সেই 'ব্র্যাকিশ ওয়াটার' বা মিঠেকষা সংস্কৃতির খাঁটি প্রতিনিধি।

        এবার একটা উদাহরণ দেখা যাক। প্রায় ১১,০০০ বছর আগে ভারতের পূর্ব দিকে ধান খাদ্যশস্য রূপে আবিষ্কারের সময় থেকে প্রকৃতিকে মাতৃরূপে আরাধনার মানসিক সূচনা, অনুমান করা যায়। প্রাচীন বঙ্গে ( বৈদিক - ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি অনুপ্রবেশের আগে) প্রকৃতি ও মাতৃ দেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল । সেই উপাসনা বা পূজা পদ্ধতি কেমন ছিল আমরা জানি না, তবে সংস্কৃতির বিবর্তন ঘটলেও মাটির মানুষের আচার বিচার রীতি কিছু কিছু রয়ে যায়। বাঙালি ডালা পূজা বা প্রসাদ সংস্কৃতিতে প্রকৃতি আরাধনার মূল প্রবণতাটা ধরা পড়ে ।এই প্রসাদ নিবেদনের উদ্দেশ্য ধরলেই একটা অলৌকিক সত্ত্বার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার দিক প্রতিফলিত হয়। এর সঙ্গে বাস্তব যৌন সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েই উর্বরতার কাল্পনিক উপাস্য নারী রূপ তৈরি হলো। সেই থেকে মাতৃধর্ম তুলনীয় হয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেবী নাম সৃষ্টি হলেও মৌল মাতৃ-সংস্কৃতি প্রসারিত হলো। মোটকথা সামাজিক রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে মা মঙ্গলের প্রতিমূর্তি হয়ে পড়লো । তার রীতি নীতি নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত হতে হতে মাতৃতান্ত্রিক দর্শন অলিখিত রূপে গড়ে ওঠে। সেখানে পুরুষ গৌণ হয়ে রক্ষক,সেবক হিসাবে আদৃত হলো । এই সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ব্যবস্থা বহু দিন মাতৃতান্ত্রিকতার কাঁচা রূপেই ছিলো । পূর্ব ভারতের মাটির চিন্তা নায়ক কপিল প্রচলিত মাতৃতান্ত্রিকতা বিশ্লেষণ করে দুটো দিক দেখতে পেয়েছিলেন - লৌকিক ও অলৌকিক। লৌকিক দিক হলো বাস্তব মাটির সংস্কৃতি, তা জীবের দেহ - যাকে তিনি প্রকৃতি বললেন । তিনি লক্ষ করলেন বংশ পরম্পরায় দেহের মধ্যে বহমান এক ধারা রয়েছে, তাকেই নাম দিলেন পুরুষ। এটাকেই পূর্ব ভারতের মানুষেরা নিবেদিত প্রসাদ সংস্কৃতিতে উপলব্ধি করেছিলো , দেহ নয় দেহের অন্তরালে কিছু একটা আছে, যা সৃষ্টি, সৌভাগ্য , রক্ষা ও পালন করে চলেছে মায়ের মতো। এটাই অলৌকিক দিক। গড়ে উঠলো পাকা মাতৃতান্ত্রিক পুরুষ উপাসনার যৌক্তিকতা।

       এই অলৌকিক মাতৃতান্ত্রিক পুরুষই বৈদিক ব্রাহ্মণ্য বা স্মার্ত-ব্রাহ্মণ্য ধারায় ব্রহ্ম , যাকে পুরুষতান্ত্রিক ব্রহ্ম বলা যায় । পুরুষতান্ত্রিক বলা হলো কেননা বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধারায় মনে করা হয় এক সর্বোচ্চ সর্বশক্তিমান সর্বনিয়ন্ত্রক সত্ত্বা আছেন, তাকেই পুরুষোত্তম ব্রহ্ম বলা হয়েছে । তাই বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধারায় ভগবান,রাজা, কর্তা সবাই পুংলিঙ্গ পুরুষ। ভগবান বিষ্ণুকে পুরুষোত্তম ধরা হয় ব্রাহ্মণ্য ধারায়। তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী। তিনি ধন, ঐশ্বর্য ও রূপ সৌন্দর্যের দেবী। তাই রাজলক্ষ্মী। এই রাজলক্ষ্মী সম্ভাব্য উৎস ঋগ্বেদের পঞ্চম মণ্ডলের শ্রীসুক্ত। এই শ্রীসুক্ত অনুসারী বাজসনেয়ী সংহিতায় আদিত্যর স্ত্রী রূপে স্বীকৃত হয়েছে। 

         খ্রী.পূর্ব সপ্তম- ষষ্ঠ শতকের নিরীশ্বরবাদী কপিলের প্রকৃতি -পুরুষ তত্ত্ব অনুসারী মাতৃতান্ত্রিক পুরুষ বা ব্রহ্ম উপাসনা ( মাতৃদেবী ও প্রকৃতি পূজা ) পূর্ব ভারতে প্রচলিত হবার অনেক পরে দ্বাদশ শতকের বিখ্যাত ভাষ্যকার সায়ণাচার্য-এর ‘ঋগ্বেদ ভাষ্য’ এবং আনন্দতীর্থ বা অন্যান্য বৈদিক টীকাগুলোতে দেখিয়েছেন যে, বৈদিক যুগে ধন বা ঐশ্বর্য মানে কেবল সোনা-দানা নয়, বরং তা ছিল মূলত কৃষি-উৎপাদন, বৃষ্টি, উর্বর জমি এবং গো-ধন। তিনি এই পদগুলোকে ভূমির উর্বরতা ও জলসিঞ্চনের শক্তিরূপেই ব্যাখ্যা করেছেন। ডেভিড কিন্সলে (David Kinsley) - "Hindu Goddesses: Visions of the Divine Feminine in the Hindu Religious Tradition": কিন্সলে তাঁর বইয়ের ‘শ্রী-লক্ষ্মী’ অধ্যায়ে শ্রীসূক্তের এই মন্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কীভাবে দেবী লক্ষ্মীর আদি রূপটি ছিল সম্পূর্ণ রূপে গ্রামীণ ও কৃষিভিত্তিক (Agrarian Fertility)। তিনি স্পষ্ট লিখেছেন যে, দেবী এখানে কাদা (mud), আর্দ্রতা (moist) এবং গোবরের সুবাসের সাথে যুক্ত, যা শস্যের প্রাচুর্যকে নির্দেশ করে।

        অতএব দেখা যাচ্ছে, যা উপরিকাঠামোয় 'লৌহকঠিন ব্রাহ্মণ্যবাদ' বা 'বিশুদ্ধ বৈদিক ধারা' বলে মনে হয়, তার শিকড়টি আসলে প্রোথিত রয়েছে কাদা-মাটি-জল আর ফসলের আদিম লোকায়ত গর্ভেই। বাঙালি হিন্দু এই দুই ধারার মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য 'মিঠেকষা' সম্প্রদায়। তাই বাইরে থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে কোনো একক বা উগ্র সমরূপতার (Homogeneity) সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে বাঙালির এই স্বতন্ত্রতাকে ভারতের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। কারণ, বাঙালির বৈচিত্র্য আসলে ভারতীয় সংস্কৃতিরই সেই গভীরতম আদি রূপ, যা সমুদ্রের লোনা জলকে নিজের অজান্তেই মিঠে করে রেখেছে।

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register