- 3
- 0
পূজা ও আধ্যাত্মিকতা
আমার মনে হয় ভারতীয় জনজীবনে পূজা আর আধ্যাত্মিকতার মধ্যে বিস্তর ফারাক। পূজা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া একটা ব্যবস্থা যার সঙ্গে সাধ্য ও সাধকের ( ভগবানের সঙ্গে ভক্তের) সম্পর্ক পরোক্ষ । পূজার মাধ্যমে ঈশ্বরের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়,অনেকটা বশ্যতা স্বীকার করার মতো। পূজার অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ মাধ্যম বা দালাল হিসাবে ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক স্থাপন করেন। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভক্তি ও ধর্ম প্রীতির পরীক্ষার অন্তরালে একটা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতা চলে । প্রকৃত আধ্যাত্মিকতায় সমগ্র ভারতীয় জনজীবনের সঙ্গে বাঙালির আধ্যাত্মিকতার বিরোধ বা পার্থক্য নেই। বরং এই মাতৃদেহে পুরুষ জাগানো তথা ব্রহ্ম জাগিয়ে জনগণমন তথা পরমাত্মায় মিলিত হবার সাধনা সকলের মধ্যে রয়েছে। বাইরের গড্, আল্লাহ, ভগবানের প্রতি ভক্তি নিষ্ঠার মধ্যে প্রদর্শন মূলক ধর্মাচরণ প্রবণতা থাকে। সেই আনুষ্ঠানিক বিভেদকে আনুষ্ঠানিক করে তোলে ধর্মীয় রাজনীতি। এইখানে মানুষ তার আধ্যাত্মিক শুদ্ধতায় বিভ্রান্ত হয়। ধর্মীয় রাজনীতির আনুষ্ঠানিক বিভেদকে যুগে যুগে ধর্মীয় শুদ্ধতা বলে প্রচার করা হয়েছে। কেননা সেখানে যে যার গড্ আল্লাহ ভগবানকে কর্তা রূপে তুলে ধরে মানুষের মধ্যে তার মাহাত্ম্য এমন ভাবে প্রচার করে যে, অনুগতরা বুঝতে পারে তাদের ঈশ্বর কত মহান,কত শক্তিশালী। আধ্যাত্মিকতায় অলীক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে অসন্তোষ থাকে না। সেখানে বিপরীত ক্রমে নিজেকে সকলের উপযোগী বা ঈশ্বরের কর্ম উপযোগী করে তোলার প্রয়াস থাকে। সে জন মানবের মধ্যে ঈশ্বর খুঁজতে থাকে। তার কাছে তখন ,সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নেই, বা জীবে প্রেম করে যেই জন,সেইজন সেবিছে ঈশ্বর,বা এক দেশ,এক বিধান,এক আইনের দাবি ওঠে । পূজা সংস্কৃতি ছাড়া ভারতীয়দের মধ্যে আধ্যাত্মিক ঐক্যে বিরোধ নেই। তাই পূজা সংস্কৃতিকে ব্যক্তিগত সীমায় বেঁধে ফেলতে পারলে আত্মার প্রসারণ ঘটবে। বাইরের ইন্ধন বন্ধ না করতে পারলে, ভেতরের দরজা খুলবে না। হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্টান, মুসলমান সব মানুষ চাইলেও পারে না নিজেদেরকে এক ভাবতে। কেননা আমাদের পূজা সংস্কৃতি তার হতে দেয় না । অথচ এই স্বার্থ বিদ্ধস্ত বিশ্বে আধ্যাত্মিক ঐক্য স্থাপন ছাড়া রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন সম্ভব নয়।
0 Comments.