- 61
- 0
শহরতলির ইতিকথা
শতদল ,রাজীবের সঙ্গে সেই প্রাইমারি সেকসন থেকে পড়ে এসেছে;এখন সে চাটার্ড একাউন্টান্সি পড়ছে;না,পাস আর করতে পাচ্ছে না;রাজীব যখন,ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করছে,তখন থেকেই আবার ওদের হৃদ্যতা বেড়েছে।
রাজীব,কলেজের অধ্যাপনার সাথে সাথে,কস্ট-একাউন্টান্সিটা পাস করেছে;শতদল,খুবই ভেঙ্গে পড়লেও,রাজীব,ওকে উৎসাহ যুগিয়েছে;ওদের মধ্যে বন্ধুত্বটা গাঢ় হয়,ফলে রাজীব একরকম বাধ্য হয়েই ওদের বাড়িতে শতদলের বোন, ক্লাস টুয়েলভে পড়া ছাত্রীকে,ইকোনমিক্সটা পড়িয়েছে;ওদের বাড়িতে রাজীবের একটা বিশেষ জায়গা আছে।শতদলের দাদাও রাজীবের ক্লাস -মেট,তবে সে স্কুল ফাইন্যাল পাস করার পরই,ওর বাবার অফিসে ঢুকে গেছে,বিয়েও করেছে, পাড়ারই সমবয়সী মেয়েকে;শতদলদের
বাড়িতে তা নিয়ে একটু খুঁত খুঁত ভাব থাকলেও ,দুই পরিবারই বামুন,স্বজাতি বলেই বোধহয় শেষ পর্যন্ত দু'পরিবারই তা মেনে নিয়েছে;শতদলের বৌদি,নিকটবর্তী স্কুলের শিক্ষিকা,গ্রাজুয়েট,তাই হয়তো মনোমালিন্যটা প্রকাশ্যে মাথাচাড়া
দেবার সুযোগ পায়নি,তবে,চাপা গুমসানো ভাবটা রয়েই গেছে।
রাজীবের মেজবোনের বিয়ের সময় ঐ গণ্ডগোলের দুর্দিনে,পাড়া বা অন্য সঙ্গী-সাথীরা তাকে এড়িয়ে গেলেও শতদল কিন্ত,ঠিক সাইকেল করে প্রায় প্রতিদিনই এসে ,একবার করে খোঁজ নিয়ে গেছে,ওর বাবা-মা'রাও রাজীবের জন্য যথেষ্ট উৎকন্ঠিত ছিলেন।বিপদের দিনে যে পাশে থাকে,সেই তো বন্ধু,আর অন্যজনেরা?
সময় সুযোগ পেলেই রাজীব
শতদলের সাথে সময় কাটায়; ওর তো নৈশ কলেজ,শতদল,বাড়িতে থাকলে,তারা একসঙ্গে সময় কাটায়, পড়াশোনার চর্চা হয়,ওদের বাড়িতে থাকতে তার ভালো লাগে,আর ভালো লাগার কারনে,অনেকেই অনেক কথা বলে,সে তা গায়ে মাখে না।শতদলের বোন,গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে,পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করছে কোলাকাতায়; বিয়ের তোড়জোড়ও চলছে। রাজীবের সহকর্মী ,রমাকান্ত'র সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তো ওর বাবা-পিসিমা,রাজীবের মাধ্যমে তাঁদের মতামত জানিয়ে দেবেন বলেছেন।
হৈমবতী,গঙ্গার ঘাটে চান করতে গেছে;পাড়ার অন্যেরা বলে,"কী দিদি,মেজো ছেলের বিয়ে কবে দিচ্ছেন,চাকরিতো ভালোই করে,আবার বিয়ের বয়সও তো পেরিয়ে যাচ্ছে"।প্রশ্নোত্তরে,হৈমবতীর বলে,"না,এখন তো বিয়ের কথা বললে,এড়িয়ে যায়,আজকালকার ছেলে,কখন যে মর্জি হবে, কে জানে"।
প্রশ্নকর্ত্রী বলে,"শোনা যায়,কোন বন্ধুর বোনের সাথে ,মনের মিল হয়েছে",বলে মুচকি হেসে দেয়।
" বিয়ের কথা বললে,ভাবা যাবে ," বলে হৈমবতী বাড়ির পথ ধরলেও,মনে দুশ্চিন্তা,যদি সত্যি হয়,তবে তো সব ছক বানচাল হয়ে যাবে।বিয়ের জন্য মেয়ের বাবারা এলেও,হাজরা-দম্পতির সদর্থক ভূমিকার অভাবে,মেয়ের বাবারা আর এগিয়ে আসতে সাহস করে না।
কাল এগিয়ে যেতে থাকে;সেজো- বোন হায়ার সেকেণ্ডারী পাস করে দূরের মেয়েদের কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। ঐ কলেজের একটি মেয়ের বাবা,রাজীবের সঙ্গে দেখা করে,বাড়িতে চা খাওয়ার নেমতন্ন করেছেন,উদ্দেশ্য মেয়ে-ছেলে,পরস্পরকে দেখলে,উভয়ের সম্মতি পেলে ,তবেই রাজীবের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব রাখবেন।একদিন,সেজো- বোনকে সঙ্গে নিয়ে রাজীব ওদের বাড়ি গেল; ছিমছাম পরিবার, মেয়েটি এবার থার্ড ইয়ার অনার্সের ফাইনাল পরীক্ষা দেবে,ওর সেজোবোনের কলেজেরই ছাত্রী;রাজীবের কাস্টম-হাউজে কাজের সূত্রে,ভদ্রলোকের সঙ্গে অল্প পরিচয় ছিল বলে,অনুরোধ এড়াতে পারেনি।পরিবার,বেশ রুচিশীল,দুই ভাই,এক বোন,মেয়েই বড়। পছন্দ হয়েছে,তবু স্পষ্ট করে কিছু বলেনি;কে আর জানতো,ওর সেজো বোনের পেটে আছে অন্য চাল; একদিন কলেজ থেকে এসে সে,ঐ মেয়ের নামে বিরূপ কিছু বলায়,রাজীব আর এ বিষয়ে এগোইনি; না,কোনো উত্তরও দেয়নি,সেজো বোনের কথা বিশ্বাস করেছে,তার পড়াশোনার খরচ তো রাজীবই মেটায়,এমনকি, হৈমবতী খেতে না দিলে,ওর হাতে রাজীব টাকাও অনেক দিন দিয়ে থাকে, যাতে দোকান থেকে সে কিনে কিছু খেতে পারে।
এবার এক প্রবাসী বাঙালির পরিবারের আত্মীয়-স্বজন,এসে বিয়ের কথাবার্তা উত্থাপন করলে,রাজীব,তার পরিবারের সকলের মেয়ে দেখতে যাবার ,'আসা-যাওয়া' খরচা দিয়ে,হাজরামশাইকে ,বারবার করে বলে দিয়েছে,যেন ফাইন্যাল কথা না দেওয়া হয়;সেজোবোনকে,কী কী জানতে হবে, সব বিশেষভাবে বলেছে,আর সেও তা জানবে বলায়,রাজীব আর সঙ্গে যায়নি; ওরা সব দেখার পর,ফাইন্যাল হবার সময় সে মেয়ে দেখতে যাবে;সে ,মেয়ে পক্ষকে কোলকাতার শহরের হোটেল বা রেস্তোয়ায় এনে পরস্পরের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে বলেছিল;মেয়ের জামাইবাবু ও তার কাকার পেটে তো অন্য ফন্দি,তারা রক্ষণশীলতার অজুহাতে , গ্রামের বাড়িতেই সব ব্যবস্থা করতে চায়;বিয়ের ব্যাপারে মানুষ যে এতো নীচতায় নামতে পারে,তা রাজীবের ধারনার বাইরে ছিল।যাই হোক,মেয়েদেখে,হাজরামশাই,একেবারে পাকা কথা দিয়ে এসেছে;মেয়ের বাবাও হাজরামশাই'র হাত ধরে, খাট বিছানা,অত দূর থেকে আনা সম্ভব নয় বলে , হাজরামশাই'র হাতে দু'হাজার টাকাও ধরিয়ে দিয়েছে। তা শুনে,রাজীব তো ক্ষাপ্পা,বলে,"জানো, বিয়ের ব্যাপারে টাকা-পয়সা,আমি একদম পছন্দ করি না,তা সত্ত্বেও তুমি নিলে!" না,সেজো- বোনও কোনো প্রশ্ন করেনি,বা
যা, যা,জানার জন্য রাজীব বলে দিয়েছিল, এবং সেও তা জানবে বলে কথা দিয়েছিল,তা জানার চেষ্টাও করেনি। হাজরামশাই নাকি ,'ঘরের কাছে শুয়োরের খোঁয়ার আর নয়' (সজীবের বিয়ে কাছেই হয়েছে), বলে
সকলের মত আদায় করেছে।রাজীব অত্যন্ত ক্রূদ্ধ হয়,ফাইন্যাল কথা দিতে নিষেধ করা সত্ত্বেও ওর পরিবার, তা করে এসেছে। হাজরা বলে,"তোমার দাদা তো,হাত পেতে সেই টাকা নিয়েছে; আর, পাশের গ্রামের স্কুলে তো মেয়ের চাকরি ঠিক হয়েই আছে,ওরা সে কথা বলায়, তো কথা দেওয়া যেতেই পারে;ওদের কথা অবিশ্বাস করার প্রশই ওঠে না,খুব ভদ্র পরিবার; সুতরাং-----।"
যাই হোক,পরিবারের সম্মান বাঁচাতে ,সে সব নিজের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছে; মানুষ যে কতটা নীচ হতে পারে,তা তার ধারনার অতীত ছিল। যথা সময়ে শানাই বাজলো ,আর তার জীবনে সেই শানাই'র মূর্ছনার সুর স্থায়ী হয়ে, চাপা যন্ত্রনায় পর্য্যুবসিত হল; স্ত্রী,না জানে প্রাথমিক স্তরেরও বাংলা,না জানে ইংরেজীর হদ্দমুদ্দ। বোনের বিয়েতে,যে সামাজিক অসম্মান সহ্য করতে হয়েছে,এরপর আরও তা বাড়তে দিতে সে রাজি নয়;তার বৌদি,নিজের দিদির অশিক্ষিত মেয়েকে
বিয়ে করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায়,মধুর প্রতিশোধে,যে আড়ালে মুচকি হেসেছে,তা আর বলতে!বিয়েবাড়ির পর্ব সব মিটে গেছে;হৈমবতীর সুর হয়েছে,"তুমি এলে বৌমা,আর শ্বশুর রিটায়ার হল",যেন রিটায়ার হবার কথা ছিলনা। হৈমবতীর শ্লেষপূর্ণ কথার অর্থ,নতুন বৌ'র বোধগম্য নয়,তার কোনও রিএকশনই নেই।
0 Comments.