- 49
- 0
শহরতলির ইতিকথা
রমা এখন মিউনিসিপ্যালিটির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা;খুবই ব্যস্ত,সকাল নটা তিরিশ মিনিটের মধ্যেই রিক্সা চেপে স্কুল যায়;গাম্ভীর্যও দেখা দিয়েছে চোখে-মুখে।
রাজীবের সেজ বোনও ক্লাস নাইনে উঠেছে;স্কুলের পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন ঘটেছে;স্কুল ফাইন্যালের
পরিবর্তে এগারো ক্লাস চালু হয়েছে,আর এখান থেকেই,ভাগ হয়ে যাচ্ছে আর্টস ও সায়েন্স। রাজীবদের অঞ্চলের গার্লসস্কুলে বিজ্ঞান-বিভাগ নেই,তাই,ওর বোন , আর্টসই নিয়েছে; ওর বন্ধুরা ,স্কুল ছেড়ে,দূরের স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হল।
দিনগুলো কেমন তাড়াতাড়ি অলক্ষ্যে চলে যায়। দেশে রাজনৈতিক স্থিরতা এসেছে;নক্সালদের মোটামুটি
একেবারে নুলো করে, পঃবাংলায় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষিত হয়েছে;বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বামজোট,এবার গর্ত থেকে বেড়িয়ে,নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।তা, নিলে হবে কী! নক্সালদের মধ্যে খেঁকশিয়ালরা
তো এখন ভোল পাল্টিয়ে কংগ্রেসের
পতাকা নিয়ে বামদলগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে;নির্বাচনের দিন,বেলা দুপুর পর্যন্ত ঠিক চললেও,বেলা দুটোর পর,বীতশ্রদ্ধ হয়ে বামদলগুলো নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ানোর কথা সিদ্ধান্ত নেয়; ফলতঃ,কংগ্রেসের শাসন চালু হল,পঃ বাংলার আইনসভা হল বিরোধী শূন্য,যা কখনোই গণতন্ত্রে কাম্য নয়।
হাজরা-দম্পতি তো আবার স্ব-মূর্তিতে ফিরে এসেছে। সেজ মেয়ের সঙ্গে,হৈমবতীর বাক্যালাপ বন্ধ। রাজীব সব বুঝলেও সংসারের অশান্তির মধ্যে আর মাথা গলায় না। হাজরামশাই'র
অবসরকালের সময় ঘনিয়ে এসেছে। কোম্পানি,শ্রমিকদের স্বেচ্চাবসারের সুযোগে,নিজেদের পরিবারের একজনকে চাকরিতে বহালের সুযোগ দিয়েছে। হাজরামশাই'র সহকর্মীদের মধ্যে, অনেকেই এ সুযোগ নিয়ে,নিজেদের ছেলেদের একটা হিল্লে করে দিলেও,হাজরামশাই, ঐ স্কুলে পাঠ করেনি। রাজীব,এ সুযোগ নিয়ে রজতকে ঐ কারখানার চাকরিতে বহাল করার কথা বললে,হাজরামশাই দম্পতি তীব্র প্রতিবাদে বলে ওঠে,"উঠতি মুলো পত্তনেই বোঝা যায়",না,এ প্রস্তাব গ্রাহ্য হলো না;রজতের না হলো,লেখাপড়া,না হলো চাকরি,কেবল,মায়ের আঁতুড় তুলতেই তার শৈশব-কৈশোর গেল কেটে,পরিবর্তে, করে খাবার সুযোগ টুকুও হাজরামশাইদম্পত্তি দিতে গররাজী।
রজত খুবই পরিশ্রমী,তাই অঞ্চলের থারমাল পাওয়ার স্টেশনের কন্ট্রাকটারের অধীনে কাজ পেয়ে গেল; কিন্ত কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে,বাইরের জগতের সঙ্গে হলো পরিচয়,হলো নেশাগ্রস্ত।উড়িষ্যার তালচিরিতে,ঐ কনট্রাকটার কোম্পানির অধীনে কাজ করে ফিরে আসার পর সে হলো টিবিতে আক্রান্ত।না,ঐ রোগীকে তো বাড়িতে স্থান দেওয়া যাবে না,রাজীবও স্থির সিদ্ধান্তে এসেছে;অতএব ঠাঁই হলো তার
নিকটবর্তী অঞ্চলের টিবি হাসপাতালে।
বাড়িতে এখন সেজ বোন ছাড়াও ছোট সহোদর ও এক সহোদরা।
রাজীব,টাকা দেয় সংসারে,তো তার খাতির আলাদা; হাজরা-দম্পতির মতে "দুধেল গরুর চাঁট তো খাওয়া যেতেই পারে"। না,এ বাড়ি বিক্রি করে,অন্য কোথাও যাওয়ার আর প্রশ্নই ওঠে না; রাজীবের কেনা জমির কথা,আর ওঠেই না। হাজরা-দম্পতিও মনে মনে কষে যায় ছক;পিতা স্বর্গ,স্বর্গাদপি মাতা কি না! সেজটাকেও রাজীবের ঘাড় দিয়ে পার করতে পারলে, থাকবে তো মাত্র আর একটা, তখন আর রাজীবের প্রয়োজন অতটা হবে না বলেই বোধ হয়, ছোটটাও তখন প্রায় দাঁড়িয়ে যাবে,অবসরকালীন টাকার একটি পয়সাও খরচা না করে যতদিন পারা যায়,রাজীবকে দুয়ে যাও। আর ছোট মেয়েকে নিয়ে, ভাববার সময় এখনও আসেনি।
চলবে
0 Comments.