Mon 14 September 2026
Cluster Coding Blog

|| কালির আঁচড় পাতা ভরে কালী মেয়ে এলো ঘরে || T3 26য় সুশোভন কাঞ্জিলাল

maro news
|| কালির আঁচড় পাতা ভরে কালী মেয়ে এলো ঘরে || T3 26য় সুশোভন কাঞ্জিলাল

দীপার দীপাবলি

"আপনারা শুনছেন এখন বিশেষ বিশেষ খবর। আজ উলমাটি সদর বাজারে পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে নিহত কুখ্যাত অপরাধী সেপাই ওরফে আবুবাখার সেপাই এবং তার দুই অনুচর গঙ্গু ওরফে গঙ্গারাম গাঙ্গুলি আর টুন্দা যাদব।"
ঢোক দিতে গিয়ে গ্লাসের মধ্যে পানীয় না পেয়ে রাগের চোটে হাতের গ্লাসটা দীপান্বিতা ছুঁড়ে মারলো টিভির স্ক্রিনে। ঝনঝনিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো ওয়ারেন্টি পিরিয়ডে থাকা দেয়ালে ঝোলানো টিভিটা। শালা সেই দুপুর থেকে একই খবর। প্রথমদিকে বেশ ভালো লাগলেও ক্রমশ গা পিত্তি জ্বালিয়ে দিচ্ছে এই খবর। তারওপর মদের বোতলটাও শেষ। ড্রাইভার কানাইকে দিয়ে আরেক বোতল আনানো দরকার। উঠতে গেলো দীপান্বিতা। কিন্তু তাল সামলাতে না পেরে আবার সোফাতেই আছড়ে পড়ল দীপা। আচ্ছা ফোনে হাবিলদার গণপতিকে ডাকলেই তো হয়! দরজাতেই তো পাহারা দিচ্ছে। ফোনের লক খুলতেই দীপা দেখে যে সব কিছু ঝাঁপসা। প্রচন্ড আলোর মায়াবী নদীতে ঝাঁপসা কালো লেখাগুলো যেন উড়ছে। নাকি ভাসছে! কোনো এক সাপুড়ে যেন বিন বাজাচ্ছে আর সেই নিস্তব্ধ সুরের দোলায় নেচে নেচে ফণা তুলছে অক্ষরগুলো। হাজার হাজার শব্দ? নাকি কাল নাগিনী! নাকি সমাজের অগ্নিকুন্ডে ক্রমশ ঝলসে যাওয়া দীপান্বিতার মতন কালো মেয়েরা!
তার দুহাতে রক্ত। মেরে ফেলেছে কাউকে! ভয়ে কষ্টে পালিয়ে যায় মায়ের কাছে। আঁচলের মধ্যে লুকিয়ে পরে।মা আদর করে আঁচল থেকে বার করে মুখে পাউডার মাখাতে থাকে। বলে যায় পরম আদরে "দীপা তুই কালো তো কি? তোর মুখটা কি সুন্দর।", "দীপা চা খায় না মা আরো কালো হয়ে যাবি ", "দই মাখিয়ে দেবো তোকে রোজ রাতে", "বুলি মাসি বলেছে দুধের স্বর, মধু আর লেবু মিশিয়ে গায়ে মাখলে ফর্সা হয়".. হঠাৎ প্রচন্ড আওয়াজ। বোমা ফাটল। দীপা দৌড়ে গিয়ে বাবার কোলে উঠতে গেল। কিন্তু পারল না। কোলে যে বোন মাহি মানে মহাস্বেতা। বাবা বলল "এত ভয় পেলে হয় দীপা। তুমি না ব্রেভ লেডি।" বাবার মুখে এটাই শোনা অনেক। কারন নয় বছরের দীপাতো নিজের কানে বাবার মুখে মাকে ব্যক্ত অনুরোধটা শুনে ছিল "চল আমরা আরেকটা বাচ্চা নিই। দেখো আমরা তো প্রথম থেকেই মেয়েই চেয়ে ছিলাম। কিন্তু এমন হবে কে জানত! বিশ্বাস করো আমাদের বংশে এতো কালো কেউ নেই। তবে তোমার দাদুর রঙ তো বেশ চাপাই ছিল!" মা বা বাবা কেউ সেদিন বোঝেনি যে দীপা ঘুমের ভান করছিল কিন্তু আসলে ঘুমোয়নি। বাবা মায়ের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। দশ বছরের ছোট বোন বাবা মার মর্যাদা রেখে ছিল। তাই তো তার নাম মহাস্বেতা আর ফেব্রুয়ারীতে জন্মেও তার নাম দীপান্বিতা।
প্রচন্ড আওয়াজে চমকে উঠল দীপা। স্বপ্ন দেখছিল আইপিএস দীপান্বিতা দাসগুপ্ত। কালীপুজোর রাতে আতস বাজির আওয়াজে আচমকা ঘুম ভেঙে গেছে। সবে আট মাস হয়েছে এই পোস্টে এসপি হয়ে যোগ দিয়েছে। নেশা এখনো কাটেনি। ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে পরে ছিল। মাথা দুহাত দিয়ে টিপে ধরে উঠে বসে দীপা। আরেকটু মদ দরকার। হঠাৎ মনে পড়ল সিপির নেকু বৌ একটা ওয়াইন গিফট করে ছিল যেদিন দীপার বস ওর জন্য ওয়েলকাম পার্টি দিয়ে ছিলেন। উঠে গিয়ে আলমারি থেকে ওটা বার করে একটা লম্বা চুমুক মারলো। উফঃ শান্তি।
অবাক লাগছে দীপার। একটা সাড়ে সাতশোর বোতল আজ দুপুর থেকে একা খেয়ে ও শেষ করে ফেলেছে। জীবনে প্রথম বার। প্রথম বার তো সে মানুষও মারলো। সেপাই মাস্তান আর ওর তিন সাগরেদকে তো দীপা আর সাব ইন্সপেক্টর সোহেব মিলে পরাস্তই করে ফেলে ছিল। অস্ত্র ফেলে দু হাত তুলে আত্মসমর্পণ করে ছিল ওই চারজন। মেরে ফেলার কি আদৌ দরকার ছিল! গঙ্গুর সেই উক্তি - "এ কি গো গুরু! এতো সাক্ষাৎ মা কালী!! কালী মাগি এসেছে শিব মারতে! এবার জিব বার করে তোমার বুকে দাঁড়াবে!" খিক খিক করে হেসে সেপাই বলে ছিল - "ন্যাংটো হয়ে নাকি রে গঙ্গু! ইউনিফর্ম খুলে!" ফুট কেটে হাসতে হাসতে যাদব বলে ছিল যাদব "জয় কালী কোলকাত্তাওয়ালি!" কি যে হয়ে গেল তার তখন হঠাৎ করে জানে না দীপা। প্রচন্ড আক্রশে তিনজনের বুকে গুলি করে সে। চোখের সামনে তিন মিনিটের মধ্যে মরে  তিন আবর্জনা সমাজের। চতুর্থ দুষ্কৃতী মানে যুগল মূর্ছা যায় পরিস্থিতি দেখে। দৃঢ় দীপা আদেশ দেয় সোহেবকে মেডিকেল সুপারভিশনে যুগলকে কাস্টডিতে নিতে। সোহেব লোক জন ডাকতে যেতে সবার অলক্ষ্যে সেপাইয়ের বুকে কষিয়ে এক লাঠি মারে দীপা। কিছুটা অবচেতন মনেই জিব বার করে ভেঙচায়। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখে একটা বন্দুক পরে আছে সেপাইয়ের বডির পাশে খুব সন্তর্পনে সেটি লুকিয়ে তুলে নেয়।
ওয়াইনটা অর্ধেকের বেশী বেঁচে আছে। গুমোট লাগে দীপার। ইউনিফর্ম খুলে ফেলে। এসিটা চালিয়ে বেডরুমে গা এলিয়ে দাওয়ার আগে মিউসিক সিস্টেমটা চালিয়ে দেয়। গান চলতে থাকে। আজ তো কালী পুজো। দীপার পুজো। কার্তিকী অমাবস্যা। আপন মনেই মুচকি হাসে সে।
আবার আবেশ আসছে তার। হঠাৎ একটা গান চলছে খেয়াল করল সে "গভীরে যাও, গভীরে যাও"। হঠাৎ টান টান হয়ে সোজা হয়ে বসলো সে। আজ না কালী পুজো! আজ তার কাছে একটা বেওয়ারিশ বন্দুক আছে না! আজ পুরো একটা জেলা আছে যার আইন তার অধীনে। আজ না আছে তার পায়ের তলায় একটা উন্মত্ত সমাজ যা কালী মাকে পুজো করে কিন্তু কালো মেয়েকে হেও করে! দৌড়ে গিয়ে সেপাইয়ের বন্দুক টা খুঁজে বার করে দীপা ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে। নগ্ন দীপা এক হাতে বন্দুক আর এক হাতে ওয়াইনের বোতল নিয়ে ছুটে গেল বাইরে বেরনোর দরজার দিকে। হঠাৎ কিছুতে ধাক্কা খেয়ে উল্টে পড়ল দীপা। কান ফাটা একটা আওয়াজ হলো। বন্দুক এর থেকে গুলি বেরোনোর আওয়াজ না কি হাতের বোতল ভাঙার আওয়াজ না কি কালীপুজোর আতস বাজির!
পরের দিন প্রায় দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠে দেখে দীপা নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। উঠে তার স্বভাব অনুযায়ী প্রথমে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। তার কালো অপয়া মুখ কাউকে সে প্রথমে দেখায় না আর নিজেও অন্যেরটা দেখে না। নিজের নগ্ন দেহ দেখে ভাবলো এই সুঠাম দেহ তো সত্যি সুন্দর। তারপর নিজের মুখের দিকে তাকালো। এই মুখশ্রী যদি কুশ্চিত হয় তো সমাজের চোখে ছানি আছে। ভাবাবেগে বয়ে যাচ্ছিল দীপা, হঠাৎ একটা অদ্ভুত আওয়াজে সম্বিত ফিরল। কিসের আওয়াজ? মেও মেও! বেড়াল! আওয়াজ অনুধাবন করে খাটের নিচে খুঁজে পেলো একটা ছোট্ট কালো বেড়াল বাচ্চা। কি মিষ্টি! কোথা থেকে এলো? প্রবল স্নেহে কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটাকে। ছোট্ট বেড়াল বাচ্চাটা উষ্ণতায় দীপার উন্মুক্ত স্তন চাটতে লাগল। দীপার মাথায় একটা কথা এলো হঠাৎ। কালো বেড়াল! এই বাচ্চাটাকে চিরজীবন মানুষের কুসমস্কারের শিকার হতে হবে। পরম স্নেহে বুকের মাঝে চেপে আদর করতে থাকে দীপা বেড়ালের কালো বাচ্চাটাকে। চুমু খেতে থাকে নিরন্তর। হঠাৎ তার মুখে ভেজা কিছু লাগে। কিছু বোঝার আগেই কলিং বেল বেজে ওঠে। বেড়ালটাকে খাটে বসিয়ে তড়িঘড়ি ম্যাক্সি টা গলিয়ে নিয়ে ছুটে গিয়ে দরজা খোলে দীপা। ওঃ দুধওয়ালা বুলান। ও পেপারও দিয়ে যায় রোজ। বুলান বলল "ম্যাডাম সকালে এসে ছিলাম। বেল দিলাম। খুললেন না দেখে গণপতিদাকে জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন আপনি ছুটি তে আছেন দুদিন তাই ডিসটার্ব করতে না। বেলায় এসে আবার দিয়ে যেতে। কিন্তু দিদি সরি ম্যাডাম ও লোক কিন্তু ভালো না। রাতে আপনি বাড়ি ঢুকে গেলে ও আদৌ পাহারায় থাকে না। রাতে কেটে পরে আবার সকালে আসে। একি! আপনার মুখে রক্ত! ম্যাডাম আপনার চোট লেগেছে নাকি?" হঠাৎ কাল রাতের কথা মনে পড়ল দীপার। মাটিতে পরে ওয়াইনের বোতল যখন ভেঙেছে আর নিজেও যখন ভূপতিত হয়েছে তখন চোট লাগা খুব স্বাভাবিক। বুলানকে কোনো রকম কাটিয়ে দরজা বন্ধ করে দুধটা টেবিলে রেখে খবর কাগজে চোখ বোলালো দীপা। কালকের এনকাউন্টারের খবর নিশ্চয়ই আছে। এসিপি নিজে দুষ্কৃতী মেরেছে তাও আবার মেয়ে হয়ে! আছেও!! তার নামের জয় জয়াকার প্রথম পাতার পুরোটাই। প্রথম হেডলাইন "এসিপি দীপান্বিতার দীপাবলি।" দুধ গরম করতে বসিয়ে ওই খবরটাই পড়তে পড়তে শেষাংশ আট পাতায় পড়তে গিয়ে পাশের একটা খবর পরে চমকে উঠল দীপা। "চারটি সাদা বেড়ালের বাচ্চা গুলিবিদ্ধ এবং একটি কালো বাচ্চা নিখোঁজ।" বেডরুম থেকে ভেসে আসে আবার সেই করুণ ডাক "মেও মেও!"

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register