- 1
- 0
বসন্তের স্রোতে
সকালে উঠেই অন্যদিনের মতো গাছগুলোর পরিচর্যা করতে চলে এলাম ছাদে। এখন বসন্ত কাল। শীতের কিছু কিছু ফুল এখনও ফুটে আছে। জিনিয়ার দল ভোরের হাওয়ায় মাথা নাড়াচ্ছে। চন্দ্রমল্লিকা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন নিজেই গাছের যত্ন করত। গাছ ছিল মল্লিকার (চন্দ্রমল্লিকার ডাকনাম) প্রাণ। যেখানে গাছের সন্ধান পেত সেখান থেকেই সংগ্রহ করত। আমি আর আমাদের দুই মেয়ে তিতি, মিতি কত বকাবকিই না করতাম! গাছে জল দিয়ে নামতে নামতে প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেল। তিতি নর্থ বেঙ্গলে মেডিক্যাল নিয়ে পড়ছে, এখন এখানে থাকে না। মিতি ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষা পরের বছর দেবে। মিতির ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম মেয়েটা ঘুমোচ্ছে, ভাবলাম ঘুমোক। আজ উঠেই মনঃকষ্টে ভুগবে, এ যন্ত্রণায় আমরা সর্বক্ষণ ভুগি। তবুও প্রতি বছর এইদিনে সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা বারবার মনে পড়ে। গিয়ে দাঁড়ালাম চন্দ্রমল্লিকার ছবির সামনে। আজ মল্লিকার পৃথিবী ছেড়ে, আমাদের ফেলে রেখে চলে যাওয়ার দিন। এই ছবিটায় মল্লিকা মনের টানে হাসছে, গলায় পলাশের মালা, মুখে নানা রঙের আবীর আর মাথায় হলুদ চন্দ্রমল্লিকা ফুল। শান্তিনিকেতনে একবার দোলের দিন বৌদি ছবিটা তুলেছিল। আমরা মল্লিকার ছবিতে মালা ধূপ দিই না। আমাদের সহ্য হয় না। আমরা বিশ্বাস করি না যে ও নেই। সবকিছুতেই ওর কথা ওঠে, চলে যাওয়ার পর থেকে এইদিন আমি চেম্বার, নার্সিংহোম কোথাও যাই না। ওইদিনে কোনো অপারেশন সাধারণত করি না, একান্ত কোনো কেস এসে গেলেও অন্যদের দিয়ে দিই। শুধু বিকেলে দাদা বৌদি আর মল্লিকার বোন ঊর্মি আসে। একেবারে নিজেদের মধ্যে অতীত চারণা করি। তবে আজকে আসার সময় এখনও স্থির হয়নি। জানি না কেউ আসবে কিনা ! আমি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জেন ডাক্তার সুমিত চৌধুরী। আমার জীবনসঙ্গী চন্দ্রমল্লিকাও একই ফিল্ডের ডাক্তার ছিল। মল্লিকার আচম্বিতে চলে যাওয়া যতদিন বেঁচে আছি ততদিন মন থেকে মানতে পারবো না। জীবন চালানোর জন্য অনেক কিছু বাধ্য হয়ে মানতে হয়। সেদিন আমরা অন্যদিনের মতোই একসঙ্গে লাঞ্চ সেরে যে যার চেম্বারে যাবো বলে বেরোলাম। মল্লিকা নেমে গেল হিন্দুস্তান পার্কের ক্লিনিকে। ওই শেষ দেখা, গাড়ির দরজা বন্ধ করে এক পলক একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। আমি চলে গেলাম কসবার একটা নার্সিংহোমে। হঠাৎই খবর এলো ওর ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাক হয়েছে। আমি গিয়ে দেখি চেম্বারেই সব শেষ। “ বাবা , কখন উঠলে?” “অনেকক্ষণ।” চলো, চা খাবে চলো। আরতি মাসি ডাকছে।” মল্লিকার কথা ভাবতে ভাবতে কখন অজান্তেই চোখ ভিজে গেছে, বুঝিনি। চশমার কাচ মুছতে মুছতে মিতিকে বললাম,” চল।” আমরা অনেক সময় তিনজনে পরস্পরকে লুকিয়ে কাঁদি। সবাই জানি,টের পাই, প্রকাশ করি না। খাবার টেবিলে রাখা ছোট ছোট গাছের পটে জল দিতে দিতে মিতি বললো,” বাবা, আজ রোগী দেখো না ঠিক আছে, তবে একবার তো দিশায়( আমাদের নার্সিংহোমে) এমনিই যেতে পারতে, গেলে তবু তো সবার সঙ্গে কথা হয়।” হঠাৎই কলিং বেল বেজে উঠলো। মিতি ছুটতে ছুটতে দরজা খুলেই বললো,” আরে প্রবুদ্ধ কাকু যে!” প্রবুদ্ধ, আমি ও মল্লিকা -আমরা সবাই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পড়তাম। অনেক অনেক বছরের বন্ধুত্ব আমাদের। মেডিক্যাল কলেজ আর কফি হাউসের অলিন্দ থেকেই আমাদের প্রেমের যাত্রাপথ শুরু হয়। তারপর জীবনের গতিতে সব হয়। প্রবুদ্ধ এইদিনে প্রতি বছর আসে। মল্লিকা চলে যাওয়ার পর যেভাবে ও আর সুমিতা আমাদের আগলে রেখেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। “ বাবা কাকু এসেছে। বাই দ্যা ওয়ে কাকু জলখাবার খেয়ে যাও।” “ সুমিত, কাল অনেক দিন পর সুবিনয় ফোন করেছিল। অক্টোবরে কলকাতায় আসবে। “ চায়ের কাপ হাতে তুলে বললাম,” তাই, সুখবর। কতদিন পর আসছে বলে তো!” “ শোন না, তিতির ছুটি দেখে একটা ট্যুরের প্রোগ্রাম করি বল! কতদিন হয়ে গেল কোথাও সবাই মিলে যাইনি!” খাবার টেবিলের পরিবেশটা মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল। চন্দ্রমল্লিকা চলে যাওয়ার পর কোথাও যাওয়াই হয় না, ও সবকিছুর প্ল্যান করত, কত হইচই করতাম সবাই! দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মিতি নিস্তব্ধতা ভাঙলো। “ কাকু তুমি ঠিক করো। যে সবকিছু ঠিকঠাক করত সেই তো আর…” “ আমি বুঝি রে! সব হই হুল্লোড় আড্ডা সবেতেই চন্দ্রমল্লিকাকে মিস করি। সব চলছে, সেই রিদিমটা নেই। এত স্পিরিটেড ছিল!” কথা ঘোরানোর জন্য বললাম,” মিতি স্কুলে যাবি তো?” “ ওহ্, গল্প করতে করতে দেরি হয়ে গেল। “ কোনোরকমে স্যান্ডউইচে কামড় দিতে দিতে মিতি ঘরে গেল রেডি হতে। “ আজ সারাদিন বাড়িতেই থাকবি সুমিত?” “ হুম, কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে নেই রে। “ কথার মাঝে মিতি স্কুল ড্রেস পরে রেডি।” বাবা আসছি,কাকু আসছি। দাঁড়ানোর এক মুহূর্ত সময় নেই গো। বাবা সাবধানে থাকবে, ফোন করবো।বাই বাই সবাইকে।” মিতি চলে গেল, গমগম করা ঘরটা আবার মহাশূন্যতার আড়ালে তলিয়ে গেল। নিজের খাবার খেয়ে প্রবুদ্ধ বললো, “ শোন, চল না আমার সঙ্গে। তুই তো আগে খুব চিত্র প্রদর্শনী দেখতে যেতিস। রং তুলি নিয়ে তো মাঝে মাঝে বসতিস। চল,চল। খুব দূরে নয়, পাশেই প্রায়,সল্টলেকের বি ব্লকে হচ্ছে। কাল ওই এক্সসিবিশনের কর্ণধার সুদীপ্তদা বললেন।” “ আমার কিছু ভালো লাগছে না রে, ইনফ্যাক্ট এখন ওই চিকিৎসাটুকু করা ছাড়া আর কিছুই…”। “ বুঝি, সুমিত। তোকে এখনও এতটা রেস্টলেস দেখলে মেয়ে দুটো মুখে না বললেও এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারবে,বল? আমি জানি এই আঘাত, শোকের পূরণ হবে না, তবে জীবন চালাতে হবে তো ব্রাদার! প্লিজ গো উইথ মি।” প্রবুদ্ধকে দেখে একটু চিন্তিত লাগলো, মল্লিকার মৃত্যুর পর আমি যে সব এন্টারটেইনমেন্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি এই নিয়ে প্রবুদ্ধ খুব ভাবে। “ একটু দাঁড়া, এলাম বলে।” মোবাইল ফোন আর পার্স নিয়ে আসতেই প্রবুদ্ধ বললো,” চল।” আরতিদিকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলেই প্রবুদ্ধর গাড়িতে উঠলাম। অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে। “ চল, খানিকটা সময় কাটাই। তারপর চলে আসবো।” মিনিট পনেরোর মধ্যেই গাড়ি ওখানে পৌঁছে গেল। বাড়ির বেশ কাছেই এই আর্ট গ্যালারির অবস্থান। পরিবেশ বেশ অভিনব। কমলা, সাদা রঙের বেগনভেলিয়া ফুলের ঝাড় নুইয়ে পড়েছে তোরণ থেকে। বাড়িটার ভেতরে ঢুকেই দেখলাম যামিনী রায়ের চির পরিচিত উমা আর গণেশের ছবি। প্রদর্শনী এখনও বোধহয় শুরু হয়নি। ছবি টাঙানো সদ্য আরম্ভ হয়েছে। “ সুমিত, একটু এখানে থাক, একটু উপর থেকে সুদীপ্তদার সঙ্গে দেখা করে আসি।” প্রবুদ্ধ যেতেই একটু মেসেজ চেক করতে করতেই শুনলাম,” ডাক্তারবাবু! আপনি এখানে? কেমন আছেন?” এক লহমা চেনা অচেনার দ্বন্দ্বে থাকার পর উত্তর দিলাম,” অদ্বীতিয়া না?” “ চিনতে পেরেছেন তাহলে।” এই ডাক্তারি করতে গিয়ে কম পেশেন্ট তো আসেনি, সময়ের নিয়মে অনেকেই ভুলে গেছি। কিছু কিছু মানুষের কথা, মুখের ছায়া মনে রয়ে গেলেও নাম অনেক সময় ভুলেই যাই। অদ্বিতীয়া নামটা জীবনে কখনও ভুলতে পারিনি, পারবো না। কয়েক বছর আগের কথা। অদ্বীতিয়া সন্তানসম্ভবা অবস্থায় আমার পেশেন্ট ছিল। আগে বেশ কয়েকবার বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে। যাইহোক ওর স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে একটাই কারণে। প্রসবের নির্দিষ্ট দিনের কিছুদিন আগেই চূড়ান্ত অসুস্থ অবস্থায় হসপিটালে ভর্তি করা হয় অদ্বীতিয়াকে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে আমি আর মল্লিকা অনেক চেষ্টার পরেও সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি। তারপর অদ্বীতিয়ার প্রবল মর্মভেদী কান্নার শব্দ আমাকে নড়িয়ে দিয়েছিল। “ কেন আমার এমন হয়েছে” - বলে হা হুতাশ আর ক্ষণে ক্ষণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা মনে রয়ে গেছে। আমি একজন ডাক্তার, চোখের সামনে জীবন মৃত্যু- এই দ্বৈতের দড়ি টানাটানি দেখেছি, কত মানুষের স্বজন হারানোর বেদনার সাক্ষী থেকেছি! কত মানুষ হাসিমুখে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন! অদ্বীতিয়ার সেদিনের প্রবল আর্তনাদ কেন জানি না দীর্ঘদিন আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল। কতদিন রাতে ঘুম ভেঙে গেছে! খালি মনে হত ইশ বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারলাম না। তারপর সময়ের পলি জমেছে, ট্রমা মুক্ত হয়েছি। “ কিছু ভাবছেন ডাক্তারবাবু?” “নাহ!” “ তুমি এখানে অদ্বীতিয়া?” “ ডাক্তারবাবু, চলুন ওই শেডের নীচে গিয়ে বসি। চা খেতে খেতে কথা বলি। এক্সসিবিশন শুরু হতে একটু দেরি আছে। “ কিছু বলার আগেই মেয়েটা চায়ের অর্ডার দিল। “ বসুন। এখানে এভাবে আপনার সঙ্গে দেখা হবে, ভাবিনি। আপনার মনে না থাকার কথা আমি আঁকতাম, আঁকা শেখাতাম।” সত্যিই ভুলে গেছি, অদ্বীতিয়া কখনও ওর মা বাবা কখনও জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আসত। কথা হত, মল্লিকাও মাঝে মাঝেই ওর মায়ের সঙ্গে বেশ কথা বলত। একটু থেমে বললাম, “ তুমি খুব সুন্দর আঁকতে। তোমার কয়েকটা ছবি বোধহয় দেখিয়েছিলে আমাকে! মনে পড়ছে।” “ হুম ডাক্তারবাবু। আপনি আমাকে বলতেন, আঁকা কখনও বন্ধ না করতে। তুলি পেন্সিল রঙকে জড়িয়ে থাকতে। ম্যাডাম কেমন আছেন ?” “ আমার আর দুই মেয়ের জীবন নদীর উপর দিয়ে শোকের স্রোত বয়ে গেছে অদ্বীতিয়া, হঠাৎ ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাকে তোমার ম্যাডাম…” শেষ করতে পারলাম না। “ ওহ্! ইশ! এমন দুঃসংবাদ শুনতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি। কত প্রাণচঞ্চল মানুষ ছিলেন ম্যাডাম! এ শোকের কোনো সান্ত্বনা নেই ডাক্তারবাবু। সময় আপনাদের সামলে ওঠার শক্তি দিক। আমি স্তম্ভিত!”
“ কিছু ঘটনার উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই অদ্বীতিয়া। বাই দ্য ওয়ে তোমার জীবনসঙ্গী কেমন আছে?” কথাটা উচ্চারণ করতেই দেখলাম অদ্বীতিয়ার হাসি হাসি মুখটায় অস্বস্তির রেখা ফুটে উঠলো। ভাবলাম কিছু ভুল করলাম নাকি! “ আমি আর প্রতীক একসঙ্গে থাকি না। আপনি জানেন না ,জানার কথাও নয়।ওই ঘটনার পর অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখন তো ভাবি হয়তো বদলানোর ছিল। “ “ প্রতীকের নাম মনে ছিল না। যাইহোক তোমার ওই ঘটনার কথা ভাবলেই আমি এখনও বিচলিত হই, নিজের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে, তোমার কোলে তোমার সুস্থ জীবিত সন্তান তুলে দিতে পারলাম না। আমার ডাক্তারি জীবনে কম ব্যর্থতা, ওঠাপড়া আসেনি। কিন্তু এই বিষয়টা এতটাই…” “ আপনি আর ম্যাডাম অনেক চেষ্টা করেছিলেন, সবকিছু হাতের মুঠোয় থাকে না ডাক্তারবাবু। “ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,“তবে প্রতীকের কথা তুমি না চাইলে বলো না । তোমার একান্ত ব্যক্তিগত ইস্যু।” “ যে বিষয় চাঁদের আলোর মতো সত্যি তাই না বলার কিছু নেই তো ডাক্তারবাবু। ওই ঘটনার পর থেকেই আমাদের মধ্যে মনোমালিন্য, মন কষাকষি বাড়তে থাকে। অহেতুক আমাকে দোষারোপ করা শুরু হয়। আমি নাকি ওই অবস্থায় রেগুলার দুটো আঁকার স্কুলে ট্রাভেল করে শেখাতে গেছি বলে এইসব হয়েছে। আপনি, ম্যাডাম আমার আগের ডাক্তারবাবু সবাই কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। একটা সময়ের পর আমি উপলব্ধি করি যে আমি নিজের প্রতি সুবিচার করছি না। বিনা কারণে অসম্মান হজম করছি। তাছাড়া আমি আপোষ করে নিজের তৈরি করা আইডেন্টিটি, স্বাধীন জীবন সবটাকেই ধ্বংস করছি। অকারণে কুকথা অপমান সহ্য করতে করতে আমার কনফিডেন্স লেভেল একেবারে তলানিতে এসে ঠেকলে কিছু বন্ধুদের সাহায্যে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিই।” “ তোমার বাবা মা?” চরম হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলতে বলতে অদ্বিতীয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসলো। “ কেউ দাঁড়ায়নি আমার পাশে। ডিভোর্সে প্রবল আপত্তি ছিল। তারপর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। বোন শুধু মাঝেমধ্যে খবর নেয়। কিছুদিন আগে মা চলে যাওয়ার পর গিয়েছিলাম, বাবা কোনো কথাই বললো না। যতটুকু খবর পেয়েছি প্রতীকও অন্যত্র সংসার পেতে দেশ ছেড়েছে। ” কথাগুলো বলতে বলতে অদ্বিতীয়ার ফুলের পাপড়ির মতো চোখ দুটোতে দেখলাম জল উছলে পড়ছে, গলা বুজে আসছে। আমারও কিছু বলতে ইচ্ছে করল না । কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বললো, “ চলুন ছবি ঝোলানো প্রায় শেষ, ওদিকে যাই।” কয়েকটা ছবি দেখার পর গিয়ে দাঁড়ালাম অদ্বীতিয়ার ছবির সামনে। রং আর রেখার মিলনে ছবি যেন কথা বলছে। নীল কালো পটভূমিতে দুজন নারীর মুখ, প্রেম বিষাদ ছবি দুটোকে ঘিরে আছে। একটা ছবিতে একজন নারীর নাকফুলে পড়েছে চাঁদের আলো। নিঃসঙ্গ চাঁদ একাকী জেগে আছে আকাশে। অপর ছবিটা প্রতীক্ষারত প্রেমিকার ছবি, অপেক্ষার যন্ত্রণা আর অস্ফুট ভালোবাসা মিশে আছে ছবিতে। নিজের মনের অনুভূতি আর ভাবনা মিশিয়ে অদ্ভুত দু খানা ছবি এঁকেছে অদ্বীতিয়া। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলাম। “ ডাক্তারবাবু, এবার আমাকে যেতে হবে, প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে।” কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। শুধু মাথা নাড়ালাম। মনে মনে বললাম যাও অদ্বীতিয়া যাও, তুমি শিল্পী, শিল্পেই তোমার বাস। ব্যক্তিগত শোকে ম্রিয়মান না হয়ে যন্ত্রণাকে যে শিল্পে পরিণত করা যায় তা তোমার থেকে শিখতে হয়। তুমি যন্ত্রণাকে নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে উদযাপন করছো।
অচিরেই চোখে জল এসে গেল। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপের ঠুংঠাং শব্দ হলো, মেসেজ এসেছে, মিতি লিখেছে,বাবা বিকেলে মাসি আর জেঠিমারা আসবে। মুখ তুলতেই দেখি প্রবুদ্ধ। “ সরি সরি খুব বোর হলি?” মনে মনে ভাবলাম” না রে , যা হয়েছে ঠিক হয়েছে, মেয়েটা কুড়ি পঁচিশ মিনিটে জীবনে ফিরিয়ে দিল। যন্ত্রণায় নীল হয়েও বাঁচার মানে যে মরে যায় না - তাই শিখিয়ে গেল, বাঁচতে হবে।“ এখন ওদিকে চল সুমিত ।” কিছু উত্তর না দিয়ে চললাম প্রবুদ্ধর পিছুপিছু।
0 Comments.