Wed 09 September 2026
Cluster Coding Blog

T3 - নববর্ষ সংখ্যায় সুদীপ্ত পারিয়াল

maro news
T3 - নববর্ষ সংখ্যায় সুদীপ্ত পারিয়াল

নারী শুধু নারী নয়


পৃথিবীতে বর্তমানে পুরুষ-অধিকার নিয়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন—পুরুষের আবার অধিকার কী? পুরুষশাসিত এই সমাজে পুরুষরা তো চিরকালই অত্যাচার করে চলেছেন, নারীদের আজও খেলার পুতুল করে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে চলেছেন। তাই তো সমাজে বেড়ে চলেছে এত ধর্ষণ, এত নৃশংসতা। কিন্তু এসব কিছুর পেছনে রয়েছে এক চরম অমানবিকতা। শিক্ষার পরশ পাওয়ার সাথে সাথে মানুষ নিজের অধিকারবোধ শিখেছে। সেই অধিকারের সাথে নিজেকে মিলিয়ে কখন যেন মানুষ দাপটের সঙ্গে স্বার্থপর উপাধি অর্জন করে নিয়েছে। বর্তমানে নারী মনে করে সে আধুনিক—পুরুষের সঙ্গে সমান তালে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা তার নৈতিক অধিকার। অধিকাংশ পুরুষও এর সাথে সহমত। কিন্তু যারা পুরুষ-অধিকার নিয়ে আজকাল কথা বলছেন, তাদের মত হতে পারে অন্যরকম। তারা বলতে পারেন— “আপনারা তো হাইলাইট করে নারী-নৃশংসতার খবরগুলোই দেখান, কিন্তু প্রতি ঘরে ঘরে কত পুরুষ যে নির্যাতিত হচ্ছে তার খোঁজ রাখেন?” একটি ছেলে জন্মানোর সাথে সাথে বাবা-মার মুখে হাসি ফুটে ওঠে, কারণ বাবার দায়িত্ব নেওয়ার একজন যোগ্য উত্তরসূরি এসে গেছে। তাহলে পুরুষের নিজের মতো বাঁচার অধিকার তেমন করে আছে কি? তাদের ভয় থাকতে নেই? তাদের খিদে পেতে নেই? লজ্জা অথবা কুণ্ঠাবোধ তাদের থাকতে নেই? এসব কথা শুনলে সবাই বলবে, “আপনি মশাই বড় প্রাচীনপন্থী! মেয়েরা যে আধুনিক হচ্ছে, বর্তমান সময়ে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটছে, সেটা আপনার সহ্য হচ্ছে না।”

কিন্তু ব্যক্তিকে চোখের থেকে চশমাটা একটু নামাতে হবে। খালি চোখে একবার জগতের চেহারাটা দেখতে হবে। সমান অধিকারের নামে নারীকে যে সব জায়গায় দুর্বল করে রাখা হচ্ছে, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত—সংরক্ষণ। 


নারীর জন্য আলাদা করে সংরক্ষিত কামরা অথবা আসন থাকবে—সেটিও তারা দখল করবে, আবার সর্বসাধারণের জন্য ব্যবহৃত জিনিসগুলো সমানভাবে ব্যবহার করবে, তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না? যদি সমানাধিকারী হন, তাহলে কেন এই বৈপরীত্য?


 দিনের পর দিন যেন বেড়েই চলেছে এই অত্যাচার। আসলে বিষয়টা এতটাই জটিল যে বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে মনে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে—নারী হয়েও কী করে প্রথম কেউ একজন কবিতা লিখেছেন? নারীকে দুর্বল না ভেবে কিংবা তাকে অন্যরকম না ভেবে, কেন শুধুমাত্র ভাবা যায় না—সেও তো একজন মানুষ, ঠিক অন্য মানুষের মতো? পুরুষ মানুষ যেমন যাবতীয় সাহিত্যকর্ম, সৃষ্টিশীল কাজ করতে পারেন, তিনিও পারবেন। পারলেও সেই ‘পারাটা’কে দুর্বল করে দেখানোর জন্য প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে তাদেরকে বসিয়ে দিয়ে এক অন্যরকম দুর্বলতার চাদর তাদের গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নারী তা বুঝতে পারে, উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে, নানারকম সামাজিক ও নৈতিক অপরাধের শিকার হতে হতে নারীর মনের মধ্যেও অধিকারের এক স্পৃহা জন্মেছে। এটা তার সহজাত প্রবৃত্তির মধ্যেই পড়ে। আর দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব না পেতে পেতে, গুরুত্ব অর্জনের এক রকম যুক্তিসম্মত খিদে তার মধ্যে জন্মে গেছে। তাই যখন সে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে শিখেছে। তাই তো ঠাকুরবাড়ির নারীদের শিক্ষা ও তাদের জীবনযাপন নিয়ে আজও আলোচনা চলে। কিন্তু এ গল্পে তাদের ভূমিকা বিন্দুমাত্র নেই, শুধু কথা প্রসঙ্গে উঠে এলো তাদের কথা। এই কথাটা আমার এক বান্ধবীর মুখে শোনা। ঘটনাটা তার সাথেই ঘটেছে। ঘটনাটা ঘটার পর ও এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে নিজে কিছু লিখতে পারছিল না। তাই ও বলল, যদি ওর হয়ে, আমি দু-চার কলম লিখে দিই। পাঠক মহল হয়তো আমার সেই বান্ধবীর নামের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। তিনি ‘নারী উত্তরণ’ পত্রিকার সম্পাদক দীপ্তি সেনগুপ্ত।


অনুষ্ঠানের দিন অবশ্য আমি উপস্থিত ছিলাম, জীবনানন্দ সভাঘরে হচ্ছিল অনুষ্ঠান, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির আসন অলংকার করে বসে শ্রীমতী ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। ভদ্রমহিলা একসময় বাংলা সাহিত্যের গবেষণা করেছেন বিদেশে গিয়ে, বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নেন আজও। বয়স ৫৫ -এর কাছাকাছি হবে। তবে দেখে সেরকম মনে হয় না। মনে হয় যেন সত্যি তিনি এখনও যুবতী। সব থেকে ভালো লাগে তাঁর মিষ্টি কন্ঠস্বর, ওনার কন্ঠস্বর যেন পিয়ানোর তানের মতন সুরেলা। দেখতেও ঠিক তেমনই শুভ্র তাঁকে। সাদা রংয়ের একটি শাড়ি পরেছেন, কালো পাড়। আমাকে দেখে বললেন, তোমার লেখা মাঝেমধ্যে দেখতে পাই, তবে ইদানিং আর লেখালেখি করো না, তাই না?

সত্যিই যে আমি এখন আর লিখি না, সেটা ওনাকে আর বললাম না। বললাম, কি করব বলুন? আমি যে পুরুষ হয়ে বিশাল বড় অপরাধ করে ফেলেছি।

উনি হেসে বললেন, পুরুষ না হলে সৃষ্টি হয় না, নারী না হলেও সৃষ্টি হয় না। তাই ব্যাপারটা পুরুষ নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখো না।

আমি না রাখলে কি হবে? পত্রিকার সম্পাদক শ্রীমতী দীপ্তি সেনগুপ্ত তা শুনলে তো? দীপ্তির একটা অপূর্ব স্বভাব আছে ও যেকোন অনুষ্ঠানে মার্জিত সাজ-পোশাক পরতে পারে। কোন অনুষ্ঠানে কোন পোশাক পরলে ওকে মানাবে, সেটা ওর নখদর্পণে, এই যেমন আজকে ও সাদার উপর শাড়ি পরেছে একটা। ওর বয়েজ কাট চুল, একটা রিমলেস চশমা। ওকে কিন্তু চমৎকার লাগছে আজকে। মেয়েটা এতটাই পাগল, নারীবাদ নারীবাদ করে বিয়েটা অব্দি করল না। বাবা ভাই আর মাকে নিয়ে একটা সুখের পরিবার ওর। ভাই বিয়ে করেছে, তবে আমার ধারণা ভুল হতেও পারে, কেন জানি না, আমার মনে হয় ও ঠিক মানিয়ে নিতে পারে না ওর ভাইয়ের বউয়ের সাথে। তাই ওর এই নারীবাদের ধারণা এখন যেন অনেকটাই জোরালো। আজকের স্বাগত বক্তব্যে ও বলল,

“ নারীদের অগ্রাধিকার আমাদের নিজেদেরই আদায় করতে হবে, মনে রাখতে হবে নারীরা নারীদের প্রধান শত্রু। এই শত্রুতা ধ্বংস করার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যদি আমরা নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ করি তাহলে পুরুষ সমাজ আমাদের দমন করতে বাধ্য হবে। এমনিতেই দীর্ঘকাল ধরে আমরা দমিত অবহেলিত হয়ে এসেছি, সেই কারণে তো আজও প্রতিদিন এত ধর্ষণের খবর চোখে পড়ে।

আমাদের পত্রিকার উদ্দেশ্য সেই সমস্ত নারীদের কথা তুলে ধরা, যাঁরা সংগ্রাম করে উঠে এসেছেন আজকে এই জায়গাটায়। তাদের চেতনায় লেখা হোক ভালোবাসার বীজমন্ত্র। এ ভালোবাসা হবে অন্য ভালবাসা। নিজেকে নিয়ে একান্তে ভালো থাকবার ভালোবাসা। আপনারা মন খুলে হাসুন, পুরুষের অত্যাচারে ভয় পেয়ে চুপ করে থাকবেন না। পথে-ঘাটে যদি এরকম দেখেন, যে কেউ আপনার দিকে বক্র দৃষ্টিতে দেখছে, সবার সামনে প্রতিবাদ করুন। মনে রাখবেন আমাদের আইন কিন্তু আমাদের সাথেই আছে।

পৃথিবীতে সবথেকে প্রাচীন সংস্কৃতি আমাদের। প্রাচীন যুগে নারীদের যে অবস্থান ছিল, সেটা তারা নিজেদের সংগ্রামের মাধ্যমে জয় করেছিলেন। মনে পড়ছে আধুনিক সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর কথা। কতটা লড়াই তাঁকে করতে হয়েছিল, একবার ভেবে দেখুন তো! আর সে কারণেই তো বেরিয়ে এসেছে সেই সমস্ত কালজয়ী উপন্যাস। আজকের সমাজে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন লুকিয়ে আছে এরকম অনেক অবহেলিত মেয়েরা, তাদেরকে নিয়ে আসুন আমাদের সংগঠনে। তারাও আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলুক। এই হোক আমাদের বার্তা। নারী...”

সম্পাদক তার বক্তব্য আরও দীর্ঘ করেছিলেন, কিন্তু তার সম্পূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরার কোন মানে হয় না।আমি লক্ষ্য করছিলাম সভায় উপস্থিত প্রত্যেকটি নারী এবং তাদের পরিবার যেন সম্মোহিত হয়ে গেছে। কিন্তু ব্যতিক্রমী ঈশিতা দেবী। কেমন যেন উদাস নয়নে তিনি দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছেন, সদ্য প্রকাশিত “নারী উত্তরণ” পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যাটিতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একটি উপন্যাস। দীপ্তি আমার বাল্যবন্ধু হওয়ায়, ওকে অনেক অনুরোধ করার পর, আমারও একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকাটিতে।

অন্যান্য পত্রিকা হলে আমি লেখার এত আগ্রহ দেখাতাম না। কিন্তু আমার নিজের বাল্যবন্ধুর পত্রিকা! তাছাড়া এই যে নারী বিষয়ক প্রতিটি সংখ্যা। আমার একবার ইচ্ছে হল, আমি নারী ছদ্মনামে কিছু লিখব। কিন্তু লেখাটি পাঠানোর পরই বাতিল হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম না, দীপ্তি কি পুরুষের লেখাতেও পুরুষতন্ত্রের গন্ধ পায়?

এই সংখ্যায় তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। একটি লিখেছেন সম্পাদক স্বয়ং, “ চিৎকার কর মেয়ে”। আগে উল্লেখিত হয়েছে আজকের প্রধান অতিথি ঈশিতা মুখোপাধ্যায় লিখেছেন একটি উপন্যাস, ওনার উপন্যাসের নাম, “ ছবিটা আজও একই আছে ”, আর তৃতীয়টি যিনি লিখেছেন, তাঁর নামটা আমি এর আগে কখনও শুনিনি। লেখিকার নাম পারমিতা ঘটক, উপন্যাসের নাম, “নারী শুধু নারী নয়”।

দীপ্তিকে জিজ্ঞাসা করায় ও বলল, এককালে মহিলা খুব লেখালেখি করতেন। এখন তেমনটা করেন না। খুবই অসুস্থ, দক্ষিণ কলকাতায় ওনার ভাইজির কাছে উনি থাকেন। উপন্যাসটি সংগ্রহ করতে গিয়ে বিস্তর যুদ্ধ করতে হয়েছে ওকে। এক এক করে নারীদের কবিতা পাঠ হচ্ছে, আজকে আমি কবিতা পাঠ থেকে বঞ্চিত।

কিছুক্ষণ কবিতা পাঠের পর প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরু হল, খুবই পরিশীলিত ভঙ্গিতে বক্তব্য রাখলেন শ্রীমতী ঈশিতা মুখোপাধ্যায়, প্রথমে মৃদু হেসে উনি বললেন “... জানি না, আমার কথা শুনে দীপ্তি আমাকে মারবে কিনা! ... কিন্তু কোথায় যেন একটা গোলমাল লাগছে আমার! সবই তো ঠিক আছে, নারীবাদ হবে, নারীদের অধিকার রক্ষা হবে, লড়াই হবে, সংগ্রাম হবে, চিৎকার করা হবে, কবিতা লেখা, উপন্যাস লেখা- সবই হবে। কিন্তু একটা কথা যে বাকি থেকে যাচ্ছে, মানুষের কথা ভাবতে হবে তো! যে মানুষগুলো খেতে পায় না। যে বাবার মেয়েটা পঞ্চমীর দিন বিকেল অব্দি অপেক্ষা করে থাকে, কখন তার বাবা দুটো টাকা নিয়ে এসে, তার জন্য একটা নতুন জামা কিনে দেবে! তাদের কথা ভাবতে হবে না?...”

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এগুলো তো সব আমার কথা, এতদিন ধরে বলব বলব করে বলা হয়নি দীপ্তিকে। হয়তো ভয় পেয়ে বলতে পারিনি। যা মারকুটে বিদঘুটে স্বভাবের মেয়ে ও। কি জানি এই ধরনের শব্দ চয়ন পড়লে ও আবার রেগে যাবে কিনা? এতক্ষণ যারা মুগ্ধ হয়ে দীপ্তির বক্তব্য শুনেছিল তারা এই মহিলার অন্য ধরনের কথা শুনে, ঠিক যেন খুশি হল না। তাই ঈশিতা দেবী তার বক্তব্য খুব বেশি দীর্ঘায়িত করলেন না।

তারপর নারীদের শ্রুতি নাটক ছিল, আমাকেও একটা ছোট্ট অংশ অভিনয় করতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও আমাকে কোণঠাসা করার সুনিবিড় কৌশল হয়েছে নাটকে।

যখন নাটক অভিনয় শুরু হবে, তখন ঈশিতা দেবী নিজে থেকেই মঞ্চ থেকে নেমে এসে দর্শকের সারিতে বসলেন। এবং মুখে একটা স্মিত হাসি বজায় রেখে, আমাদের নাটকটি মন দিয়ে শুনতে থাকলেন।নাটকের বক্তব্য আর একটু আগে দীপ্তির সম্পাদকীয় বক্তব্য খুব একটা পার্থক্য ছিল না। মনে মনে বোধহয় এক রসিকতার ছক আঁকছিলেন শ্রীমতী ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। যদিও তিনি মনে মনে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, বাইরে তার বিন্দুমাত্র আভাস পাওয়া গেল না। পুরো নাটকটাই তিনি মন দিয়ে শুনলেন, তারপর নাটক শেষ হতে উঠে ধীরে ধীরে চলে গেলেন প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে। যাবার আগে শুধু দীপ্তিকে একবার বলে গেলেন।

আমি ভেবেছিলাম দুটো-একটা কথা বলব ওনার সাথে, কিন্তু তার আগেই উনি বেরিয়ে ওনার গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। উনি চলে যাওয়ার পর, দীপ্তি হঠাৎ করে বলল, এই সুদীপ্ত, একবার দ্যাখ তো, ঈশিতাদি চলে গেছেন কিনা?

-চলে গেছেন তো। এই তো বাইরে গিয়ে দেখলাম গাড়ি বেরিয়ে গেল!

-গাড়ি করে এসেছিলেন? নিজে চার চাকায় চড়ে বড় বড় বাতেলা!

-ওনার সব কথা কিন্তু ভুল নয়।

-তুই চুপ কর তো! ওনার ব্যাগটা উনি ফেলে গেছেন তো, মেমেন্টো বই সব রয়ে গেছে ব্যাগে।


কি করা যাবে এখন আর! পৌঁছে দিতে হবে ওর কাছে সেটা! ঠিক হল আগামিকাল ওদিকে একটা কাজে যাবে দীপ্তি। এক ফাঁকে মহিলার বাড়িতে গিয়ে বইটা দিয়ে আসবে। এরপর যা ঘটনা ঘটছে সবই আমি কিন্তু দীপ্তির কথা শুনে লিখেছি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ঈশিতা একটা গল্পের প্লট নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছিল। পূজাবার্ষিকী বা বইমেলা সংখ্যার জন্য লিখতে লিখতে কখন যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে ও। গতকালের সেই অনুষ্ঠানে ছিল এক চমক। অল্পবয়সী দাম্ভিক সেই মেয়েটি জানেও না কত বড় ভুল সে করে চলেছে। মানুষের কথা না বুঝতে পারলে লেখক হয়ে ওঠার কোন মানেই থাকে না। ঈশিতার বর রুদ্র ওকে বলে, তোমার কি দরকার এই অনুষ্ঠানগুলোতে যাওয়ার? নিজের সুস্থ শরীরকে, ব্যস্ত করে লাভ কি? এসব ছোটখাটো পত্রিকা টাকা-পয়সাও দেয় না। ডেকে নিয়ে গিয়ে অপমান ছাড়া আর কিছু হয় না।

-ওভাবে বলো না। অপমান কিছু করেনি। ওদের কথা ওরা বলেছে। ছেলেমানুষ সবাই। দেখো, একটা সময় ঠিক ওরা ওদের ভুল বুঝতে পারবে।

-পারলেই ভালো। কি বলছিলে কাল বইটাতে কি ইন্টারেস্টিং আছে!

-পারুদির লেখা আছে।

-পারুদি! সেটা আবার কে?

-সত্যি রুদ্র, তুমি বুড়ো হয়ে গেছো। তোমার কিছুই মনে নেই আর। আমাদের বাংলার টিচার পারমিতা ঘটক। আমি পড়তাম ওনার কাছে।

-ও আচ্ছা আচ্ছা! ইনি তো সেই, যিনি তোমাকে বলেছিলেন, খবরদার ক্লাস টুয়েলভ-এর রুদ্রনীলের সাথে প্রেম করবি না।

-তা বলেনি! বাজে কথা বলছ কেন?

-তাহলে কি বলেছে?

-বলতেন, নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে কোনদিন বিয়ে না করতে।

পারমিতাকে নিয়ে আরও কিছু কথোপকথন হতো কিন্তু ওদের মেয়ে উপাসনা এসে জানালো, একজন মহিলা দেখা করতে এসেছেন ঈশিতার সাথে। এখন আবার কে আসবে?

সবে একটা নতুন গল্পের প্লট মাথায় এসেছিল। গল্পের প্রধান চরিত্র থাকত দুজন, কালকের সেই দাম্ভিক সম্পাদক, আর সেই দিনের সেই দিদি। ওর পারুদি, কে জানে কেমন আছেন এখন তিনি? বাইরের বৈঠকখানাটা ছোট, ঈশিতার ফ্ল্যাটটা দেখলেই মনে হয় বিলাসিতার ছোঁয়া মাত্র বাড়িটাতে নেই। অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। রুদ্র একটি বেসরকারি অফিসে চাকরি করে। মাত্র এক বছরের বড় সে ঈশিতার থেকে। ওদের একটি মেয়ে, একটি ছেলে, উপাসনা বড়। আর ছেলেটির নাম আলেখ্য। সে আবার মায়ের ধারা পেয়েছে, মায়ের মতন লেখালেখির শখ আছে তার। উপাসনা আগে লিখত, কিন্তু এখন বড় হচ্ছে বলেই বোধহয় কেমন পাল্টে যাচ্ছে ও।

বাইরে বেরিয়ে এসে সত্যিই অবাক হয়ে গেল ঈশিতা। একদমই কল্পনা করেনি এই মানুষটিকে, এসেছে কালকের সেই অহংকারী নারীবাদী সম্পাদক দীপ্তি সেনগুপ্ত। ঈশিতা বলল, বলো দীপ্তি কি ব্যাপার? এক গাল কৃত্রিম হাসি হেসে দীপ্তি বলল, কালকে তাড়াহুড়ো করে চলে এলেন, আপনার পত্রিকা মেমেন্টো কিছুই তো নিয়ে এলেন না। আসলে ইচ্ছা করেই আনেনি ঈশিতা। যদি কেউ তার হাতে জিনিসটা না ধরিয়ে দেয়, তাহলে সে কেন আনবে? শুধু পত্রিকার মোড়ক উন্মোচনের সময়, হাতে একটি সংখ্যা দেওয়া হয়েছিল, পরে সেটিকেও অফিস কপি বলে গণ্য হলো সর্বসমক্ষে।

ওর হাতে কোন সৌজন্য সংখ্যা বা কিছুই দেওয়া হলো না। ও কি নিজে থেকে চাইবে? অতটাও নিচে নামতে পারবে না ঈশিতা।

দীপ্তি, একটা ব্যাগের মধ্যে করেই স্মারক ও “নারী উত্তরণ” পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যাটি নিয়ে রাখল টেবিলের ওপর। তারপর খুব বিনয়ের সাথে বলল, কালকে কোন অসুবিধা হয়নি তো দিদি। আর আমার কথায় কোন কষ্ট পেলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

-ক্ষমা চাইবে কেন? তোমার যদি উপলব্ধি হয় তাহলে ভালো, না হলেও কোন ক্ষতি নেই। কথাতেই আছে জীবন মানুষকে অভিজ্ঞ করে। তোমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না। তাই একদিন ঘটবে দেখো।

-কথাটা যখন উঠলই তখন একটা কথা বলতেই হয় দিদি, আপনার কি সত্যি মনে হয় না, যে নারীদের এখনও অনেকটা দমিয়ে রাখা হয়! এখনও সেই মান্ধাতার আমলের কনকাঞ্জলি প্রথা কেন আছে? বিয়ে হয়ে গেলে কেন শ্বশুরবাড়ি চলে যেতে হবে মেয়েদের? এই নেগেটিভ দিকগুলো কি জাস্টিফাই করা যায় না!

-নিশ্চয়ই যায়। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও তো ভেবে দেখতে হবে, যে এখন এমন একটা সময় চলছে, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই তাদের মা-বাবাকে ছেড়ে শহরের বাইরে বা দেশের বাইরে পাকাপাকিভাবে চলে যাচ্ছে। ব্যাপারটা কিন্তু আজকে নয়, ৮০ কিংবা ৯০ দশক থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। আজকে ব্যাপারটা ফ্যাশন হয়ে গেছে।

দীপ্তি যেন সঠিক পয়েন্টটা পেয়ে গেছে, ও বলল, একদম ঠিক বলেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু যেতে হচ্ছে ছেলেটির ক্ষেত্রে। ছেলেটি চাকরি পেয়ে চলে যাচ্ছে সেই জন্য যেতে হবে। কিন্তু এমন কি কখনও লক্ষ্য করেছেন, মেয়েটি চাকরি পেয়ে যাচ্ছে বলে ছেলেটিও তার সাথে যাচ্ছে।

-দ্যাখো দীপ্তি, তর্ক শুরু করলে এখন অনেক কথাই উঠতে পারে। তার থেকে তোমাকে একটা প্রশ্ন করার ছিল সেটা করি।

বিজয়ের গৌরবে দীপ্তির বুক যেন চওড়া হয়ে গেল। ওর মনে হল কথার অস্ত্রে, সে পরাজিত করেছে নারীবাদের বিরুদ্ধাচারণ করা এই লেখিকাকে। কিন্তু আসল বিনয়ীদের লক্ষণ চুপ করে থাকা। তর্ক না করা। সেটা আবিষ্কার করার বুদ্ধি দীপ্তির এখনও হয়নি।

দীপ্তি বলল, বলুন না দিদি, কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

-তোমরা পারমিতা ঘটকের ঠিকানা যোগাড় করলে কি করে?


দীপ্তি এক মুহূর্ত চুপ করে গেল কথাটা শুনে। ভেবেছিল এই মহিলা বোধহয় অন্য কোন প্রশ্ন করবে, ভবিষ্যতে এদের গ্রন্থ প্রকাশের সম্ভাবনা আছে কিনা, গ্রন্থ প্রকাশ করলে কি রকম রয়ালিটি দেবে? কারণ বেশিরভাগ বিখ্যাত লেখকরা এ ধরনের প্রশ্ন করে, তারা বিভিন্ন প্রকাশনীতে তাদের গ্রন্থ প্রকাশ করতে চায়, নতুন নতুন ভাবে প্রকাশকদের উন্মুক্ত করার জন্য। দীপ্তির মনের মধ্যে সেরকম একটা স্বপ্ন একদম ছিল না যে, তা নয়। যদি সত্যি সত্যি ঈশিতা মুখোপাধ্যায় তার কাছে একটি ছোট্ট উপন্যাস করাতেন তাহলে বেশ লাভজনক হতো ওর “নারী উত্তরণ” পত্রিকা এবং সংযোজিত প্রকাশনা দপ্তর। যদিও প্রকাশনা থেকে একটি মাত্র বই বেরিয়েছে গতকাল। বলা যায় গতকাল থেকেই প্রকাশনার জন্ম হলো। পত্রিকা বের হচ্ছে বছর দশেক হয়ে গেছে। কিন্তু সেই প্রসঙ্গেই গেল না লেখিকা ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। 


প্রাচীন সেই লেখিকার সম্পর্কে তার কিসের এত কৌতুহল? অবশেষে বলতে হলো “নারী শুধু নারী নয়” উপন্যাসটি আবিষ্কার করার ইতিহাস। এই লেখিকার একটি বই বইমেলা থেকে একবার কিনেছিল দীপ্তি। তারপরই লেখিকার অনুসন্ধান শুরু করে। তার কারণ এই লেখিকার ভাবনাচিন্তা তার নিজের ভাবনাচিন্তার সঙ্গে যেন হুবহু মিলে যায়। অনেক চেষ্টা করে তার খোঁজ পাওয়া যায়। তিনি এখন দক্ষিণ কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে তার ভাইঝির সাথে থাকেন। প্রায় শয্যাশায়ী অবস্থায় থাকেন সর্বক্ষণ। সেখানে গিয়ে দীপ্তি জানতে পারে, মহিলা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকদিন হলো। যদিও কাঁপা কণ্ঠে উনি বলার চেষ্টা করলেন, উনি আবার লিখতে চান। ওনার কলম আরও কথা বলতে চায়। তবে সম্প্রতি তিনি কিছু লেখেননি, যা লিখেছেন সবই ৮০ কি ৭০-এর দশকে, কি তারও আগে। ৯০-এর দশকের শেষের দিক থেকেই তাঁর স্নায়ু দুর্বল হতে শুরু করে। তারপর এখন প্রায় চলাফেরা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। একজন লোক সবসময় তাকে দেখাশোনা করে।

দীপ্তির মুখে পারমিতার বর্ণনা শুনতে শুনতে মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল ঈশিতার। সেই দাপুটে বাংলার দিদিমণি, শ্যামলা চেহারা ছিল তার, কিন্তু অদ্ভুত রকমের এক জ্যোতি বেরোত গা থেকে, বেশিরভাগ সময় লাল পাড় সাদা শাড়ি পড়তেন। দিদি বিয়ে করেননি। ছেলেমেয়েরা ওনাকে পারুদি বলে ডাকত। বিশেষ করে ছেলেরা ওর ক্লাস করতে ভয় পেত। এতটাই দাপট ছিল ওনার। ঈশিতার গাল বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু নেমে এল, তা দেখেই বোধহয়, দীপ্তি জিজ্ঞাসা করল, আপনার সঙ্গে পরিচয় আছে বুঝি?

আমাকে একবার নিয়ে যেতে পারো? দিদির কাছে?


গাড়িতে যেতে যেতে দীপ্তি জানতে পারলো, ভদ্রমহিলা আসলে ঈশিতা দেবীর স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা। পারমিতা ঘটক তার পুরনো একটি উপন্যাস যেটি অপ্রকাশিত অবস্থায় পড়েছিল সেটি তুলে দিয়েছিলেন দীপ্তির হাতে। দীপ্তিকে তিন-চারটে ডাইরি এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, যেটা পছন্দ নিয়ে নাও। এমন সুবর্ণ সুযোগ কেউ কি হাতছাড়া করে! ওনার ভাইঝি দুঃখ করে বলেছেন, পিসির এই লেখালেখি ছাড়া আর কিছু নেই, বিশ্বাস করুন। ছাত্র-ছাত্রী কত তৈরি করেছিলেন এককালে, এখন তারা কেউ খোঁজও নেয় না।

দীপ্তি জিজ্ঞাসা করল, আপনি আপনার দিদিমনির খোঁজ নেননি?

-তোমাকে যখন প্রথম দেখেছি, বিশেষ করে সেই অনুষ্ঠানের দিন, তখনই আমার পারুদির কথা বড্ড বেশি করে মনে পড়ছিল।

-কেন?

-তুমি যেভাবে নারীদের অধিকার রক্ষার কথা বলো, নারীদের নবজাগরণের জন্য সবসময় উৎসাহ দাও, আমাদের সময় পারুদি ঠিক সেভাবেই কথা বলতেন। কিন্তু কখনও কোন মানুষকে অপমান করতে দেখিনি। নারীবাদ-এর জয়গান গাইতে গিয়ে, পুরুষদের নিপীড়ন করতেও দেখিনি। অথবা যে ভুল, পুরুষরা এতকাল করে এসেছে, সেই একই ভুল উনি করতে বলতেন না।

দীপ্তি বললেন, উনি গান্ধীবাদী?

-তা কিছুটা তো বটেই, তবে উগ্রতা ছিল না কোন। খুব গুছিয়ে কথা বলতেন। দাপট ছিল কথার মধ্যে, কিন্তু অহংকার ছিল না।

এই কথাগুলো দীপ্তির অন্তরে যেন অনুরণিত হতে লাগলো, সত্যিই তো তাই, নারীবাদ মানে যদি সত্যিকারের অধিকার রক্ষা হয়, তাহলে দাপট থাকুক, কিন্তু কথা বলার মধ্যে নম্রতা থাকা উচিত। কিন্তু তাই বা কেন হবে? নম্র হলে মানুষ আক্রমণ করতে ভালোবাসে, কিন্তু ছোটবেলায় বইতে পড়েছিল, বড় হতে গেলে আগে ছোট হতে হবে। আচ্ছা, এই নারীবাদের ভূত হঠাৎ করে মাথায় চাপল কি করে?

বাবা বামপন্থী রাজনীতি করত। এখন অবশ্য বাংলায় বামপন্থা বলে কিছু নেই। কিন্তু নীতিগুলো যেন রয়ে গেছে বইয়ের পাতায়। বামপন্থার যে মহিলা সংগঠনগুলো ছিল কলেজ জীবনে বামপন্থীয় ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করত দীপ্তি।এসব ভাবতে ভাবতে, ও নানারকম গঠনমূলক আলোচনা করতে করতে ওরা এসে পৌঁছে গেল দক্ষিণ কলকাতার সেই ফ্লাটে, যেখানে থাকেন আশির দশকের বিখ্যাত লেখিকা তথা শিক্ষিকা তথা সমাজকর্মী পারমিতা ঘটক।


দরজা খুললেন ওনার ভাইজি, সুস্মিতা ঘটক। দীপ্তি অবশ্য মহিলাকে ফোন করেছিলেন, আজকে উনি আসছেন, পারমিতা দেবীর সৌজন্য সংখ্যাটি তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। সেই সাথে আসছেন বিখ্যাত লেখিকা ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। যিনি একসময় পারমিতা দেবীর ছাত্রী ছিলেন। বিভিন্ন কারণে ছাত্রী ও শিক্ষিকার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শিক্ষিকার সন্ধান পেয়েই তাঁর কাছে আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন ছাত্রী ঈশিতা।

একটা ছোট্ট একটেরে ঘর। খোলা জানালা দিয়ে সবুজ ডালপালা আকাশটাকে আড়াল করে রেখেছে। জানলাটা বন্ধ করে রাখা আছে বোধহয় মশার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। গোটা ঘর জুড়ে একটা শুভ্রতার চিহ্ন। বইয়ের আলমারি, একদিকে ছোট্ট ঠাকুরের আসন, দেওয়ালে পারমিতা ঘটকের বিভিন্ন সময়ের ছবি, তার রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি, জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার প্রাপ্তির বিরল ছবি। যেটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি এপি জে আবদুল কালাম। এছাড়া রয়েছে কিছু হাতে লেখা চিঠি, যেগুলো বিখ্যাত মানুষরা ওকে পাঠিয়েছিল, কোন চিঠিতে স্বাক্ষর রয়েছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের। কোথাও বা সৌমিত্র চ্যাটার্জির নিজের হাতে লেখা কবিতার খসড়ার বাঁধানো সংস্করণ টাঙানো আছে দেওয়ালে।

একটা সাদা রংয়ের নীল ফুটকি দেওয়া নাইটি পরানো হয়েছে শ্রীমতী পারমিতা ঘটককে। তার গালগুলো তুবড়ে গেছে, চোখ কোটরে ঢুকে গেছে। চোখের পাতায় যে কেশ আছে সেগুলো পর্যন্ত সাদা। মাথার চুল প্রায় নেই বললেই চলে। হাত দুটো কঙ্কালের মতন সরু, দুহাতে একটা করে ছোট ছোট সোনালী চুরি, জানালার পাশে একটা চেয়ারে বসে আছেন তিনি। সুস্মিতা উচ্চস্বরে ওনাকে ডাকল, পিসি ও পিসি, ভালো করে দ্যাখো, কে এসেছে? পারমিতা অল্প ভুরু তুলে দেখার চেষ্টা করলেন ঘরে আগত দুজন নতুন মানুষকে। দুজনেই পর্যায়ক্রমে প্রণাম করলেন ওনাকে।


সুস্মিতা আগে থেকেই দুটো চেয়ার এনে রেখেছিল, সেখানে বসলো ওরা দুজন। সুস্মিতা বসলো ছোট্ট খাট-টায়। ঈশিতা নিজের কান্নাকে সংবরণ করতে পারছে না, প্রায় কান্না জরানো গলায় তিনি ডাকলেন, পারুদি, ও পারুদি? 


মহিলা তাকালেন, চিনতে পারলেন না একথা আর বলে দিতে হয় না। ঈশিতা বলে, আমাকে চিনতে পারছেন না দিদি? আমি ঈশিতা, আপনি বলতেন আমাকে বিয়ে না করতে। 


সুস্মিতা হাসলো, তার পিসি যে এই কথা তার সমস্ত ছাত্রীদের বলত; সে কথা সুস্মিতা জানে। ঈশিতা পারমিতার ভাইজিকে জিজ্ঞাসা করল, ডাক্তার দেখছে?

-দেখছে। কিন্তু তিনবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। আর কিছু করার নেই। যত দিন ভোগান্তি আছে আর কি।

চোখের জল মোছে ঈশিতা, এবার সে নিচে বসে পড়ে তার দিদিমনির দুটো হাত ধরে বলে, আমি মানুষের কথা এখন বলতে পারি দিদি... আপনি বলতেন, মানুষের কথা বলতে, আপনাকে অনেক খুঁজেছি দিদি, কিন্তু পাইনি। শুনেছিলাম স্কুলে অন্যায় ভাবে টাকা তছরুপ করা হচ্ছে বলে আপনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। যেন ওর সমস্ত কথা বুঝতে পারছে পারমিতা, এরকম একটা ভঙ্গিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল, মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ছেন, ঈষৎ হাসি হাসছেন। হাসলেই তার দাঁতবিহীন মাড়িটা দেখা যাচ্ছে।

সুস্মিতা বলল, আর বলবেন না। পিসির যত পাগলামি!

বোঝা গেল মহিলা খুব একটা স্বস্তিতে নেই তার পিসিকে নিয়ে। থাকার কথাও নয়, ওনার বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় ২০০০ সাল থেকে এই ভোগান্তি শুরু হয়েছে। আগে তবুও কথাবার্তা বলতে পারতেন, হাঁটাচলা করতে পারতেন। বাইরেও বেরোতেন একটু-আধটু। রাষ্ট্রপতি পুরস্কার আনতে উনি দিল্লি গিয়েছিলেন। তাছাড়া ঘরের মধ্যে একটু আধটু লেখালেখিও করতেন। কিন্তু ২০১১ সালে তৃতীয়বার স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার পর তিনি একদম চুপ হয়ে গেছেন। কারো সাথে বেশি কথা বলেন না। মাঝেমধ্যে লেখার খাতায় পেন নিয়ে আঁকিবুকি কাটেন, কিন্তু অক্ষর দুটো-একটার বেশি লিখতে পারেন না। সেগুলো কাউকে দেয় না সুস্মিতা। তার পিসির স্মরণ-চিহ্ন হিসেবে সেগুলো সে রেখে দিতে চায় নিজের কাছে।

ঈশিতা সেগুলো দেখার লোভ সংবরণ করতে পারল না। একদম যে কথা বন্ধ হয়ে গেছে তা নয় কিন্তু, মাঝেমধ্যে উনি কথা বলেন। এই তো দীপ্তি যখন এসেছিল, তার দিকে তিনটে ডাইরি এগিয়ে দিয়ে বললেন যেটা খুশি নাও। ওর সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বললেন। কিন্তু আজ কেমন যেন চুপ করে আছেন। সুস্মিতার কথা অনুযায়ী, সকালবেলা খবরটা পাওয়ার পরেই ওনাকে বলা হয়েছিল, ওনার পুরনো এক ছাত্রী আসছেন, তার নাম ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। এখন সে বিশাল বড় লেখিকা। তারপর থেকেই কেমন যেন চুপ করে গেলেন তিনি। এখনও সেভাবেই চুপ করে আছেন। সুস্মিতা দুটো খাতা নিয়ে এলেন। প্রথম খাতায় কিছুই তেমন লেখা নেই, শুধু দুটো-একটা শব্দ, “তুমি...”, “মানুষ...” , “অহেতুক চিৎকার” , “মানুষের কথা..” এই ধরনের কথাগুলো লেখা। অনেকগুলো পাতায় আবার অকারণে বানান ভুল আছে। উনি বাংলার শিক্ষিকা তাও বানান ভুল! তার মানে ওনার স্মৃতি কাজ করা একদমই বন্ধ করে দিয়েছে।


অন্য খাতাটায় অনেকগুলো পাতা ফাঁকা দিয়ে দিয়ে একটা দুটো কবিতা লেখা। তার মধ্যে একটা কবিতা উপন্যাসের নামের সঙ্গে মেলানো, ওই খাতাটা আবার দীপ্তি দেখছিল, কবিতাগুলোতে তার পরিবর্তিত মানসিকতার কথা। অর্থাৎ যেন তিনি তার জীবনের পরতে পরতে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার নিরিখে বুঝতে পেরেছেন, মানুষের কথা ঠিকভাবে বলতে পারেননি বলেই তিনি আজ এভাবে পড়ে আছেন অনাদরে।

“নারী শুধু নারী নয়” এই কবিতাটি অবশ্য ওই নামে প্রকাশিত উপন্যাসে রয়েছে, তবে উপন্যাসে অন্যরকমভাবে রয়েছে এখানে অন্যভাবে।


নারী শুধু নারী নয়


নারী তবে কি?


নারী কি শুধুই নারী?

নাড়ি—

আমি কিছুতেই নারি

কাঁদছে ছেলে, বাজছে ঢাক—

নারী, তুই শুধু নারী হয়েই থাক?


দীপ্তি কবিতাটা পড়ে অবাক হয়ে গেল। কবিতার মধ্যে প্রশ্ন আছে, উপন্যাসটিতে যদিও নারীত্বের জয়-পতাকা উড়িয়েছেন তিনি, উপন্যাসটিতে “নারী শুধু নারী নয়” মানে নারীর অধিকার রক্ষার কথাই বলা হয়েছে। আর সে কারণেই একজন নারীবাদী হওয়াতে উপন্যাসটিকে সহজে পছন্দ করেছিল দীপ্তি। যদি ধরে নেওয়া যায় উপন্যাসটি তিনি আশির দশকে লিখেছিলেন, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে, লেখিকার মনে সেই সময় যে প্রশ্নগুলো ছিল সেগুলো এখন আমূল পরিবর্তিত। এখন সে উপন্যাস নিয়ে ও তার মধ্যে দ্বন্দ্ব এসেছে, মনের মধ্যে প্রশ্ন এসেছে, ‘নারী তবে কি?’, ‘নারী কি শুধুই নারী?’ এ কথাই কি সেদিন বলতে চাইছিলেন লেখিকা ঈশিতা মুখোপাধ্যায়? দীপ্তির সামনে কেউ যেন একটা ভবিষ্যতের আয়না রেখে দিয়েছে। আর অদ্ভুতভাবে তার উল্টোদিকেই বসে আছেন একসময়ের দাপুটে নারীবাদী লেখিকা পারমিতা ঘটক। নিজের পরিবর্তিত মানসিকতা দিয়ে নতুনভাবে নারীত্বকে তিনি জানতে চাইছেন। বোঝার চেষ্টা করছেন, নারীত্ব আসলে কি? মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার নাম নারীত্ব? নাকি সাম্যবাদ বজায় রাখার অন্য নাম নারীত্ব? হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছেন, নারীত্বকে শুধুমাত্র সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলে মানবিক দিকটা সত্যি সত্যিই যেন ফিকে হয়ে যায়। তারপর এই নারী নামের অন্য বানান, ‘নারি’, অর্থাৎ তিনি পারেন না। হয়তো ফেলে আসা সময়ের আক্ষেপের ছবি ফুটে উঠেছে এই লাইনে। আরও একটা বানান, ‘নাড়ি’ যেন জীবনের গভীর প্রবহমানতা—এখানে নারী নিজেকে শুধুমাত্র নারীর পরিচয়ে আবদ্ধ রাখতে চাইছেন না। “কাঁদছে ছেলে, বাজছে ঢাক” এখানে যেন পিতৃতন্ত্রের ও দ্বিমুখী আচরণের প্রতীক হয়েছে ওনার ভাবনা—এখানে নারী কাঁদলেও শোনা হয় না, ছেলের কান্না অস্বাভাবিক। ‘নারী, তুই শুধু নারী হয়েই থাক?’ যেন নিজের প্রতি নিজের ব্যঙ্গ এই লাইন, এই আত্ম উপলব্ধি হতে তার অনেকগুলো বসন্ত নষ্ট হয়ে গেছে।

ঈশিতা যাওয়ার আগে আরেকবার বসলেন তার পারুদির পায়ের কাছে, তার কোলে মাথা রেখে ছেলেমানুষের মতন যেন একটু আদর খেতে চাইলেন, ভাঙা অস্পষ্ট কাঁপা কন্ঠে এবারে কথা বললেন পারমিতা, তার আগে তার শীর্ণ হাত দুটি তুলে, ঈশিতার মুখে বুলিয়ে দিলেন, অনেকখানি মমতা। দুটো কথা উনি বললেন, দুটো প্রশ্ন, চলে যাচ্ছো? আবার আসবে তো?

ঘরের পরিবেশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। গোটা পৃথিবীর লোকজন যেন কথা বলতে ভুলে গেছে। ভুল পথে চলা মানুষ যখন জীবনসন্ধ্যায় এসে বুঝতে পারেন, সবকিছু আবার শুরু করা যেতে পারত না তখন হয়তো এরকমই কোন বাক্য বেরিয়ে আসে। দিদিমণিকে প্রণাম করে মন খারাপকে দোসর করে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন দুই লেখিকা। আসার সময় অনেক কথা বলছিল দীপ্তি। এখন কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে সে। তার এই এতদিনকার ঘুণ ধরা মানসিকতা সম্পর্কে, তার হঠাৎ করে যেন চেতনা ফিরে এসেছে। কিন্তু এখনও অনেক দ্বন্দ্ব, নিজেকে সঠিকভাবে অন্বেষণ করার আরও অনেক চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজেকে সময় দিতে ইচ্ছে করছে। ঈশিতা বুঝতে পারছে, কি চলছে তার মনের মধ্যে। তার নিজের মনও কি আর ভালো আছে? ভেবেছিল অনেকদিন পর আসছে, অন্তত কয়েকটা কথা শুনতে পাবে তার সেই পরিচিত পারুদির মুখে। কিন্তু মানুষ যে মানসিকভাবে ও বাহ্যিকভাবে কিভাবে বদলে যায়, তার আরও একটা জ্বলন্ত নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে এলো দুই লেখিকা।


তিন প্রজন্ম তিন ধারাকে অনুসরণ করে যেন এক বাঁকে এসে মিলে গেছে। গাড়ির বন্ধ কাছের বাইরে থেকে শেষ বিকেলের আলোটুকু পড়ছে দুই লেখিকার গায়ে, দুজনেই যেন আজ কেমন অন্যরকম আবেশে জর্জরিত। দীপ্তি যেমন নিজেকে আজকে অন্যভাবে আবিষ্কার করল, অনুরূপভাবে নিজের ফেলে আসা শৈশবের আদর্শকে এভাবে জীর্ণ অবস্থায় দেখে, নিজেকে নতুনভাবে ভয় পেতে শুরু করেছে লেখিকা ঈশিতা মুখোপাধ্যায়।

মানবতাবাদী হলেও সে সম্পূর্ণরূপে নারীবাদ বিরোধী নয়। তাছাড়া পেটের দায়ে বাণিজ্যের চাকর হয়ে গেছে এখন সে। প্রকাশকের তাগাদা মতন লেখা দিতে হয়। মাঝেমধ্যে মনের খোরাক জোগাতে দীপ্তি সেনগুপ্তদের পত্রিকায় লেখে। কিন্তু তার এ লেখা যেন নতুন প্রাপ্তি এনে দিল তাকে।

পারমিতা ঘটক আশির দশকের দাপুটে লেখক ও সমাজকর্মী, নারীবাদ প্রচারে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ছাত্রীদের বোঝাতে চেয়েছিলেন জীবনে নিজের পায়ে না দাঁড়ালে চলে না। এমনকি ছাত্রী ঈশিতাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন নিজের পায় না দাঁড়িয়ে যেন বিয়ে পর্যন্ত না করে। মানুষের দুঃখ বোঝার কথা তিনি বলতেন বটে, কিন্তু সেভাবে বোধহয় নিজেও মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা বুঝে উঠতে পারেননি। সেই কারণে জীবনের রাত্রিবেলায় তিনি তার যৌবনকালে লেখা উপন্যাস “নারী শুধু নারী নয়”-এর ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে সঠিকভাবে ভাবতে চান আসলে নারী তবে কি? নারী নিজেকে আবিষ্কার করতে করতেই তার জীবন কাটিয়ে দিল। তাই জীবনের শেষ দিকের কবিতায় তিনি বলছেন, ‘নারী তুই নারী হয়েই থাক’। এই লাইন শুধু কবিতার লাইন নয়, এই লাইন যেন নিজের প্রতি ধিক্কার।


পারমিতা ঘটকের উত্তর প্রজন্ম ঈশিতা মুখোপাধ্যায়। পারমিতাকে আদর্শ মনে করলেও নিজস্ব সত্তাকে আলাদাভাবে তৈরি করেছেন তিনি। তার পাশে সবসময় ছিল তার প্রেমিক ও বর্তমানে স্বামী রুদ্রনীল মুখোপাধ্যায়। সংসার লেখালেখি সব নিয়েই তার মধ্যবিত্ত জীবনে আছে সাবলীলতা। মানুষের কথা তিনি ভাবতে জানেন, তার গাড়ি চড়া আর বিলাসিতার জন্য নয়। নিজস্ব শারীরিক অক্ষমতার জন্যই হয়তো, কিংবা হয়তো সামান্য অর্জিত খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে গাড়ি করে যাতায়াত করা হয় সব জায়গায়। তবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা তিনি বারবার তার লেখায় যেমন পাঠককে বলেন, ঠিক তেমনি বর্তমান প্রজন্মের সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে একই কথা তিনি বলেন।


দীপ্তি সেনগুপ্ত তার পরবর্তী প্রজন্ম, আজ নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করছে যেন, নিজের আয়নাকে খুব কাছ থেকে দেখে আসার পর তার মনের মধ্যে এখন চরম একটা অনুরণন চলছে। কিন্তু এই প্রেক্ষাপট থেকে নিজেকে বদলাতে হবে সেই উত্তর তার এখনও অজানা। সব মিলিয়ে বলা যায় এই তিন প্রজন্মের তিন লেখিকা যেন ভাবনার দিক থেকে কোথায় একটা গিয়ে আজ একই সূত্রে গাঁথা হয়ে গেলেন। নারীবাদের নতুন সংজ্ঞা আবিষ্কৃত হয়েছে দীপ্তির মধ্যে। এখন তাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার পালা। তার মাধ্যম কি হবে? লেখালেখি? আলোচনা? নাকি শুধুই এভাবে নীরবে সেই অনুভবকে যাপন করে যাওয়া? নিজেকে সময় দিতে চায়। ওকে এভাবে চুপচাপ দেখেই বোধহয় ঈশিতা বলল, মন খারাপ লাগছে?

-না দিদি। ঠিক আছি আমি। ভদ্রমহিলার কবিতার হাত কিন্তু খুব ভালো, ওনার আগের কবিতাগুলো পেলে খুব ভালো হতো। আমি যে কবিতাগুলো পড়েছিলাম, মানে যে বইটা পেয়েছিলাম আর কি, তাতে কবিতাগুলো অত স্পষ্ট ছিল না।

নিজেকে সামলানোর জন্য, কিংবা নিজের মনের কষ্টের এই অনুরণন একটু শান্ত করার জন্যই বোধহয় এই অবান্তর কথাগুলো বলছে দীপ্তি। দু-তিনবার যেন সেই ‘নারী শুধু নারী নয়’ কবিতার কয়েকটি লাইন, ‘নারী তুই নারী হয়েই থাক’ আবৃত্তি করছে দীপ্তি। এই প্রতিধ্বনি তার মধ্যে এখন দীর্ঘক্ষণ থাকবে, তা সে খুব ভালো করেই জানে।


সেদিন এই অহংকারী মেয়েটিকে যেভাবে দেখেছিল আজ যেন সম্পূর্ণ অন্যরকম চেহারা। এই মেয়েটি যেন নিজের এই বাহ্যিক সত্তা নিয়ে চরম এক দ্বন্দ্বে ভুগছে এই মুহূর্তে। যে গল্পটা লেখবার কথা ভেবেছিল ঈশিতা, সেটা অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে। দুটো-একটা দৃশ্য লেখা হয়েছিল, কিন্তু সে গল্পটা বোধহয় শেষ হবে না। সব গল্প তো শেষ হয় না। এই অসমাপ্ত গল্পগুলো জুড়লে হয়তো নতুন একটা জীবন তৈরি হতে পারতো।


বাইরে হঠাৎ হালকা বৃষ্টি শুরু হল।গাড়ির কাচে এসে পড়ছে সেই জল যেন ঝাপসা হয়ে গেল বাইরের কলকাতা। সামনের উইন্ড স্ক্রিন দিয়ে যদিও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনের সুবিস্তৃত রাস্তা। দীপ্তি জানলার দিকে মুখ করে বললো, দিদি মানুষের কথা কিভাবে ভাবতে হয় বলবেন একটু?

ওর হাতটা ধরে ঈশিতা বলে, সামনের দিকে তাকাও, এই যে দেখছ, এত গাড়ি তোমাকে ফেলে রেখে আগে চলে যাচ্ছে, এরা হলো সমস্যা। আর তুমি হলে একটা মানুষ। তুমি আগে নিজেকে সুস্থ রাখো। নিজেকে সুস্থ রাখলে দেখবে ধীরে ধীরে হলেও অনেক দূর তুমি যেতে পারবে। আর যদি নিজে ছোটাছুটি শুরু করো, যেকোন মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

-আমি অনেক মানুষকে ঠকিয়েছি দিদি। অনেক গোলাপকে পায়ে দলেছি। আমি জানি, আমার পরিণতিও পারমিতা ঘটকের মতন হবে।... ... ... বলেই দীপ্তি ছেলে মানুষের মতন কেঁদে উঠল, অনেকক্ষণ ধরে নিজের কান্নাকে সামলে ছিল সে। কিন্তু এখন আর পারল না। ওকে সান্তনা দিয়ে চোখ মুছে দিয়ে ঈশিতা বলল, পারুদির স্পর্ধা এতদিন পর হয়েছে। যখন আর কিছু করার নেই। আর তোমার স্পর্ধা এখন থেকেই হয়ে গেছে। এই স্পর্ধাকে ঘুমিয়ে পড়তে দিও না। একে বাঁচিয়ে রাখো। তুমি পারবে। আজকেই তোমাকে পুরোপুরি বদলে যেতে হবে, এমনটা নয়। জীবনটা তো ছোটগল্পের মতন নয়, যে এক নিঃশ্বাসে সব কিছু বদলে যাবে।আমাদের মতো সাধারণ মেয়েদের জীবন একটা বড়গল্প কিংবা নিদেনপক্ষে একটা ছোটখাটো উপন্যাস তো বটেই। এতে অনেক সময় আছে, নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার অনেক সুযোগ আসবে। ভেবো না এত। ঈশিতা এবার সেই কবিতাটা আবৃত্তি করতে শুরু করে, অবিশ্বাস্য ভাবে সেই লাইনগুলো দীপ্তির মাথাতেও এখন ঘুরছে।


“নারী তবে কি?

নারী কি শুধুই নারী?

নাড়ি

আমি কিছুতেই নারি—

নারী তুই শুধু নারী হয়েই থাক!”


কবিতাটা শেষ হবার পর, দীপ্তি বলে, দিদি আপনি একটা কথা দেবেন। সেদিন সাহস করে আপনাকে বলতে পারিনি। আপনার ওই “ ছবিটা আজও একই আছে ” উপন্যাসটা আমরা বই আকারে বার করব। আমরা নতুন ভাবে শুরু করব দিদি! আপনি পাশে থাকবেন তো?

ঈশিতা বলে, ওটাও খানিকটা একই রকম কথা বলে, বরং আমি একটা নতুন উপন্যাস লিখব, যেখানে মানুষের বেঁচে থাকার কথা থাকবে।

হঠাৎ একটা ট্রাফিক জ্যামে গাড়িটা দাঁড়ায়, একটি যুবক কাঁধে একটি বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে কাঁচা আমলকি লজেন্স বিক্রি করছে গাড়িতে গাড়িতে। গাড়ির কাচ নামিয়ে দীপ্তি তাকে ডাক দেয়, দাদা একটু এদিকে আসবেন? তারপর ওনার থেকে কয়েকটা আমলকি ও কিছু লজেন্স কেনে। ঈশিতা অবাক হয়ে দেখে এ দৃশ্য। ওকে একটা ঝাল লজেন্স দিয়ে ঈশিতা ছেলেমানুষের মতো বলে, মুখে রাখুন দিদি, দেখবেন, বেশ ভালো লাগবে! ঈশিতা মুখে লজেন্সটা নিয়ে আবৃত্তি করতে থাকে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতা

“মানুষ বড় কাঁদছে

তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও”।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register