- 22
- 0
অমরাবতীর সহযাত্রী
আলাপ পরিচয় হতে একটু দেরী হল। কাল শেষ রাতে ট্রেন ছেড়েছিল। আজ সারাদিন সারারাত ট্রেন জার্নি। আগামীকাল ভোরে নামব হসপেট। হাম্পি, গোকর্ণ ও আরও কয়েকটা জায়গায় বেড়াব।
অনেক কথা ও গল্পের পর নাম জানলাম হুমায়ুন মন্ডল। আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। ওঁর সঙ্গে স্ত্রী। গ্রুপ ট্যুরে বেড়াতে যাচ্ছি। আমরা তিনজন এই কামরায়। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তিরিশ জনের গ্রুপ।
আমি হেসে বললাম, "আপনার নামের একজন তো এখন খুব হৈচৈ করছেন। মসজিদ বানাবেনই।"
"আর বলবেন না।" একটু বিরতি দিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বললেন," ধর্ম নিয়ে বেসাতি বড্ড বেড়ে যাচ্ছে।" এবার দুজনেই চুপ।
ট্রেন ছুটছে। আশপাশের সহযাত্রীরা যে যার মত মোবাইল ঘাঁটছেন। রিল দেখছেন। গল্প করছি শুধু আমরা দুজন। ওঁর স্ত্রী জানলা দিয়ে প্রকৃতি দেখছেন।
হসপেটে নেমে হাম্পি যাব। হাম্পির বিখ্যাত জিনিসগুলোর গল্প করতে করতে এক সময় হুমায়ুনদা বলতে শুরু করলেন, তাঁর পুরানো দিনের বেড়ানোর গল্প। বোঝা গেল তিনিও আমার মতই ভ্রমণ পাগল। সারাজীবন অনেক ঘুরেছেন। এখনও ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসেন।
গোকর্ণর সৈকতের কথা উঠতেই বললেন, "স্নান করবেন তো?"
আমি হেসে বললাম, "সমুদ্র স্নানের সময় কি পাব?"
"মন্দিরে যাবেন তো?"
"যেতে পারি। এই মহাবালেশ্বর মন্দিরে আবার ধুতি পড়ে যেতে হয়। কিন্তু ধুতি তো নেই আমার!"
"আরে ওখান থেকে কিনে নেবেন।"
"না। না। শুধু মন্দির দর্শনই করব। ঠাকুর দর্শন তাতেই হয়ে যাবে।"
হুমায়ুনদা হাসলেন। একটু পর বললেন, "আমি পুরী তিনবার গেছি।"
"তাই! এত ভালো লাগে পুরী?"
"সে অনেক কাল আগের কথা। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে রথের সময় চলে গিয়েছিলাম।"
"ওরে বাবা!.. সে সময় তো খুব ভিড় হয়।"
"আরে ওই বয়সে ভিড়টাকেই তো ভালো লাগত।"
"তা অবশ্য ঠিক।"
পুরীর সমুদ্রে স্নান করেছি। রথের রশি ধরে টেনেছি। সে কি শক্তি লাগে শরীরে।"
"তাই!.. আপনি রথও টেনেছেন!"
"আরে সেবার তো টেনে চলে এসেছি। পরে শুনলাম, তিনবার নাকি টানতে হয়।"
"তাই নাকি? এটা তো জানি না।"
"হ্যাঁ। তাই পরে আরও দুবার গেছি। রথের রশি টেনে এসেছি।"
হুমায়ুনদা চা খেতে খেতে হাসছেন গল্পটা শেষ করে।
রথের রশির গল্পটা শুনে ধর্মের বেসাতি করা লোকগুলোর জন্য বড্ড করুণা হল। আমার জীবনে ধর্ম বড্ড আলগা হয়ে জাপ্টে রয়েছে শরীরে। তাই মন্দির দেখলেই আমার দেবতা দর্শন হয়ে যায়। হুমায়ুনদা হঠাৎ বললেন, "শুনুন না, একটা ধুতি কিনব। একবার আপনি পড়ে দেখে আসবেন। তারপর আমি পড়ে যাব। বেড়াতে তো এসেছি। একটু আনন্দ মজা না করলে হয়!.."
ট্রেনের নাম অমরাবতী এক্সপ্রেস।
আমরা সত্যিই এক অমরাবতীর সহযাত্রী।
0 Comments.