- 12
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
ঘোতনের সাথে বিট্টুর সখ্যতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিট্টু ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, বিট্টুকে একপ্রকার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ঘোতন… তারপর ১২ তম পর্বে
ঘোতন বিট্টুকে ঘুড়ির পেছনে দৌড়নো থেকে বিরত করল। বিট্টুকে মৃদু ধমক দিল,
“হচ্ছেটা কি? ওই ছেলেগুলোর সাথে কেন দৌড়চ্ছিস? ওদের এইসবে অভ্যেস আছে, তুই পারবি ওদের সাথে? আমাকেও জ্বালাচ্ছিস। আমার সাথে গ্রাম দেখতে যাবি বললি যে! কাছেই একটা কালীমন্দির আছে। সেখানে আজ পুজো আছে”
ঘোতনের কথা শুনে বিট্টু ওর কথামত কালীমন্দিরের দিকে এগিয়ে চলল। বেশ কিছুটা দূরে একটা কালীমন্দির আছে। সেখানে ধুমধাম করে কালীপুজো হচ্ছে। মন্দিরের চারপাশে জনতার ভীড়। একটা জায়গায় পাঁঠাবলি হচ্ছে। বিট্টু দেখেই আঁতকে উঠল। মানুষ কি নিষ্ঠুর! একটা কুপ্রথা মেনে মানুষজন একটা অবলা প্রাণীকে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে। সেই দেখে মানুষের উল্লাস যা রীতিমত প্রহসন। বিট্টুর ছোট্টমাথায় এইসব কথা ঢুকবে না, কিন্তু ওর ছোট্টমন মানুষের এই কুপ্রথাকে মেনে নিতে পারেনি। তাই সে বলি দেখতে চাইল না, বরং তার চোখ মন্দিরের আশেপাশে থাকা মেলার দিকে। মেলায় অনেক স্টল বসেছে। গ্রামের অঢেল বাচ্চারা মেলায় হাজির হয়েছে। নাগরদোল্লা বসেছে একজায়গায়। আবার অন্য এক জায়গায় একজন স্টল বসিয়েছে, সেই স্টলে একটা ছোট্ট ছেলের হাতে বন্দুক, সেই বন্দুক দিয়ে সে বেলুনের উপর টার্গেট করছে। বিট্টু দেখল, ছেলেটা পকেট থেকে টাকা বের করছে, এবং অবলীলায় তার টার্গেট করে যাচ্ছে। কিন্তু একটাও সে হিট করতে পারছে না। অবশেষে বেশ কিছু টাকা খুইয়ে ছেলেটি একটা বেলুনে হিট করল। স্টলের মালিক সেই হিট করা বেলুনের পেছনে একটা চিরকুট ছিল। সেই চিরকুট খুলে ছেলেটিকে বলল,
“এ বেলুন ফাটিয়ে তুমি একটা প্রাইজ পেয়েছ। একটা চামচ পেয়েছ তুমি”
ছেলেটির বেশ আনন্দ হল। চামচটা নিয়ে সে লাফাতে লাফাতে সেখান থেকে বিদায় নিল। বিট্টুর দিকে ঘোতন তাকিয়ে ছিল। ঘোতন বুঝতে পেরেছে বিট্টুর আকর্ষণ আপাতত কোনদিকে…! বিট্টু ঘোতনকে কিছুই বলল না, শুকনো মুখে সে স্টলের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘোতন এবার বিট্টুকে বলল,
“কি রে বিট্টু? বেলুনে বন্দুক তাক করতে খুব ইচ্ছা করছে? তাই না”
বিট্টুর জবাব নেই। ঘোতন বিট্টুর হাত ধরে সেই স্টলের কাছে নিয়ে এল। বিট্টুর হাতে বন্দুক ধরিয়ে বলল,
“দেখি, তুই কটা বেলুনকে হিট করতে পারিস?”
ঘোতনের এই অস্বাভাবিক আচরণে বিট্টু বেশ অবাক হল। ঘোতন ফিসফিস করে বিট্টুকে বলল,
“তোর ইচ্ছা আমি পূর্ণ করব। শুধু তোর বাবার মোবাইল নাম্বারটা আমাকে দিবি। কি দিবি তো?”
বিট্টু ওর বাবার কাছে ফিরতে চাইছে না। সেখানে ওর নতুন মা অর্থাৎ দুষ্টু মেয়েটা আছে। সে কিছুতেই ওকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। ঘোতনের উপর ভয়ানক চটে গেল বিট্টু। সে বলল,
“আমি বন্দুকটা রেখে দিলাম। আমার দরকার নেই। এখান থেকে চলো”
ঘোতন বুঝতে পারল বিট্টু অসন্তুষ্ট।
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোকে কিছু জিজ্ঞেস করব না। এবার তুই বেলুনগুলোকে হিট কর, দেখি”
বিট্টু প্রথমবার নয়, এর আগেও সে তার মা-বাবার সাথে একটা মেলায় গিয়ে এমনই বেলুনের ওপর বন্দুক নিয়ে হিট করেছিল। সেখানে বেশ কয়েকবার বেলুনে হিট করে সে প্রাইজও পেয়েছিল। সেই কথা ভেবে নিয়ে বিট্টু বন্দুক তুলে নিল নিজের হাতে। পরপর পাঁচটা বেলুনকে সে হিট করল। তার মধ্যে দুটো বেলুনের মধ্যে পুরস্কার ছিল। একটায় সে রিমোট কন্ট্রোল চালিত খেলনার গাড়ি ও আরেকটায় সে কুড়ি টাকা পেল। কুড়ি টাকাটা সে ঘোতনের হাতে তুলে দিয়ে নিজে গাড়িটা নিল। ঘোতন বিট্টুর এমন স্বভাবে খুব খুশি হল। কিন্তু নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ রেখে ঘোতন আরও বেশী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হল, যে করেই হোক বিট্টুর থেকে ওর বাবার মোবাইল নাম্বারটা চেয়ে নিতেই হবে।
বিট্টু এবার কালীমন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। কালীমূর্তির দিকে তাকিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম জানাল। মনে মনে প্রার্থনা করল,
“মা গো, আমার মায়ের ইচ্ছা ছিল, আমি যেন খুব বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হতে পারি। মায়ের ইচ্ছা পূরণ করো। আর দুষ্টু মা’কে শাস্তি দিও। বাবাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও মা”
কালীমন্দিরের মেলা থেকে বেরিয়ে ঘোতন বিট্টুকে নিয়ে গ্রামের আলের রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে থাকল। গ্রামটি হল আমতার দিকে। দামোদর নদীর ধার। নদীর জল টলমল করছে। নদীর পাড়ে জমিগুলোতে চাষ হচ্ছে। ওর বেশ ভালো লাগছে সূর্যমুখী ফুলের সারি দেখে। কি সুন্দরভাবে ফুলগুলো মেলে আছে। বিরাট অংশ জুড়ে শুধু সূর্যমুখী ফুল। এছাড়াও আরও অনেক ফুলের সাজি। এছাড়াও কোথাও আলুর চাষ হচ্ছে, কোথাও বা ধান চাষ হচ্ছে।
ঘোতনের হাত ধরে এবার ফেরার পালা… রাস্তায় ঘোতনের পরিচিত একজন জিজ্ঞেস করল,
“আরে ঘোতনা যে, কোথায় ছিলিস বাবা? অনেকদিন পর গ্রামে এসেছিস। এই ছোকড়াটাকে কোত্থেকে পাকড়াও করলি? বেশ ভালো ঘরের ছেলে মনে হচ্ছে। নতুন কোনও কেস করেছিস নিশ্চয়ই। দেখিস বাবা, তোর জন্য এ গ্রামে আবার পুলিশ না আসে। খুব সাবধান ঘোতনা। এবার একটু কাজেকম্মে মন দে”
“কি সব বলছ? এ আমার এক আত্মীয়র ছেলে। আমার সাথে গ্রামে এসেছে। দু’দিন পরেই বাড়ি ফিরে যাবে”
“আত্মীয়? তোর আবার আত্মীয় কবে হল? তাও আবার ভালো ঘরের … হাসালি রে ঘোতনা”
ঘোতন আর কথা বাড়াল না। বিট্টুকে নিয়ে অতি দ্রুত সেই স্থান পরিত্যাগ করল। বিট্টুকে সে কিডন্যাপ করেছে, এ ব্যাপারটা বোঝালে চলবে না। গ্রামের লোকেদের সন্দেহ হবার আগেই ওকে যা করার করতে হবে। বিট্টুর থেকে ওর বাবার মোবাইল নাম্বার জোগাড় করতেই হবে। অনেক টাকা কামানোর সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করা যাবে না।
কে এই ঘোতন? কি তার পরিচয়? এই নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।
ঘোতনের আমতার সন্তোষনগরের কাছে একটা গ্রামে বাস। ছোট্ট থেকেই তাদের ছিল অভাবের সংসার। ওর বাবা চাষাবাদ করত। আর পুজোর সময় ঢাক বাজাত। মাঝে মাঝে চুরি চামারিও করত। গ্রামের কিছু বদলোকের পাল্লায় পড়ে টুকটাক ডাকাতিও করত। আশেপাশে গ্রামের লোকজনের বিভিন্ন অভিযোগ আসত। ওর বাড়িতে হামলা চালাত। বেশ কবার জেলও খেটেছিল। একদিন ছোট্ট ঘোতনের সামনে ওর বাবাকে পিটিয়ে মারল পাড়া ও অন্য পাড়ার লোকেরা। ঘোতনের সামনেই হয়েছিল সেই নারকীয় ঘটনা, যা এখনো মনে আছে। বাবা মারা যাবার পর পাড়ার লোকেদের তাচ্ছিল্য আরও বেড়ে গিয়েছিল। ওকে দেখলেই বলত,
“চোরের ছেলে চোরই হবে। একটা কুলাঙ্গার তৈরী হবে”
গ্রামের বড়রা সকলকে ডেকে বলত,
“এদের ছায়া মাড়ানো পাপ। এদের এক ঘরে করে দাও”
ঘোতনের মা বেশ কয়েকটা বাড়িতে রান্না করত, ফাই ফরমাশ খাটত। সামান্য কিছু উপার্জনে ঘোতন ও ওর আরও দুই ছোট বোনের সংসার কোনওরকম টেনেটুনে চলত। পড়াশোনা সেভাবে ঘোতন করেনি। খুব ছোট থেকেই সেও বেশ কিছু বদসঙ্গদের পাল্লায় পড়েছিল। কালক্রমে সেও তার বাবার মতই অসৎ কাজে লিপ্ত হল। সংসারে অভাবের তাড়নায় সে নিজের পাড়ায় চুরি-চামারিতে জড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেভাবে কেউ ধরতে পারেনি। পাড়ার লোকের সন্দেহের তালিকায় ও সবসময় ছিল। তবে ঘোতন খুব চালাক ছিল। সে কাউকে বলার সুযোগ দিত না। এমনিতেই পাড়ায় সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলত। তাদের বিপদের সময় ছুটে যেত। কিন্তু চুরির সময় পাড়ার কোনও বাড়ির তোয়াক্কা করত না। সে অন্য পাড়ার গ্যাংদের সাথে কাজ করত। নিজের পাড়ায় খুব কম মেলামেশা করত। তবে পাড়ায় সব বাড়ির খোঁজ খবর রাখত। তক্কে তক্কে থাকত। যখনই কোনও পরিবারে ভালো কিছু হত, যারা আর্থিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্য হত, সে তার গ্যাংদের কাছে খবর দিত। ও পরিকল্পনা করে দিত। সেই অনুযায়ী তারা সেই সব পরিবারে লুঠপাট করত। ঘোতন শুধু নিজের হিস্যা বুঝে নিত। এমনকি ঘোতনের সেই গ্যাং কলকাতার কোনও এক প্রভাবশালীর নেতার সাথে যুক্ত হয়েছিল। সেই নেতার তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু অসামাজিক কাজকর্ম করত…
ঘোতন কি ধরণের কাজ করত?... এরপর অপেক্ষায় থাকুন ১৩তম পর্বের...
0 Comments.