- 56
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
সামনে এল নতুন বিপদ। ঘোতন কি করবে? পড়ুন ১৬তম পর্বে…
বিভাস পুলিশকে ঘোতনের নামে নালিশ করেছে। একটা বাচ্চা ছেলেকে কিডন্যাপ করেছে ঘোতন। অভিযোগটা যদিও সত্যি। কিন্তু বিট্টুর সাথে ঘোতনের এই মুহূর্তে যা সম্পর্কের সমীকরণ। তাতে বিট্টুকে ঘোতনই বেশী করে নিরাপত্তা দেবে। কাজেই পুলিশের জালে পড়লে চলবে না। বিট্টুও ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। সে ঘোতনকে জিজ্ঞেস করে,
“কে এসেছিল ঘোতনকাকা? ওই লোকটা কি তোমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে? তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকব? আমাকে কে দেখবে?”
বিট্টুর কথায় ঘোতনের ভীষণ কষ্ট হল। সত্যিই তো! ওকে পুলিশ ধরলে বিট্টুকে কে দেখবে? প্রথমে ও যে উদ্দেশ্যে বিট্টুকে নিয়ে এসেছিল। সেই একই উদ্দেশ্যে বিট্টুকে অনেকেই কিডন্যাপ করতে পারে। নয়তো পুলিশের সাহায্যে বিট্টুকে ফিরে যেতে হবে নিজের বাড়িতে, সেখানে আছে শয়তান সৎ মা। ঘোতনের অনেক কিছু ভাবনা মাথায় আসছে। এমন সময় গ্রামে ঘোতনের ঘনিষ্ট এক বন্ধু এসে বলল,
“ঘোতন, এক্ষুণি এখান থেকে পালিয়ে যা। এই বিভাসের লোকেরা পুলিশকে খবর দিয়েছে। ওরা এখানেই আসছে। তোকে তুলে নিয়ে যাবে”
না, আর ভাববার সময় নেই। ঘোতন এবার বিট্টুকে বলল, “এবার তৈরী হয়ে নে বিট্টুসোনা। আমি একটা জায়গায় তোকে নিয়ে যাব”
বিট্টু বলল, “কিন্তু যাবে কোথায়?” যদিও সে বলল, “আমার হরিদাদুর নাম্বার মনে আছে। ঘোতনকাকা, দাদুর কাছে যাবে?”
“হরিদাদু আমাকে দেখেই সন্দেহ করবে, বিট্টু। এখন ঐদিকে গিয়ে লাভ নেই” তারপর বিট্টুকে আদর করতে করতে বলল,
“আপাতত এগিয়ে চলি আমরা স্টেশনের দিকে। তারপর মাঠ পেরিয়ে হাইরোড। একটা যাহোক কিছুতে উঠে পড়ব। তারপর ভাবছি, আমার বড় বোনের বাড়িতেই চলে যাব। জানি, সে আমাকে দেখে একটু ঝামেলা করবে। একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাছাড়া সবাই জানে, আমার সাথে বোনেদের সম্পর্ক নেই। ওখানে গেলে কেউ সন্দেহ করবে না। সেখান থেকেই আমি তোর সাথে বসে প্ল্যান করব, তোকে কিভাবে হরিদাদুর কাছে নিয়ে যাওয়া যায়”
বিট্টু যেদিন রাতে বেরিয়ে গেল। কেউ ঘূনাক্ষরে ভাবতে পারেনি, বিট্টু এইভাবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। তারপরের দিন বাড়ির কাজের লোক মিনতি ঘুম থেকে উঠে দেখে বাড়ির মূল দরজা খোলা। বেশ অবাক হয়ে গেল। এদিক ওদিক দেখার পর বিট্টুর ঘরে গিয়ে দেখল সেখানে বিট্টু নেই। বিট্টুকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার করে ডাকতে থাকে,
“ও দিদিমণি, ও দাদাবাবু, সর্বনাশ হয়ে গেল। বিট্টুকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না”
চিৎকার শুনে কমলের ঘুম ভেঙে গেল। সে রত্নাকেও ডাকল। রত্না ঘুমের ঘোরে বলল,
“কি হল?”
“মিনতি বলছে, বিট্টুকে কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না”
“ভালোই হয়েছে। আপদ বিদায় হয়েছে”
“কি বললে?”
রত্না সত্যি কি বলল? রত্না ধড়ফড় করে উঠে কমলকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“সত্যিই তো কি বললাম আমি? আমার ছেলেটা কোথায় গেল?”
ন্যাকামো করে সে আদিখ্যেতা করে মায়াকান্নায় ভেঙে পড়ল।
“ও আমার বিট্টুরে, তুই কোথায় গেলি সোনা? আমার উপর এত রাগ তোর? আমি বলেই ছিলাম, এই বাড়ি থেকে চলে যাব। তুই আমাদের ছেড়ে কোথায় গেলি রে?”
কমল রত্নার কান্নাতে বিরক্ত বোধ করল।
“প্লিজ, তুমি একটু চুপ করো। দেখি কি হল?”
কমল সারাবাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজল, বিট্টু কোথাও নেই। নিজের উপর তার ভীষণ রাগ হচ্ছে। কেন যে গতরাতে ওকে মারধর করতে গেল, মহাচিন্তায় পড়ে গেল। দেখতে দেখতে সকাল হয়ে বেলা গড়িয়ে এল, বিট্টুকে পাওয়া গেল না। কমল তার প্রথম স্ত্রী তন্দ্রার বাড়িতে কল করল,
“হ্যালো, বাবা… বিট্টু কি আপনার বাড়ি গেছে?”
“না তো। আমি অনেকদিন বিট্টুর সাথে কথা বলিনি। কেন কি হয়েছে? তোমার সাথে এই ব্যাপারে অনেক কথা আছে। কিন্তু বিট্টু কোথায়? পুলিশকে জানিয়েছ? অন্যান্য জায়গায় ফোন করে দেখেছ?”
“আমি দেখছি। আমি সব জায়গায় কল করে দেখছি। যদি বিট্টু আপনার কাছে আসে, প্লিজ আমাকে জানাবেন”
কমল কল কেটে দিল। এরপর সে হরিদাদুর বাড়িতে কল করল,
“হ্যালো, কাকাবাবু, বিট্টু কি আপনার বাড়িতে গেছে?”
“সে আমার বাড়ি চেনে নাকি। কেন কি হয়েছে?”
“বিট্টুকে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেল কিছুই বুঝতে পারছি না”
“আমি জানি এমন কিছু একটা হবে”
“কি জানেন? এমন কথা কেন বলছেন?”
“না, এমনিই বললাম। তুমি সব জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখ। আমি সময় করে যাচ্ছি তোমার বাড়ি”
“ঠিক আছে। আমি দেখছি”
কমল কল কেটে দিল। সে অন্যান্য আত্মীয়স্বজন, বিট্টুর বন্ধুদের বাড়ি সর্বত্র কল করল। কিন্তু বিট্টুর হদিশ কোথাও পেল না। সারাদিন কেটে গিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। রত্না মনে মনে বেশ খুশি হল, “আপদটা বিদায় হয়েছে” তবুও সে মন খারাপ করার ভান করে কমলের কাছে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি জানিনা, আমার বিট্টুকে যে করেই হোক, ফিরিয়ে আনো। ওর জন্যই আমার এই জীবন। ওকে ছাড়া কি করে থাকব?”
কমল, রত্নাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“আমি কি চুপ করে বসে আছি? সব জায়গায় কল করেছি। কিন্তু ছেলেটা কোথাও যায়নি। এবার পুলিশকে জানাতে হবে”
সর্বত্র খোঁজ-খবর নেওয়ার পর কমল অবশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হয়। থানার ওসি বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলী কমলের বিশেষ পরিচিত। রত্নাও যেতে চাইছিল। প্রথমে কমল আপত্তি করলেও রত্নার ন্যাকামো কান্নাকে সত্যি ভেবে কমল রাজি হয়। রত্নাকে নিয়ে ওসির কাছে যেতেই বিশ্বজিৎ বলল,
“আরে কমলবাবু যে, কি খবর বলুন? একেবারে বৌদিকে নিয়ে চলে এসেছেন? এনিথিং সিরিয়াস”
“হ্যাঁ বিশ্বজিৎবাবু। খুব সিরিয়াস। আমার ছেলে বিট্টুকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না”
“ছেলেকে নিশ্চয়ই বকাবকি করেছেন। এমন ধরণের কেস অনেকগুলো এসেছে। আজকালকার বাচ্ছাগুলো ভীষণ সেনসিটিভ। বাবা-মার বকুনিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে”
“তেমনই কিছু হয়েছে অফিসার। আমি গতকাল রাতে ওকে মারধোর করেছি”
“কেন?”
রত্না সেই সময় বলল,
“আমি তোমাকে কত মানা করলাম। আমার ছেলেটাকে ওইভাবে মেরোনা। আমার কথা শুনলে না।। এখন আমি কি করব? আমার ছেলেকে ফিরিয়ে না আনলে আমি কিছুই খাব না। আমার চোখের মাণিককে না দেখে কি করে থাকব বলতে পারেন অফিসার?”
অফিসার বিশ্বজিৎ, রত্নাকে শান্ত হতে বললেন,
“কি হয়েছে এক্সাটলি বলুন প্লিজ”
“ছেলেটা আমার সাথে কথা বলেনি। ওর বাবা বাড়িতে সদ্য ফিরে রাগারাগি করে বিট্টুকে প্রচণ্ড মারধোর করে। তারপর ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরে চলে গেল। সকালে উঠে কাজের মেয়েটা দেখে বাড়ির মূল দরজা খোলা। বিট্টুর ঘরে গিয়ে দেখে বিট্টু নেই। ওর চিৎকারে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়” রত্নার কথা শেষ হতেই কমল বলল,
“বিট্টু আমার প্রথম পক্ষের স্ত্রী। মা মারা যাওয়ার পর কেমন যেন চুপ হয়ে যায়। নতুন মা’র সাথে ভালোভাবে কথা বলে না। ওকে মেনে নিতে পারছিল না। আমি কেন যে ওকে মারধোর করতে গেলাম”
অফিসার বলল,
“খুব অন্যায় করেছেন। আপনাদের ওকে সময় দেওয়া উচিত ছিল। এইভাবে মারধোর করেছেন বলেই ও অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে”
কমল মাথা নিচু করে বসে রইল। রত্না মনে মনে বেশ আনন্দ পেল। যাক, দোষটা বিচ্ছুটার বাবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া গেছে। ওকে পুলিশ সন্দেহ করবে না। বিচ্ছুটা যেন না ফিরে আসে। কমলের এই সম্পত্তিতে এবার জাঁকিয়ে বসা যাবে।
অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন,
“আপনারা বিট্টুর কোনও ছবি নিয়ে এসেছেন? তাহলে আমাদের খুঁজতে সুবিধা হয়”
কমল ওর মোবাইল থেকে বিট্টুর বর্তমান ছবি অফিসারকে দিল। অফিসার বিট্টুর ছবি নিয়ে সাব-ইন্সপেক্টরকে আদেশ করলেন,
“এই ছবি সব জায়গায় সার্কুলেট করে দাও। কমলবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেখানে যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সব জায়গায় খোঁজ করতে বলে দাও। এমনকি ওনাদের বাড়ির ল্যান্ডফোন, কমলবাবুর মোবাইল সব কিছু ট্র্যাপ করার ব্যবস্থা করো”
অফিসার বিট্টুকে খোঁজার প্রয়োজনে যা যা করার করে ফেললেন।
বিট্টুকে অফিসার খুঁজে পাবে? … পড়ুন ১৭তম পর্বে…
0 Comments.