- 4
- 0
প্রমাণ
--ভুত আছে, আলবৎ আছে।
--প্রমান কোথায়?
--আছে, ভুরি ভুরি আছে।
--যেমন?
--যেমন আবার কি? অনেকেই ভুত দেখেছে, আমার বাবার পিসতুতো ভাইয়ের শালা তো ভুতের হাতেই মারা গেছেন। তারপর অনেক পোড়ো ভুতের বাড়ি এ শহরে আজও আছে, আমাদের পাড়ার ভাঙাচোরা শিবমন্দিরটার কথাই ধর না কেন! ওইযে আমাদের ভুতেশ্বরের থান! তারপর, ভানগড় দুর্গ, বেগুনকোদর.. নাম শুনিস নি বুঝি?
নিশ্চুপে দুই বন্ধুর বার্তালাপ শুনছিল কণিস্ক। এ ওদের রোজকার বারোমাস্যা। কোন ব্যাপারে একমত হয়না ধীরু আর শানু। একজন যদি বলে,
সুর্য পুর্বদিকে ওঠে, তো আরেকজন তৎক্ষণাৎ বলবে, বলবেই বলবে,
--আজ কিন্তু সুর্য উত্তরপুর্ব কোনে উঠেছিল, আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
তারপরেই শুরু হবে মুখেমুখে কুরুক্ষেত্র, যতক্ষণ না থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার, থুড়ি, আড্ডার তৃতীয় সঙ্গী কণিস্ক ওরফে কেন অন্য কোন প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করবে বা বিরক্ত হয়ে চলে যাবার ভান করবে। তবে আজ আর হাসি চাপতে পারলো না বেচারা। আজ আলোচনায় সেও মাথা গলিয়ে ফেললো, বললো,
--ভূতের ভবিষ্যত খুব খারাপ রে ভাই; ডিফরেস্টেশনের চোটে আর একান্নবর্তী পরিবারের দাদু ঠাম্মার অভাবে ওরা লুপ্তপ্রায়।
--ছ্যাঁচরামোর একটা লিমিট থাকে কেন, ভুত বলে কিছু নেই, তাই তো? অত হেলাচ্ছদ্দা করিস নে, সত্যিকারের ভুতের পাল্লায় পড়লে রামনাম করেও কেঁদে কুল পাবিনা বলে দিলাম।
রেগেমেগে নিজেই ক্লাবঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল শানু। দড়াম করে ক্লাবঘরের একপাল্লা দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। খানিকক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হো গো করে হেসে উঠলো কেন আর ধীরু। শ্রাবণের সন্ধ্যে। ট্যুইশন পড়ে ফেরার পথে অভ্যাসমত ওদের ঐক্যতান ক্লাবে ঢুঁ মারতে এসেছিল দু'জন। বর্ষার দিন বলেই হয়ত একা শানুই ক্যারামবোর্ডে ঘুঁটি সাজিয়ে তাই নিয়ে ব্যস্ত ছিল। খুব জোরে বাজ ডাকছিল, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল ঘনঘন। স্ট্রীটল্যাম্পগুলো জ্বলছিল না, ইনভার্টারের মৃদু আলোয় কেন জানিনা ভুত নিয়েই তর্কাতর্কি শুরু করেছিল দু'জনে। আসলে শানুটা রামভীতু, কলেজে ভর্তি হয়েও অন্ধকারে ভয় পায়, একা শুতে পারেনা, তাই ভুত বললেই যে ওর হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে সেটা জেনেই মজা করার লোভ সামলাতে পারেনি ধীরু।
--আরে পাগলাটা বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে গেল তো! এত খচাতে গেলি কেন?
--আমরাও তো আসতে আসতে ভিজে গেছি। ভাবলাম ক্লাবে একটু গল্পগুজব করে চা-টা খেয়ে ঘরে ফিরব, বৃষ্টির জন্য অন্য কেউ আসেনি দেখে শানুটার সাথে একটু মজা করছিলাম, ও যে এত সিরিয়াসলি নেবে কে জানত! আজ কেউ আসবে না মনে হয়, চল ঘরেই যাই চল।
ক্লাবঘরটা রামুদার পানের দোকানের লাগোয়া, রাত্রে দোকান বন্ধ করার সময় ওই দরজা বন্ধ করে দেয়। তাই খোলা ক্লাবঘর ফেলে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল দু’জনে, একই আবাসনে থাকে ওরা। ক্লাবঘর থেকে মিনিট দশেক হেঁটে ওদের পাঁচিল ঘেরা আবাসনে ঢুকতেই কেমন অন্যরকম লাগলো পরিবেশটা। বি ওয়ান বিল্ডিং-এর সামনে বেশ ভীড়, একটা এম্বুলেন্স দাঁড়ানো, কান্নার শব্দ… ধীরু ভীড়ের দিকে এগিয়ে গেল, কেন ভিড়ভাট্টার মধ্যে না গিয়ে ব্যাকপ্যাক থেকে মোবাইল বার করে স্যুইচ অন করলো। অঙ্কের স্যার ভীষণ কড়া, মোবাইলে চোখ রেখে অঙ্ক কষা পছন্দ করেন না, সোজা টার্মিনেট করে দেন, অথচ শিক্ষক হিসাবে ওনার খুব নামডাক আছে। তাই ধীরু মোবাইল নিয়ে যায় না, কেন ট্যুইশান সেন্টারে ঢোকার আগে ওর মোবাইল সুইচ অফ করে রাখে। মোবাইলে ৪৭টা মিসড কল। মায়ের, বাবার, দিদির, ক্লাবের শান্তনু, পরাগ, জাহাঙ্গিরের। দিদির মেসেজটা পড়তে পড়তে হিমেল স্রোত বয়ে গেল কেনের শিঁড়দাড়া দিয়ে,
--কোথায় আছিস? শিগ্গীর বাড়ি আয়। তোদের শানু আর নেই রে ভাই। বৃষ্টির জমা জলে ওভারহেড ইলেকট্রিক তার ছিঁড়ে পড়েছিল। খেয়াল না করে সেই জমা জলে পা রেখেছিল শানু। ওর বডি আনতে যাচ্ছে তোদের ক্লাবের সবাই। তাড়াতাড়ি আয়।
কেন আর ধীরু আর কোনোদিন ভুতে অবিশ্বাস করবে না, করতে পারবে না।
0 Comments.