Sat 17 October 2026
Cluster Coding Blog

হৈচৈ গল্পে দীপঙ্কর বৈদ্য

maro news
হৈচৈ গল্পে দীপঙ্কর বৈদ্য

ডানা ভাঙা রোদ্দুর

(উৎসর্গঃ প্রজ্ঞা-কে)

     শহরের এক কোণে পুরনো আমলের সেই এক চিলতে ছাদটা ছিল দীপার নিজস্ব আকাশ। সেখানে নীল শাড়ি পরে সে যখন দুহাত ছড়িয়ে ঘুরপাক খেত, বিকেলের মরা রোদে তাকে মনে হতো কোনো এক অচিন দেশ থেকে উড়াল শেষে জিরিয়ে নিতে আসা এক চঞ্চল শঙ্খচিল। পাড়ার লোক তাকে ডাকত 'চঞ্চল পাখি' বলে। পৃথিবীর ছন্দ যেন জেগে থাকত তার স্বাধীন কলকাকলিতে।

     রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোড়াসাঁকো ক্যাম্পাসের সেই লাল ইটের ধুলোমাখা সুর আর সাহিত্যের গন্ধে দীপা নিজেকে গড়ে তুলেছিল। বাংলায় এম.এ করার সময় তার মেধা শিক্ষকদের অবাক করে দিত। তারা বলতেন, "দীপা, তোমার কলমে ধার আছে। তুমি পিএইচডি করো, গবেষণায় তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।" দীপার চোখে তখন হাজারো স্বপ্ন। সে ভেবেছিল উনিশ শতকের নারী মুক্তি নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু জীবনের চিত্রনাট্য সবসময় নিজের কলমে লেখা যায় না। বিয়ের সানাই বাজার সাথে সাথেই সেই নীল আকাশটা ছোট হয়ে চার দেয়ালের ফ্রেমে আটকে গেল।

     স্বামী রতন মানুষ হিসেবে ভদ্র, কিন্তু তার মনটা ছিল এক নিরেট যান্ত্রিক গোলকধাঁধা। তার কাছে সংসার মানে একটি সুশৃঙ্খল ফ্যাক্টরি, যেখানে আবেগ বা মেধার কোনো ওভারটাইম নেই। বিয়ের প্রথম রাতেই যখন দীপা তার পিএইচডি-র আবেদনপত্রটি লাজুক হাতে রতনের সামনে রেখেছিল, রতন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিল,

"দেখো দীপা, বাংলায় পিএইচডি করে তো আর সংসার চলবে না। ঘর তো সামলাতে হবে সেই আমাকেই। ঘরের বউদের পণ্ডিত হওয়ার চেয়ে রান্নাঘরে পটু হওয়া বেশি জরুরি।"

     দীপার শ্বশুরবাড়িতে বই ছিল 'নিষিদ্ধ বস্তু'র মতো। দামী আসবাব আর শোপিসের ভিড়ে দীপার প্রিয় রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ কিংবা আশাপূর্ণা দেবীর বইগুলো ব্রাত্য হয়ে পড়েছিল। শাশুড়িমা দীপার প্রিয় বইয়ের স্তূপ দেখে নাক সিঁটকাতেন। এবং বিরক্ত হয়ে বলতেন, "কী হবে এসব আবর্জনা জমিয়ে? এগুলো তো উইপোকার আস্তানা। তার চেয়ে ঠোঙাওয়ালাকে ডেকে বিক্রি করে দাও, ঘরটা পরিষ্কার হবে।" দীপার বুকে তীরের মতো বিঁধতো এই কথাগুলো। যে বইগুলো তার প্রাণ, যা তার পিএইচডি স্বপ্নের সিঁড়ি ছিল, তাদের 'আবর্জনা' বলাটা সে মেনে নিতে পারছিল না।

     প্রতিটি অপমানের আঁচড় যখন দীপার বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছিল, তখন তার পাশে এসে দাঁড়াল দীপু—দীপার কলেজ জীবনের অভিন্নহৃদয় বন্ধু। দীপু নিজে একজন লেখক, বইয়ের নেশা যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। একদিন রতনের অগোচরে নিজের প্রিয় কয়েকশো বই ব্যাগে ভরে দীপা রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে জল, হাতে নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় পাণ্ডুলিপি।

     দীপু হাত বাড়িয়ে বইগুলো নিয়েছিল। সে দীপার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলেছিল, "দীপা, তুই ভেঙে পড়িস না। এই বইগুলো আমার কাছে আমানত রইল। বিদ্যা তো কেউ কেড়ে নিতে পারে না রে। তুই যেদিন চাইবি, সেদিনই ফেরত পাবি। এই অক্ষরগুলো একদিন আবার তোর কলমে প্রাণ পাবে।" সেই কঠিন সময়ে দীপু ছিল দীপার একমাত্র মানসিক অক্সিজেন। ফোনে অল্প সময়ের কথোপকথনে দীপু তাকে বারবার মনে করিয়ে দিত, "সূর্য মেঘে ঢাকা পড়ে, কিন্তু নিভে যায় না।"

     কিন্তু দিনের পর দিন অবহেলা আর রুটিনমাফিক খাটুনিতে দীপা বদলে যেতে লাগল। সেই চঞ্চল মেয়েটি হয়ে উঠল এক নিস্তব্ধ প্রতিমা। সকালে চা বানানো থেকে শুরু করে রাতে রতনের ফাইল গুছিয়ে রাখা—সবই সে করত রোবটের মতো। এক সময় তার হাসিমাখা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে এলো। চোখের জল ঝরতে থাকে অবিরত। ঠিক পাড়ার সেই দুখী মেয়েটির মতো, যে প্রতিদিন একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকার বিন্দুর দিকে।

    সে যেন নিজের ভেতরেই নিজে হারিয়ে যাচ্ছিল। যখন মনে হচ্ছিল জীবনটা এই চার দেয়ালের গণ্ডিতেই শেষ হয়ে যাবে, তখন দীপার কোলজুড়ে এলো একমুঠো রোদ্দুর। তার মেয়ে 'উজ্জয়িনী', ডাকনাম উজি। ছোট ছোট নরম আঙুল দিয়ে যখন উজি দীপার আঁচল আঁকড়ে ধরল, দীপা অনুভব করল এক তীব্র শিহরণ। সে বুঝতে পারল, তার নিজের গবেষণা হয়তো থমকে গেছে, কিন্তু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ থিসিস হলো এই মেয়েটি। উজির হাসির শব্দে দীপার পাথুরে মনের বরফ গলতে শুরু করল।

     উজির বয়স যখন চার, তখন একদিন এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। রতন অফিস থেকে ফিরে দেখল দীপা বিছানায় বসে উজিকে আর বর্ণপরিচয় নয়, বরং জীবনানন্দের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছে। রতন চিৎকার করে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই দীপা সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখে আজ আর জল নেই, আছে ইস্পাতকঠিন সংকল্প। সে শান্ত গলায় বলল, "আমি হয়তো তোমার আপত্তির কারণে ডানা মেলতে পারিনি রতন, কিন্তু আমার মেয়েকে আমি আকাশ চিনিয়ে দেব। আর তাকে আকাশ চেনাতে হলে আমার নিজের আকাশে আবার উড়াল দিতে হবে। আমি আমার পড়াশোনা আবার শুরু করছি।"

     দীপা তার বাড়ির নিচতলার অব্যবহৃত ছোট ঘরটিকে পরিষ্কার করে পাড়ার বাচ্চাদের পড়াতে শুরু করল। আর এই যাত্রায় পুনরায় সারথি হয়ে এলো দীপু। সে তার আলমারিতে পরম যত্নে আগলে রাখা দীপার সেই 'আবর্জনা' বলা বইগুলো নিয়ে ফিরে এলো। দীপু উৎসাহিত করে বলল, "এবার সময় হয়েছে। তোর গবেষণার বিষয় তো ছিল 'নারীর মুক্তি', এবার নিজের জীবন দিয়ে সেই মুক্তির সংজ্ঞাটা লিখে ফেল।"

     আজ দীপা আর সেই মুখচোরা গৃহবধূ নয়। দীপু আর উজির অনুপ্রেরণায় দীপা আবার তার পিএইচডি-র রেজিস্ট্রেশন করাল। সে এখন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তার থিসিসের বিষয় : 'সমকালীন সাহিত্যে ও সমাজে নারীর অন্তহীন লড়াই'। দীপু তাকে বইপত্র জোগাড় করে দেয়, আর উজি তার পড়ার টেবিলের পাশে বসে নিজের ড্রয়িং খাতার রঙে মাখামাখি করে। আজ দীপা আর সেই "দুখী মেয়েটি" নেই। সে এখন এক উজ্জ্বল রেখা হয়ে উজির হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

     সেদিনকার সেই চঞ্চল শঙ্খচিলটা হয়তো একবার ডানা ভেঙে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু আজ যে উড়াল দিচ্ছে, সে এক লড়াকু মা। যে বইগুলোকে একদিন অবহেলার চোখে অবজ্ঞা করা হয়েছিল, আজ সেগুলোই দীপার পিএইচডি-র রেফারেন্স বই হিসেবে টেবিলে শোভা পাচ্ছে। অন্ধকার চিরে দীপার জীবনে এখন শুধুই ঝকঝকে রোদ্দুর—যে রোদে ডানা ভাঙার কোনো ভয় নেই, আছে কেবল দিগন্ত ছোঁয়ার আনন্দ।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register