- 25
- 0
ধেড়ে শিশুদের গান
শিশুরা তাদের সাহিত্য তৈরি করতে পারে না, উপভোগ করে এবং তার থেকে নিজের মানস -জগত গড়ে তোলে । শিশু যত আবোল তাবোল চিন্তা করবে ,ততই তার মস্তিষ্ক গড়ে উঠবে, ভবিষ্যতে নিজেকে বিকশিত করতে পারবে । আর সেই দায়িত্বটা যারা কাঁধে তুলে নেয় ,তারাই ধেড়ে শিশু । এতে শিশুদের জগতে ধেড়েদের মনের জগত ঢুকে পড়ে বলেই অনেকে বলে শিশুরা যেহেতু শুনতে ভালোবাসে,তাই ওটা শ্রুতি সাহিত্য। তথাপিও বলতে হয়,ধেড়ে শিশুদের হাতে সব ছড়া শিশুতোষ বা শিশু ভোলানো ছড়া হয় না। কোনো কোনো ছড়া সব বয়সের সকলের হয়ে ওঠে। এমন একটা হতে পারে সুবল নস্করের লেখা " যা সত্য" ছড়াটি ।
বালুকণা চিক্ চিক্
পুঁ-গাড়ি ঝিকঝিক
ঘড়ি বলে টিকটিক
খুকু হাসে ফিক্ ফিক্ ।
কানাকানি ভাল নয়
বাজে কথা বেশি নয়
রোদে ঘোরা ভাল নয়
জলে ভেজা ঠিক নয় ।
ছড়াটার মধ্যে অদ্ভুত এক মাদকতার সৃষ্টি হয়েছে ধ্বনি বিন্যাসে, শব্দ চয়নের, তালের অন্তমিলে। এইসব শ্রুতির পাশাপাশি আছে ছবি । শ্রুতি -গতি - ছবি মিলে একটা অনন্য সম্পদ তৈরি হয় , যেখানে শিশু থেকে বয়স্ক সকলে ধেড়ে -শিশুর কর্মে মোহিত হতে বাধ্য । আর সেটা হয় মহৎ সৃষ্টি ।
" বালুকণা চিক্ চিক্ / পুঁ-গাড়ি ঝিকঝিক/ ঘড়ি বলে টিকটিক / খুকু হাসে ফিক্ ফিক্ । "
নিবিড় পাঠক নিশ্চিত বুঝতে পারছেন, এখানে অসংবদ্ধ চিত্র কোনো গল্প বলছে না। ছড়াকার যে সময়ে বসে লিখছেন, লেখার উপাদান সে সময়ের নয় - তাঁর শৈশবের। " পুঁ-গাড়ি ঝিকঝিক" সময়ের প্রাচীর ভেঙে খুকুর ফিক্ ফিক্ হাসির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। হয়তো বালুর চিক্ চিক্ আছে বর্তমানে। কিন্তু ঘড়ির টিকটিক তো যেতে বসেছে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। এই কোলাজের কেন্দ্রে আছে খুকুর হাসি । সব বিষম উপাদানের মধ্যে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করেছে অন্তমিলের অনুপ্রাস।
এই লেখাটির দ্বিতীয় ভাগে ছড়াকার নিজের ছড়া বলার বৈশিষ্ট্যে অন্য ভূমিকায় চলে গেলেন।
"কানাকানি ভাল নয় / বাজে কথা বেশি নয় / রোদে ঘোরা ভাল নয় / জলে ভেজা ঠিক নয় ।"
অনেকে ভাবতে পারেন জ্ঞান দিচ্ছেন। কেন দেবেন না? শিশুরা তো আমাদের নিজস্ব সম্পদ। তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কি কম ? যদি তাদের সঠিক বন্ধু হতে না পারি , তাদের সঙ্গে মিশে যেতে না পারি - তাহলে তা খাতায় কিম্বা মেমোরি কার্ডে শোভা হবে । তাদের আপন জন হলেই তারা নিশ্চিত আমাদের কথা শুনবে। সেই দায় ও দায়িত্ব থেকে আমরা নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়েছি অনেকখানি। তাই চারদিকে শিশুদের জন্য শিল্পগুলোতে দেখি কেবল বুদ্ধির জাদুতে মোড়া অর্থের কারবার। প্রথম পর্বের ওই উচ্চতার পাশে দ্বিতীয় তথা শেষ পর্বে ছড়াকার প্রায় বিপরীত দিকে হাঁটলেন কেন ? প্রথম পর্বে শিশুমন বশীভূত। এবার সে ছড়াকারের সঙ্গে একাত্ম। এবার যদি তাকে সতর্ক করার জন্য বলা হয় - কানাকানি ভাল নয়, বাজে কথা বেশি নয়। আশাকরি সে শুনবে। আজকাল সিনেমা, সিরিয়ালের দৌরাত্ম্যে শিশুরা সব অকালপক্ক ধেড়ে হয়ে যাচ্ছে। কানাকানি এখন সব শিশু ক্লাসের সাধারণ দৃশ্য । কানাকানি, ফিসফিস কারা করে ? তখন তারা কি বলে ? সহজেই অনুমেয় । শিশুরা গলা ছেড়ে কথা বলবে, ডাকবে - এটাই স্বাস্থ্য ও মনস্তত্ত্ব সম্মত। অথচ কানাকানি, ফিসফিস করতে শিখিয়ে আমরা তাদের মনে বিষ সঞ্চয়ের পথ প্রশস্ত করছি। তাই শিশুটা বাড়িতে বা পার্কে বা স্কুলে আপন খেয়ালে নেচে উঠতে পারে না, গান গেয়ে উঠতে পারে না। অথচ একটা শিশু ,সে বাড়িতে হোক আর যেখানেই হোক , আপন মনে গান গাইলে বা নাচলে বা ছড়া বললে ,তা দেখে ও শুনে আমাদের গ্লানি ভরা মনের গ্লানি সব ধুয়ে যায়, কিছুটা পবিত্র হয়ে উঠি ,আমাদের ঈশ্বর সান্নিধ্য ঘটে । এটা আমরা সব বাবা মা,দাদু দিদা চাই - কিন্তু ভবিষ্যতের স্বার্থে তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নিই। আমাদের অর্থ ,সম্পদ, মর্যাদা সব তো ডাক্তারের পুঁজি বৃদ্ধি মাত্র। কোনো বাবা মা শিশুদের রোদে পুড়তে বা জলে ভিজতে দেয় না। ওখানেও শিশুর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয় । কী আনন্দ যে আছে, বিশেষ করে বৃষ্টিতে ভেজার মধ্যে। এখানে কিন্তু ধেড়ে-শিশু-মন আর শিশুটি রইল না ।পিতা ,দাদু, দাদা হয়েই ধরা দিচ্ছে । তাই সামগ্রিক দিক থেকে এটা একটা প্রকৃত শিশু ভোলানো ছড়া বলতে আপত্তি নেই।
0 Comments.