Sat 03 January 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৩৩)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৩৩)

শহরতলির ইতিকথা

সজীবের স্ত্রী,আবার অন্তঃসত্ত্বা; সুতরাং, আবার বাপের বাড়ি; পর পর দুই মেয়ে; বোধহয়, পুত্রের আশায় ওরা দিন গুনছে, হয়তো, শ্বাশুড়ী-মায়ের অনুমোদনেই এটা ঘটে চলেছে; ফলতঃ সজীবের, এ সংসারের প্রতি টান ক্রমাগত কমে চলেছে, বললেই চলে।

       রাজীবের দিন যাপনে নেই কোনো ব্যতিক্রম---লক্ষ্য স্থির। বাড়িতে 'ঘোঘের'

বাড়াবাড়ি; এণ্ডি-গেণ্ডির দল বড় হচ্ছে, চেঁচামেচি বাড়ছে, অন্দরের গোপনতা, আজ রাস্তায় আলোচনার বিষয় বস্তু; ট্রেনের ডেলি প্যাসেঞ্জারেরা যাওয়া-আসার পথে, বাড়ির দিকে অবাক- বিস্ময়ে, তাকাতে তাকাতে যায়----মানুষের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা পশুত্ব ভাবটা, আজকাল মাঝে মধ্যেই গর্জন করে সংসারটাকে আদিম-অরন্যে রূপান্তিত করে চলেছে--শান্তি দূরস্থ; এণ্ডি-গেণ্ডিরা স্কুলে ভর্তি হয়েছে, তাদের বই-পত্র, খাতা-পেন্সিল, আরো কত কিছুর জন্য, রাজীবের কাছে তারা আবদার করে; রাজীব হাসিমুখে, তাদের সে আবদার মেটায়; স্কুলে তো পয়সা লাগে না--প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক।

তিনটে সহোদর-সহোদরা, স্কুলে যায়, একটা এখনও হাঁটিহাঁটি পা, পা-এর অবস্থায় আছে; শ্বশুর বাড়িতেও,

সহোদর-সহোদরার কথা উঠলেই সজীব লজ্জাবোধ করে, নিজেরও আবার তৃতীয়, এবারও যদি না পুত্র হয়, তবে!

    শ্বশুর বাড়ি থেকেই সজীব প্রায়ই কারখানায় যায়; এদিকে হাজরা মশাই ও হৈমবতীর মধ্যে প্রায়ই গোপন শলাপরামর্শ হচ্ছে; বাড়িতে একটা ভয়ানক কিছু ঘটতে চলেছে। রাজীব সংসারের ব্যপারে নিস্পৃয় থাকলেও বুঝতে পারে; থমথমে অবস্থা অনেক কিছু জানান দেয়, যেন প্রবল ঝড়ের পূর্বাভাস। এই দম বন্ধ করা অবস্থা থেকে মুক্তি, তাই নিজের পায়ে দাঁড়ানোই রাজীবের কাছে প্রথম ও শেষ কথা। হাজরামশাই'র কারখানায় সজীবের চাকরি হয়েছে,হাজরামশাই'র দৌলতেই সেটা হয়েছে বলে, হৈমবতীর অভিমত; অতএব সজীবকে এ সংসারের ভারও নিতে হবে; কিন্ত হায়! প্রশ্ন তো উঠবে, তোমার প্রতি কর্তব্য আশা করতে পারো, তোমাদের উৎপাদনের দায়ভার কেন সজীব নেবে! তোমরা দায়িত্বহীন হয়ে খাবারের মুখ বাড়িয়ে যাবে, আর প্রজন্মের উপর দায় ভার ঠেলবে, এই মানসিকতাই জন্মদাতা-জন্মদাত্রীর থেকে আজ আত্মজ-আত্মজাকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে।

      বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজীবের নতুন বন্ধু

হয়েছে;গ্রামের ছেলে সহদেব, কোলকাতার নিমতলার একটা মেস বাড়িতে থাকে; গ্রামের স্কুল থেকে স্কুল-ফাইন্যাল পাশ করে সে ঐ মেস বাড়িতে উঠেছে। কোলকাতার কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে সেও দিনের বেলায় এম কম ক্লাশে ভর্তি হয়েছে। রাজীব, দু-একদিন ওর মেসেও এসেছে: ওর একটা আলাদা ঘর আছে; গেস্ট হয়ে ওর ঘরে থাকা যায়। ফেরার পথে, দুজনে, হাঁটতে হাঁটতেই বড়বাজার পর্যন্ত আসে, তারপর হয় ছাড়াছাড়ি; মোটামোটি অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, তা হোক, রাজীবের সঙ্গে মনের মিল আছে,তাই বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে দেরি হয়নি।

     কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে, সেন্ট্রাল এক্সসাইজ এন্ড ল্যান্ড কাস্টম অফিসে, সাব-ইনস্পেটরের পদে নিয়োগ হবে। রাজীব দরখাস্ত পাঠিয়ে দিল। কয়েকদিন পরে হল লিখিত পরীক্ষা। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এবার হবে ফিজিক্যাল টেষ্ট: আর এ টেস্টের মধ্যে আছে, সাইকেল চালানোর দক্ষতা (সাইকেল প্রার্থীকে আনতে হবে), তারপর বুকের মাপ-জোক ও ভিক্টোরিয়া- মনুমেন্টের চারপাশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একপাক ঘোরা।

     যাই হোক, আগের দিন ট্রেনে করে সাইকেল নিয়ে, লিলুয়া স্টেশনে রাজীব নেমে পড়ে; কারন, হাওড়া স্টেশনে, বিনা লাগেজে সাইকেল নিয়ে গেলে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে বলে, লিলুয়া থেকে সাইকেল চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করার পর, সহদেব ও রাজীব হাঁটতে হাঁটতে সাইকেল নিয়ে, সহদেবের নিমতলার মেসের দোতলার ঘরে। পরের দিন ভোরে, আলিপুরের পিচ-ঢালা পুলিশ-ট্রেনিং গ্রাউন্ডে হবে সাইকেল চালানোর দক্ষতার পরীক্ষা ও অন্যান্য ফিজিক্যাল টেষ্ট।

      পরের দিন, প্রথমেই হল হাঁটার পরীক্ষা। এরপর,সবাইকে নিয়ে আসা হল, ট্রেনিং স্কুলে, শুরু হবে সাইকেল চালানোর দক্ষতা বিচার। রাজীব, মফঃস্বলের ছেলে; মাঠের পাঁচ-পাক, সাইকেল করে ঘুরতে, পাঁচ মিনিটও সময় লাগেনি। সহরের আনাড়িরা, উঠছে, পড়ছে; এসব করতেই তাদের সময় লেগে গেল প্রায় আধঘন্টা-টাক; এরপর, দু-হাত উপরে তুলে হল বুকের ছাতির মাপজোক।

পরীক্ষা শেষ; ফলাফল কাস্টম-হাউজের নোটিশ বোর্ডে টাঙ্গানো হবে। রাজীব, সাইকেল করে চলে এল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করতে; বেলায়, কোলকাতার রাস্তায় সাইকেল চালানো একটু কষ্টসাধ্য ব্যাপার, তা হোক, একটু হেঁটে, একটু সাইকেল করে, এভাবেই সে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে। বিকাল বেলায়, আবার হাওড়া স্টেশনের পর, একটু সাইকেলে, একটু হেঁটে, সে লিলুয়া পর্যন্ত এসে, ট্রেন ধরে বাড়ি এসেছে; চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে,বাড়িতে সবাই খুশি;আর রাজীব যে চাকরি পাবে, সবাই একরকম নিশ্চিত। কয়েকদিন দিন পরে হল ভাই-ভা। ঐদিন, ওর সময় দেওয়া হয়েছে, বিকেল চারটে; তো, রাজীব, যথারীতি ক্লাস করে,পৌনে-চারটের সময় পৌঁছে,নির্দিষ্ট ঘরের সামনে পাতা বেঞ্চে দেখলো,তখনও দুজন বসে আছে,ওরাও চাকুরি-প্রার্থী।সবার শেষে রাজীবের ডাক পড়লো। রাজীব ঘরের প্রবেশ পথে, "may I coming sir, বলে ভিতরে ঢুকে, বসতে না বলতেই, একজন ইনটারভিউয়ার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,

   "Do you know saitan sing"?

শয়তানের নাম শুনে একটু থতমত খেয়ে, নিশ্চিত হবার জন্য বলে, "pardon please". আবার প্রশ্ন, "Saitansing".

    সালটা ১৯৬২; চিনের সঙ্গে লাডাক সীমান্তে চলছে যুদ্ধ; ইন্টারভিউ নিচ্ছে,চাপদাড়ি, মাথায় বাঁধা পাগড়ি, অতএব নিশ্চয়ই কোনো পাঞ্জাবী সৈনিক, যুদ্ধে শহিদ হয়েছে, ভেবে নিয়ে সংঙ্গে সংঙ্গে বলে, "Probably, he was shot dead by the Chinese, details not known to me". সকাল, সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, ক্লাস করেছে, ঐ দিনের খবরের কাগজটা পড়ে উঠতে পারেনি; কাগজে, শহিদ শয়তান সিং'র মরদেহ নিয়ে দিল্লিতে শোক মিছিলের ছবি রয়েছে। যাই হোক, এর উত্তরটায়, সবাই খুশি, বললো,

  "Very smart boy you are.o.k."

   "Thank you, sirs", বলে বের হয়ে হাওড়া স্টেশন; তারপর, কাটোয়ার ট্রেন ধরে বাড়ি, না, শান্তির আবাসস্থল নয়, যেন ঘনঘন বজ্রপাতের মাঝে থেমে থাকার সময়ের সাময়িক বিরতির অনুভূত স্থিতি। এ চাকরিটা হলে, সে কয়েক মাসের টাকায় বইপত্র কিনতে পারবে, আবার সংসারে কিছু দিতেও পারবে; বাড়ি থেকে কলাপাতায় মুড়িয়ে, ন্যাকড়া জড়িয়ে রুটি নিয়ে যায়; কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তির তলায়, ঘাসের উপর বসে, সে টিফিন সাড়ে; অনেক সময়, সহদেবের পীড়া-পীড়িতে, ক্যান্টিনে বসে খায়; আলুর দম অর্ডার করে, তা সহযোগে, সহদেব, জেনারেল কারিয়াপ্পা (অন্য একজন বন্ধুর চেহারার জন্য রাজীবের দেওয়া নাম) ও রাজীব টিফিন সাড়ে।

       একদিন সজীবের সঙ্গে -ধর্মদাস হাজরামশাই'র বাদানুবাদ, মুখে মুখে হতে হতে, প্রায় হাতাহাতি পর্যায় পৌঁছে গেল, আর হৈমবতীও গলা ছেড়ে চীৎকারে পাড়া মাতিয়েছে; রাজীব আর থাকতে না পেরে, সজীবকে থামিয়ে বলে, "দাদা, তুই চলে যা, আমিও কোলকাতায় একটা মেসে থেকে যাবো, এ অবস্থা অসহ্য, তখনই নিষেধ করেছিলাম, শুনলে তো আর আজ এ অবস্থা হত না।"

    সজীব চলে গেছে, আর বাড়িমুখো হয়নি। রাজীব, কাস্টম-হাউজে চাকরি পেয়েছে; হাজরামশাই, তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে নিষেধ করেছে: ছোট-ছোট সহোদর-সহোদরার করুণ মুখ চেয়ে, সে এ বাড়িতে রয়ে গেল। হৈমবতী, দেশের বাপের বাড়িতে গেছে; যাওয়ার কারন, রাজীবের কাছে অজ্ঞাত; বাড়ির রান্নাঘর সামলাচ্ছে রজত। তার আর, লেখাপড়া হলো না, হবে কী করে, হেঁসেল সামলাবে, বাচ্চাদের দেখাশোনা করবে, না, বই'র পাতায় মন দেবে! স্বর্গাদপির আঁতুড় তুলতে তুলতেই তার শৈশব-কৈশোর গেল কেটে, পিতা স্বর্গ, স্বর্গাদপির সৌজন্য বলে কথা!

     রাজীব, কাস্টম-হাউজের সাব-ইনস্পেটরের পদে জয়েন করেছে; অফিস এখন কাস্টম-হাউজেই।

ক্লাসে, প্রক্সি দিচ্ছে সহদেব। অফিসে তো এখন কাজ নেই; তাই তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেড়িয়ে,সহদেবের মেসে গিয়ে, দৈনন্দিন ক্লাসের নোটস বুঝে নিয়ে, রাতের ট্রেনে ফেরা। আবার পরের দিন সকালের টিউশনি সেড়ে, তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে অফিস যাওয়া। ট্রেনেই, যেটুকু খাতার পাতায় চোখ বোলানো; সহদেব ও অন্যান্য সহপাঠীদের কাছে তার ঋণ অপরিশোধ্য। কয়েক দিন পর, নতুন সাব-ইনস্পেটরদের ডাক পড়লো কলেক্টর সাহেবের ঘরে; কয়েকজন তো খেলাধুলোয়পাওয়া মেডেল, সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছে; স্বয়ং কলেক্টর সাহেব ও অতিরিক্ত কলেক্টর মশাই, সে সব দেখে পোস্টিং'র ব্যবস্থা করছেন। যারা স্পোর্টসম্যান, তাদের পোস্টিং হল কোলকাতায়। রাজীবকে জিজ্ঞেস করা হল, "are you sportsman?"

  রাজীব উত্তর দিল, "yes, surely a sportsman, but sportsman in spirit", কারন, ওর তো মেডেল, সার্টিফিকেট নেই। শুনে, ওর পোস্টিং হয়ে গেল, কোলকাতার বাইরে, উলুবেড়িয়া-ফুলেশ্বর সেক্টরে; থাকার ব্যবস্থা হয়েছে বাউরিয়া কটন মিলের সৌজন্যে একেবারে কারখানার চীফ-ম্যানেজারের বাংলোর পাশেই একটা একতলা বাংলোয়; রাজীবের জন্য পড়াশোনার টেবিল থেকে আরম্ভ করে সব রকম সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছে কটন-মিল। কোম্পানি, সর্বক্ষণের জন্য লোকের ব্যবস্থা করেছ। সে, এসে রান্না করা থেকে আরম্ভ করে সব কিছুই করে, অর্থাৎ কোম্পানি, অফিসারদের খুশি রাখার আপ্রাণ ব্যবস্থা করেছে, বিনিময়ে---, না, রাজীবের অত মাথা ব্যাথা নেই।

    সবচেয়ে মজার ব্যাপার, প্রথম দিন বাড়ি থেকে বাউরিয়া যাচ্ছে; এই প্রথম সাউথ-ইস্টার্ন রেলের লাইনে যাচ্ছে; হাওড়া থেকে ঐ সময় যাবার লোক কম, তাই কামরায় অল্প কয়েকজন আছে। বাউরিয়া স্টেশন এলে, রাজীবকে নিয়ে তিনজন কামরা থেকে স্টেশনে নামলো; একজনকে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা দাদা, কটন মিলটা কতদূর?" লোকটি তো মেজাজ নিয়ে বললো, "এগিয়ে যান, ঐ রাস্তা ধরে।" রাজীব, স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রিক্সার সঙ্গে কথা বলছে, এমন সময় ঐ লোকটি এসে কোম্পানিতে যাওয়ার কারন জানতে পেরে বলে "স্যার, রিক্সা করতে হবে না, এই মিনিট পাঁচেকের পথ, আমি আপনার অফিসের সিপাহি; "রাজীব বুঝলো, ধুরন্ধর লোক, সিপাই'র তো সব সময় কারখানায় থাকার কথা, না, উনি, কোলকাতা থেকেই যাতায়াত করেন, মাঝে মাঝেই ডুব দেন, নিজের জন্য বরাদ্দ ঘরটিকে ভাড়া দিয়ে দিব্যি কোলকাতা থেকে আসা-যাওয়া করছেন; খবর পেয়েছেন, নতুন অফিসার আজ জয়েন করতে আসছেন, তাই, সময় মত আফিসে আসছেন। এক্সসাইজ অফিসারদের বাংলো, তো কারখানার বাইরে, যেতে গেলে তো কারখানার পাঁচিলের পাশ. দিয়ে যাওয়ার রাস্তা দিয়ে যেতে হবে এবং ওদের সামনে কারখানার থাকা গেটের ভিতর দিয়ে গেলে, অল্প হাঁটতে হবে, আবার, ভিতরের অফিসটাও দেখা হয়ে যাবে; অফিসে জয়েন করে, পরে বাংলোয় যাওয়া স্থির করলো। সেই সিপাহি-ই তো এখন রাজীবের পথ-প্রদর্শক, গার্জেনের ভূমিকায় রয়েছে; কারখানার গেটের সামনে থাকা দারোয়ানকে বললো, "গেট খোলো, সাব আয়া হ্যায়;" দারোয়ান তো

সিপাহিকে চেনে, তার হম্বি-তম্বিতে, গেট খুলেই, খটাস করে সেলাম, রাজীবও সেলাম করে কৃত্রিম গাম্ভীর্যে এগিয়ে চলে। কারখানায় ওদের অফিসে, তখন কেউ নেই; ভিতরের চেয়ারে বসিয়ে, সিপাহি মশাই চলে গেল, নতুন সাহেবের খাবারের ব্যবস্থা করতে; কোম্পানির ক্যান্টিনে খবর দিল, সাহেব এসেছে, খাবারের একটা থালি পাঠাতে হবে। কিছুক্ষণ পরে, ওর সহকারী, কারখানার বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ভিজিট সেড়ে, অফিসে এলে, পরিচয় সম্পন্ন হল।

"আমি---হালদার, আরো একজন আছে,সে ফুলেশ্বরের ফাউন্ড্রী কারখানায় ভিজিট করতে গেছে; আপনাকে নিয়ে আমরা তিনজন হলাম।

সুপারিন্টেন্ডেন্ট মশাই, বলে গেছেন, যে আপনি আজ জয়েন করবেন; আপনার থাকার ব্যবস্থাও উনি করে গেছেন; আমরা এক সঙ্গেই থাকবো। আজ এখন এদের খাওয়া খান, পরে রাত্রিবেলা আমাদের ঘরে একসঙ্গে খাবার ব্যবস্থা হবে, বলে সিপাহিকে সম্বোধন করে, রাজীবের খাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলতেই, সিপাহি মশাই, বলে, 'সব ব্যবস্থা আমি আগেই করে রেখেছি'; হ্যাঁ, তুমি তো ওস্তাদ লোক হে, "বলে হালদার হেসে দিল রাজীব, অফিসের ফর্মালিটি পূরণ করে ক্যান্টিনের অখাদ্য খাবার কিছুটা খেয়ে, বুঝলো, কেন এরা কেউ ক্যান্টিনের খাবার খায় না। সিপাহি মশাই, দেখা দিয়েই আবার স্টেশন।

বিকেল বেলায়, নিজেদের জন্য বরাদ্দ বাংলোয় যাওয়া--রাজীবের শুরু হল নতুন জীবন-ধারা; সামনে ভাগীরথীর জলের ছলাৎ, ছলাৎ, দূরে দেখা যায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ছোটো জাহাজ, হুগলি-নদীর ওপারে বজবজ (কোলকাতা-এরিয়া), এপারে বাউরিয়া, হ্যাঁ, এটা মফঃস্বল, সুতরাং, তার মাস-মাইনে গেল কমে, সিটি- এলাউন্স তিরিশটাকা আর মিলবে না।

    পরের দিন, সুপারিন্টেন্ডেন্ট এলে, ঠিক হল, তিনটে পর্যন্ত অফিসে থেকে রাজীব, ট্রেন ধরে কোলকাতার নাইটে  ক্লাস করবে, সপ্তাহের শেষে শনিবার বাড়ি যাবে, আবার সোমবার দশটার মধ্যে এসে অফিসে বসবে। অন্যরা, অন্যদিন বাড়ি যাবে, নিজেদের মধ্যে, একটা বোঝাপড়া করে নিল। রাজীবের তো কোনও ট্রেনিং হয়নি, তাই, সুপারিন্টেন্ডেন্ট বলে দিয়েছেন, পুরোনো দু'জনের একজন না থাকলে, যেন রাজীব কোনো পেপারে সই না করে। ম্যানুয়েলটা ভালো করে পড়ে নিতে উপদেশ দিয়েছেন। শিক্ষানুরাগী, রাজীবের পড়াশোনার জন্য খুব খুশি। বিকেল তিনটেয় অফিস থেকে বেড়িয়ে ট্রেন ধরে কোলকাতায় এসে ইভনিং সেকসনে এম-কমের ক্লাস করা হল শুরু। দিনের বেলা, সহদেবও অন্য বন্ধু, জেনারেল কারিয়াপ্পা প্রক্সি দিয়ে চলেছে। রবিবার দিন রাতে বাড়ি থেকে সহদেবের মেসে থেকে দু'জনে পড়াশোনা করে, সকাল বেলা মেস থেকেই চলে আসা বাউরিয়ায়, চলছে ব্যস্ততম জীবন-চর্চা, এক নতুন জীবন-ধারা।

চলবে

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register