Fri 23 January 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৩৬)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব - ৩৬)

শহরতলির ইতিকথা

গ্রামের বাপের বাড়ি থেকে হৈমবতী ফিরে এসেছে; আবার সংসারের হাল ধরেছে, কেনই বা গিয়েছিল, তা রাজীব-রজতের কাছে অজ্ঞাত। রাজীব, শনিবার রাতে আসে, আবার পরের দিন বিকেলে চলে যায়; মাসে সংসারে পঁচাত্তর টাকা করে দিতে পারছে; সংসারে, ওর গুরুত্ব বেড়েছে; সহোদর-সহোদরাদের জন্য কাপড়ের ফেন্স এনে দিয়েছে; হৈমবতীর জন্য কাপড়ের দড়ির ব্যান্ডিল এনে দিয়েছে, বর্ষার সময় তা খাটিয়ে বারান্দায় জামা-কাপড় শুখোনেতে কাজে লাগবে। সংসারের প্রচণ্ড আর্থিক টানাটানির সময়, রাজীবের দেওয়া টাকা বিস্তৃত মরুতে দীর্ঘকাল হাঁটার পর, পথিকের কাছে মরূদ্যান দেখার মতনই বোধ হচ্ছে।

       বাউরিয়া কটন মিলের কোয়ার্টার থেকে, রাজীব যথারীতি কোলকাতায় ক্লাস করছে; ফিরতে ফিরতে, অনেক সময়, রাত এগারো-সাড়ে এগারোটা হয়ে যায়; রান্নার লোক কাঙালীচরন, তাকে খাবার দিয়ে, সব কিছু গুছিয়ে, তবেই বাড়ি যায়; রাজীবের জন্য সে বসে থাকে, সেই প্রথম রাজীবকে ডিমের সঙ্গে আলু চটকে একটা সুন্দর পদ তৈরি করে খাওয়ায়; লোকটির মধ্যে পিতৃসুলভ আচরন সে অনুভব করে।

সকাল বেলায়, ব্রেক ফাস্ট করতে যাবার সময়, কোম্পানির উচচ-পদস্থ অফিসারেরা, নিজেদের কোয়ার্টারে যাওয়ার পথে, ওদের ডাক দিয়ে গেলে, কখনও কখনও হালদার বলে, "চল, আমরাও ফল খেয়ে আসি; আমাদের যা সাধ্য, তাতে তো টমাটো ছাড়া আর কিছু হওয়ার কথা নয়। " রাজীবদের কাছাকাছি, পোস্ট-মাষ্টারমশাই'র কোয়ার্টার; ওরা, অনেক সময়, ওনার বাড়িতে চা খায়; সবাই কেন্দ্রীয় সরকারের লোক, অর্থাৎ, ঐ টমাটো খাওয়ারই সাধ্যায়ত্ব বেতন, ফলে ওদের মানসিকতায় মিল আছে; অন্তরে আছে, মোটা বেতনের অবাঙালি কোম্পানির অফিসারদের প্রতি পুঞ্জীভূত ঈর্ষা।

     একদিন সন্ধ্যাবেলায়, হালদার হঠাৎই বাড়ি গেল। অফিসে রাজীব একা আছে; অফিসের দৈনন্দিন ডায়েরিটা লেখা হয়ে গেছে; বিশ্ববিদ্যালয়েরও ক্লাস নেই ; অফিসে বসেই সে ক্লাসের নোট্সগুলো দেখছিল। কোম্পানির ক্লথ সেকসনের প্রোডাক্টশন ম্যানেজার, অফিসে এসেই রাজীবকে স্যালুট জানিয়ে, কিছু কাগজ-পত্র টেবিলের উপর রাখলো, একটা নতুন ক্লথের প্রোডাক্টশন শুরু হবে; পরের দিন, ফ্যাক্টরীর বাইরে লরি বোঝাই হয়ে বেরিয়ে যাবে। টেবিলের উপর ক্যাপস্টান সিগারেটের প্যাকেটটা রাখলো, সেটা যে স্যারের জন্যই আনা, তা বলাই বাহুল্য; নতুন কিছু প্রডাক্টশন শুরু করলেই, সেটা এক্সসাইজ-অফিসের নজরে আনতে হয়; কিছু কাপড়ের উপর ডিউটি ছাড় আছে, আবার অন্যান্য ক্ষেত্রে রপ্তানির উপর তো ডিউটি ড্র-ব্যাকেরও সুযোগ আছে। রাজীব তো, কাজ সেরকম শেখেনি, আবার ম্যানেজারের সামনে, নিজের অজ্ঞতা জানান দেওয়া যাবে না; যাই হোক সুপারিন্টেন্ডেন্ট মশাই'র সাবধান বানী বিস্মৃত হয়ে, ঘ্যাম দেখিয়ে কাগজে সই করে দিল। পরের দিন, গেট -পাস করার সময় সুপারিন্টেন্ডেন্ট মশাই বললেন, "রাজীব, আজ তুমি সরকারের কয়েক লক্ষ টাকা জলে দিচ্ছিলে, ভাগ্যিস আমি, হালদারের ডায়েরিতে স্টেশন লিভের খবরটা পেয়ে, রাতের কাজগুলো খুঁটিয়ে দেখলাম, গতকালের কাপড়গুলো সব ডিউটিএবেল (ট্যাক্সের আওতায়), তুমি, ডিউটি-ফ্রি বলে উল্লেখ করে, সই করে দিয়েছো। যাক, এরপর, ওদের অপেক্ষা করতে বলবে, সই করো না। "রাজীবের প্রেষ্টিজে লেগেছে; হালদার এসে গেছে। রাজীব, ফ্যাক্টরীর বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে রাউন্ডে যাবার সময় ম্যানুয়েলটা সঙ্গে নিয়ে গিয়ে প্রডাক্টশন ম্যানেজারকে বললো, "এই বেলটা খুলিয়ে, হাম ইসকো চেক করে গা। :" প্রতিটি বেলে, একশো পিস ক্লথ আছে, সব পলিথিন প্যাকেটে মোড়া। অফিসের লোক, বেল খুলে, একটা, একটা পিস- ক্লথের পলিথিন- প্যাকেট ছিড়ে, টেবিলের উপর রাখছে, আর, রাজীব ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে এক বর্গ ইঞ্চিতে ব্রেডথ-ওয়াডথ (টানা-পোড়েন)পরীক্ষা শুরু করলো। প্রডাক্টশন ম্যানেজারের লোক, খুলছে, আর রাজীব পরীক্ষা করে নিজের ডায়েরিতে, কোন বেল থেকে সে পরীক্ষা করেছে, তার নং, লিখে চলেছে। এ রকম কয়েকদিন চলার পর, বুঝলো, হালদার ও আর একজন সহকর্মী-অফিসারের মুখ ভার; ওরা মুখে কিছু বলতে পারছে না, কিন্ত তারা যে রাজীবের কাজে অসন্তুষ্ট, তা তাদের ব্যবহারে প্রকাশ পাচ্ছে।

       একই সঙ্গে থাকা, একই টেবিলে খাওয়া, অথচ, গম্ভীর মুখ, তো দম বন্ধ করার মত পরিবেশ; না, সরাসরি রাজীব প্রশ্ন করে, "আচ্ছা বলতো, তোমাদের সঙ্গে, কোম্পানির কোনো অলিখিত সমজোতা আছে কি?, না হলে, তোমাদের স্বাভাবিক ব্যবহার পাল্টানো কেন?পরিষ্কার করে বলো, আমি তো ম্যানুয়ালের নির্দেশ মেনে চেকিং করছি"।

  হালদার ও অন্যজন বললো, "করতে পারো, কিন্ত, কোম্পানির উৎপাদন ব্যহত করতে পারো না। "রাজীব প্রশ্ন করে, "মানে, কোম্পানির লোক, তোমাদের বলেছে, কিন্ত, আমায় তো বলেনি; অর্থ দাঁড়ায়, কোম্পানির খাম আসে মাসের শেষে, তোমাদের কাছে; তা বুঝতে আমার আর অসুবিধা নেই, এধরনের মানসিকতা আমার নেই; ভয় নেই, আমি রেজিগনেশন দিচ্ছি, এ অপরাধ বোধ নিয়ে চাকরি, আমি করি না। " এক মাসের নোটিশ দিয়ে রাজীব ইস্তফা পাঠিয়ে দিয়েছে।

মাসের শেষে, রাজীব, নিজের দায়িত্ব বুঝিয়ে, বাড়ি চলে এলো। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি, কেউ ছাড়ে, এ তো মূর্খামি, লোকের মুখে শুনলেও, রাজীব, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে, পোস্ট-গ্রাজুয়েট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বদ্ধপরিকর। আর মাস তিনেকের পরই পরীক্ষা; এ পরীক্ষায় ফল, ভালো করতে পারলে, অধ্যাপনা, নিদেনপক্ষে ভালো স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেতেই পারে। বাড়িতে, অর্থের যোগান বন্ধ, বিরূপ প্রতিক্রিয়া যে হবে, তা তার অজানা নয়। আবার সেই বন্ধুর দোকানে সকাল, দুপুরে পড়া, মন্ত্র সেই 'করেঙ্গে অউর মরেঙ্গে'।


চলবে

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register