- 27
- 0
শহরতলির ইতিকথা
রাজীব, ইস্কুলে এসে হেড-মাস্টার মশাই'র সঙ্গে দেখা করার পর,স্টাফ রুমে অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচিত হল;হেড-মাস্টার মশাই ,রাজীবকে সঙ্গে নিয়ে,ইলেভেন ক্লাসে,ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে,রাজীবকে ক্লাস চালিয়ে যাবার কথা বলে চলে গেছেন। ডায়াসে, রাজীব দাঁড়িয়ে;সামনে রয়েছে, বেঞ্চে প্রায় চল্লিশজন ছাত্র-ছাত্রী;এখন ওদের ইকোনমিক্স'র ক্লাস;ম্যালথাসের পপুলেসন থিয়োরী-অপটিম্যাম পপুলেসন থিয়োরী আলোচনা হতে হতে,আগের শিক্ষক চলে গেছেন। রাজীবের প্রায় সমবয়সী বা দু'তিন বছরের হয়তো কম হবে, ডায়াসের নিচে বেঞ্চে বসা ছাত্র-ছাত্রীর দল।তাদের সঙ্গে মোটামুটি পরিচিতি সেরে, কুশারী স্যারকে স্মরণ করে চললো, উদাত্ত কন্ঠে বক্তৃতা; ডায়াসের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে পদ-চারনা,কখনও ইংরেজী,কখনও বাংলা,আবার বোর্ডে চললো চক দিয়ে আঁক।সে সময় অপটিম্যাম পপুলেসন থিয়োরীকেই সমর্থন করা বই-ই বোর্ডের অনুমোদিত; এবং সেই সব বই-ই স্কুলে পড়ানো হোত; ম্যালথাসের বিরুদ্ধাচরন করে বলা হোত ,মানুষ শুধু পেট নিয়েই জন্মায় না,দুটো হাত নিয়েও জন্মায়। রাজীব, তার জীবন-বোধে যে শিক্ষা পেয়েছে,তাতে কঠোর জন্মনিয়ন্ত্রনের পক্ষের মতই তার মনে প্রোথিত;এবার বই'র বাইরে,সে বলতে আরম্ভ করলো,ঠিকই দুটো হাত থাকে বটে, মানব সম্পদ তো! কিন্ত তা সময় সাপেক্ষ;আজ যে শিশু জন্মায়,সে তো ভবিষ্যতের মানব সম্পদ,কে তাকে সম্পদে পরিণত করবে ? হায়,নির্বিচারে পশুর মত মৈথুন আর উৎপাদন যে সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর,তা তো,অকাল শিশু মৃত্যুর হারের উদাহরণ থেকে পরিস্ফুট; ক্ষুধার্ত মানুষ রয়েছে;রোগ-বালাই'র প্রাদুর্ভাব রয়েছে; এগুলো কি প্রমাণ করেনা,ম্যালথাস থিয়োরী কতটা প্রাসঙ্গিক? তাই তো উন্নয়নকালে, জন্মনিয়ন্ত্রনের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত;দেখ, চীন ,আমাদের পরে স্বাধীন হয়েছে; কম্যুনিস্ট দেশ হওয়া সত্ত্বেও,শ্লোগান, "হাম দো হামারা এক,আর আমার দেশে----!" ছাত্র-ছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে সে সম্বিতে ফেরে; নিজের জমা ক্রোধ,ক্ষোভ,লাভার মতই সুযোগ পেয়েই উৎগীরণ করতে সুরু করেছিল।
ভাগ্য ভালো,ক্লাস শেষের ঘণ্টা কখন বেজে গেছে; পরের ক্লাসের টিচার,চক-ডাস্টার নিয়ে, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে;রাজীব,অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলে,"প্রথম ক্লাস তো,আবেগ সামলাতে পারিনি।" ঐ শিক্ষক মশাই তো, টিফিন পিরিয়ডে,সব টিচারের সামনে রাজীবের ,জন্ম নিয়ন্ত্রনের মন্তব্য উল্লেখ ও এপ্রসঙ্গে ক্লাসে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখিয়ে এমন একটা আপন করে নেওয়ার সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করে,যে, সেদিনের কথা রাজীবের মনের মণি -কোঠায় হয়ে আছে অম্লান,অক্ষয়; বক্তৃতা দিতে পেরে, মনে মনে কলেজ জীবনের কুশারী স্যারকে প্রণাম জানায়।
মাস শেষ হয়ে গেছে।হেড-মাস্টার মশাই,রাজীবকে ডেকে বলেন,"স্কুলটা তো,সরকারী-এডেড ;এই মার্চ-এপ্রিল,দু মাস,সময় মত সরকারী- গ্রান্ট আসে না,মে মাস থেকে আবার সময় মত মাইনে হয়;এ দু'মাস স্কুলের জমা ফান্ড ও ছাত্রদের দেওয়া ফি থেকে সবাইকে কিছু কিছু টাকা দেওয়া হয়।তোমার মাইনের টাকাটা যদি কয়েকদিন পরে নিলে কি খুব অসুবিধা হবে? বয়স্কদের মোটামুটি দিয়ে,ব্যাচেলরদের কয়েকদিন পরে খেপে খেপে দিয়ে,এসময়কার অবস্থার সামাল দেওয়া হয়।তুমি,নতুন বলে,তোমাকে তিরিশ টাকা দেবার ব্যবস্থা করেছি;পরে পরে,ছাত্রদের ফি আদায় হলে,কিছু কিছু করে দেওয়া চলবে;গ্রাণ্ট এসে গেলে,সব দেওয়া হয়,আবার নিয়ম মত বেতন দেওয়া চলবে,বলে তিরিশটা টাকা হাতে দিয়ে,একটা এক্সসারসাইজ খাতায় সই করিয়ে নিলেন,বললেন,পুরো মাইনে হলে,মাইনের খাতায় সই করিয়ে নেব।" ।স্কুল-শিক্ষাব্যবস্থায়,শিক্ষার কারিগরদের আর্থিক অবস্থায় সে বিস্মিত হল।হায় রে!শরৎ চাটুজ্যে মশাই'র'পল্লীসমাজে'র কালে শিক্ষক মশাইদের অবস্থা এখনও বহাল!
ভারত-পাকিস্থানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীজি,জাতির প্রতি ভাষণে,দেশবাসীকে উদ্দীপিত করে বক্তব্য রেখেছেন;কাগজে ,মিলিটারিতে কমিশনড- অফিসার নিয়োগের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে;পশ্চিম-সেক্টরের মরু অঞ্চলে আমেরিকার প্যাটনট্যাঙ্ক ধ্বংস করতে ভারতের অনেক অফিসার শহিদ হয়েছে;ভারত,পাক-সেনাদের তাড়া করে লাহোরের পথে এগিয়ে চলেছে। রাজীব দরখাস্ত পাঠিয়েছে। চারদিকে সাজো সাজো রব,যুদ্ধের উত্তেজনায় আগুন পোয়ানো চলছে।
রাজীব,ট্যুইশানে পাওয়া টাকা থেকে বাড়িতে পুরো একশো টাকা দিয়ে বলেছে,কয়েকদিন পরে আরো একশো টাকা দেবে।
এবার কলেজের নিয়োগের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। রাজীব ,মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের একটা কলেজে ইন্টারভিউ দিতে চলেছে। রাতের লালগোলা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে যাবে;সময় রহেছে,একবার পূরোনো কলেজের মা স্টার মশাইদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। বাংলার অধ্যাপক মশাই,কলেজের নাম শুনেই বললেন,"আমার পুরোনো কলেজ,একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি;"টিচার-ইন--চার্চের নামে একটা চিঠি, খামে পুরে রাজীবের হাতের দিয়ে বললেন,"বেস্ট অফ লাক"।
পরের দিন সকাল বেলা ওখানকার স্টেশনে নামতেই,ওর ব্যাচের ক্লাসমেটদের সঙ্গে দেখা। সবাই ইনটারভিউ দিতে এসেছে;পরস্পরের খোঁজ নিয়ে,রাজীব রিক্সা ধরে,টিচার-ইন-চার্জের বাড়িতে,চিঠিটা দিয়ে, এসেছে কলেজের গেস্ট রুমে। ফ্রেস হয়ে,টিফিন খেয়ে,ইন্টারভিউ দিল;জয়েন করার জন্য একমাসের সময় নিয়ে বাড়িমুখী,মাইনে আর উল্লেখ করার মত নয়,এন-সি-সি'র দিকটাও দেখতে হবে,অবশ্য,ওর জন্য সরকার থেকে একটা আলাদা এলাউন্স দেবে।এখানেই থাকতে হবে,পরে কোয়ার্টার পাবে,অর্থাৎ বাড়ি ভাড়া,অথবা ছেলেদের হস্টেলে থাকার ব্যবস্থার,জন্য সুপারের সাহায্য নিতে হবে, ইত্যাদি,অর্থাৎ নূন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যাবে।
0 Comments.