- 3
- 0
ভদ্রলোকের ভাই'র টেবিল এটা, ভাই দু'মাস ছুটি নিয়েছে, বি,কম পরীক্ষার্থী; ভদ্রলোক, যাবার সময়, ভাইকে একটু ইনকাম-ট্যাক্সটা দেখিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করে গেল। রাজীব সম্মতি জানিয়েছে। একাউন্টান্ট মশাই, অন্য একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট একাউন্টান্টকে, কাজটা কী, বুঝিয়ে দেবার জন্য বলে, নিজের কাজে ব্যস্ত রইলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট মশাই, পেল্লাই সাইজের ক্যাসবুকটা এগিয়ে দিয়ে, সঙ্গে ফার্স্ট-ন্যাশালান সিটি ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্টগুলো ধরিয়ে বললেন, "ব্যাঙ্ক রি-কন্সিলিয়েসন স্টেটমেন্ট তৈরি করতে হবে। পাশে রয়েছে লেজার বই। রাজীব, থিয়োরী,পদ্ধতি, জানে কখনও হাতে কলমে করেনি, বা ব্যাঙ্কের স্টেটমেন্টও কখনও চোখে দেখেনি। যাই হোক, হার মানলে তো চলবে না; কিছু জিজ্ঞাসা থাকলে, অ্যাসিস্ট্যান্ট মশাই'র সাহায্য নিতে বলে, একাউন্টান্ট মশাই, চাটার্ড অ্যাকাউন্টান্ট মশাই'র চেম্বারে গেলেন।
রাজীব, স্টেটমেন্ট গুলোর কোনে কোথাও লালকালিতে কিছু লেখা, আবার কালো কালিতে,একই অঙ্ক দুবার লেখা দেখে, অ্যাসিস্ট্যান্ট মশাইকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি,মুখ বেজার করে উত্তর দিলেন, "এম কম পরীক্ষা দিয়েছেন, এটা জানেন না, লালকালিতে লেখাগুলো ব্যাঙ্ক -চার্জ, আর কালো কালিতে একই টাকা লেখাটা ভুল সংশোধন; এসব আবার পয়সা খরচ করে কেউ শেখে,ইত্যাদি "; এরপর, আর জিজ্ঞেস করতে রাজীবের প্রবৃত্তি হয়নি, নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করছে; টিফিন সময়ে অ্যাকাউন্টান্ট মশাই, ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে, চা খাওয়ালেন। অফিসের অনেক লোকের সঙ্গে পরিচয় হল; কেউ, কেউ প্রশ্ন করলেন, কার তদ্বিরে এখানে এসে পৌঁছালেন ইত্যাদি। যাই হোক, প্রথম দিন, মাত্র একমাসের রি-কন্সিলিয়েসন স্টেটমেন্ট তৈরি হল। পরের দিন, অ্যাকাউন্টাান্ট মশাই, কিছু ভাউচার দিয়ে, সেগুলো, ক্যাসবইতে, বিভিন্ন হেড-এ এন্ট্রি করতে বললেন, শিখিয়ে দিলেন, এবং বললেন," প্রাক্টিক্যাল একটু ভিন্ন, তবে, থিয়োরী জানলে, চট করে ধরে নিতে পারবেন।"
একাউন্টান্ট মশাই বোধ হয়, রাজীবের সম্বন্ধে কিছু বলেছেন, তাই চাটার্ড একাউন্টান্ট মশাই, প্রায়ই অফিসের কস্ট-সেভিং'র ব্যাপারে, রাজীবের সঙ্গে আলোচনা করেন, উনি জেনেছেন, রাজীব, কস্ট ইনস্টিটিউটের ছাত্র,পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অফিসের একজন লোক, দুপুর বারোটার কাছাকাছি সময়ে এসে, একদিন বললো, "গ্রেট-ইর্স্টান হোটেলের কাউন্টারে যাচ্ছি, সকলের জন্য প্যাট্রিস আনতে, তুমি চারআনা পয়সা দাও, তোমারও আনবো।"ঐ সময় হোটেলের কাউন্টার থেকে গরম,গরম সদ্য তৈরি ভেজিটেবল প্যাট্রিস বিক্রি হয়,মূলতঃ,অফিস পাড়ার খদ্দেরদের জন্যই কিছুক্ষণের জন্য এ ব্যবস্থা।
ক্যাস বই,লেজার বই'র আড়ালে চাপা পড়ার অবস্থা। বেশ কয়েক মাসের স্টেটমেন্ট তৈরি হয়ে গেছে। মাইনে একশো পঞ্চাশ টাকা। বাড়িতে একশো টাকা দিয়ে নিজের হাত খরচা,ট্রেনের মান্থলি,বাসভাড়া,টিফিন,ইত্যাদিতে সব খরচ হয়ে যায়;প্রথম কয়েকদিন ভালো লাগলেও ঐ নীরস হিসেবের খাতায়,রাজীব হাঁফিয়ে ওঠে; ফেরার সময় হাওড়া স্টেশনে,কাজ কেমন লাগছে,পরিচিতদের প্রশ্নের উত্তরে,রাজীব বলে, "রেজাল্ট বেরোলে,সে অন্য চাকরির সন্ধান করবে,ফিগার-ওয়ার্কে,সে কাজের মধ্যে কোনো আনন্দ দেখতে পায় না। কিছুদিন কেটে গেছে;রাত হয়েছে, হাওড়া স্টেশনে,ট্রেন ধরার জন্য অপেক্ষা করছে,এক ভদ্রলোক,রাজীবকে ডেকে বললেন,"খোকা,মাস্টারি করবে,তোমার বাড়ির কাছেই,ইচ্ছা হলে,রেজাল্ট রেরোলে,অমুক (ছেলেদের)স্কুলে একটা দরখাস্ত পাঠিয়ে দিও।" রাজীব বলে,"আচ্ছা"।
রাজীব খোঁজ নিয়ে শোনে, ভদ্রলোক, হাইকোর্টে পেসকারের চাকরি করেন; উনি, ঐ নাম বলা স্কুলের সেক্রেটারি, আর স্থানীয় কংগ্রেস নেতা হচ্ছেন সভাপতি; ইস্কুলে ইলেভেন ক্লাস শুরু হয়েছে, ইলেভেন ক্লাসটা কিন্ত কো-এডুকেশন; আর্টস, সায়েন্স আগে থেকেই ছিল; কমার্স বিভাগ চালু হয়েছে।
কমার্সের শিক্ষক,লিয়েনে ছুটির দরখাস্ত দিয়েছে,মাসখানেক পরেই ওদের স্কুলে একজন কমার্সের শিক্ষকের দরকার হবে। রাজীব বাড়ি এসে, একটা দরখাস্ত লিখে, মোটামুটি তৈরি হয়ে রইলো;রেজাল্ট না বেরোলে তো,দরখাস্তটা সম্পূর্ণ করতে পারছে না। কয়েকদিন পর, একদিন শনিবার,অফিসের হাফছুটি হয়েছে,বেলা আড়াইটে নাগাদ, হাওড়া স্টেশনে আসতেই দেখা হয়ে গেল, তারকেশ্বরে থাকা এক ক্লাস মেটের সাথে;সে,ও অন্যান্যরা টাবুলেটরের বাড়ি থেকে রেজাল্ট জেনে ফিরছে;রাজীবের তো তর সয়না, রাজীব ওদের, ঐ টাবুলেটরের বাড়ি নিয়ে যেতে অনুরোধ করলো; একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে সবাই আবার সেই টাবুলেটরের বাড়ি; তিনি তো বিরক্ত হয়ে বললেন, আর তো তিন চার দিন, তারপরই ফল প্রকাশ হয়ে যাবে; তিনি তো আর ছাত্র নন, উৎকণ্ঠা বোঝার কথা না; রাজীব,বললো, "অনেক দূর থেকে আসছি,বন্ধুরা সব জেনে গেছে, আমায় যদি একটু দয়া করে বলে দেন তো, ভালো হয়", কিন্ত, ভবি তো ভোলার নয়; হয়তো, বলে, বলে, ক্লান্ত বোধ করছেন, শিক্ষক তো, মনের গভীরে রয়েছে যে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি অফুরন্ত স্নেহের ফল্গুধারা। রাজীব দোতলার ঘর থেকে ব্যর্থ মনোরথে নেমে আসছে,অদূরে দাঁড়িয়ে আছে ওর সতীর্থরা; হঠাৎই একজন বললো, রাজীব, ঐ দেখ; দোতলার জানলায় একটা বাচ্চা মেয়ে, হাত নেড়ে ইশারা করে আসতে বলছে, রাজীবের তো তখন হার্টের পিস্টন সজোরে ছুটছে,ত্বরিতে দোতলার অন্য ঘরের ভিতর যেতেই এক মহিলা, শিক্ষক মশাই'র স্ত্রী, রোল নং জিজ্ঞেস করে, টেবিলের উপর পাতা টাবুলেসন শীটে, রোল মিলিয়ে দেখে, একটু দাঁড়াও বলে, পাশের ঘরে, ছাত্র পড়াতে ব্যস্ত শিক্ষক মশাইকে কী যেন বলায়, শিক্ষকমশাই ডেকে বললেন, "মাষ্টারি করবে? তাহলে, রেজাল্ট বেরোবার পর, কলেজে এসে দেখা করবে।" শিক্ষকের স্ত্রীর কাছ থেকে ফল জানতে পেরে, খুশি মনে বাড়ি ফেরা, হোক না কিছু টাকা অনর্থক ব্যয়: এআনন্দের কাছে ওবাজে ব্যয়ের দুঃখও আজ ম্লান। আজ সে সাফল্যের দোর গোড়ায়-----।
পরের সপ্তাহে, ফল প্রকাশিত হয়েছে; রাজীব, দরখাস্তপাঠিয়ে দিয়েছে স্কুলে। স্কুলের হেড-মাস্টার মশাই, পরের সপ্তাহের সোমবার থেকেই জয়েন করতে বললেন, মাসের প্রথম থেকেই শুরু করা ভালো।ইনসুরেন্স কোম্পানির কাজে ইস্তফা দিয়ে, পুরো একশো পঞ্চাশ টাকা পেয়ে, কলেজ স্ট্রিট থেকে দুটো বই কিনে, free to move, free to starve, even to enjoying the life to the lees ভাবতে ভাবতে ট্রেন ধরে বাড়ি। সামনে রবিবার, চুটিয়ে বন্ধুদের সংঙ্গে আড্ডা, সোমবার থেকে শুরু হবে নতুন জীবন--অজানা, এটা তো একটা ধাপ মাত্র:কলেজের লোক নেবে গ্রীষ্মের ছুটির পর, সুতরাং, এ ক'মাস ইস্কুলই সই। এখান থেকেই, সময়কালে কলেজের ইন্টারভিউ দিতে সুবিধা হবে, বাড়ির চাহিদাও বেশি করেমেটানো সম্ভব হবে। নতুন জীবন-চর্চা-----।
চলবে
0 Comments.