Sun 13 September 2026
Cluster Coding Blog

।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় অমিতাভ দাস

maro news
।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় অমিতাভ দাস

প্রিয় ইছামতী

"এই রকম বিকেল খুব ভালো লাগে। আগে কত কত বিকেল এই নদীর তীরে বসে কাটিয়েছি। বড় ভালোবাসার জায়গা হে।" বললেন বিভূতিভূষণ। জীবনানন্দের চোখে তখন অপার বিস্ময়।" এই তাহলে আপনাদের ইছামতী নদী। এই নদী নিয়ে আপনার একটা উপন্যাস আছে না? কী একটা পুরস্কার পেয়েছেন যেন..." --" হ্যাঁ গো, এই আমাদের ইছামতী।এই নামেই একটা উপন্যাস লিখেছিলাম। সেইটে রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিল। তবে কী জানো , পুরস্কার-টুরস্কার কিছু নয়। লিখে বড় আনন্দ পাই। পাঠক হল বড় পুরস্কার। "বলে থামলেন বিভূতিভূষণ। তাঁর ছায়া ছায়া শরীরটি যেন বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে । নদীর আ-নীল জলের দিকে তাকিয়ে জীবনানন্দ বললেন, "আমিও কী জানতাম , এত লোক আমার কবিতা পড়বে! বড়-ই স্বভাব সংকোচ ছিল। লিখে রেখে দিতাম তোরঙ্গের মধ্যে। " দু'জনে ভাসতে ভাসতে মাধবপুরের দিকে এগিয়ে গেলেন। বিভূতিভূষণ বললেন," লেখকের সংকোচ থাকে। যাই লেখে মনে হয় কিছুই হচ্ছে না। তুমি কিছু উপন্যাস লিখেছিলে কানে এসেছিল আমার।" --" লিখেছিলাম বেশ ক'টি--- সুতীর্থ , মাল্যবান, জলপাইহাটি, কল্যাণী-- আরো আছে, এখন আর মনে করতে পারি না। তবে জলপাইহাটি লিখে বড় আনন্দ পেয়েছিলাম।" বলে চুপ করে আকাশের দিকে তাকালেন জীবনানন্দ । দুটো পাখি তখন উড়ে যাচ্ছে নিজস্ব গন্তব্যের দিকে। বিভূতিভূষণ জানতে চাইলেন, আচ্ছা কবি, তুমি আরণ্যক পড়েছ? বিভূতিভূষণ এখানে জীবনানন্দকে স্নেহ বশত কবি বলেই ডাকেন। জীবনানন্দ বললে, "পড়েছি। কলকাতায় থাকা কালে পড়েছিলাম। আহা-- কী গভীর নিমগ্ন আপনার প্রকৃতি বর্ণনা--- পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতাম লবটুলিয়ার জঙ্গলে। ভানুমতীকে বড় ভালো লেগেছিল ...মনে হত..." হা হা হা করে হেসে উঠলেন বিভূতিভূষণ। " মনে হত সত্যচরণের সঙ্গে ভানুমতীর বিবাহ হল বলে, তাইতো..." মৃদু হাসি জীবনানন্দের ঠোঁটে খেলে গেল । তারপর কিঞ্চিৎ বিমর্ষ ভাবে বললেন, হল না তো--- এইটেই তো বড় বেদনার...
রোদ্দুর ক্রমশ ডানা গুটিয়ে নিচ্ছে। তাঁদের লোকে দিন-রাত্রির কোনো ভেদ নেই। সেই লোক থেকে মনুষ্য লোকে আসতে বড় কষ্ট হয়। তবু বড় মায়া। মর্ত্যলোকে আসতে যে ইচ্ছে করে। অনেকগুলো স্তর পেরিয়ে তবে আসতে হয়। এইসব ভাবতে ভাবতে দুজনেই হয়ত চুপ করে ছিলেন । প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে কথা থেমে যায়। চুপ করে থাকতেই ভালো লাগে। বেশ দূর থেকে হেঁটে আসছিলেন শক্তি চাটুয্যে । কন্ঠে রবি ঠাকুরের গান । ওঁদের কাছে এসে বললেন, বাঁশবনের নীচে দাঁড়িয়ে আপনাদের গল্প শুনছিলাম । তারপর জীবনানন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন,"এইরকম তো আমারো মনে হয়েছিল বনলতা সেন পড়তে গিয়ে গুরুদেব । তিনি কি বাস্তবিক আপনার প্রেমিকা নাকি কল্পনা?" কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত মনে হল জীবনানন্দকে। বললে, "না না আমি কারো গুরুটুরু নই বাপু...গুরুদেব তো ওই একজন--রবীন্দ্রনাথ --"ঠিক বলেছ। রবীন্দ্রনাথ। আমারো যে তাই মনে হয়...তিনিই তো প্রকৃত গুরু।: বললেন বিভূতিভূষণ । "ওঁর গোরা পড়ে ভারতবর্ষকে বুঝেছি। দেখতে শিখেছি।" --"সে তো নিশ্চয় । তবে আধুনিক কবিতার জনক জীবনানন্দ দাশ একথা কেউ অস্বীকার করে না এখন । সেদিক থেকে জীবনানন্দ স্যার আমার গুরু। " বলতে বলতে তিনি তাকালেন বিভূতিভূষণের দিকে। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন: "স্যার আপনি আমার উপন্যাস পড়েছেন?" -- "না না পড়া হয়নি। তবে সুনীলের কাছে তোমার কবিতা শুনেছি। হোয়াটস অ্যাপে আমায় পাঠিয়েছিল দু-চারটে কবিতা। -- কুয়োতলা, দাঁড়াবার জায়গা আমার দুটো উপন্যাস । তা অবিশ্যি আপনার পড়বার কথাও নয় আপনার জীবৎকালে। কেন যে জিজ্ঞেস করলাম , বলে অন্য দিকে তাকালেন শক্তি। --তোমরা তো কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর , তাই না?" বলে এগিয়ে গিয়ে বসলেন ইছামতী নদীর তীরে একটি ঘাটে। পাশে বসলেন জীবনানন্দ এবং শক্তি। রোদ্দুর শেষবেলার ম্লান আলো মাখিয়ে দিয়েছে নদীর জলে। কেমন যেন চিকচিক করছে। দূরে একটা নৌকা ফিরে এলো । ঘাটে লোকজন তেমন নেই। সাইকেল নিয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে একটা লোক চলে গেল । দূরে পীচ রাস্তা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে হর্ণ বাজিয়ে মোটর গাড়ি চলে যাচ্ছে। শক্তি বললে, "হ্যাঁ আমরা কৃত্তিবাসী। সেজন্য আমি গর্বিত ।" বিভূতিভূষণ বললেন," সেদিন সুনীল একজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলো। বললে, দাদা আপনার লেখার ভক্ত। নাম আলোক সরকার । আমাদের এই অন্তরীক্ষ লোকে নতুন এসেছে। আহা--শুনলাম ওঁর কবিতা। মৃত্যুর কিছুদিন আগে নাকি সে আকাদেমি পেয়েছে। সেও খুব প্রকৃতিমগ্ন দার্শনিক কবি বুঝলে।" মাথা নাড়ল শক্তি চাটুয্যে।
কথা চলছিল জীবনানন্দ ও শক্তির মধ্যে বিভূতিভূষণের উপন্যাস নিয়ে। ডায়েরি নিয়ে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বিভূতিভূষণ কিছুই যেন শুনছেন না। তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে। তাঁকে বিব্রত না করে দুটো ছায়াশরীর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল নিঝুম বনপথে। নৌকা চলে যাচ্ছে তার নিজ গন্তব্যে। জেলে-মাঝিদের নৌকা। চলে যাচ্ছে অনন্তকালের দিকে। তাঁর মনে পড়ল কাছে নিজের বাস্তুভিটের কথা। তাঁদের দাম্পত্য-কথা। গৌরীর কথা। রমার কথা। পুত্র তারাদাস এখন অন্য লোকে থাকে। চাইলেও দেখা করা যায় না। সবার কাছে ফোন নেই-- সবাই নিজের মতো থাকে । সপ্ত আসমান-- সপ্তম তলা। আধুনিকতার ছোঁয়া তাঁদের জগতেও এসে পড়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শিখিয়েছে মোবাইলে ফোন করা-- হোয়াটস অ্যাপ বলে কী যেন একটা ব্যাপার আছে। তবে এসব বিভূতিভূষণের ভালো লাগে না । আত্মার নানান স্তর পেরিয়ে আজ এই ইছামতী তীরে এসেছেন তিনি জীবনানন্দের সঙ্গে । "হঠাৎ করেই কবি শক্তি চাটুয্যেকেও পেলাম" ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যা নেমে এলো । দূরে শঙ্খের নিনাদ । পায়ের তলে জল । বয়ে যাচ্ছে ইছামতী । বিভূতিভূষণের প্রিয় নদী । বাবলুর হাত ধরে কত বিকেল কেটেছে তাঁর। ভাবতে ভাবতে দেখলেন চারপাশে কেউ নেই-- না শক্তি না জীবনানন্দ । বিভূতিভূষণ ভাবলেন "ভালোই হয়েছে। ওঁরা চলে গেছে বোধহয়। এখানেই শুয়ে থাকি তবে আজ রাতে। না না , কেবল আজ রাতে বলে নয়, শুয়ে থাকি অনন্তকাল । মানুষেরা কেউ তো আর দেখতে পাবে না আমায়।"
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register