Thu 17 September 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব - ৩৭)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব - ৩৭)

বিন্দু ডট কম

একটা সুরঙ্গ নেমে যাচ্ছে নীচে।এই অঞ্চলে শুভব্রত এর আগে আসেনি।মাটির উপর থেকে দেখে বোঝা যাবে না মিটির নীচে এতো বড় খনন লুকিয়ে আছে।একটা ছোট্ট কাঁচের ক্যাপসুল করে শুভব্রত নেমে যাচ্ছে নীচে।ভূস্তর পার করে নেমে যাচ্ছে।প্রথমে পিচ,তারপর মাটি,তারপর মেটেপাথর।তার নীচে কালো কালো সুরঙ্গ।তার হাতে একটা ছোট শাবল।লিফ্ট স্থির হতেই তাকে নেমে পড়তে হলো।মাটিতে পাতা রেললাইন।এই লাইনে ট্রলি করে কয়লা পৌছে যাবে উপরে।শুভব্রত মাথায় হেলমেটের আলোটা জ্বালিয়ে এগোতে থাকে।সামনের ঢালটার কাছেই সুপারভাইজার দাঁড়িয়ে।একটা গোলোযোগ মনে হচ্ছে ঘটেছে সামনে।একটা দুর্ঘটনা!নাকি অন্যকিছু।সুপারভাইজারের চোখমুখ চেনা লাগলো তার।কোথায় যেন দেখেছে সে।সে যা হোক,লোকটি তাকে ডেকে বলল,"এগারো নম্বর মাইনটা কোল্যাপ্স করেছে।মৈনাক মণ্ডল ওখানেই ছিল।একবার দেখে আসুন।

মেঝের মাঝে ভীড় করা মানুষের ফাঁকে বেশ অনেকটা রক্ত।তার মধ্যেই উপুড় হয়ে পড়ে আছে মৈনাক।এই মৈনাক এখানে এল কীকরে?ওর তো কাকিনাড়া থাকার কথা।ওয়ান বিএইচ কে ঘর।ঘরের দেয়ালে চাপচাপ রক্ত।সেই মৈনাক!সুপারভাইজার চলে এসেছে কখন!কোথায় দেখেছে শুভব্রত?পুরুষোত্তম প্রেসে?সেই চোখ,নাক,টিকোলো থুতনি,আলতাসাদা গায়ের রঙ।কিন্তু অচিন্ত্য মিত্র এখানে এলেন কী করে?তাঁর তো পক্ষাঘাত।জিসিএস চার।সেই অচিন্ত্য মিত্র!ভুল হচ্ছে কোথাও।ভাবতে ভাবতেই কৌলাহল বাড়লো খানিকটা।কেউ একজন মৈনাকের মুঠির ভিতর কিছু একটা চকচক করতে দেখেছে।সুপারভাইজারের সঙ্গে শুভব্রতও দৌড়ে গিয়ে দেখল মৈনাকের মৃত হাতে ধরা কয়লার বুকে একটুকরো কাচের মতোই উজ্জ্বল একখণ্ড হীরে লেগে আছে…

-কোন প্যাকেজটা নেবেন?পাঁচশো দিলে গাওয়া বানারসি ঘি।সঙ্গে অরিজিনাল চন্দন।তিনশো হলে লোকাল। 

শুভব্রত দেখলো শ্মশানের লোকটা তার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছে।

-পাঁচশোই দিন।

প্রদ্যুতের পাঠানো খাম থেকে একটা নোট তুলে দিল সে লোকটার হাতে।তার পাঠানো টাকা এইভাবে সদ্ব্যবহার হবে কে জানতো!অনেকটা সময় চলে গেল মাঝে।পুলিশ মর্গ ময়নাতদন্ত।ওই ময়নাতদন্তের ডাক্তারদিদিমণি মৈনাকের শরীরে কী পেলেন জানা হলোনা তার।সে শুনেছে ফরেনসিক ডাক্তারদের একটা তৃতীয় চোখ থাকে।তাহলে তিনি কী বলতে পারতেন না মৈনাকের মৃত্যু কীভাবে হলো?এটাকে কী আত্মহত্যা বলা যেতে পারে?নাকি শুধুই হত্যা?কে হত্যা করল তাকে?আরুণি?প্রদ্যুত সরকার?নাকি সে নিজে?

-পুজাপাঠ করিয়ে দিব।এক হাজার লাগেগা।

-করে দিন।

ডোমটা কোথা থেকে পুরুত জোগাড় করে এনেছে।যেদিন  জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি মানুষ প্রতিটি ক্ষণের হিসেব দর করে বুঝে নিতে পেরেছে,ঠিক সেইদিন থেকেই মানুষ আধুনিক হতে পেরেছে।শুভব্রত জানে।

     মৈনাকের মাথাটা এলিয়ে রয়েছে একদিকে।মাত্র কয়েকঘন্টা আগেই তারা কথা বলেছে। স্থানীয় হাসপাতালের ডাক্তার দিদিমণি এমনিতে ভালো।ভালো বলেই তো রাতের মধ্যেই ময়না তদন্ত হয়ে গেল। অন্য কেউ হলে বডি রেখে যেতে হতো।কাল সকালে কাগজ নিয়ে থানা।থানা থেকে হাসপাতাল।সকালে ভীড়টাও বেশি।এই নিশুতিরাতে গঙ্গার ঘাটে বিশেষ লোক নেই।দিদিমণি বেশি কাটেননি দেহটা। মাথা ফাটানো নিয়ম।তাই ফাটাতে হয়েছে।মৈনাকের মৃত্যুর কারণ "মস্তিষ্কে দূর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণ"।মাথা ফাটাবার পর সাদা গজ দিয়ে ব্যাণ্ডেজ করে দেওয়া হয়েছে।মৈনাককে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন এখনই কয়লাখাদান থেকে হেলমেট পরে উঠে এল।তারপর মাথায় ফেটি বেধে নানকপীঠে মাথা ঠুকে এল।চুল্লিতে ঢোকবার আগে শুভব্রতর মনে হলো মৈনাক হাসছে।তার হাত মুঠো করা।কী আছে সে মুঠোর ভিতর।জেদ,নিষ্ঠা,সাধনা।নাকি মহাকালের একবিন্দু।

-আব চালিশ মিনিট লাগেগা।বাহার বৈঠিয়ে।

ডোম বলে চলে গেল।নদীঘাটে একা বসে রইল সে।মনে পড়ে গেল একবার একটা অনুষ্ঠানে তারা গিয়েছিল উত্তরপাড়া লাইব্রেরি মাঠে।পড়ন্ত বিকেল।মৈনাক বলছিল।
-শুভ।এই যে আমি সারাজীবন আমার কাগজে শুধুই সাক্ষাৎকার আর প্রবন্ধ ছেপে গেলাম। কবিতা ছাপলাম না।গল্প উপন্যাসও নয়।এসব কেউ কোনও দিন পড়বে?

-পড়বে।কেন পড়বে না।আলবাত পড়বে।সময় আসুক।

মৈনাকের বিশ্বাস হয় না।তার সাক্ষাৎকার নেবার নিজস্ব ধরন নিয়ে সাহিত্য মহলে সমালোচনা তো কম হয়নি!তার পত্রিকার পাতার প্রবন্ধগুলো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বারবার।শুভ সেদিন তার বন্ধুর চোখে সেই অসহায়তা দেখতে পেয়েছিল।তাই বলেছিল,"শোন মৈনাক।তুই যে লেখাগুলো ছাপছিস,সেগুলো তো শুধুই লেখা নয় রে।একটুকরো জীবন।জীবনের মূল্য যতোদিন থাকবে,তোর পত্রিকার লেখাগুলোও ততোদিন অমলভাস্কর হয়ে রয়ে যাবে।

ভোর হয়ে আসে।চুল্লির উপরের সাদা ধোঁয়া বাতাসে মিশে যাচ্ছে।সেই বাতাসে মৈনাক মিশে আছে।কর্ণ মিশে আছে।'কর্ণ' বের করবি না মৈনাক?

উত্তরে মৈনাক কয়লাখাদানের ভিতরেই খাতা খুলে বসে পড়ে।

-আমাদের কাজ হীরা খোদাই করা শুভব্রত।এখন বুঝবি না হয়তো।বল দেখি সামন্ত্যকমণি যে খোদাই করে আবিষ্কার করেছিল সেই শ্রমিকের নাম তোর মনে আছে?কে প্রবন্ধ লিখবে বল?সেই মৌলিক চিন্তা,অন্যভাবনা।জীবনানন্দ দাশের মতো।রক্তকরবীর শঙ্খ ঘোষের মতো।

-তাহলে ?তরুণ লেখকদের তো একটা লেখার জায়গা চাই।

-অবশ্যই চাই।কিন্তু আমার পত্রিকা কোনও কুস্তির আখড়া নয় যে তরুণ খেলোয়াড় আসবে আর অভ্যাস করে চলে যাবে।আমি প্রোমোটার নই।বাড়ি বানাই না আমি।আমি ঘর বানাই।বসত বানাই।বিনিময়ে শুধুই একফালি অলিভ পাতা দিতে পারি।ব্যাস।

-তা বলে তরুণদের লিখতে দিবি না কখনও?

-কেন দেব না?আমার কাগজ তো তরুণদের জন্যই। কিন্তু সে তরুণকে হীরকখণ্ড এনে দিতে হবে।এজরা পাউণ্ড আমেরিকার কবিতাকাগজের সম্পাদককে কী বলেছিল তোর মনে আছে?মণীদা তাঁর 'পরমা'য় সে কথা যত্ন করে ছাপিয়েছিলেন।পাউণ্ড বলছেন,"সেই স্তরে না পৌছোনো পর্যন্ত কোনোকিছু গ্রহণ করো না,কথা দিয়ে বসো না।ফাইল খোলা রাখো প্রেসে যাবার শেষমুহূর্ত পর্যন্ত,এই আশায়।যদি সত্যিকারের ভালো জিনিস এসে যায়।শেষ পর্যন্ত কিছু না এলে অগত্যা ঐ মরা কাঠগুলোর মধ্যে থেকেই কিছুকিছু ব্যবহার করবে।"

ডোম একটা ছোট হাড়িতে মৈনাকের অস্থি দিয়ে গেল।এই মৃন্ময় পাত্রে মৈনাক আছে!তার সমস্ত জীবন।সাধনা।বিদ্রোহ দোলাচল।মৈনাকের খোলা ফাইল আজ বন্ধ হয়ে গেল চিরদিনের জন্য।এভাবেই একদিন তার 'দোয়াব'এর ফাইলটিও বন্ধ করে দিতে হবে।সেদিন তোয়া চ্যাটার্জির কী হবে?সে যে সত্যিই খাঁটি কোহিনুর হীরে।সেই হীরকচ্ছটার সামনে অগণিত শুভব্রত তার তরুলতাকে পাশে রেখে সেই আলোয় মিলিয়ে যেতে পারে।নদীতে ভাসমান অস্থিকলসের দিকে চেয়ে শুভব্রত আরও একবার অস্ফুট বলে উঠল যেন,"বিদায় কমরেড।ভালো থেকো।আবার দেখা হবেই।তখন কথা হবে আমাদের।অনেক কথা।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register