- 6
- 0
৮
লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে উপরে উঠতে শুরু করা মাত্র মায়া আর্তনাদ করে ওঠে।
—- স্যার। এদিকে সর্বনাশ হয়ে গেছে।
কি? কি হয়েছে ?
মাথাটা একটু ঝাঁকিয়ে ঘোর কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে রনি।
আমাদের সেফ, শ্যামের বাবা মারা গেছেন খবর এসেছে। সে ত বেরিয়ে এলাহাবাদ যাবার ট্রেন ধরতে দৌড়ালো।
এদিকে আজ করপোরেট পার্টি বুকিং আছে।
কি হবে?
–সেকি !
মা কোথায়? জানে খবরটা?
–ম্যাডামকে একটু আগে ফোন করেছি।
এখন ত দশটা, সকাল। পার্টি সন্ধ্যে সাতটা। তার মধ্যে দেখুন।
মনোলীনা লাঞ্চের সঙ্গে রেড ওয়াইন অর্ডার করতে চেয়েছিল।
রনি ড্রিংক করে না এমন নয়। কিন্তু এত সকালে সাধারণত নয়।
তাও দামি গেস্টকে খুসি করতে ফোন করে দিয়েছিল স্টাফদের।
তারপর এটা ওটা কথা হতে হতে মনোলীনা প্রায় কোলেই এসে বসে পড়ছে সুইটের সোফায় দেখে একটু ঘাবড়েই যাচ্ছিলো ভিতরে ভিতরে।
এমন সময় মায়ের ফোন।
বহুদিন পর মায়ের গলাটা শুনে এত আনন্দ হল রনদেবের।
–হ্যাঁ মা, এক্ষুনি আসছি।
এক লাফে দরজার কাছে রনি।
–একি!
ভীষণ সেক্সি মুখভঙ্গিতে ঠোঁট ফোলায় মনোলীনা।
–কোথায় যাচ্ছেন?
সবে ত কথা শুরু হল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ, হবে। আপনি খেতে থাকুন। আমি মা কেন ডাকছেন শুনে আসি।
তাড়াতাড়ি দরজা টেনে দিয়ে প্যাসেজে বেরিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে রনি।
চটপট এগিয়ে যায় লিফটের দিকে।
নিজের ফ্লোরের সোফায় হৈমর সাথে কথা বলছিলেন কলাবতী।
বিকেলের পার্টি কী করে সামলানো যায় ভাবতে শুরু করে, তাঁর মনে পড়েছিল এই গেস্টের কথা যে নাকি রান্না আর প্রেসেন্টেশান নিয়ে পড়াশুনো করে ডিগ্রী লাভ করে এসেছে বিদেশ থেকে।
সে ডিগ্রী হোম সায়েন্স পড়াতে গিয়ে একেবারেই অপচয় হচ্ছে, বলে না দুঃখ প্রকাশ করেছিল সেই মেয়ে?
তার চেনাশোনা ভাল বিদেশি রান্না জানা শেফ কেউ থাকে যদি ভেবে ইন্টারকমে কল করেছিলেন কলাবতী।
একা ঘরে বসে থেকে থেকে বোর হয়ে যাওয়া হৈম লিফটে করে চলেই এসেছিল তাঁর ঘরে।
রনি ঘরে ঢুকে অবাক।
এই রকম হাঁসফাঁস বেবি শুদ্ধু মহিলা মায়ের সঙ্গে বসে কেন ?
হৈম তখন চকচকে চোখে কলাবতী ম্যাডামকে প্রাণপণ বোঝাতে ব্যস্ত, যে তাকেই আজ সন্ধ্যেটা সামলাতে দেওয়া হোক।
স্টাফেরা কথা শুনে কাজ করলেই পরপর ডিস টেবিলে পৌঁছে যাবে।
ইটালিতে এমন অনেক ইভেন্ট ইন্টার্নশিপ করতে করতেই সামলে এসেছে হৈম।
মা, হৈমবতীর সাথে রনির পরিচয় করিয়ে দেয়া মাত্র, হৈম উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“ও রনিবাবু…”
.. রনিবাবু?
এমন নামে ত কেউ ডাকেনি জন্মেও। রনি চমকে যায়।
তবে বেশিক্ষণ সে চমক টিকে থাকার উপায় নেই।
প্রচন্ড স্পিডে সাইজে ক্ষুদ্র, গোল গোল ফ্রেমের চশমা পড়া, কোমরে শাড়ির আঁচল গোঁজা মহিলা বুঝিয়ে চলেছে, আজকের মেনুর সব ডিশ কি ভাবে রান্না হবে আর তাদের কি ভাবে ড্রেস করে পাঠাতে হবে।
দু মিনিটের মধ্যে মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে রনির।
দু হাত তুলে বলে, থামুন থামুন।
ইন্ডিয়ান আর্মি কি জানে দেশের কত বড় পোটেনশিয়াল তারা নষ্ট করছে?
থতমত খেয়ে চুপ করে যায় হৈম।
—- মানে ?
—- আরে, কোন অস্ত্রশস্ত্র ট্যাঙ্ক মিসাইল কিছুই লাগবে না ত।
সামরিক বাজেটের কত টাকা বেঁচে যেত এদ্দিনে ।
কলাবতী দেবী এবার মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন।
রনি বলে চলে।
–বাবা এতো মেশিনগানের গুলির ওপর দিয়ে যায়।
কোনো রকমে, শত্রুসেনার প্রধানের সামনে নিয়ে গিয়ে শুধু একবার দাঁড় করিয়ে দিতে হবে।
ননস্টপ চলবে কথা।
সে সেনাপ্রধান বেচারা যতই হাঁকুপাঁকু করুক, কোন চান্স পাবে না নিজের সৈনিকদের কোন ইন্সট্রাকশন দেওয়ার।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা ততক্ষণে ঘিরে ফেলবে ওদের সবাইকে।
বিনা রক্তপাতে বিপুল জয়!!
জয় হিন্দ! বন্দে মাতরম!!
হৈমর মুখখানা লিটারেলি হাঁ হয়ে গেছিল।
কলাবতী দেবীর হাসির শব্দ শুনে চোয়াল বন্ধ করে ফেলল তাড়াতাড়ি।
আর তারপর চোখ বড় বড় করে, সবে তেড়ে গালাগালিটা শুরু করতে যাচ্ছিলো।
থেমে গেল, রনদেব ওর হাতটা খপ করে ধরে দরজার দিকে টানতে শুরু করায়।
—- একি!! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ??
–কেন, কিচেনে।
এত বক বক করলেন, কাজে কি করতে পারেন দেখি।
মুখে বলে কি হবে।
যদি না পারেন, লোকশানের বরাত মেনে নিয়ে অন্য হোটেল থেকে খাবার কিনিয়ে আনাব।
চলুন।
কলাবতী হাঁ হাঁ করে ওঠেন।
“ কিন্তু হৈম আপনার প্রেগন্যান্সি!! এই সময় এই চাপ নেয়া… ”
হৈমবতী জ্বলজ্বলে চোখে ঘুরে দাঁড়ায়।
—- মিসেস রায়, আমি ত এই পরশুই চেক আপ করিয়ে এসেছি। ডাক্তার বলেছেন আমি একেবারে ফিট।
আর একদম ভয় না পেতে। আমাদের দেশের মেয়েরা ধানক্ষেতে কাজ করতে করতে ও বেবি ডেলিভার করে।
আমি ত সামান্য রান্নাঘরে ইন্সট্রাকশন দেব। একটু ভরসা রাখুন প্লিজ।
আমার ডেলিভারি ডেট এখনো এক মাস বাকি।
চলুন রনিবাবু।
বাবু টা কট করে কানে লাগে, কিন্তু এই গোল মিসাইলের মত মহিলার গতির সাথে পা চালিয়ে রনি আর নামের কথা তুলতে পারে না।
ততক্ষণে লিফট এসে গেছে।
0 Comments.