Mon 05 January 2026
Cluster Coding Blog

ধারাবাহিক || ভ্রমণ সিরিজ আফ্রিকার ডায়েরি - ১০ || সুব্রত সরকার

maro news
ধারাবাহিক || ভ্রমণ সিরিজ আফ্রিকার ডায়েরি - ১০ || সুব্রত সরকার

(কারাটু - আরুষা - নামাঙ্গা হয়ে নাইরোবি) 

উত্তর তানজানিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর কারাটু। গোরোংগোরোর প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও কারাটুকে বলা হয় "সাফারি জংশন।" পর্যটকরা এই শহরে এসে একসঙ্গে দুটো সাফারির সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। একটা অতি বিখ্যাত 'গোরোংগোরো ক্রেটা' অপরটি হলো 'লেক মানিয়ারা ন্যাশনাল পার্ক'।

আমাদের ভ্রমণসূচীতে লেক মানিয়ারা ছিল না। তাই গোরোংগোরো দেখে এসে এই শহরে রাত্রিবাস এবং পরের দিন সকালে বেরিয়ে যাওয়া আরুষা হয়ে নামাঙ্গা বর্ডারের দিকে। কেনিয়া - তানজানিয়ার এই প্রান্তের সীমান্ত হলো নামাঙ্গা।

আমরা চারদিন আগে কেনিয়ার মাসাইমারা থেকে ইসেবানিয়া বর্ডার দিয়ে তানিজানিয়ার ভিক্টোরিয়া লেকের শহর মুসোমায় প্রবেশ করেছিলাম। এবার নামাঙ্গা দিয়ে বেরিয়ে কেনিয়ায় ঢুকে চলে যাব নাইরোবি।

কারাটু শহরটা খুব পরিচ্ছন্ন লাগল। রাস্তাঘাট বেশ চওড়া। লালমাটির গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে কারাটুতে। সবুজ গাছগাছালিতে ভরা কারাটুকে ভালো লাগল। সন্ধের মুখে কারাটুতে এসে পৌঁছলাম। সারাদিন প্রচুর জার্নি হয়েছে। সেরেংগেটি থেকে গোরোংগোরো। গেম ড্রাইভে চষে বেড়ানো হয়েছে গোরোংগোরো। তাই বেশ ক্লান্ত হয়েই রিসর্টে এসে উঠলাম। নাম- "বোগেনভিলিয়া।" খুব পছন্দ হলো রিসর্টটি। সুন্দর লন, ফুলের বাগান, সুইমিং পুল। এবং ডাইনিং হলটা অপূর্ব। 

আজ প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল আফ্রিকায় এসেছি। অনেকটা বেড়ানো হলো। কত কিছু দেখলাম। জানলাম। এই কদিনে কিছু সোয়াহিলি শব্দও শিখে নিতে পেরেছি। বন্যপ্রাণীদের নামগুলো সোয়াহিলিতে বেশ সুন্দর। যেমন - সিংহ ( সিম্বা), চিতা ( ডুমা ), কুমীর ( মাম্বা), হাতি ( টেম্বো), লেপার্ড ( চুই), গন্ডার ( কিফারু), জেব্রা ( পুন্ডা মিলিয়া)।

কারাটু এসে আমাদের একটু বিশ্রাম হলো। সন্ধেটা নিজের মত করে কাটালাম। একটু নোট রাখলাম ভ্রমণের। এটা আমার প্রতিদিনের প্র্যাকটিস। তার পর বিয়ার খেলাম একান্তে বসে। বিয়ারের নাম-কিলিমাঞ্জোর। ডুলুং ও সোহম ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল, আগামীকাল নাইরোবি পৌঁছে পরশু দিন শুরু হবে ওদের আন্তর্জাতিক সেমিনার। পেপার পড়া। এই ভ্রমণের একটা বড় অংশই তো ওদের নাইরোবি ইউনিভার্সিটিতে সেমিনারে আসা।


ডিনার তাড়াতাড়িই করতে হয় এসব ভ্রমণে এলে। ক্লান্ত শরীর আর্লি ডিনারে অভ্যস্ত হয়েও যায়। রাতের ঘুমটা একটু ভালো ও বেশি দরকার, পরের দিনের ছুটে বেড়ানোর জন্য।

আজ কারাটুকে গুডবাই জানিয়ে চলে যাব তানজানিয়ার সীমান্ত শহর নামাঙ্গা। সেখানে ইমিগ্রেশন পর্ব মিটিয়ে ওপারে কেনিয়ার মাটিতে আবার পা রাখব। আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকবে মাসাইমারার সেই পাইলট মাসা!..

কারাটু থেকে নামাঙ্গা লম্বা জার্নি। প্রায় পাঁচ-ছ ঘন্টার সড়ক সফর। মাঝখানে পড়বে তানজানিয়ার এক বড় ও বিখ্যাত শহর আরুষা। আরুষা থেকে কিলিমাঞ্জোর মাত্র তিরাশি কিমি। এছাড়া আরুষা থেকে যাওয়া যায় এক বিখ্যাত জঙ্গলে- Tarangire National Park. 

আমাদের এই সফরে এবার হলো না তানজানিয়ার এই দুটো বিখ্যাত জঙ্গলে ভ্রমণ - Lake Manyara National Park ও Tarangire National Park.


সকালের জলখাবার খেয়ে কারাটু থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আজ জুলিয়াসের সঙ্গে আমাদের একবেলা কাটবে। তার পর গুডবাই। নামাঙ্গা থেকে মাসা আমাদের নিয়ে যাবে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে।

এক গাড়িতে জুলিয়াসের সঙ্গে চারদিন ধরে ঘুরছি। সেই ইসেবানিয়া থেকে মুসোমা, সেরেংগেটি, কারাটু হয়ে আজ নামাঙ্গা। এই চারদিনে কত সুন্দর সুন্দর সব মুহূর্ত কেটেছে, কত গল্প হয়েছে। সে সব চিরদিনের স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল। জুলিয়াস অতি সুভদ্র একজন মানুষ। ছোটখাটো চেহারা, খুব নিচু স্বরে নম্রভাবে কথা বলে। গাড়ি ড্রাইভ করে খুব সাবধানে। কখনোই রাফ ড্রাইভ করতে দেখি নি এই পাঁচ দিনে।  

আমার চেয়ে সোহমের সঙ্গে জুলিয়াসের বেশি কথা হোত। ওদের দুজনের গল্পগুলো আমি শুনতাম। আজ জুলিয়াসকে ছেড়ে চলে যাব। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে আমাদের। মন খারাপ এখন থেকেই হচ্ছে।

কারাটু থেকে একটু একটু করে যত এগিয়ে চলেছি পথের দু'ধারের দৃশ্য দেখে চোখ মন জুড়িয়ে যাচ্ছে। খুব চেনা প্রকৃতির মত কারাটুর চারপাশ। আমাদের রাঢ় বঙ্গের সঙ্গে ভীষণ মিল পাই। সেই লাল মাটি, চাষজমি, জলাভূমি- জলাশয়, টিলা, ছোট ছোট পাহাড়, জঙ্গল, আদিবাসী মানুষজন, হাট- বাজার, স্কুল। ছাত্র ছাত্রীরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। এখানে একটাই শুধু অমিল মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে ছোট বড় চার্চ। যেটা আমাদের ওখানে কমই দেখি।

এপথে একবার থামলাম। পথের ধারের এক বিশাল দোকান - SAFARI LAND দেখব বলে। জুলিয়াস বলে রেখেছিল একজন ভারতীয়র এই দোকান নাকি খুব বিখ্যাত। অনেক কিছু দেখার মত আছে। শপিংও করা যায়। তার জন্য জুলিয়াস এক ঘন্টা সময় আমাদের দিয়েছে।


সাফারি ল্যান্ড দোকানটা এক কথায় অসাধারণ। একবার ঢুকে পড়লে মন হারিয়ে যাবে। যাবেই। বিপুল আয়োজন। আফ্রিকার যাবতীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে দারুণ উজ্বল এই সাফারি ল্যান্ড। এখানে সাজানো রয়েছে নানা রকম জিনিসের হরেক গ্যালারি- Tribal Art & Bronzes, Wildlife Sculpture & Painting, Traditional Fabrics & Souvenirs, Handmade Gifts & Souvenirs, Local Cuisine Reimagined, Africa Gems & Jewelers.

আমরা অনেকটা সময় এই দোকানে কাটালাম। সুন্দর সুন্দর কত পেন্টিং ও স্কাল্পচার দেখলাম। শিল্পীদের সঙ্গে আলাপ করলাম। কিছু কেনাকাটিও করা হলো। আফ্রিকার কফি, টি শার্ট, ফ্রিজ ম্যাগনেট, ছোট ছোট শো পিস।এখানে আলাপ হলো একটি পাকিস্তানি পরিবারের সঙ্গে। লাহোর থেকে বেড়াতে এসেছেন। দেখে বেশ শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবার মনে হলো। আলাপ করে কথা বলছি, কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যেই চলছে চোরা এক অস্বস্তি। কারণ সদ্য ঘটে যাওয়া কাশ্মীরের সন্ত্রাস ও অপারেশন সিঁদুর!..অনেক কথার পর উঠেই এলো সেই তিক্ত গল্প!.. বুঝলাম যুদ্ধ আমরা কেউই চাই না!.. সাধারণ মানুষ এই জঙ্গি হামলা, এই ঘোলা জলের রাজনীতি পছন্দ করে না!.. কিন্তু আমরা এর শিকার হয়ে যাই!.. তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্র শক্রতা করলেও সেই রাষ্ট্রের মানুষরা সবাই শত্রু নয়!.. সুদূর আফ্রিকায় এসে ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা দুই প্রতিবেশী দেশের পর্যটক তাই বন্ধু সুলভ কথার ছলে আরও অনেক গল্প করতে পারলাম!..

"সাফারি ল্যান্ড" থেকে গাড়ি ছাড়ল আবার। জুলিয়াসকে ধন্যবাদ জানালাম এত সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। জুলিয়াস বলল, "মালিক ইন্ডিয়ান, তাই আপনাদের ভালো লাগবে ভেবে নিয়ে এসেছিলাম।"

"খুব ভালো লেগেছে।" হেসে বললাম। 

 দোকানটার মালিক সম্ভবত গুজরাটি। ক্যাশ কাউন্টারের একজনকে ভারতীয় মনে হয়েছিল। দোকানটার প্রশংসা সত্যিই করতে হয়। 

চকচকে পিচ সড়ক ধরে গাড়ি ছুটতে ছুটতে আরুষায় চলে এলাম। বুদ্ধদেব গুহর লেখায় আরুষার কথা পড়েছিলাম। সেই আরুষায় এসে বেশ রোমাঞ্চ লাগছিল। আরুষাও বেশ সুন্দর শহর। এয়ারপোর্ট আছে। এই শহর থেকেই তারেংগেরি ন্যাশনাল পার্ক যেতে হয়। জুলিয়াস বলল, "আকাশ পরিস্কার থাকলে এখান থেকেই কিলিমাঞ্জোরের স্নো পিক দেখা যায়।" আজ আকাশটা তত ঝলমলে নেই। কেমন ধোঁয়াশায় ঢেকে আছে। তাই কিলিমাঞ্জোর দেখার আশা না করাই ভালো। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে অ্যাম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্ক থেকে দেখতে পেলেও পেতে পারি। আর কয়েকদিন পরেই তো যাব অ্যাম্বোসেলি।


আরুষার পথের দু'ধারের দৃশ্য দেখছি, শহর দেখছি, মানুষজনদের দেখছি। নতুন জায়গাকে এভাবে এক পলকের একটু দেখারও একটা মজা ও বিস্ময় আছে বৈকি। এবার চোখে পড়ল ST. Augustine University of Tanzania ( SAUT) ARUSHA. আমি ডুলুংকে মজা করে বললাম, "তোরা এই সব ইউনিভার্সিটিতে এসে পড়া। এখানে থাক। তাহলে আমিও মাঝে মাঝে এসে থাকতে পারব। একপাশে গোরোংগোরো, সেরেংগেটি, অন্যপাশে মাসাইমারা!.. আহা!.. কোয়ালিটি লাইফ ও লিভিং দুটোই হবে!..আরুষায়ও নয় আদিবাসী বাচ্চাদের জন্য একটা "সবুজ পাঠ" খুলে নেব!.. "আমার এসব কথা শুনে ওরা দুজনেই মিটিমিটি হাসল!.. ওদের মনের কথা বোঝা গেল না!.. আমেরিকায় ট্রাম্প বাবাজি যা শুরু করেছেন, আমি তো একটু চিন্তায় থাকি, ওদের পিএইচডি টা যেন ভালোয় ভালোয় আগে শেষ হয়ে যায়!..

আরুষার পথের ধারে রক্তপলাশের মত কত গাছ ফুলে ফুলে ভরে আছে দেখলাম। খুব সুন্দর লাগছিল। 

পথের ধারের অনেক হাট- বাজার চোখে পড়ল। তানজানিয়ার নানান আদিবাসী- জনজাতি মানুষজনদের দেখছি। পার্থক্য করতে তো চট করে পারি না। চোখের দেখায় দেখছি। কত বিচিত্র ওদের সাজপোশাক। কেউ ছিপছিপে লম্বা, কেউ বেশ গাবলুগুবলু। কালো মানুষদের আলো করা হাসিমুখগুলো দেখতে দেখতে তানজানিয়ার ভ্রমণ প্রায় শেষ করে ফেলেছি। তাই নামাঙ্গা যত এগিয়ে আসছে, আমাদের ভালোও লাগছে, আবার মন একটু ভারীও হয়ে যাচ্ছে! তানজানিয়ায় এই চার রাত পাঁচ দিন অসম্ভব সুন্দর বেড়ালাম। কত কিছু দু'চোখ ভরে দেখলাম। জুলিয়াসের সঙ্গে কেমন বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ওরও নিশ্চয়ই মনটা একটু হলেও বিচলিত। জুলিয়াস খুব নম্র, লাজুক স্বভাবের। বোঝা যায় না সবটা। কিন্তু আজ ওর কথা বলার মধ্যে কোথাও একটা বিষাদের গুঁড়ো লেগে রয়েছে।

চলে এলাম নামাঙ্গা সীমান্তে। তেমন কোনও নজরদারী, কড়াকড়ি চোখে পড়ল না। গাড়ি থেকে ধীরে সুস্থে সব মাল নামালাম। এবার বিদায়ের পালা। একইসঙ্গে একটা দেশকে ও সেই দেশের একজন মানুষকে গুডবাই বলতে হলো। চোখ বোধহয় চিক চিক করছিল আমাদের সকলের!.. চোখের জল দেখা যায়!..কিন্তু হৃদয়েও অশ্রু ঝরে!.. তাতো আর দেখা যায় না।

জুলিয়াসকে আলিঙ্গন করে বললাম, "তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। খুব সুন্দর বেড়ালাম তানজানিয়া তোমার জন্যই। তানজানিয়া অপূর্ব। আর তুমি অসাধারণ!.. ভালো থেকো।"


সোহম-ডুলুংও ওকে বিদায় জানিয়ে বলল, "Asante, Asante Sana"

জুলিয়াস মৃদু হেসে বলল, "অসান্তে। Kwaheri!.. বিদায়!"..

আমরা এবার একসঙ্গে ওকে গুডবাই বলে এগিয়ে চললাম ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে। দেখলাম একটু দূরে মাসা দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি থেকে ও চলে এসেছে। আমাদের দেখেই ওর সেই স্বভাব সুলভ রসিক মুখের হাসি ছড়িয়ে বলল, "জাম্বো। জাম্বো। কারিবু। ওয়েলকাম মাই গেস্ট !... "

ক্রমশ..

Admin

Admin

 

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register