- 93
- 0
অন্ধকারের উৎস হতে - ষোলো
সেদিন স্কুল থেকে একটু আগে বেরিয়ে থানায় এসেছিল অনন্যা আর জয়িতা। তদন্তকারী অফিসারের দ্যাখা পেতে পাক্কা একঘন্টা তাদের থানায় বসে থাকতে হ'ল। অফিসার থানায় ছিলেন না, কোথাও বেরিয়েছিলেন। ফিরে আসার পরেও অনন্যাদের দেখে না দেখার ভঙ্গিতে নিজের টেবিলে গিয়ে বসলেন। জয়িতা এগিয়ে গেল। পেছনে পেছনে অনন্যা। অফিসারের সামনে এসে জয়িতা বলল, 'কিডন্যাপিংয়ের ওই ব্যাপারটা কতদূর কী হ'ল সেই জন্য আমরা এসেছিলাম স্যর।'
অফিসার বললেন, 'যা বলার সেদিনই তো আপনাদের বলে দিলাম। এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। ছেলেটাকে ধরে এনেও আমরা সেদিন ইচ্ছা করে ছেড়ে দিই নি। অনেক ওপর মহল থেকে চাপ আছে। সুতরাং ওসব ভুলে যান। আর ম্যাডাম তো দিব্যি ফিট আছেন।ওসব আবার নাড়াঘাটা করে নিজের সব্বনাশ ডেকে আনতে চাইছেন কেন? সব কিছু ভুলে বাড়ি চলে যান।'
-মানে! একটা মেয়ের মানইজ্জত নিয়ে যেখানে প্রশ্ন, সেখানে আপনি একজন তদন্তকারী পুলিশ অফিসার হয়ে একথা কেমন করে বলছেন স্যর? আপনারাই তো আমাদের ভরসা। এই বিপদের দিনে আপনারা যদি পাশে না দাঁড়ান, তাহলে আমরা মেয়েরা কোন ভরসায় রাস্তাঘাটে বেরবো স্যর?' অনন্যা ভদ্রভাবে বেশ বিনয়ের সঙ্গেই অফিসারকে বলল।
-'তাই তো বলছি। আপনি তো স্কুলে চাকরি করেন। স্কুল শিক্ষিকা। এইসব ব্যাপার আবার খোঁচাখুঁচি করে গন্ধ ছড়ালে আপনি নিজেকেও সামলাতে পারবেন তো?যে ছেলেটার বিরুদ্ধে আপনাদের অভিযোগ, তাদের হাত কতটা লম্বা সেই ব্যাপারে কোনও ধারনা আছে? আপনার নামে এমন স্ক্যান্ডেল ছড়িয়ে দেবে যে আপনার ঘটি বাটি সব হারাতে হবে ম্যাডাম। বদনাম নিয়ে স্কুলে শিক্ষকতা করতে পারবেন তো? '
জয়িতা সেন একটু রুষ্ট হলেও মুখে কিছু প্রকাশ না করেই বলল, 'সাধারণ মানুষের জন্য তাহলে কোনও আইন নেই এটাই ধরে নেব কি স্যার?'
কিন্তু অনন্যা নিজের মেজাজ ধরে রাখতে পারল না, 'বেশ রুক্ষস্বরে বলল, 'আপনি কি আমাদের ভয় দ্যাখাচ্ছেন অফিসার? দেশে কোনও আইন শৃঙখলা নেই? পুলিশ প্রশাসন সবাইকে তাহলে বড়লোকদের কুকীর্তি ধামাচাপা দেওয়া আর সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার জন্য সাধারণ মানুষেরই ট্যাক্সের টাকায় পোষা হচ্ছে? বাহ্! খুব সুন্দর।'
-'দেখুন, অবান্তর কথা বাড়িয়ে কোনও লাভ নেই। আমি বাস্তবটাকে আপনাদের বললাম। মানা না মানা আপনাদের ব্যাপার। শুধু এটুকু শুনে রাখুন আপনারা কিছুই ছিঁড়তে পারবেন না।' অফিসার বললেন।
-'ঠিক আছে আমরা কী পারব, না পারব আমরা বুঝে নেব। আপনাদের দিয়ে, বিশেষত আপনাকে দিয়ে যে কিছু হবে না সেটা বুঝে গিয়েছি। আপনি যেটা মুখে বলছেন, সাহস থাকলে সেটা লিখে দিন।'-অনন্যা বেশ রাগত স্বরেই অফিসারের উদ্দেশ্যে কথাগুলো ছুঁড়ে দিল।
অফিসারের কানে এটা যাওয়া মাত্রেই তিনি বিরাট রেগে গিয়ে বললেন, 'এই যে ম্যাডাম, আমি কিছুই লিখে দেব না। ছেলেটার বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ আমরা পাইনি। আপনি অযথা মিথ্যা অভিযোগ করে একটা ভদ্রছেলের সম্মান নষ্ট করছেন। তার বাবার টাকা হাতানোর ধান্দায় আপনিই ছেলেটাকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ওই বাড়িটাতে। নিজের দেহের ফাঁদে ফাঁসিয়ে ভেবেছিলেন টাকা হাতানোর পরিকল্পনায় সফল হবেন। এখন সেটা যখন হ'ল না, তখন এইসব অপহরণের ফাঁদ পাতছেন? আপনি স্কুল শিক্ষিকা? এইসব শেখান ছাত্রছাত্রীকে? ছিঃ! কী ভেবেছেন আপনি? আপনার ব্যাপারে আমরা কোনও ইনফো রাখি না?
-'আর কী ইনফো আছে আপনাদের? যেগুলো বললেন সেগুলো আদালতে প্রমাণ করতে পারবেন তো?'
-'আর আদালত দেখাবেন না! আপনি যদি এতই ভালো তাহলে,আপনার হ্যাজবেণ্ড সৌমাল্যর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ তুলে নিলেন কেন? যান, নিজের হ্যাজব্যাণ্ড কে প্রশ্ন করুন। যান।' অফিসার কিছুক্ষণ থেমে আবার নিজেই বলতে শুরু করলেন, 'ওহ! সরি। আপনি তো আবার আপনার হাজব্যান্ডের সঙ্গে থাকেন না! তা ম্যাডাম, আপনি যখন এত ধোয়া তুলসিপাতা, তখন আপনার স্বামী আপনাকে ঘরে নেন না কেন সেটা একটু বলতে পারেন? হু! যতসব ঝাড়িমাল। আবার টিচার! শাল্লা, প্রসস্টিটিউট!'
-'মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ অফিসার।' ধমকে উঠল জয়িতা সেন। অনন্যা বাকরহিত।
বিধ্বস্ত অবস্থায় গোমড়া মুখে ওরা যখন বাড়ি ফিরল ওদের সেই অবস্থা দেখে তুষার সেনের কিছু বুঝতে বাকি থাকল না। অনন্যা পুরো দমকে গিয়েছে। জয়িতা সেন থানার ঘটনা পুঙখানুপুঙখ জানালো। সব শুনে তুষার সেন একটু রাগ করেই বললেন, 'আমাকে কিছু না জানিয়ে তোমরা থানায় যেতে গেলে কেন? আমি বলেছি তো বিষয়টি আমি দেখছি। ওই কালপ্রিট ছেলেটা খুব শিগগিরই গ্রেপ্তার হবে।'
এবার অনন্যা বলল, 'তাই বলে একজন দায়িত্বশীল অফিসার এমন ভাষায় কথা বলতে পারে তুষারদা?'
-'পারে। এদেশে সবই সম্ভব। তবে আমার ওপর আর একটু বিশ্বাস রাখো। তুমি সমস্ত রকমের আইনি সহায়তা পাবে। এই কেসের সম্পূর্ণ মেরিট তোমার দিকে। সো, ডোণ্ট ওরি।'
এই ঘটনার তিন চার দিনের মধ্যেই সৌমাল্য আবার গ্রেপ্তার হ'ল। অনষ্কা আর জয়িতা খবরটা তুষার সেনের কাছেই পেয়েছিল।গ্রেপ্তার করার পরের দিন লক আপ থেকে সৌমাল্যকে কোর্টে চালান করা হ'ল। কোর্ট থেকে জামিনের নেবার জন্য সৌমাল্যর বাবা চেষ্টার কোনও কসুর করেননি। কিন্তু সৌমাল্য নিজেই নাকি বেঁকে বসে। সে জামিন নিতে অস্বীকার করে। নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও চেষ্টাই সৌমাল্য করেনি। সমস্ত দোষ স্বীকার করে নেয় ফলে আপাতত নব্বইদিনের হাজতবাস। তার পরে জামিন হলেও হতে পারে।
খবরটা শুনে অনন্যা অনেকদিন পরে কিছুটা হলেও আনন্দ পেল। অনেকদিন পর মনে খুশির একটা শিহরন খেলে গেল। অনন্যা প্রাণভরে এই সময়টাকে কিছুক্ষণ ধরে নিজে অনুভব করতে চাইল।
0 Comments.