- 128
- 0
❝রাজদীপের সঙ্গে আড্ডা❞ - ষষ্ঠ আড্ডা
কবি প্রাবন্ধিক সজ্জ্বল দত্ত
নাম : সজ্জ্বল দত্ত
জন্ম তারিখ ও সাল: ৬ই নভেম্বর ১৯৬৮
বাবা ও মায়ের নাম: চিন্ময় কুমার দত্ত ও নমিতা দত্ত
পড়াশোনা :
পড়াশোনাই তো করে চলেছি সারাজীবন। ওইটাই তো জীবনের একমাত্র কাজ। এখন তো আরও সুবিধে হয়েছে, অত বইও কিনতে হয় না। পি.ডি.এফ ডাউনলোড করেই প্রচুর প্রচুর প্রচুর পড়াশোনা করা যায়। বিষয় - বিবিধ। প্রধানতঃ সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, রাজনৈতিক দর্শন এইসব। ... তবে আপনি যদি ওই প্রাতিষ্ঠানিক বোর্ড-ইউনিভার্সিটির ছাপ মারা কাগজ কত অবধি পকেটস্থ করেছি জিগ্যেস করেন, তো তার উত্তর হল প্রতিযোগিতকমূলক পরীক্ষা দিয়ে একটি ভদ্রস্থ চাকরী পেয়ে মোটামুটিভাবে জীবন চালিয়ে নিতে কমপক্ষে যতটুকু লাগে। অর্থাৎ স্নাতক পর্যন্ত।
প্রকাশিত গ্রন্থ:
কাব্যগ্রন্থ - স্বাগত শ্রাবণ-জোনাকি, পোস্টমর্টেম (এই দুই একত্রে অ্যালবাম), দাগ, আত্ম..., নদী বৃষ্টি এবং
প্রবন্ধ - অস্তহীন সূর্যের আলো (দুটি বহু পুরোনো বিদেশী চলচ্চিত্রের ওপর)।
★রাজদীপ : শৈশবের কথা কিছু বলুন। কীভাবে বেড়ে উঠলেন। আজ ফিরে তাকালে কী মনে পড়ে?
# সজ্জ্বল দত্ত : শুনেছি ছোটবেলায় নাকি ভয়ংকর দুষ্টু ছিলাম। ভয়ংকর মানে সে প্রবল ভয়ংকর। সামলাতে নাকি হিমশিম খেত বাড়ির লোকেরা। একদিকে সচল মস্তিষ্কের দুষ্টুমি, সঙ্গে হাতেপায়ে দুষ্টুমি, দু'য়ে মিলে সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার ছিল নাকি! যদিও আমি এ'সব একেবারেই বিশ্বাস করি না, সমস্তটাই আত্মীয়স্বজনের অপপ্রচার😀 বলে আমি নিশ্চিত। তবে নিজে এটুকু জানি, আমাকে কিছু একটা মনোমত বাচ্চাদের বই দিলেই আমি আশ্চর্য রকমের শান্ত। অনেক ছোটবেলাতেই আমি পুরো রামায়ণ, মহাভারত, সুকুমার, উপেন্দ্রকিশোর সব পড়ে শেষ করে পদ্য গদ্য নির্বিশেষে লাইন টু লাইন একেবারে মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। গড়গড় করে পাগলা দাশু, পাজি পিটার, মজন্তালী সরকার, কুমড়োপটাশ, ছোটদের রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ড এসব মুখস্থ বলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতাম। ক্লাসের ওই নম্বর তোলার বই পড়তে আমার একটুও ভাল্লাগতো না।
★রাজদীপ : আপনার বইয়ের কবি পরিচিতি থেকে জেনেছি, দর্জিপাড়ার মিত্রবাড়ির মত কোলকাতা শহরের এক বিশিষ্ট বনেদী পরিবার আপনার মাতুলালয়। কী মনে হয়, মামাবাড়ির এই বনেদী আবহাওয়া ছোটবেলায় আপনার রুচি সংস্কৃতি বা মন তৈরি করার ক্ষেত্রে কোনোরকম সহায়ক হয়ে উঠেছিল?
# সজ্জ্বল দত্ত : হুমম, এটা ঠিক যে দর্জিপাড়ার মিত্তিরবাড়ি উত্তর কোলকাতার অন্যতম একটি বনেদী অভিজাত পরিবার। এই পরিবারের পাওয়া উপাধি ছিল " রাজা "। পরিবারের প্রত্যেক পুরুষের নামের শেষাংশে ইন্দ্র এবং মাঝের অংশে কৃষ্ণ যোগ করা। ধরুন কারো নাম নকুল। তার নাম এইভাবে উচ্চারিত হবে : রাজা নকুলেন্দ্র কৃষ্ণ মিত্র। পরিবারের গৃহদেবতা : রাজরাজেশ্বর নারায়ণ, কালো কষ্টিপাথরে তৈরি গোলাকৃতি এক অদ্ভুত মূর্তি। আমাদের রানাঘাটের বাড়িতেও ঠাকুরঘর ছিল, কিন্তু তাতে ছিল সাধারণ লক্ষ্ণী সরস্বতী এদের ছবি। মামারবাড়ি গেলে অত্যন্ত ভক্তিভরে এই গৃহদেবতার পুজোর সময় বিষয়টির অভিনভত্ব ছোটবেলায় খুব টানত আমায় , মনে হত কোথাও যেন আর দশটা বাড়ির থেকে একটু আলাদা, অন্যরকম। মামারবাড়ি ছোটবেলা থেকেই গরমের ছুটিতে শীতের ছুটিতে গিয়ে আমরা লম্বা করে থাকতাম । ...তবে বনেদীয়ানা এবং আভিজাত্যের বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকেই মনন তৈরি করায় সহায়তা দিয়েছিল কিনা সেটা বলা একটু শক্ত। সচেতনে রুচি এবং মন তৈরি করার ক্ষেত্রে বরং গোটা এই পরিবারের ঊর্ধ্বে আলাদাভাবে এই পরিবারের যে মানুষটির কথা আমি অনায়াসে বলতে পারি তিনি আমার বড়মামা রাজা কপিলেন্দ্র কৃষ্ণ মিত্র। দীর্ঘদিন বিলেতে থাকার ফলে তার চিন্তাভাবনা, সাংস্কৃতিক বোধ, প্রগতিশীলতা সবই ছিল সেই আমলে অন্যদের থেকে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী। সঙ্গে পারিবারিক আভিজাত্যের কারণেই মিশ্রিত ছিল ট্র্যাডিশনাল বাঙালী কালচার, এবং তার এই পুরো বিষয়টি তিনি ভীষণভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন আমাদের মত নেক্সট জেনারেশনের মধ্যেও, যা আমাকে আকৃষ্ট করত প্রবলভাবে। ঘরে রেকর্ড প্লেয়ারে কখনও দেবব্রত বিশ্বাস কখনও ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক, হাতিবাগানের উত্তরা সিনেমাহলে চার্লি চ্যাপলিনের গোল্ডরাশ এলে অনেকে মিলে দেখতে যাওয়া। দ্য সাউণ্ড অফ মিউজিক, দ্য রোমান হলিডে, কাম সেপ্টেম্বরের টাইটেল মিউজিক এগুলোর সঙ্গে আমার যে বয়সে পরিচয় হয়েছে তৎকালীন সময়ে দূর মফঃস্বলে থাকা খুব কম ছেলেরই তা হয়েছে । ...তো, আমি যেটা বলতে চাই, একদিকে মফঃস্বলের আমগাছের উঁচুডালে বসে পা দোলাতে থাকা সংস্কৃতির সঙ্গে অনেক দূর পর্যন্ত অনেক গভীর পর্যন্ত প্রসারিত এই বিশ্বজনীন সংস্কৃতি এসে মিশে সেই কৈশোরেই আমার মনের প্রসার ঘটিয়েছিল কিনা, ক্ষুদ্র জায়গায় আটকে থাকা থেকে বার করে অনেকখানি বিশ্বকেন্দ্রিক করে তুলতে পেরেছিল কিনা, সে আর আমি কী বলব, যারা আমাকে চেনে জানে, আমার কবিতা এবং অন্যান্য লেখাটেখা পড়ে তারাই বলুক ।
★রাজদীপ : বেশ। এবার বলুন কবিতার দিকে প্রাথমিক ভালোলাগা গড়ে উঠল কীভাবে?
# সজ্জ্বল দত্ত : অবশ্যই আবৃত্তি শুনে। প্রদীপ ঘোষের কামাল পাশা, আমার কৈফিয়ত, দেবতার গ্রাস, পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষের কর্ণকুন্তী..., এবং সর্বোপরি কাজী সব্যসাচী। আশি-নব্বই দশকে রাজনৈতিক কারণেই আমার পুরোনো শহর রানাঘাটের রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝেই মাইকে বেজে উঠত সেই প্রবল দাপুটে কন্ঠস্বর "যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না ..." । এই কবিতা শুনতে শুনতে সবসময় আমার মনে হত কবিতার অসীম ক্ষমতা, মানুষের মনকে নিয়ে সে যা ইচ্ছে তাই করতে পারে, পাগল করে দিতে পারে পুরো। ... আর তার পরবর্তীতে লম্বা ছাতাটি নিয়ে ঠুকঠুক করতে করতে আশপাশ দিয়ে হেঁটে বেড়ানো সেই প্রত্নজীব-কবি তো আছেনই। আমার বাড়ির থেকে পাঁচমিনিট দূরত্বে থাকতেন তিনি। তার সংস্পর্শে আসবে অথচ আমার মত মানসিক গঠনের ছেলের কবিতার প্রতি গভীর ভালোলাগা জেগে উঠবে না, তাই কখনও হয়?
★রাজদীপ : কাদের কবিতা পছন্দ হয় আপনার? অর্থাৎ আপনার ভালোলাগার কবি কারা? কেন?
# সজ্জ্বল দত্ত : ভালোলাগা কবিতা এবং কবির ব্যাপারে আমি বরাবর খুঁতখুঁতে। মোটামুটিভাবে জীবনানন্দ পরবর্তীদের মধ্যে বিনয় মজুমদার, রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী, দেবদাস আচার্য, জয় গোস্বামীর 'ক্রিসমাস...' থেকে 'ভুতুম ভগবান' এবং পরবর্তীতে 'এক' ,চন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, এদের কথা সর্বাগ্রে বলব। এই শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছরে যারা লিখতে এসেছেন তাদের মধ্যেও জনা তিনেকের কবিতা ভীষণ ভালো লাগে। কিন্তু তাদের নাম বলার সময় এখনও এসেছে বলে মনে করি না। বিদেশী কবিদের কথা আর এর মধ্যে আনলাম না।
★রাজদীপ : নিজে সিরিয়াসলি কবিতা চর্চা শুরু করলেন কোন সময় থেকে?
# সজ্জ্বল দত্ত : নয়ের দশকের গোড়ার দিক থেকে। মধুবনের প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছিল '৯৪ এর গোড়ায়। ধরতে পারেন তারও বছর দেড়েক আগ থেকে।
★রাজদীপ : লেখালেখির জগতে বন্ধুবান্ধব, সংঘ, যাপন ইত্যাদি আপনাকে প্রভাবিত করে বা করেছিল?
# সজ্জ্বল দত্ত : করবে না? এই যাপন ছাড়া এই অবধি কোনোকালে পৌঁছনো সম্ভব হত না । নয়ের দশকে আমরা রানাঘাট ও তার আশপাশের অঞ্চলের তথা গোটা নদীয়া জেলারই নতুন-পুরোনো কবিরা নিজেদের মধ্যে ঘন ঘন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বসতাম। কবিতা নিয়ে সে সব আসরে নিবিড় আলোচনা হত। ত্রুটিবিচ্যুতি, কিভাবে কবিতাটা আরও ভালো হতে পারত - এইসব খোলামেলা মন নিয়ে জানতাম এবং জানাতাম। তখন তো আর মোবাইল-যুগ আসেনি। ফলতঃ এরপরও থাকতো টুকটাক এর বাড়ি ওর বাড়ি চলে যাওয়া। কখনও তপন ভট্টাচার্যের বাড়ি, কখনও চন্দ্রাণীদি-অগ্নিদার বাড়ি, বাদকুল্লায় প্রাণেশদার বাড়ি, দেবুদার (দেবজ্যোতি রায়) চাকদহর বাড়ি, মীরাদির পোস্টঅফিস, কখনও ফল্গুদাকে বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে রানাঘাট স্টেশনে ধরে বসিয়ে লম্বা আলাপ আলোচনা, রানাঘাটে লালগোপাল স্কুলের কাছে আনন্দদার পুতুলের দোকানে তপনদা, প্লাবনদা, স্নেহাংশুদা, লক্ষ্মণদা, স্বপনদা, নির্মাল্যদা, চন্দনদা এবং আরও বিভিন্ন কবির নিবিড় সঙ্গযাপনের মাধ্যমে কবিতাযাপন, এছাড়াও রাস্তাঘাটে সুমিতেশদা, সঞ্জয়, নিলয়, দেবাশিসদের সঙ্গে দেখা হলেই কবিতার এটা ওটা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা কথোপকথন তো আছেই। আমি খোলাখুলি বলছি, এই সঙ্গ, এই যাপন, এই বন্ধুবান্ধব এবং দাদা-দিদিদের ছাড়া সম্ভবতঃ এক পা ও এগোতে পারতাম না কবিতায়। এটা লাগেই লাগে।
★রাজদীপ : নিজের কবিতায় কী বলতে চান?
# সজ্জ্বল দত্ত : ওরে বাবা! এইবার সত্যিই কিন্তু রীতিমত ভয় পাচ্ছি😀। না না, কিচ্ছু বলতে-টলতে চাই না। যখন যা মনে হয় লেখার চেষ্টা করি।
★রাজদীপ : আপনার কবিতা এবং কাব্যগ্রন্থগুলির কোনো প্রেক্ষিত আছে? কোনো পশ্চাদপট? প্রেরণা?
# সজ্জ্বল দত্ত : সেরকম কিছু ঠিক বুঝে উঠতে পারি না । ওই যে বললাম যখন যা মনে হয় লিখি । তবে এটুকু অনুভব করতে পারি, কবিতা উৎসারিত হওয়ার সময়টায় একটা নির্দিষ্ট কোনো মানসিক অবস্থা কখনও সচেতনে কখনও অবচেতনে কাজ করে । আমার মনে হয় না এটা মুহূর্তে মুহূর্তে পাল্টে যায় । একটা ধরনের state of mind এ হয়ত বেশ একটা লম্বা সময় ধরে অবস্থান করে মন । ওই পশ্চাদপটেই হয়ত একটা বই বের করার মতো কবিতা লেখা হয়ে গেল। বা, হয়ত হল না। কিছু কবিতা লেখা হল। আবার অন্য কোনোদিকে হয়ত তারপর ঘুরে গেল মন। এইরকম হয় আর কী । কিন্তু কাব্যগ্রন্থ ধরে ধরে যদি এই সচেতন বা অবচেতন মানসিক অবস্থাকে ভেঙে ব্যাখ্যা করে খুলে বলতে বলা হয়, তাহলে খুবই মুশকিলের কথা।
★রাজদীপ : মূলত কোন পত্রিকাগুলিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিখেছেন এতকাল?
# সজ্জ্বল দত্ত : নয়ের দশকে যদি বলেন তো পাললিক, ঋদ্ধ, নবদিশারী, প্রজন্ম, একালের বোধিসত্ত্ব, ন হন্যতে, শমী, বিরোধীপক্ষ, অবগুন্ঠন, অহর্নিশ, একলব্য এ ধরনের প্রচুর ছোট পত্রিকায় ...। এছাড়া আরও অসংখ্য পত্রিকায় সেইসময়ে অসংখ্য কবিতা লিখেছি যেগুলোকে লিটন ম্যাগাজিনের মধ্যেও তখন সবাই খুব মান্যতা দিত, বড় পত্রিকা বলে মনে করত। তার অনেক পত্রিকা এখনও বের হয়। কিন্তু গুচ্ছ গুচ্ছ সেই সব নামে ভারে গগনফাটানো পত্রিকার নাম আর এখন উল্লেখ করে উত্তরের পরিসর বাড়াতে খুব একটা আগ্রহবোধ করছি না। তবে ওই দেশ, সানন্দা জাতীয় বাণিজ্যিক পত্রিকায় কোনোদিন লিখিনি। ইচ্ছেও নেই লেখার।
★রাজদীপ : কবিতা কীভাবে লেখেন? স্বতোৎসারিত হয় শব্দ? পঙ্ক্তি? তারপর কাটাকুটি করেন যথেষ্ট?
# সজ্জ্বল দত্ত : শুরুটা তো স্বতোৎসারিত হয় বটেই। ভেতরের শান্ত পুকুরের জলে হঠাৎ কোনো অদৃশ্য কারণে কেমন যেন সুনামির মত অবস্থা তৈরি হয়। প্রবলভাবে ফুলেফেঁপে ওঠে একটা ঢেউ। কখনও ওই একটা ঢেউ উঠেই পুকুর ফের শান্ত। তখন ওই এক দু-লাইনই দ্রুত নোট ডাউন করে নেওয়ার চেষ্টা করি। আবার কখনো একের পর এক ঢেউ ওই ছোট্ট পুকুরের ছোট্ট পাড়ে এসে আছড়ে পড়ে জোরালো ধাক্কা সহ আশপাশের সমস্ত কিছুকে প্রবলভাবে ভিজিয়ে দিয়ে যায়। তখন হুড়হুড় করে অনেকখানি লেখা হয়ে যায়। সবচেয়ে সমস্যা হয় রাস্তাঘাটে এই ঢেউ জাগ্রত হলে। পুরো টালমাটাল হয়ে যায় পৃথিবী। এরকমও ঘটেছে , সোদপুরে আমার অফিস, বারাকপুর থেকে ট্রেনে উঠে সোদপুরে নামার বদলে খড়দহে নেমে আপনমনে অফিসের দিকে 😀 হাঁটতে শুরু করেছি। কিছুক্ষণ বাদে খেয়াল হয়েছে ততক্ষণে সে ট্রেন পগার পার। আবার পেছনের ট্রেন ধরে ...। দুটো বিষয় তখন কাজ করে শুধু ভেতরে। এক - লক্ষ্য করা যে আরও ঢেউ উঠছে কিনা। দুই - যতটুকু উঠেছে তাকে কিভাবে এখন এই রাস্তার মধ্যেই নোট ডাউন করব।
আর কমপ্লিট হওয়ার পর কাটাকুটি তো করতেই হয়। কবিতা শব্দ দিয়ে তৈরি হওয়া একটা আর্ট। তার পারফেকশান বলে একটা ব্যাপার আছে না?
★রাজদীপ : নিজের কবিতা ও লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা কিছু আছে?
# সজ্জ্বল দত্ত : ভাবনা নেই। স্বপ্ন আছে। খুব গোপন। এক্ষুনি সেটা " মনের কোণের বাইরে " আনা টা কি ঠিক হবে? যারা পড়ছে এ সাক্ষাৎকার, হাসবে না তো? ... হাসুক গে, বলেই ফেলি 😀। ... সমস্তটুকুর এক মলাটের ভেতরে যথাযথ ইংরেজি অনুবাদ। তবে যথাযথ শব্দটি কিন্তু এখানে ভয়ংকর গুরুত্বপূর্ণ।
★রাজদীপ : কবিতা লেখার সঙ্গে জনপ্রিয়তা, বই বিক্রি, পুরস্কার - এই সব শব্দের সম্পর্ক নিয়ে আপনার মনোভাব জানতে চাই।
# সজ্জ্বল দত্ত : ধুসসস! যত্তো আলতুফালতু ...! ... কবিতা লেখার সঙ্গে ওসবের ন্যুনতম সম্পর্কও নেই । যতটুকু বাহ্যিকভাবে সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় সবটুকুই আর্টিফিসিয়ালি ক্রিয়েটেড ।
★রাজদীপ : এই পৃথিবী এবং সেখানে নিজের বেঁচে থাকা, অস্তিত্ব, অস্তিত্বহীনতা, সময়প্রবাহ - এইসব বিষয় আপনাকে কীভাবে ভাবায়?
# সজ্জ্বল দত্ত : দেখুন, দু'জন মানুষের ইচ্ছে অনুযায়ী অস্তিত্ব, যে ইচ্ছের পেছনে আছে এক ধরনের প্রাকৃতিক তাড়না। এই তাড়নায় ওই দুজন তাড়িত না হলে এ' অস্তিত্বের যে কোনো প্রশ্নই উঠত না, সেটা তো নিশ্চয়ই প্রত্যেকে মানবে। কারো অস্তিত্ব কারো নিজের ইচ্ছেয় নয়, নিয়ন্ত্রক-- মহাশক্তিমান প্রকৃতি, আর মাঝখানে তার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে দম দেওয়া পুতুলের মতো দুটি মানুষ , একটি নারী এবং একটি পুরুষ। আসছে অস্তিত্ব, আমি এই গোটা অস্তিত্বকে বলি প্রাণশক্তি, এবং আমার ভাবনায় পুরো ব্যাপারটা এইভাবে ধরা পড়ে প্রাকৃতিক শক্তির প্রাণশক্তিতে রূপান্তর। ... বিজ্ঞান শক্তির নিত্যতা সূত্র অনুযায়ী বলে শক্তির সৃষ্টিও নেই ধ্বংসও নেই, আছে কেবল রূপান্তর। এই নিয়মেই অস্তিত্ব, এই নিয়মেই অনস্তিত্বও। অর্থাৎ অনস্তিত্ব হল প্রাণশক্তির আবার মহাশক্তিমান প্রাকৃতিক শক্তির অতি ক্ষুদ্র একটি অংশে ফের রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া। ... বিজ্ঞান বস্তুবাদী। সে তার শক্তির নিত্যতা সূত্রে প্রাকৃতিক শক্তি, প্রাণশক্তি এইগুলোর কথা ভাবে না। তার কাছে শক্তি মানে বস্তুবাদী যান্ত্রিক শক্তি, তাপশক্তি, আলোকশক্তি, চৌম্বকশক্তি ইত্যাদি। যদি ভাবতে পারত , তবে এই শক্তির নিত্যতা সূত্র দিয়েই আমার মনে হয় গোটা অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের ধারণা ব্যাখ্যা হয়ে যেতে পারত, আর কোনো থিওরীর দরকার পড়ত না।
আর সময়প্রবাহ? এই প্রাণশক্তির বৈশিষ্ট্য যদি বিশ্লেষণ করি তো দেখি এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল অন্যকে শাসন করতে চাওয়ার প্রবৃত্তি, তার চেয়ে আরও ভালো থাকার ইচ্ছে। ফলতঃ এই প্রাণশক্তির যে ধারাটি মনুষ্যধারা, অনিবার্যভাবে সে ধারা নিয়ে আসে মুদ্রা, পেছন পেছনই আসে অর্থনীতি ও রাজনীতি । এতখানি যখন ভাবতে পারি, তখন এই মুদ্রা , অর্থনীতি আর রাজনীতিকে ঘিরে নিরন্তর আবর্তিত হতে থাকা সময়প্রবাহে আপন অস্তিত্ব টিঁকিয়ে রাখার একটি বই দ্বিতীয় শর্ত তো কিছু ভাবনায় আসে না । "লড়াই লড়াই লড়াই চাই / লড়াই করে বাঁচতে চাই "।
★রাজদীপ : পৃথিবীতে মানবসভ্যতা ও জীবজগতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার ভাবনা জানতে ইচ্ছে করে।
# সজ্জ্বল দত্ত : অত্যন্ত খারাপ। ওই যে বললাম, সবার ওপরে প্রকৃতি, সব শক্তির সর্বোচ্চ শক্তি হল প্রাকৃতিক শক্তি। মানুষের দুর্নিবার লোভ যদি সেই শক্তিরও ওপর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তার ওপরেও নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চায়, তবে তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে যেটা হওয়ার কথা, সেটাই হবে। এখনও সময় আছে, যদি সংযত হয় মানুষ তো ভালো, নইলে অদূর ভবিষ্যতে একদিন সত্যিই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে এই মানবসভ্যতা। মুখোমুখি দাঁড়াবেই বা বলছি কেন, ধ্বংসই হবে।
★রাজদীপ : আরেকটা সুযোগ পেলে নিজের জীবন বা কবিতাকে নতুন কোনো রূপে দেখতে চাইতেন?
# সজ্জ্বল দত্ত : কবি বলতে লিটারেলি যা বোঝায় সেই আঙ্গিকে কোনোমতেই দেখতে চাইব না। জীবনকে চাইব চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে দেখতে। নিজের কবিতাকেও চাইব ক্লোজ আপ, লঙ শট, অ্যাকশান, কাট্, আর এডিটিং জনিত দৃশ্যায়নের ভেতর দিয়ে দেখতে এবং মানুষকে দেখাতে। চাই গোদারের ম্যাসকুলিন-ফেমিনিন বা ফেলিনির এইট অ্যাণ্ড হাফ এর মতো ছবি বানাতে। আহা! এইট অ্যাণ্ড হাফ এর এক্কেবারে শুরুটা ...! ভাবা যায়! ... নিও ক্লাসিকাল, নিও লিবারাল এইসব গালভরা শব্দের ভাবনায় যেতে চাই না। অবাক হয়ে শুধু দেখি ব্যঞ্জনার সূক্ষ্ণতম কাব্যিক গভীরতা শব্দে না লিখেও কিভাবে নিছক দৃশ্যনির্মাণের মাধ্যমে অনায়াসে ফুটিয়ে তোলা যায়। আর একবার সুযোগ পেলে সত্যিই আমি আমার সবটুকু কবিমনকে সঙ্গে নিয়েই ফিল্ম তৈরির পথে যাবো । কিন্তু সে সুযোগ কি আর পাবো😀?
★ রাজদীপ : নিজের লেখা সবচেয়ে পছন্দের দুটি কবিতা পাঠকদের জন্য দিন।
# সজ্জ্বল দত্ত : সবচেয়ে বেশি পছন্দের কবিতা সব দীর্ঘকবিতা। পে অ্যাণ্ড ইউজ, গরুরচনা, ভূতরাজ্য ... আইনক্স ... ম্যাটিনি শো, এইগুলো । কিন্তু ওই ভলিউমের কোনো কবিতা এখানে যুক্ত করা শক্ত । ফলতঃ পছন্দের একটি ছোট কবিতা বরং এখানে রাখছি ।
“হঠাৎ দেখা”
(“রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা”)
নিয়ানডার্থাল : ...হয়ত জঙ্গলে গাছের কোটর থেকে অথবা কোথায় কোন্ গুহার ভেতরে সেই কঠিন লড়াইযুগে যাত্রাসূচনা করে হাঁটতে হাঁটতে আজ তুই-আমি একসঙ্গে ...
আধুনিক : কোন্ পথে হাঁটি! কোন্ অপার সাহারা! (চোরা) বালির ওপর দিয়ে আজন্ম-আমৃত্যু পা ... তলিয়ে যেতে যেতেও মিথ্যে স্বপ্নঘোর - হাত ধরি হাত ছাড়ি ...
নিয়ানডার্থাল : নেশা! নেশা! বুঁদ হয়ে ডুবে থাকা! হাঁটার নেশাও যেন তাড়ির নেশার মত! শরীর চিমসে হোক, রোগা থেকে আরো রোগা, হাঁটার গল্পকথা তবুও একশো পার ... হাজার লক্ষ পার ... কোটি কোটি বছরের হাড়ে দাঁতে পলিমাটি পাললিক শিলা পার ...! হাঁটতে হাঁটতে কত বর্ষা-বসন্তের ঋতু পরিবর্তন, স্থান কাল বিশ্ব, দেশ পরিবর্তন! জঙ্গল ইজারায়, পাহাড়ে টানেল, যত আদিম বাসস্থান সাজানো গোছানো গুহা — নীলবোর্ডে ইতিহাস — তেপান্তরের মাঠ দেড়শো তলার বাড়ি বুকে নিয়ে নিশ্চুপ!
আধুনিক : পৃথিবী ডুবছে, ঠিক সূর্য ডোবে যেমন! কথায় কথায় বেলা বিকেল হয়েই গ্যাছে। পশ্চিমে জানলায় চোখ রাখি, চোখ রাখো, সব রোদ শুষে দূরে চরাচর জুড়ে ঘন আলকাতরার পোঁচ! পূর্বপুরুষ, ওহে আদিম লুপ্ত, এসো মুখোমুখি বসে আজ প্রলয়ের ছবি দেখি, বিনাশকাব্য লিখি, সাধের ভড়ংপ্রিয় সৃষ্টির অস্ত দেখি!
যাকগে, এসব ঘোর! তুমি বলো কোথা থেকে এলে? কোথায় লুকিয়ে ছিলে এতদিন টানা এত হাজার বছর?
নিয়ানডার্থাল : আটলান্টিকে ডুবে। সবচেয়ে নীচে এক শান্ত জলের ফোঁটা, তার গায়ে আশ্রয়ে লেপ্টে লেগেছিলাম, সবুজ প্রবাল ছুঁয়ে নোনাস্বাদ জিভে নিয়ে ছোট্ট এতটুকুন! ... হঠাৎ কী করে যেন জাদুর ছোঁয়ায় ফের প্রাণ পেয়ে সেজেগুজে বিশ্বভ্রমণে আজ! ... তোরা সব ঠিক আছিস? কোথায় থাকিস ভাই?
আধুনিক : বাজেটে শোষণমন্ত্রে গ্লোবালি সাপের গর্তে...
নিয়ানডার্থাল : আয় তবে একসাথে। হাতে এই সুতো বাঁধ। রূপকথা গল্পের দৈত্যপ্রাসাদ ছাদে কড়া মাঞ্জায় এই ধারালো সুতোর শুরু। মাটি জঙ্গল ছেড়ে ইঁটকাঠ কংক্রিট হাইরাইজ মাথা ছুঁয়ে শূন্য পথের রেখা ... সৌর ... মিল্কিওয়ে... কাগজের ফুলে ফুলে সাজানো রাস্তা ধরে সুতোয় লটকে নড়ি ...
একসঙ্গে : সুতো টানছে-ছাড়ছে দৈত্যরাজ । অনন্ত অভাগা আমরা। যত গ্রন্থি, যত শুকনো পিত্তরস, বিশ্বমাতৃকার যত জারজ সন্তান এই শক্ত সুতোর গিঁটে মমির মিছিলে এসো। রক্তারক্তি জার্নি। লুকোনো ক্ষতচিহ্ন ঢাকা। মোমের পৃথিবী থেকে ছাঁচ তুলে আমাদের চলমান লাল-সাদা মোমের শরীর।
0 Comments.