- 5
- 0
বিট্টুর সঙ্গী
সাহেবের কি হল? পড়ুন পরের ২৩ পর্বে…
হরি তার সাহেব বন্ধু টনিকে সাথে নিয়ে জাপানের কোবে শহরের একটি ফুড শপে মাছ ভাজা খেতে লাগল। হরি কতদিন পর মাছ ভাজা খাচ্ছে। তবে মায়ের হাতের ভাজার স্বাদই আলাদা। সাহেবের জন্য হরি অর্ডার করল। সাহের বেশ তৃপ্তি সহকারে মাছ ভাজা খাচ্ছিল, হঠাৎ গলায় কাঁটা আটকে গিয়ে ভয়ানক বিপত্তি ঘটল। শপের মধ্যে উপস্থিত সবাই ব্যতিব্যস্ত। সাহেব বেশ কষ্ট পাচ্ছে। সেখানে আশেপাশে থাকা নানা লোকের জমায়েত হল। হরি শপের মধ্যে একটা রান্না ঘরে ঢুকে কোত্থেকে সেদ্ধ ভাত নিয়ে এসে টনির মুখে দিয়ে ওকে গিলে নিতে বলল। সাহেব হরির কথা শুনে তাই করল। সাহেব সেই ভাত গিলে নিতেই মাছের কাঁটাও সেই ভাতের সাথে পেটের মধ্যে চালান হল। হরি বেশ স্বস্তি অনুভব করল, হরিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ইউ আর আ ব্রিলিয়ান্ট পারসন, এন্ড ইউ আর অলসো মাই ভেরি স্পেশ্যাল ফ্রেন্ড”
সেখান থেকে বন্ধুকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। কোবে পাহাড়ে দুজনে বেড়াতে গিয়ে দেখল, পহাড়ের উপর ছবির মত কাঠের সুন্দর সুন্দর বাড়ী। সমতল শহরের মতই। এখানে আছে অনেক শপিং বিল্ডিং। প্রত্যেকটা সুউচ্চ বিল্ডিং-এ এস্কেলেটারে (রানিং সিড়িতে) এবং লিফটেও যাওয়া যায়। যেমন দশতলা বিল্ডিং, তার পাঁচ তলাই আন্ডারগ্রাউণ্ড। গাড়ী চালিয়ে ঘোরান সিড়ি দিয়ে সোজা দশতলায় চলে যেতে পারে। রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ী এবং সবরকম বাজার পরিচ্ছন্ন যেন ছবির মত পরিষ্কার আঁকা শহর। হরি খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে এমনকি কখনও ঘুম বন্ধ করেও অবসর সময় হেঁটে হেঁটে বা বাসে অথবা ট্যাক্সিতে অবাক হয়ে শহরের বিভিন্ন স্থান প্রদর্শন করে। হরি কলকাতার ছেলে। কিন্তু জাপানের বিভিন্ন শহর এমন ভাবে ভ্রমন করেছিল যেন সে কলকাতার সকল পথঘাটের থেকেও জাপানের বিভিন্ন শহরের পথঘাট ভাল করে চিনতে পারে। জাপানের রাত্রি দিনের থেকে বেশী আলোকিত ও ঝলমলে। সব শহর বা গ্রামেও বহু দোকানই দিবারাত্র খোলা থাকে। কোরেতে "আদবানীর শাড়ীর ভারতীয় দোকান" বিখ্যাত। হরি সেই দোকানে প্রবেশ করে বেশ কটা শাড়ী কিনে নিল। জাপানে গিয়ে হরির ভীষণ ভালো লাগল। কোরে শহর বেশ আভিজাত্যের ছোঁয়া। জাপানের দেশে পদার্পন করা যেকোনো শিক্ষিত মানুষের কাছে স্বপ্ন। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে হরির সেই স্বপ্ন সফল হয়েছে। ভাগ্যিস বাড়ির লোকের বারণকে তোয়াক্কা না করে সে এগিয়ে চলেছে অজানার খোঁজে।
কোরে শহরের মার্কেটিং প্লটে রাতভোর হোটেল, রেস্টুরেন্ট, নাচের ঘর, সিনেমা হল প্রভৃতি খোলা থাকে। জাপানের প্রতি বড় শহরেই একটি করে চায়না টাউন আছে। কোবেতেও আছে। চায়না টাউনে গলিতে গলিতে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট প্রত্যেকটিতে বার সহ চায়নীজ খাবার, স্টেজে সুন্দরী সুন্দরী যুবতীরা নৃত্যরত দেখা যায়। ড্রামবিট্ সহ ইংরেজী গানের মিউজিক ও গান হয়। রেষ্টুরেন্টের মেয়েরা বিদেশীদের আপ্যায়ন করে নানা ধরণের পানীয় পরিবেশন করে। প্রতি টেবিলে প্রত্যেকের পাশে একজন করে যুবতী এসে আলাপ করে। তারা চা, কফি অথবা পানীয় সহ বিভিন্ন খাদ্য ও পরিবেশন করে। সুন্দরী মেয়েরা যেহেতু পরিবেশন করে, মূল্য অবশ্যইঃ অনেক বেশী। জাপানী মেয়েদের বলা হয়, এরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ হাউজ ওয়াইফ। সেবা পরিচর্যায় এরা পৃথিবীর বিশেষ উন্নত মানের। জাপানী ঘরনীদের সম্বন্ধে অনেক গল্প আছে। এরা স্বামীর জন্য জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে থাকে। কোবে শহর থেকে ট্রেনে হিরোশিমার নিকট ''উনো" থেকে টোকিও পর্যন্ত দ্রুততম ট্রেনের জাংশন। তাছাড়া সব ট্রেনই জাপানে খুব স্পীডে চলে। গাড়ীগুলো অতি সুন্দর, শীতের সময় প্রতি সীটের নীচে হিটার থেকে গরম রাখার ব্যবস্থা আছে।
কিয়োটো শহর ছিল জাপানের পুরোনো রাজধানী। এই শহরের হোটেলে সুকীয়াকী খেতে দেয়। বিভিন্ন ভেজিটেবল্ সিদ্ধ এবং তার সঙ্গে কাঁকরা সিদ্ধ করে তার ভেতরের সাদা অংশে দিয়ে সুকীয়াকী তৈরী করা হয়। এছাড়া মাছ ও ফ্রয়েড্-রাইস ইত্যাদি বিভিন্ন খাদ্যও পরিবেশিত হয়।
শহরের প্রতি রাস্তার দুই পাশেই সারিবদ্ধ দোকান এবং প্রায় প্রত্যেক দোকানের দোতালায় দোকানের মালিকের বাড়ি। এখানকার অধিকাংশ দোকানেই ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসপত্র। মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্ট এবং কফিশপ আছে। কফিশপে সুন্দরী ওয়েটাররা ট্রেতে করে পরিবেশন করে। কোন কোন কফি শপে বিভিন্ন খাবার ও স্ন্যাকস্ পাওয়া যায়। বিশেষ ধরনের কফি শপে আনডারগ্রাউন্ড অথবা ঘরের মৃদু আলোতে স্লো জাজ মিউজিক অথবা পছন্দমত ইংরেজী গান শোনা যায়। স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়েরা অবসর সময়ে দলবদ্ধ হয়ে কফিশপে আসে ইংরেজী গান শুনতে। প্রায় প্রতি মোড়েই মিউজিক শপ আছে। জাপানী মেয়েরা অত্যাধুনিক ইংরেজী ও জাপানী সংগীতের ভক্ত। মিউজিকশপে সর্ব্বদা প্রচুর গানের ক্যাসেট বিক্রি হয়।
জাপানে হনসু, কিউসু ও সিককু তিনটি প্রধান দ্বীপ। এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে ফেরী, লোকাল এরোপ্লেন অথবা আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল পথে গাড়ীতে যাওয়া যায়। চলার পথে মনে হবে সব দ্বীপই যেন একই মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত। জাপানের যেকোনো গ্রামও প্রায় শহরের মত উন্নত। গ্রামের মধ্যে মার্কেট বেশ সুন্দর ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। জাপানের যে কোন গরীব বাড়ির জীবনযাত্রার মান অনেক ভাল। কোবেতে হরির জাহাজ জেনারেল সার্ভের জন্য বেশ কদিন ছিল।
এখানে কফিশপে এক সুন্দরী জাপানী মেয়ের সঙ্গে হরির খুব বন্ধুত্ব হয়। মেয়েটির নাম ইয়োকে, সে তার মায়ের একমাত্র সন্তান। মা আর্ট কলেজের প্রফেসর। পিতা বিখ্যাত মিটসুবিশি কোম্পানীর ম্যানেজার। তিনি টোকিওতে থাকেন। জাপানী লোকেদের সন্তান সংখ্যা খুবই কম। মাত্র ১টি, খুব বেশী হলে ২টি। ইয়োকের পিতা সপ্তাহে দুদিন কোবেতে আসেন। বাকী সময় টোকিওতেই থাকতে হয়। ইয়োকে ইংরেজী নিয়ে গ্র্যাজুয়েট হয়েছে। সে একদিন হরিকে তার বাড়ী নিয়ে যায়। তার মা হরিকে আপ্যায়ন করেন। তিনি হিরোসিমার মেয়ে। বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমায় পরমানু বোম ফেটে পাশ্ববর্তী অধিবাসী, যারা জীবিত ছিলেন তারা পরমানু বোমের প্রভাবে রোগাক্রান্ত হয়েছিল। জাপানী সরকার তাদের প্রত্যেককে প্রতি সপ্তাহে ফ্রি স্পেশাল চেক আপ করে। ইয়োকের মাও সেই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। প্রতি সপ্তাহে তাকেও একবার হাসপাতালে যেতে হয়। ইয়োকে গাড়ী ভাল ড্রাইভ করত। সে কোবের ষ্টীমপ্ল্যান্টের ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নিয়ে হরিকে প্ল্যান্ট ঘুরিয়ে দেখায়। বিস্তীর্ণ এলাকা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। প্ল্যান্ট সংলগ্ন ডকইয়ার্ডে নতুন বড় বড় জাহজ তৈরী হচ্ছে। জাপানে ছোট ছোট পার্কে বাচ্চাদের মেলা হয়। ইয়োকে হরিকে নিয়ে সেই পার্কে ঘুরতে যায়। সেখানে ছোটদের মেলায় তারা অংশগ্রহণ করে। এখানকার শহরেও ইয়োকে সাথে নিয়ে হরি ভ্রমন করে।
পরের দিন রবিবার। মা-মেয়ে হরিকে নিয়ে কোবে শহরের বড় বৌদ্ধ প্যাগোডায় গেল। সেখানে সকলে বুদ্ধের উপসনা করে। হরি পরিচ্ছন্ন মন নিয়ে মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধের উপাসনা করে। হরি, বৌদ্ধ অনুষ্ঠানে গৌতম বুদ্ধের জীবনী থেকে সবাইকে অনেক গল্প বলে। পুরোহিতগন তাকে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে বলে। তাঁরা তাকে ভারত থেকে একমাত্র বৌদ্ধ ধর্ম্মের প্রতিনিধি হয়ে মাউন্ট ফুজীর নীচে পৃথিবীর বৃহত্তম বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগ দিতে বলে। হরি, পুরোহিতদের অনুরোধে সেখানে একটি ছোট বক্তৃতাও দেয়। হরি বলেছিল, সব ধর্ম্মের সারমর্ম এক। যে কোন ধৰ্ম্মকে বিশ্বাস করলেই জ্ঞানের আধার হয়। কোন সাধু মানুষ যদি বলে সে ঈশ্বরকে দেখেছে তাহলে সে মিথ্যা বলিবে। কারন ঈশ্বর মহাশক্তি। যেমন বিদ্যুৎ দেখা যায় না। কিন্তু অনুভব করা যায়। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজমান। যে যেভাবে যে রূপে তাকে দেখতে চায় সেরূপেই তাকে অনুভব করতে পারে। একটি জেনারেটরের পিষ্টন দ্রুত নির্দিষ্ট গতি যতক্ষণ না হয় ততক্ষণ পর্য্যন্ত সঠিক বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় না। সেরূপ মানুষের মন যতক্ষণ পর্যন্ত না নির্দিষ্ট গতিতে ভগবৎপ্রেমে চঞ্চল না হবে ততক্ষন পর্য্যন্ত জ্ঞানের আলো উদয় হবে না অর্থাৎ ঈশ্বরকে বোঝা যাবে না। হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করে প্রত্যেক মানুষের আত্মাই ভগবানের শক্তির অংশ। আত্মাই মানুষের জ্ঞানের আলো তার কোন মৃত্যু নেই। সে অমর। হিন্দু ধর্মের অনেক উপদেশবাণী ও বৌদ্ধ ধর্ম্মে সহজ সরল রূপে গৌতম বুদ্ধ প্রচার করেছেন। সব ধর্ম্মের মূল কথাই এক। নিজেকে জানা এবং ঈশ্বরকে উপলদ্ধি করলেই শান্তি পাওয়া যাবে।
----------------------
হরিদাদুর বক্তব্যে সকলের প্রতিক্রিয়া কেমন? পড়ুন পরের ২৪তম পর্বে…
0 Comments.