Sun 13 September 2026
Cluster Coding Blog

মুক্ত গদ্যে রুমকি রায় দত্ত

maro news
মুক্ত গদ্যে রুমকি রায় দত্ত

জীবন ছবি

বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু’পা এগোতেই চোখে পড়ে বুক পেতে শুয়ে আছে স্টেশনটা। কবিতার মতো সুন্দর! ছোট্ট ব্যালকনি থেকেও দেখা যায় তাকে। প্রতিদিন ঐ দিকে চোখ রেখে ভাবি ‘কি নাম দেব তার? কবিতা স্টেশন?’ সেই কোন অতীতে ভূগর্ভ থেকে বালি তুলে পাহাড় বানানো হয়েছিল। আজও আছে সে পাহাড়,বুকে একটা আস্ত গাছ নিয়ে। পাশেই টলটলে ঝিলে ছায়া ফেলে সে। চেয়ে দেখি আমারই অন্তরের প্রতিচ্ছবি প্রকৃতির বুকে আঁকা। মানুষ এভাবেই প্রকৃতিকে বুকে নিয়ে হাঁটে।
প্রতিদিন সূর্য ডোবার পালা শুরু হতেই মনে হয়, ‘আজও তো তোলা হল না ছবি!’ ভাবি ক্যামেরা নিয়ে ছুটে যাই প্ল্যাটফর্মে। কেমন করে ক্লান্ত সূর্য নেমে যায় ঐ বালির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটা’র গা-ঘেষে দিগন্তের কোলে। এমনই একটা ছবি তোলার ইচ্চাটা বাঁচিয়ে রাখি। সবাই বলে ডুবন্ত সূর্যের ছবি দেওয়ালে টাঙাতে নেই! কেন নেই! সব ডুবে যাওয়ার মানে শেষ নয়। কিছু কিছু ডুবে যাওয়া নতুন জন্মের আবাহন সঙ্গীত গায়। সূর্য ডোবে বলেই তো প্রতিটি নতুন ভোরে স্নিগ্ধতা ছড়ায় আমার কবিতা স্টেশন। কচি সবুজ ধানের খেতের মাথা ছুঁয়ে বয়ে যায় ভোরের বাতাস! শরৎ এলেই মাঠের ফাঁকে ফাঁকে জেগে ওঠে সাদা কাশ। দল বেঁধে মাথা নাড়ে হাওয়ার হিল্লোলে। দূর আকাশের দিকে চেয়ে দেখি ভেসে যায় মেঘেরা।
ছুটন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখি আমারই সাথে ছুটছে জীবন,ছুটছে আস্ত একটা প্রকৃতি। কাশবন সরে সরে যায় পিছনে। মেছুনী মাছের ঝুড়ি নিয়ে উঠে বসে দরজার পাশে। হাওয়া কেটে ছুটে চলা ট্রেনের ভিতরে বসে; নাকে রুমাল দিই আর মনে মনে বিরক্তি ছুঁড়ে দিই ওই মেছুনীকে। ফলওয়ালা ফেরি করে ফল, বাঁকানো শিক থেকে ঝুলে থাকে বাদাম-ছোলার প্যাকেট, ঐ যে তৃতীয় লিঙ্গের মেয়ে অথবা ছেলেটা হাতে তালি মারে। ছোট্ট ছেলেটা গোল শিকের ভিতর দিয়ে নিজের শরীরটা প্রবেশ করায়, চায়ে....গরম চায়ে ...গরম হেঁকে যায় লোকটা। প্রতিদিন ছুঁয়ে থাকে বাস্তবের জীবন আমারই চেতনায়। ট্রেন একেকটা কবিতা স্টেশন ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুটে চলে। কত লোক নামে আর ওঠে। একটা চলমান আস্ত জীবন ক্রমাগত সরে সরে যায় অস্তগামী সূর্যের মতো। সবাই তো মনের মতো নয়,তবু তো সহযাত্রী। প্রতিদিন সহস্রবার ট্রেন তার গন্তব্য ছোঁয়। জীবনও তো একটা ট্রেন। প্রতিদিন একেকটা স্টেশন ছুঁয়ে ছুটে চলে গন্তব্যে পথে।
মাঝে মাঝেই পথচলতে দেখা হয় সুদৃশ্য শবযানের সাথে। সুন্দর একটা নাম তার ‘স্বর্গরথ’। খালি রথ ছুটে চলে তার সেদিনের গন্তব্যের পথে। শূন্য বুকে সাজানো নিথর দেহ যার,তার গন্তব্যও শেষ নয়! সে পারি দেয় অনন্ত অসীম এক মহাশূন্যের পথে। সেখানে শেষের বিন্দুটা মিশে থাকে শুরুর সাথে, অস্তাচলে যাওয়া সূর্যের মতো। ক্ষণিকের জন্য চোখ বুজে ছুঁয়ে দেখি বাস্তবতা। গোল গোল ঘুরতে থাকা জীবন! মৃত্যুতেও থামে কি! জীবন মানে একটা বৃত্ত,যার শেষ আর শুরুর বিন্দুটা মিশে থাকে একে অপরের সাথে। জীবন মানে প্রকৃতি,জীবন মানে বেঁচে থাকা,জীবনে মানে প্রবাহমানতা,জীবন মানে ছুঁয়ে থাকা বাস্তবতা!
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register