- 5
- 0
পিয়ানো:- শেষ সঙ্গী
চতুর্থ অধ্যায়:- যে ভবিষ্যৎ তারা দুজনে মিলে এঁকেছিল
প্রথম পর্ব
কোনো মানুষ যখন ভালোবাসার মধ্যে আশ্রয় খুঁজে পায়, তখন সে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, সে স্বপ্নগুলো কখনো খুব বড় হয় না। তাতে থাকে না রাজপ্রাসাদ, অঢেল সম্পদ, পৃথিবীর সমস্ত সুখ। বরং ভালোবাসা গভীর হলে মানুষের চাওয়াটা বড্ড ছোট্ট হয়ে আসে — একটা জানালা, যার পাশে বসে দুজনে বৃষ্টি দেখবে; সকালের আলোয় দু কাপ চা খাবে; সন্ধ্যায় দূর থেকে ভেসে আসা পরিচিত কণ্ঠ শুনবে; আর এমন একটা ঘর, যেখানে ফিরে এসে দিনের সমস্ত ক্লান্তি রেখে দেওয়া যাবে।
অর্ণব আর মেঘলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তাদের প্রেম তখন আর নতুন ছিল না, তবে খুব পুরনোও হয়নি — পৌঁছেছিল সেই জায়গায় যেখানে প্রেমের উত্তেজনার চেয়ে তার স্থায়িত্ব বেশি গুরুত্ব পায়। প্রথম দেখায় যে মানুষটার হৃদয় স্পন্দিত হতো, একসময় সেই মানুষটার অনুপস্থিতিতেই হৃদয় নিজের স্বাভাবিক ছন্দ হারাতে শুরু করে। মেঘলা আর অর্ণবের জীবনেও ঠিক তেমনভাবেই মিশে গিয়েছিল সেই ছন্দ। কারও কাছেই আর কেউ আলাদা কোনো মানুষ বলে মনে হতো না।
অর্ণবের সকালের চায়ের স্বাদে, দুপুরের বইয়ের পাতায়, বিকেলের আলোয়, রাতের পিয়ানোর সুরে — সবকিছুর মধ্যেই মেঘলার উপস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছিল। তাকে আলাদা করে কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না, কারণ সে ছিল সর্বত্র।
মেঘলারও একই অবস্থা। অর্ণবের সঙ্গে দেখা না হলে তার দিন অসম্পূর্ণ থাকতো, কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতাকে সে কোনোদিন দাবি হিসেবে প্রকাশ করেনি — কারণ তার কাছে অর্ণব ছিল একটা আশ্রয়, যেখানে তাকে নিজের কোনো অভিনয় করতে হতো না। পৃথিবীর সামনে সে গায়িকা, শিল্পী, কন্যা, বন্ধু — এমন নানা পরিচয়ে পরিচিত মানুষ। কিন্তু অর্ণবের সামনে এসে শুধু মেঘলা হয়ে যেতে পারতো।
মেঘলার এই বৈশিষ্ট্যই তাকে অর্ণবের কাছে টেনে রেখেছিল। অর্ণব তাকে কখনো জিজ্ঞেস করতো না, "আজ তুমি কেমন আছো?" — কারণ সে জানতো, মেঘলা সবসময় বলবে "ভালো আছি।" তার বদলে সে পিয়ানোর সামনে বসে একটা সুর বাজাতো, আর মেঘলা সেই সুর শুনতে শুনতেই বুঝে নিত অর্ণবের মনের অবস্থা। এভাবেই তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল একটা অদৃশ্য ভাষা।
একদিন বিকেলে তারা বসেছিল অর্ণবের বাড়ির ছাদে। শীতের সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে, শহরের অসংখ্য বাড়ির ছাদ একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, দূরে কোথাও ধোঁয়া উঠছে। কিছু পাখি শেষবারের মতো আকাশ কেটে নিজেদের বাসার দিকে এগিয়ে চলেছে। মেঘলা অনেকক্ষণ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে সেই নীল খাতাটা, যার প্রথম পাতায় লেখা ছিল — "আমাদের অসমাপ্ত সুরগুলোর জন্য।"
এখন খাতাটার বেশ কিছু পাতা লেখা হয়ে গেছে। কোথাও সুরের নোটেশন, কোথাও কবিতার লাইন, কোথাও অর্ণবের লেখা কয়েকটা শব্দ, কোথাও মেঘলার নিজের ভাবনা — তাদের সম্পর্কের দিনগুলো যেন ধীরে ধীরে ওই খাতার পাতায় জমা হচ্ছিল।
মেঘলা খাতাটা বন্ধ করে বলেছিল, "আমরা যদি কোনোদিন বুড়ো হয়ে যাই, তুমি তখনও পিয়ানো বাজাবে?"
অর্ণব হেসেছিল। কিছুক্ষণ থেমে আবার বলেছিল, "তুমি শুনবে?"
মেঘলা বলেছিল, "আমি যদি শুনতেও না পারি, তবুও বাজাবে।"
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে ছিল। মেঘলা তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "কারণ কিছু কথা বা কিছু কাজ সবসময় শ্রোতার জন্য নয়। বরং তা একান্তই নিজের অস্তিত্বের জন্য করতে হয়। যেমন তুমি বাজাও।"
অর্ণব তার কথার মধ্যে হঠাৎ এক অদ্ভুত বিষণ্নতা টের পেয়েছিল। সে জিজ্ঞেস করেনি কেন — সে জানতো, ভালোবাসার মানুষকে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় না, বরং কিছু অনুভূতিকে শুধু পাশে বসে থাকতে দিতে হয়।
কিছুক্ষণ পর মেঘলা আবার বলেছিল, "আমি চাই আমাদের বাড়িটা খুব বড় না হোক, শুধু একটা ঘর যেন বড় হয়।" অর্ণব জানতো কোন ঘরের কথা সে বলছে।
পিয়ানোর ঘর
মেঘলা ধীরে ধীরে তাদের কল্পিত বাড়ির ছবি আঁকতে শুরু করেছিল। জানালার অবস্থান কোথায় হবে, সকালের আলো কোন দিক দিয়ে ঢুকবে, পিয়ানো জানালা থেকে কতটা দূরে থাকবে — এসবেরই তার কাছে একটা নির্দিষ্ট অর্থ ছিল।
সে বলেছিল, "পিয়ানোটা এমন জায়গায় থাকবে, যেখানে সকালবেলা আলো এসে প্রথমে ওর ওপর পড়বে। আমি চাই, ঘুম থেকে উঠে তুমি যখন প্রথমবার ওর কাছে যাবে, তখন তোমার মনে হবে দিনটা একটা সুন্দর সুর দিয়ে শুরু হয়েছে। আর সন্ধ্যায় তুমি যখন বাজাবে, আমি রান্নাঘর থেকে শুনবো — মাঝেমধ্যে হয়তো ইচ্ছে করেই ভুল সুর গাইবো, শুধু তোমাকে বিরক্ত করার জন্য।"
অর্ণব হেসে উঠেছিল। মেঘলার কথার মধ্যে এমন এক স্বাভাবিক সংসারের ছবি ছিল যে তার মনে হয়েছিল, সে যেন ইতিমধ্যেই সেই বাড়িতে বাস করছে। তাদের ভবিষ্যৎ তখন আর কল্পনা ছিল না, তা যেন ধীরে ধীরে বর্তমান হয়ে উঠছিল।
সুখের মধ্যে থাকলে মানুষ তার ভঙ্গুরতা ভুলে যায়। অর্ণবও ভুলে গিয়েছিল — বরং ভাবতে শুরু করেছিল, পৃথিবী তাদের এই সামান্য সুখটুকু নিশ্চয়ই কেড়ে নেবে না।
তবু সেই সময়টুকুতে অর্ণব আর মেঘলা সত্যিই সুখী ছিল। তাদের কোনো বড় দাবি ছিল না, কোনো সামাজিক প্রতিযোগিতা ছিল না, অর্থের হিসাব ছিল না — কেবল একসঙ্গে থাকার ইচ্ছে। আর সেই ইচ্ছেই তাদের কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য।
এক সন্ধ্যায় মেঘলা অর্ণবের পিয়ানোর সামনে বসে নিজের লেখা একটা গান পড়ছিল। গানটার কোনো নাম ছিল না। অর্ণব সুর দেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু একটা লাইনে বারবার এসে আটকে যাচ্ছিল।
মেঘলা বলেছিল, "এই লাইনটার সুর তুমি খুঁজে পাচ্ছ না কেন?"
অর্ণব বলেছিল, "কারণ কথাটা খুব সহজ।"
মেঘলা বলেছিল, "সহজ কথা সুরে বসানো কঠিন?"
অর্ণব বলেছিল, "যে কথা সত্যি, তাকে সুন্দর করে বলা যায় না সবসময়।"
মেঘলা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল, "তাহলে সুন্দর করে বলার দরকার নেই। সত্যি করে বলো।"
অর্ণব পিয়ানোর দিকে তাকিয়ে আবার বাজাতে শুরু করেছিল। এবার সত্যি বেরিয়ে এলো — ধীর, নরম, অদ্ভুতভাবে বিষণ্ণতায় ভরা। মেঘলা চোখ বন্ধ করে শুনছিল। সুর শেষ হলে সে বলল, "এই সুরটার মধ্যে বিদায় আছে।"
অর্ণব হেসে বলেছিল, "সব সুন্দর জিনিসের মধ্যেই একটা বিদায় থাকে।"
মেঘলা তখন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যার অর্থ সেদিন অর্ণব বুঝতে পারেনি। হয়তো মেঘলা বুঝেছিল, হয়তো সে শুধু অনুভব করেছিল — মানুষের সবচেয়ে সুখের মুহূর্তগুলোর ভেতরেও অদৃশ্যভাবে ভবিষ্যতের বিচ্ছেদের ছায়া হাঁটে।
চলে যাওয়ার আগে মেঘলা নীল খাতাটা পিয়ানোর ওপর রেখে গেল। শুধু বলল, "এটা এখানে থাক। আমাদের সুরগুলো তোমার কাছেই নিরাপদ।"
অর্ণব তখনও জানতো না, এই কথাটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর স্মৃতি হয়ে উঠবে। সে জানতো না, একদিন সত্যিই মেঘলা থাকবে না — কিন্তু থাকবে তার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, থাকবে নীল খাতাটা, অসংখ্য অসমাপ্ত সুর, আর থাকবে সেই পিয়ানো, যার সামনে বসে অর্ণবকে একদিন শিখতে হবে কীভাবে একজন মৃত মানুষকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখা যায়।
সেই রাতের শেষে, মেঘলা যখন দরজা পেরিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল, অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল। সিঁড়ির মোড়ে গিয়ে মেঘলা একবার পেছনে তাকিয়েছিল। তাদের চোখে চোখ পড়েছিল, সে হেসেছিল, অর্ণবও হেসেছিল। তারপর মেঘলা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল গলির বাঁকে।
অর্ণব জানালার পাশে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর মনে হয়েছিল — মানুষকে বিদায় দেওয়ার মুহূর্তটা এত সাধারণ কেন? কোন বিদায় যে শেষ বিদায়, তা কেউ জানে না। কোন হাসির পর আর কোনো হাসি দেখা যাবে না, কোন সন্ধ্যাটাই বা স্মৃতির শেষ সন্ধ্যা হয়ে থাকবে — এসবও অজানাই থেকে যায়। সেই অজ্ঞতাই হয়তো জীবনকে সুন্দর করে তোলে, আবার একদিন সেই একই অজ্ঞতা জীবনকে করে তোলে অসহনীয়।
অর্ণবের জীবনে সেই সন্ধ্যা তখন নিঃশব্দে এগিয়ে আসছিল। সে শুধু জানতো না, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টা শেষ হওয়ার আগে আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি।
0 Comments.