- 7
- 0
সম্পাদকীয়।
ঋতুপর্ণ চলে গিয়েছিলেন এই মে মাসেই। রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিতের মাসে। আর কটা দিন এই ধরাধামে থাকলে কি অসুবিধা হত কে জানে । আরো কিছু সংবেদনশীল শিল্প, ছবি আমাদের প্রাপ্য ছিল না কি?
যে যাই বলুক ঋতুপর্ণ র শিল্পী মন নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। যেমন নিখুঁত চয়ন শব্দের লেখনীতে তেমন ছবির ভাষার অভিব্যক্তি। যদিও শেষদিকে ছবি যেন বড় একপেশে হয়ে গিয়েছিল তবু ওড়ীশি নৃত্যের শিল্পীর ভূমিকায় তাঁর ডেডিকেশন দর্শকের মনে দাগ রেখে যায়।
ছবির চেয়ে ঋতুপর্ণর লেখা আমার ব্যাক্তিগত ভাবে মনে হয় বেশি শক্তিশালী।
নীচে রইল প্রতিদিনের রোববারের কলমে প্রকাশিত ফার্স্ট পার্সনের খানিকটা অংশ।
ভালো থাকবেন সকলে।
ইন্দ্রাণী ঘোষ।
"প্রথম কথা বলতে কে শিখিয়েছিল জানি না । কালোর ওপর লাল পাখির নকশা-করা একটা বেডকভার ছিল বাড়িতে । সেটা দেখে প্রথম পাখি চিনতে শিখি । তখন পাখি বলতে পারতাম না । বলতাম ‘কাপি’ ।
প্রথম গান শিখিয়েছিল মাসিমণি । ‘আলো আমার আলো ওগো’ । চান করানোর আগে তেল মাখাতে মাখাতে ।
প্রথম ‘পথের পাঁচালী’ কিনে দিয়েছিল পিসিমণি । পিসিমণির তখনও বিয়ে হয়নি । বাবার সব থেকে ছোট বোন । শ্যামলা রং, মোটা একটা বিনুনি । অপু দুর্গার গল্প পড়ে মনে হয়েছিল, পিসিমণি আমার দিদি হলে বেশ হত !
প্রথম ফাউন্টেন পেনে লিখতে শিখিয়েছিল বাবা । শিখিয়েছিল কেমন করে মহাভারত পড়তে হয় । রাজশেখর বসুর মহাভারত । সন্ধেবেলা হোমওয়ার্ক সেরে আমরা তিনজনে বসতাম । বাবা পড়ত । আমি আর ঠাকুমা শুনতাম । বাবা শিখিয়েছিল কেমন করে জাদুঘর দেখতে হয় । শিখিয়েছিল উত্তর ভারতের মন্দিরের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের তফাৎ কী । শিখিয়েছিল U ছাড়া শুধু Q দিয়ে ইংরেজি বানান হয় না । শিখিয়েছিল ইংরেজি হরফের আসল নাম রোমান ।
মা গান গাইতে পারত না । তাই সঞ্চয়িতা পড়ে ঘুম পাড়াত আমাকে । সেই আমার রবীন্দ্রনাথে হাতেখড়ি । মা যে ছবি-আঁকিয়ে, সে-কথা মনেই থাকত না । একদিন সন্ধেবেলা বিছানায় বসে হোমওয়ার্ক করছি , আর সামনে বসে আমারই একটা পুরোনো খাতার পিছনের পাতায় পেনসিল দিয়ে আঁকিবুকি কাটছে মা । ঝুঁকে পড়ে দেখি, মা স্কেচ করছে । বিছানার ওপাশের টেবিল ফ্যানটার স্কেচ । সেই দিনই শিখলাম তিন ডানাওয়ালা ফ্যানটা আসলে একটা তিন পাপড়ি মেলা ফুল ।
ঠাকুমা শিখিয়েছিল কাঁচালঙ্কার রং সবুজ আর শুকনো লঙ্কা নাকি লাল । শিখিয়েছিল প্রথম পাতে তেতো খাওয়ার পর জল খেলে মিষ্টি লাগে । শিখিয়েছিল গরমকালের কুঁজো আর শীতকালের কাঁথা । পঞ্চুপিসি শিখিয়েছিল বেস্পতিবারের আরেক নাম বিষ্যুদবার । আর সন্ধেবেলার পর সাপের নাম লতা । চিঙ্কু -- আমার ভাই -- প্রথম শেখালো বড়ো হয়ে যাওয়া । প্রথম মিথ্যে কথা কে শিখিয়েছিল মনে নেই । কে শিখিয়েছিল আসলে কী করে বাচ্চা হয় ভুলে গিয়েছি । এক এক ছেড়ে চলে গিয়েছে যে মানুষগুলো, তারা শিখিয়ে গিয়েছিল, শুধু আরও কষ্ট পাবো বলে এই বেঁচে থাকাটা কতো সুন্দর !
বাংলা ভাষা নিয়ে অহংকার করতে শিখিয়েছে রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, শিবরাম, মুজতবা আলী । সত্যজিৎ প্রথম শিখিয়েছে ক্যামেরা দিয়ে গল্প বলা যায় । চাইলে কবিতাও ।
মা চলে গিয়ে দুটো জিনিস শিখিয়ে দিয়ে গেল । মা-রা আসলে অমর আর মা ছাড়া বাবারা বড়ো অসহায়...
কথা হচ্ছে, এতো কিছু শিখেও এমন একটা আস্ত অপোগন্ড তৈরি হলাম কী করে ?"
--- ঋতুপর্ণ ঘোষ
0 Comments.