Sun 13 September 2026
Cluster Coding Blog

মেহেফিল -এ- কিসসা তপন বাগচী (স্মৃতিচারণ)

maro news
মেহেফিল -এ- কিসসা তপন বাগচী (স্মৃতিচারণ)

স্মৃতিচারণ

ধ্রুপদী আধুনিক বাংলা গানের পুনর্জাগরণে-- 'ওয়াহিদুল হক থেকে সঞ্জয় রায়'
পথে মিলেছি আমরা ক'জন হ্যাঁ- এ যেন সেই উনিশ শতকের শেষাংশের পূণর্জাগরণেরই পদধ্বনি শুনছি। রবীন্দ্রনাথের দ্রোহ ভাবনা থেকে আধুনিক বাংলা গান সেদিন উচ্চাঙ্গ সংগীতের খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে যে পথ বের করেছিল- সে পথ ধরেই তাঁরই সময়ে কাজী নজরুলের হাত ধরে প্রতিভাবান সংগীতকারদের দ্বারা শত-সহস্র আধুনিক বাংলা গান সৃষ্টি হয়েছিল, যা একটা সময় থেকে আরেকটা সময়ের মাঝপথে আটকে ছিল যেন। ১৯৫০ সাল পূর্ববর্তী সে সব গানকে সংগীতগুরু ওয়াহিদুল হক ‘ধ্রপদী আধুনিক বাংলা গান’ নামে অভিহিত করে গেছেন। ছায়ানট, আনন্দধ্বনির মাধ্যমে পঞ্চগীতিকবির গান রাজধানীতে প্রসার এবং পরে তা জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মাধ্যমে গ্রামের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেন ওয়াহিদ ভাইরা। কিন্তু মনে মনে ওয়াহিদুল হক যোগ্য লোক খুঁজতে থাকেন 'ধ্রুপদি আধুনিক বাংলা গানে'র প্রচার প্রসারের জন্য। এবং সে সময় তিনি হাতে পান সঞ্জয়কে। সঞ্জয়ের মধ্যে ওয়াহিদ ভাই দেখতে পান জন্মগত ঈশ্বরপ্রদত্ত সুরেভরপুর সংগীতপাগল এবং ভবঘুরে মানসিকতার কর্মে ক্লান্তহীন এক কাজের মানুষকে। তাই তিনি সম্মিলন পরিষদে দপ্তরের সকল দায়িত্ব দিয়ে এবং আনন্দধনির সকল কাজে সঞ্জয়কে সঙ্গে নিয়ে নিজের ভাবনা মতো কাজে লেগে যান। সঞ্জয়ের সাংগঠনিক কাজ এবং পঞ্চগীতিকবির গানের চর্চা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখই ওয়াহিদ ভাই সঞ্জয়ের হাতে তুলে দেন 'ধ্রুপদী আধুনিক গানে’র সেই রত্নভাণ্ডার। পাগলের মত দিন-রাত এক করে নিখুঁতভাবে কঠিন সব গান তুলে সঞ্জয় ছুটে যায় তার ওয়াহিদুল দাদু এবং আরেক সংগীতরসিক নাট্যজন খালেদ খানকে শোনাতে। ব্যক্তিগত আলাপের ফাঁকে আমার কাছে একবার ওয়াহিদভাই বলেছিলেন- ৫০ পূর্ববর্তী কঠিন গলার কাজ সমৃদ্ধ এবং ভাব-রসে পূর্ণ এ সব গান সুমন চৌধুরী এবং সঞ্জয়ই পারে কেবল নিখুঁতভাবে গলায় তুলতে। বছর ঘুরতেই ওয়াহিদুল হকের আরেক শিষ্য, পুরানো সংগীতভাণ্ডারী কে.বি.আল-আজাদ ভাই'র অর্থ সহায়তায় সে সব কালজয়ী গান নিয়ে ‘উদাসী পথিক’ শিরোনামে সঞ্জয়ের অ্যালবাম বের হয়। অ্যালবামের প্রকাশনা উৎসবে পৌরহিত্য ক'রে সঞ্জয়ের গান শুনিয়ে ওয়াহিদ ভাই দেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্বদের মাঝে পরিচয় করিয়ে দেন সঞ্জয়কে। এবং এর কিছু কাল ব্যবধানে একই 'ধ্রুপদী আধুনিক বাংলা গান' নিয়ে বেশ কয়েকটি মঞ্চ অনুষ্ঠানে ওয়াহিদভাই নিজে পৌরহিত্য করে সঞ্জয়কে গান করান মিলনায়তন-ভর্তি বিজ্ঞ-রসিক শ্রোতাদের সামনে। জনসমক্ষে তিনি সঞ্জয়ের কাছে দাবি করেন--সঞ্জয় যেন এসব গান তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সঞ্জয় অনুরূপ আরো প্রতিভাবান শিল্পীদের মাঝে ছড়ানো, এবং তাদের সুযোগ করে দেবার কাজে নিজেকে ব্রতী রাখে । ঐ সব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে টিভি পরিচালক প্রযোজকদের দৃষ্টিতে সঞ্জয় আসে ওয়াহিদ ভাই'র জীবদ্দশাতেই। ২০০৫ এ শচীন দেববর্মণের জন্মশতবর্ষের টিভি অনুষ্ঠানে শচীন কর্তার অপ্রচলিত গান-- "মালাখানি ছিল হাতে, ঝরে তবু ঝরে নাই" করেন সঞ্জয় । বিটিভি'র সম্প্রচার বিভাগের বিশেষ দায়িত্বে থাকা শফিউদ্দিন শিকদারের হাত হয়ে সে গান ঐ বছর শতাধিক বার প্রচার হওয়ায় সারা দেশের রসিক শ্রোতাদের নজরে আসে সঞ্জয়। ২০০৭ এ ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুর পর সঞ্জয় মুষড়ে পড়েন। বিটিভির মহাপরিচালক কাজী আবু জাফর সিদ্দিকী ছিলেন ওয়াহিদুল হকের ভক্ত।ওয়াহিদভাইয়ের প্রয়াণের বছর তিনেকের মাথায় তিনি সঞ্জয়ের গানে মুগ্ধ হয়ে স্বতঃপ্রণোদিত তাঁকে দায়িত্ব দেন বিটিভিতে নিয়মিতভাবে ‘ধ্রুপদী আধুনিক বাংলা গান’-র প্রোগ্রাম প্রচারের। সঞ্জয়ের হাতে আসে ওয়াহিদ ভাইয়ের নির্দেশ পালন করার উপযুক্ত সুযোগ। ১০ বছর ধরে সেই থেকে এখন পর্যন্ত ‘ফিরে চলো আপন ঘরে’ শিরোনামের অনুষ্ঠানটি বিটিভিতে চলছে দেশের সকল সংগীত-সংস্কৃতির সমঝদার মানুষের কাছে প্রধান অনুষ্ঠান হিসাবে। ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা নিয়ে গত তিন বছর যাবৎ একই কাজ শুধু শিরোনাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বেতারে চলছে—‘মনে রেখ মোর গান’ নামে। এরই ধারাবাহিকতায় সঞ্জয় ব্রতী হয়েছেন আমাদের আধুনিক বাংলা গানের ঐতিহ্য রক্ষার কাজে।এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এখনকার প্রজন্মের শত শত শিল্পীকে যুক্ত করেছে। ১৯০১ থেকে ১৯৫০ এর মধ্যের রেকর্ড হওয়া শত শত গানের রচয়িতা, সুরস্রষ্টা এবং শিল্পীদের পরিচয় ঘটিয়েছে বিদগ্ধ সংগীত পিপাসু শ্রোতারদের কাছে। যা পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের ফলে ক্রমনিম্নমানের বাংলা গানের ধারা রোধে এক বিশাল ভূমিকা রেখেছে।করোনাকালে টিভি-রেডিওর প্রোগ্রাম সাময়িক বন্ধ। বন্ধুকে বললাম 'ফিরে চলো আপন ঘরে'র আদলে কিছু একটা করো পেসবুক লাইভে। কথা মত কাজ শুরু। গত ২৮ আগষ্ট থেকে "কথা ও সুরের ঐতিহ্য" শিরোনামে অনুষ্ঠান শুরু করেছেন সঞ্জয় রায় ও দিলীপ গুহঠাকুরতা। আমিও রয়েছে তাঁদের একজন হয়ে। আমরা অনেকেই জানি, ২০২০ তে মোহিনী চৌধুরী জন্মশতবর্ষ। সঞ্জয়ের পরিকল্পনায় আমারা কিছু বন্ধুরা মিলেছিলাম। কোটালীপাড়ায় তিন দিনের সংগীত সম্মেলন করার উদ্দেশ্যে। "সুধীর-মোহিনী সযঙ্গীত উৎসব"। গোপালগঞ্জ উদীচী সভাপতি নাজমূল ভাইকে নিয়ে কোটালীপাড়া মিটিং করেছে সঞ্জয়। আমিও আলাপ করে কবি আসাদ চৌধুরী, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, প্রাবন্ধিক আবুল আহসান চৌধুরী, ড. মোহাম্মদ আলী খান প্রমুখের সঙ্গে আলোচনা করি। তাঁরা সম্মত হন কোটালীপাড়ায় গিয়ে ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। করোনায় সে পরিকল্পনা বাতিল হলে আমরা সিদ্ধান্ত নেই- কোটালীপাড়ার চার কৃতি সংগীত মহামানবের (তারাপদ চক্রবর্তী, সুধীরলাল চক্রবর্তী, মোহিনী চৌধুরী এবং সুকান্ত ভট্টাচার্য) গান- নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের কণ্ঠে রেকর্ড করার। অর্ধশত গানের এই রেকর্ড মিশনে দেশের ৫০ জন ভাল শিল্পীর গান রেকর্ড হবে। যতদূর জানি কোন প্রকার ফান্ড ছাড়াই কাজটা শুরু করেছে- নাজমুল ভাই এবং সঞ্জয়ের পকেট ফান্ড থেকে। এরই মাঝে এসে পড়েছে মোহিনী চৌধুরীর জন্মের শততম বর্ষ পুর্তির দিন। ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। সেইহেতু ৪ঠা সেপ্টেম্বর মোহিনী মোহন চৌধুরীর শততম বর্ষপুর্তি দিনে আমরা অন লাইন লাইভে করতে যাচ্ছি- ‘মোহিনী-সুধীর সংগীত উৎসব’ । মোহিনী চৌধুরীর লেখা এবং সুধীরলাল চক্রবর্তীর গাওয়া এবং সুর করা গান থেকে দেশের নতুন প্রজন্মের প্রথম মানের ৩০ জন শিল্পী অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করবেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন- অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গোপালগঞ্জ জেলার মাননীয় জেলাপ্রশাসক মহোদয়। বিশেষ অতিথি থাকবেন কোলকাতার বেহালা ‘মোহিনী ভবন’ থেকে মোহিনী চৌধুরী-তনয় দিগ্বিজয় চৌধুরী এবং ঋষী বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ অধ্যাপক ড. সত্রাজিৎ গোস্বামী। ছয়টি পর্বে বিভক্ত প্রতি পর্বে ৫ জন শিল্পীর গান শেষে একজন আলোচক থাকবেন। তাঁরা হলেন শিল্পী সুমন চৌধুরী, শিল্পী মাহমুদ সেলিম, শিল্পী সুজিত মোস্তাফা, সংগঠক নাজমুল ইসলাম এবং সংগঠক রফিক সুলায়মান। সঞ্জয় রায়ের গবেষণা ও গ্রন্থণা এবং দিলীপ গুহঠাকুরতার সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে আমিও যুক্ত থাকব মাঝে-মাঝে সূত্রধরের মতো। ধ্রপদী আধুনিক বাংলা গানের এমন এক বিরল আয়োজনের সাথে নিজে যুক্ত হতে পেরে যারপরনাই আনন্দ বোধ করছি। অনুষ্ঠানের লিঙ্ক, শিল্পী তালিকা সহ যাবতীয় তথ্য আসবে সঞ্জয় রায়ের ওয়ালে। বন্ধুদের যুক্ত হয়ে হারানো সে গানের ভেলায় ভাসবার আহ্বান জানাচ্ছি। ৪ঠা সেপ্টম্বর শুক্রবার সকাল ৯-৩০ থেকে চলবে ১-০০ পর্যন্ত। সবাইকে শুভেচ্ছা।
Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register