Mon 05 October 2026
Cluster Coding Blog

সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব - ১১)

maro news
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী (পর্ব - ১১)

বিন্দু ডট কম

এই অঞ্চলে এতোবার আসবার পরও শুভব্রতর সবকিছু এমন অচেনা লাগছে কেন?অচেনা ঘরবাড়ি, অচেনা গলি,সেই গলির আনাচেকানাচে বেড়ে ওঠা পিউপাগুলোও অচেনা। অচিন্ত্যবাবু একটা তালাদেওয়া বড় লোহার গেটে চাবি ঘোরাচ্ছেন।দরজাটা সামান্য ক্যাঁচ করে খুলে যেতেই ইশারায় তিনি শুভব্রতকে ভিতরে আসতে বললেন।এই প্রাসাদোপম বাড়ি পশুপতিনাথ প্রেসের ঘর নয়।এই অট্টালিকায় শুভব্রত আসেনি কখনো!তবে কি এটা অচিন্ত্যবাবুর নিজস্ব বাগানবাড়ি। লোকমুখে শুনেছে সে অচিন্ত্য মিত্রের লৌকিক সম্পত্তির পরিমাণ নেহাত কম নয়।তার অনেকটাই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। এও হয়তো তেমনই কোনও এক অজ্ঞাতবাটিকা!কিন্তু তাঁর পক্ষাঘাত?এতো তাড়াতাড়ি সেরে গেল?শুভব্রত কি তাহলে স্বপ্ন দেখছে! বাগানের নাতিদীর্ঘ ঘাসের ভিতর লাল ইঁট পাতা একটি পথ।সেই পথ দিয়ে গেলে একটি থাম যুক্ত গাড়ি দালান।তবে আশপাশের আগাছা দেখে একথা সহজেই অনুমান করা যাবে যে বহুদিন এখানে কোনও গাড়ি ঢোকে না।অচিন্ত্যবাবু আবারও শুভব্রতকে ভিতরে আসতে বললেন।"এসো ভিতরে"।শুভব্রত যন্ত্রর মতো তাঁর নির্দেশ পালন করে চলল। সদরের ভারি কাঠের গেট পেরিয়ে বৈঠকদালান।সেখানে মেঝেতে সাদাকালো বিরাট খোপখোপ দাবার বোর্ড পাতা।বোর্ড পাতা বললে ভুল হবে।মাটিটাই যেন এক প্রকান্ড দাবার বোর্ড।বিশালাকার সেই ঘরের দুই কিনারায় সাদা ও কালো ঘুঁটি।কিন্তু আশ্চর্যর বিষয়,ঘুঁটিগুলির উপর এক একটি মানুষের মুখ।আরও একটি আশ্চর্য ঘটনা হলো এই যে সেই দাবার পিসগুলো বোর্ডে নেহাতই সাজিয়ে রাখা নেই।বেশ বোঝা যায় যে তারা চলমান।খেলাটি মধ্যপর্যায়ে রয়েছে।ঘুঁটির উপরের মুখগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ একটি মুখ দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল শুভব্রত। এই মুখ সে বিলক্ষণ চেনে।"ত্রিবন্ধ" পত্রিকার জয়ন্তীযাপন ও সম্পাদক বিমলেন্দুবাবুর অপমানিত যন্ত্রণাকাতর মুখ আবারও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল তার কাছে।দাবার বোর্ডের ঘুঁটিতে যে লোকটার মুখ সে চিনে ফেলেছে,তার নাম প্রদ্যুত সরকার।বাংলা কবিতার তরুণ তুর্কী!ও কী করছে এখানে?ভাবতে ভাবতেই অচিন্ত্যবাবুর কন্ঠে তার ঘোর ভেঙে গেল। -ওদিকে যেও না শুভব্রত। এদিকে ঐসো।এঘরে। পাশের ঘরটি অপেক্ষাকৃত ছিমছাম।কিন্তু সবকিছু সরঞ্জাম সেখানে সাদা আর কালো।ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি পড়ার টেবিল ও কালো সোফাসেট পেতে রাখা হয়েছে।অচিন্ত্যবাবু সেখানেই গিয়ে বসলেন।ঘরের কালো দেয়ালে অসংখ্য ছোট ছোট ফ্রেমে মোড়া ছবি। -এখানে এসো।আমার পাশে এসে বসো শুভব্রত। শুভব্রত সামান্য অস্বস্তিতেই অচিন্ত্যবাবুর পাশে বসল।একটা প্রশ্ন এখনও তার মাথার ভিতর ঘুরপাক খাচ্ছে। -আচ্ছা অচিন্ত্যবাবু ,পাশের ঘরে দাবার যে ছকটা আমি দেখলাম,সেখানে কী সত্যিই খেলা চলছিল? শুভব্রতর প্রশ্নর উত্তরে অচিন্ত্যবাবু শুধু বললেন, "একটু বোসো।সব প্রশ্নের উত্তর পাবে যথাসময়ে ।" ইতিমধ্যে শুভব্রত দেখল মাঝখানের পড়ার টেবিলটায় একটা সাদা রাইটিং প্যাড আর একটা লেখার কলম রেখে গেছে কেউ। -মন স্থির করে লেখ শুভব্রত। কতোদিন লেখোনি তুমি!

শুভব্রত একসময়ে কবিতা লিখতো অনেক।তখন "দোয়াব"এর ভুত তার মাথায় চেপে ধরেনি।কিন্তু ক্রমশ পত্রিকার প্রুফ দেখতে দেখতে,সম্পাদকীয় লিখতে লিখতে এক সময়ে বাংলা কবিতার সঙ্গে তার দূরত্ব বেড়ে গেল অনেক।এখন আর যে সে একলাইনও লিখতে পারে না। -ওগুলো ভুল ধারণা বলেই আমার মনে হয়।ওই যে তোমরা বলো?কবিতা লিখতে গেলে একটা যাপন জরুরি! -ভুল হবে কেন? -ছেচল্লিশ বছর হয়ে গেল প্রেস চালাচ্ছি।কতো অঙ্কুরকে পাপড়ি মেলতে দেখলাম।আবার কতোজনকে অঝোরে শুকিয়ে যেতে।এই বছরগুলো ফর্মা মেলাতে মেলাতে আমার মনে হয়েছে জাতকবির খালাসীটোলা লাগে না।তার মজ্জায় মজ্জায় কবিতা থাকে।তাতে সে কবিতাই লিখুক,বা উপন্যাস,যাপন অবিন্যস্ত হয়না কিছুতেই। -আজ যে লিখতে পারি না কিছুতেই... -কেন?কী অসাধারণ লিখতে তুমি!তুমিও তো একজন জাত কবি। -কে জানে!সব কবিতা দোয়াবে গিয়ে থেমে যায়। -বুঝলাম। একথা অবশ্য বারেবারেই শুনেছি।সম্পাদনার লুতাতন্তু একসময় নাকি সমস্ত সৃষ্টিসত্তাকে গ্রাস করে নেয়। সে নিক।কিন্তু তা বলে তুমি সরীসৃপ হবে কেন শুভব্রত ? -ওরা যে নাহলে আমাকে ঘরে ঢুকতে দিত না।আমি যে পাসওয়ার্ড ভুলে যাই বারবার। -কী যায় আসে?ওরা থাকুক না থাকুক,তোমার দোয়াব থাকবেই।কেউ কি তা কেড়ে নিতে পারবে?বলো? -জানি না।আজকাল কোনও কিছুতেই বিশ্বাস হয় না আমার। অচিন্ত্যবাবু বিপন্ন ও শান্ত এক বৃদ্ধ পিতার মতো শুভব্রতকে এতক্ষণ আশ্রয় দিচ্ছিলেন।এবার তিনি সেই বেষ্টনী ভেদ করে রহস্যময় কন্ঠে বলে উঠলেন,"পাশের ঘরের দাবা সম্বন্ধে তোমার অনেক কৌতূহল।তাই না শুভব্রত?" শুভব্রত ঘাড় নাড়ে।তার সত্যিই কৌতূহল!বিশেষত সেখানে প্রদ্যুত সরকারের উপস্থিতি যেন তাকেই কিস্তির সম্মুখীন করে দিয়েছে। -চলো তবে উপরে যাই।উপর থেকে দেখি। সোফা থেকে উঠে পড়ে দুজন।এই ঘরে দুটি দরজা।একটি দরজা দিয়ে তারা প্রবিষ্ট হয়েছিল।অপর দরজাটা খুলে দিলেন অচিন্ত্যবাবু। দরজার ওপারেই সিঁড়িঘর।পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটা লোহার সিঁড়ি সেখানে উঠে গেছে দোতলায়। ওরা দুজন সেই সিঁড়ি বেয়ে সন্তর্পনে উপরের বারান্দায় চলে এল।রেলিঙ ঘেরা বারান্দার মাঝখান থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরের দাবার ছক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।দাবাটিতে এই ঘরে ঢোকবার আগে পিসগুলোর যে পজিশন ছিল,তা এতক্ষণে অনেকটা পালটে গেছে।ওরা কি তবে চলমান?শুভব্রতর মন পড়ে ফেললেন অচিন্ত্যবাবু। -তোমার অনুমান সঠিক শুভব্রত। এই খেলাটা এখনও শেষ হয়নি।বাংলাভাষা নিয়ে এই খেলাটা এখন বেশ জমে উঠেছে। -কে খেলছে? শুভব্রতর প্রশ্নের উত্তরে এক অদ্ভুত রহস্যমাখা দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকেন অচিন্ত্য মিত্র।তার সেই চাহনিতে হতাশা আছে,ক্ষোভ আছে,আবার জিঘাংসা মাখানো হিংস্রতাও রয়েছে।তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে তার চাহনি। -দাবার বোর্ডে পিসগুলোর গলার দিকে নজর দাও শুভব্রত। বলো তো কী দেখছো? -চকচক করছে কিছু একটা।দামী কিছু। -কী জানো তো শুভব্রত, এরা সবাই একসময় খুব সম্ভাবনাময় লেখক ছিল।বাংলাভাষাকে চালনা করবার ক্ষমতা ছিল এদের মেধায়। -তারপর? -তারপরের গল্প বাইবেলের গল্পের মতো।প্রতিষ্ঠান ওদের পুরষ্কৃত করল।গলায় চকচকে মেডেল ঝুলিয়ে নৌকো গজ বানিয়ে দাবার বোর্ডে সাজিয়ে রেখে দিল! -তাহলে এখন?ওরা আর লেখে না? -লেখে তো। কিন্তু ওই চৌষট্টি খোপের বাইরে যাবার সাহস ওদের নেই।তোমার আছে। -আমি?আমি তো আর লিখতেই পারি না। -সম্পাদকীয়টাও কিন্তু একটা কবিতার মতো শুভব্রত। সবসময় মনে রাখবে।তুমি লিখতে পারো।কিন্তু তুমি সে কথা ভুলে যাচ্ছ।তোমার অবস্থা কস্তুরিমৃগের মতো।অপরূপ সুবাসের উৎস হয়েও তুমি খুঁজে চলেছ শুভব্রত। কী খুঁজছো তুমি? -বিন্দু।একটা বিন্দুর মতো চারিদিক লাগছে অচিন্ত্যবাবু। সেই বিন্দুর কোঅর্ডিনেটটা কেউ যদি আমাকে বলতো.... -এসো।তোমাকে আরও কিছু জিনিস দেখাই।

শুভব্রতর হাত ধরে অচিন্ত্যবাবু এবার দোতলার করিডর বরাবর অপরপ্রান্তের গানঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।যেতে যেতে শুভব্রত দেখলো নীচে প্রদ্যুত সরকার এক ডজন মেডেল গলায় নিয়ে অসহায়ের মতো তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।কিন্তু কথা বলার শক্তি তার নেই।সে দৃশ্য দেখে শুভব্রত চোখ ঘুরিয়ে নিল।বিমলেন্দুবাবুকে খুন করলো কে?প্রদ্যুতের মতো দম্ভই তো।বেশ হয়েছে।প্রতিহিংসায় চোরা প্রশান্তি বয়ে গেল শুভব্রতর বুকের ভিতর।

গানঘরে প্রকান্ড দেয়াল।সেখানে বড় বড় বেলজিয়ান কাঁচের আয়না টাঙানো।অচিন্ত্যবাবু তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন।একটি আয়নার সামনে দাঁড়াতেই শুভব্রত দেখল তার প্রতিফলনে সে নয়।এক কৃষ্ণাঙ্গ অন্য কোনও মুখ।কে সে? -ভালেন্তা মালেংগাতানা।বিখ্যাত মোজাম্বিকান কবি।ছবি আঁকতেন।গান শুনতেন।তারপর একদিন তার মা পাগল হয়ে গেলেন।বাবা হারিয়ে গেলেন কোথায়!কেউ বলে রাষ্ট্র তাকে গুম করেছে,কেউ বলে বাবাও পাগল হয়ে গেছেন।মালেংগাতানা সব ছেড়ে ধরলেন ভৃত্যের কাজ।কিন্তু কবিতা তাকে ছেড়ে গেল না কিছুতেই।বুঝতে পারলে? শুভব্রত মাথা নেড়ে পরের আয়নার দিকে পা বাড়ায়।সেখানে প্রতিফলনে তার জায়গায় এক তরুণ যুবার মুখ। -মাত্র তিন বছর বয়সী কন্যাকে হারিয়ে বিষণ্ণতার গ্রাসে পা দিয়েছিলেন এই কবি।মৃত কন্যার নাম ছিল ভোয়াহও।সেইমতো তার আরও একটি কন্যা জন্মালে তার নাম দিলেন ভেলমভোয়াহও।অর্থাৎ ভোয়াহও বেঁচে আছে।মাদাগাসকারের এই বলিষ্ঠ কবি তার শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারেননি।আত্মহননের ঠিক আগের মুহূর্ত অবধি তিনি কবিতা লিখে গেছেন। -জেন জোসেফ রাবিয়েরিভেলো।সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। -ঠিক।কিন্তু তার আগে কবিতার বিশ্বে তার স্বাক্ষর রেখে যেতে ভোলেন না।

পরের আয়নায় ভেসে ওঠে লেরয় জোনস অরফে ইনামু আমিরি বারাকার মুখ।আমেরিকান এই কবি আজীবন তার সমকামিতার জন্য ভর্ৎসিত হয়েছেন।শুভব্রত একে চেনে।তার কাব্যগ্রন্থ "ট্যয়েন্টি ভলিউম স্যুইসাইড নোট" তার অন্যতম প্রিয়।অচিন্ত্যবাবুর মুখে প্রশান্তি ফুটে ওঠে।শুভব্রত এগিয়ে চলে পরের আয়নায়। কিন্তু সেখানে কারোকে খুঁজে পায় না নিজেকে ছাড়া। দৃশ্যের গতিপথ বদলে দেখবার চেষ্টা করে।কিন্তু না।আয়নায় শুধুই শুভব্রত সেনগুপ্ত! -কী দেখছো? -নিজেকে। -না।ওটা তুমি নও। -তাহলে? -ওটা "দোয়াব" পত্রিকার সম্পাদক কবি শুভব্রত সেনগুপ্ত।তুমি একজন কবি শুভব্রত। ভুলে যেও না।আবার তুমি একজন সম্পাদক।মৈনাকের মতো সিনিসিজম তোমার মানায় না।সবসময় মনে রেখ,প্রতিটি প্রকৃত লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক আসলে ভিতরভিতর এক একজন কবি।এই সম্পাদনাই তার কবিতাযাপন।আর তার সম্পাদিত প্রতিটি সংখ্যা তার এক একটি কবিতা।তোমার যেমন 'দোয়াব' ।মনে রেখো।

দপ করে এবার আলোগুলো নিভে গেল।মাথা ঘুরছে শুভব্রতর।কলেজ রোর ঘরে বসে আছে সে।নিশুতি রাত।তাহলে কি এসব কিছু স্বপ্ন ছিল?নাকি দুঃস্বপ্ন?কে জানে।ঘরের ছোট দাড়ি কামাবার আয়নাটা ব্যবহার হয় না কতোদিন।তার সামনে দাঁড়িয়ে শুভব্রত দেখতে পায় আয়নার মধ্যিখানে একটা সোনালি বিন্দু জ্বলজ্বল করছে।বিন্দু নয়।ও কোনও রমণীর টিপ।একটা কবিতার লাইন মনে ভেসে আসছে তার।অনেকদিন বাদে তার আবার লিখতে ইচ্ছে করছে।সে আজ লিখবে।খাতা বের করে লিখতে বসে শুভব্রত।

Admin

Admin

dsaf  

0 Comments.

leave a comment

You must login to post a comment. Already Member Login | New Register